রোদ্দুরকে ছাড়া ঝিলমিলের সময় যতটা বোরিং কাটবে ভেবেছিল, ততটা বোরিং কাটছে না। আবার সবার সাথে থাকার ফলে যতটা ভালো কাটার কথা ছিল, ততটা ভালোও কাটছে না।
সকালের নাস্তা সেরে তিন্নি সৈন্য সামন্ত নিয়ে বাসা থেকে বের হলো। তানিশা কিছুতেই যেতে চাচ্ছিল না। বাইরে গেলেই লোকে নানারকম কথা বলে। আর কথা না বললেও ওদের তাকানোর ভঙ্গি ওর পছন্দ হয় না। তিন্নিকে এ কথা বলতেই সে ধমক দিয়ে বলল, 'আমি থাকতে তুই ভয় পাচ্ছিস? আবারও বলছি, ওদেরকে বলতে দে। আমরা তো ওদের মুখ চেপে ধরতে পারব না। তুই যদি নিজের জায়গায় ঠিক থাকিস, তবে সারা দুনিয়া এলোমেলো হয়ে গেলেও কিছু যায় আসবে না।'
তানিশাকে ভরসা জোগাল সবাই। ওকে সাথে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড় এসে বসল। এরইমধ্যে রোদশী ফোন করে জানাল, সে আর আধাঘণ্টা পর আসছে।
ওরা যখন ছোটো ছিল, তখন তো রোদ্দুর'ও ছিল সাথে। তবে তখন তানিশা ছিল না, সে একটু বেশিই ছোটো ছিল। এই নদীর পাড় ঘেঁষে বড় হওয়া। রোদ্দুর একমাত্র ভাই বলে সকলের'ই আদরের ছিল। ওদের সামনে রোদ্দুরকে কেউ ফুলের টোকাও দিতে পারত না। এইদিকে ঝিলমিল ছিল তার সমবয়সী প্রায়। সবসময় তক্কে তক্কে থাকত, কীভাবে রোদ্দুরকে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দেওয়া যায়। প্রথম যখন রোদ্দুর সাঁতার জানত না, তখন তো প্রায় জীবন যায় যায় অবস্থা হয়েছিল। ঝিলমিলকে সেবার সকলে বকাবকি করেছিল। বিশেষ করে তিথি আপু, রোদ্দুর আবার তার ভীষণ আদরের; ছোটো থেকে বড় করেছে না!
তীরে বসে নদীর স্বচ্ছ পানিতে পা ডোবাতে ডোবাতে স্মৃতিচারণ করতে ভালো লাগছিল। হালকা বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো ভঙ্গিতে ভেসে বেড়াচ্ছিল। তিন্নি এসে বসল ঝিলমিলের কাছাকাছি। ওর বিয়ের পর তো এই প্রথম সরাসরি দেখা তাদের। এই সেই কাহিনীর জন্য কথা বলার সুযোগ'ই পাচ্ছে না। আজ সকাল সকাল অবশ্য বাড়ির সবার সাথে কথা হয়েছে, ওদের বিয়ের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে। রোদ্দুর আর ঝিলমিল রাজি থাকলে কারো দিক থেকে কোন সমস্যা হবে না।
তিন্নি তাই জিজ্ঞেস করল, 'হ্যাঁ রে, রোদ্দুর যে চলে গেল আবার কবে আসবে? আমরা সবাই আছি, ও ঝটপট চলে গেল কেনো? ব্যাটা দিনকে দিন কঞ্জুষ হয়ে যাচ্ছে। শালী বলে আমরা কি ট্রিট চেয়েছি? নাকি বলেছি, দুলাভাই আমাদের সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাও। ঝড়ের গতিতে এসে আবার ওভাবেই দৌড় দিল।'
'আমিও জানতাম না, ও চলে যাবে। সকালে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে দেখি, সাহেব রেডি হচ্ছেন।'
'তোর সাহেবকে বলে দিস, এসব করে লাভ হবে না। আমরা ট্রিট চাই। বিয়ের খাওয়াতে কোনো ছাড় দিব না।'
'তোমরা বলো। আমার কথা কি শুনবে? আমি যা বলি তাই ধুর ছাই করে ফেলে দেয়।' ঝিলমিল হাই তুলতে তুলতে বলল।
'ওইটুকু না হলে ছেলে মানুষের ওয়েট থাকবে নাকি? সবসময় সব কথা মেনে নিলেও হয় না। মাঝেমধ্যে ফেলে দিতে হয়। যাইহোক, এখন বল নতুন পরিবেশ নতুন জীবনে মানিয়ে নিতে পেরেছিস তো? রোদ্দুর কিন্তু ছেলে হিসেবে ভালো। ওর বিরুদ্ধে তুই কোনো অভিযোগ করতে পারবি না। জানিস'ই তো, আগে থেকেই ও কতটা দায়িত্ববান। অন্ততপক্ষে নিজের কথা ভেবে হলেও সে তার দায়িত্ব পালন করবে।.....'
ব্যস, শুরু হয়ে গেল প্রশংসা। রোদ্দুর এই করেছে, রোদ্দুর সেই করেছে, কত কথা! অথচ ঝিলমিলের ভাষ্যমতে, সে একটা শিষ্টাচার বিহীন মানুষ। কথায় কথায় নিজে কাছে চলে আসবে নয়তো ঝিলমিলকে টেনে নিয়ে আসবে। এটুকু বোঝে না যে, এতে তার হার্টবিট কি পরিমাণ বেড়ে যায়।
তিন্নি আপুকে থামানোর জন্য ঝিলমিল বলল, 'না না আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। রোদ্দুর সবদিক খেয়াল রাখে, সামলে রাখে। ও আসলেই দায়িত্ববান, নিষ্ঠাবান, সৎ।'
তিন্নি সুন্দর করে হাসল। রোদশী বাড়ি পৌঁছে তিন্নির কাজে ফোন করতেই ওরা তড়িঘড়ি করে ছুটল। বাড়ি ঢুকতেই ঝিলমিলের ফোন বেজে উঠল। সে দেখল, রোদ্দুর ফোন করেছে। রোদশীর সাথে কোনোরকম প্রাথমিক আলাপ সেরে ছাদে উঠল। ফোন রিসিভ করতেই রোদ্দুর জিজ্ঞেস করল, 'কি খবর? কি করিস?'
ঝিলমিল সহজ গলায় উত্তর দিল, 'কি আর করব? আপু এসেছে। ওদের সাথেই আছি। তুই কোথায় এখন? বাড়িতে?'
'বাড়িতে বসে থাকার জন্য নিশ্চয়ই আমি অতদূর থেকে সকাল সকাল এখানে আসি নাই।' রোদ্দুর কাঠকাঠ কণ্ঠে জবাব দিল।
ঝিলমিল মাথা চুলকে বলল, 'ও হ্যাঁ তাইতো।' আর বলার মত কিছুই খুঁজে পেল না। নিজেকে কেমন বোকা বোকা মনে হচ্ছিল। রোদ্দুর'ও ওপাশ থেকে কিছু বলছে না। চুপ করে থাকার জন্য ফোন করেছে নাকি? আজব।
ঝিলমিল বলল, 'কি করছিস?'
'অফিসে আছি, এখানে তো আর রান্নাবান্না করতে আসি নাই। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল চেক করছি।'
ঝিলমিল থতমত খেয়ে গেল। ছোট্ট করে বলল, 'ওহ আচ্ছা।'
'বাকিদের কি খবর? আসার সময় তো সবার সাথে দেখাও করে আসতে পারলাম না।'
ঝিলমিল জবাব দিল না। কী বোরিং বোরিং প্রশ্ন করছে। এসব শুনে সে কি করবে? কারো খোঁজ নেওয়ার থাকলে সরাসরি তার কাছে ফোন দিলেই হয়। ঝিলমিলের কাছে ফোন করে কেনো অন্যদের খোঁজ করতে হবে।
ঝিলমিল রেগে গেলেও শান্ত কণ্ঠে বলল, 'আর কিছু বলবি? আমার অনেক কাজ আছে। ফালতু বকবক করার মত সময় নাই। ওদের সাথে দেখা না করে গেলেও কিছু হবে না। ওরা তোকে মিস করছে না। রাখছি।'
এই বলে ঝিলমিল ফোন রেখে দিল। 'ধ্যাত্তেরি' বলে নিচে নামল। তানিশা ঝিলমিলের খোঁজ করছিল। দেখল, সামনে দিয়ে হুড়মুড়িয়ে চলে যাচ্ছে নিজের ঘরে। তানিশা পিছু ডেকেও ওর সাড়াশব্দ পেল না। তারপর দরজার সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করল। 'আপু, আপু' বলে সম্বোধন'ও করল কয়েকবার। ঝিলমিল ভেতর থেকে চেঁচিয়ে বলল, 'আমাকে একদম ডাকাডাকি করবি না। তোদের যা মন চায়, তাই কর। আমার ভালো লাগছে না এখন।'
তানিশা ঠোঁট উল্টিয়ে ভাবল, এর আবার কি হলো? একটু আগেই তো ঠিক ছিল, আমাদের সাথেই তো ছিল।
ঝিলমিল আর ঘর থেকেই বের হলো না। সবাই এসে ডাকাডাকি করে হতাশ হয়ে চলে গেল। মূলত মেজাজ খারাপ হয়েছিল রোদ্দুরের উপর। তারপর আর একবার ফোন'ও করল না। ঘরে বসে থেকেও ভালো লাগছে না। ওরা ডেকেছিল, অযথা জেদ করে গেল না। এখান গেলে আবার একেকজন মুখ ফিরিয়ে নিবে। ঝিলমিল সিদ্ধান্ত নিল, আবার যদি কেউ ডাকতে আসে তবে সে একটু বিরক্তবোধ করেই ঘর ছেড়ে বের হবে। মুখে বিরক্তির ছাপ থাকলেও মনে মনে খুশি'ই হবে। কিন্তু আর কেউ তাকে ডাকতে এলো না। ঘরজুড়ে পায়চারি করছে, অনেকক্ষণ সময় নিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে, ফেসবুকিং করছে কিন্তু সময় কাটছে না কিছুতেই। সব হয়েছে এই রোদ্দুরের জন্য। ও তখন ফোন না করলে এখন ঝিলমিলের মুড খারাপ হত না আর সে রাগ করে ঘরের মধ্যে বসে থাকত না।
ঝিলমিল দরজা খুলে ঘর থেকে বের হলো। কোনোদিকে না তাকিয়ে সরাসরি দাদির ঘরে ঢুকে পড়ল। তিনি শুয়ে ছিলেন। ঝিলমিলের উপস্থিতি টের পেয়ে উঠে বসলেন। ঝিলমিল দাদির পাশে বসল। দাদি বললেন, 'কিরে তোর নাকি মনখারাপ শুনলাম? কি হয়েছে? সবাই ছাদে আর তুই ঘরে গিয়ে বসে কেনো?'
'এমনিই আমার ভালো লাগছে না।'
দাদি হেসে বললেন, 'বুঝি বুঝি। দাদুভাই চলে গেছে বলে ভালো লাগছে না তাই তো!'
ঝিলমিল মাথা নিচু করে বলল, 'তুমি তো ঠিকই বুঝেছ, তোমার দাদুভাই তো বোঝে না।'
'ওরে পাগলি, না বললে বুঝবে কীভাবে? ফোন করেছিস, কথা বলেছিস? খোঁজখবর নে, তাহলে তো বুঝবে তোর মনের খবর।'
'ফোন দিয়েছিলাম তো, কিন্তু আমার খোঁজ নিবে কি? সে অন্যদের খোঁজ নিয়েই হুঁশ পাচ্ছে না। আমার খুব বিরক্ত লাগে। এটা কার সাথে বিয়ে দিলে বলো তো?'
দাদি হাসলেন। খাটের পাশে ছোট টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে পানি খেলেন। তারপর বললেন, 'সংসার ধর্মটা বড্ড আজব, বুঝলি। মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হয় সবকিছুর সাথে। আর মেয়ে মানুষের জীবন তো ভাই বড় আশ্চর্যের। এইযে সময় দিতে পারল না আর তুই'ও সেটা মেনে নিতে পারছিস না। এক পক্ষকে একটু ত্যাগতিতিক্ষা করতে হয়। আজ তুই ছাড় দিলি কাল দাদুভাই দিবে। দু'জন এক বন্ধনে বাঁধা পড়েছিস, এই বন্ধন টিকিয়ে রাখতে হবে রে পাগলি।'
ঝিলমিল দাদির কথার গভীরতা বোঝার চেষ্টা করছে। তিনি পুনরায় বলতে শুরু করলেন, 'ওই যে তোরা কী যেনো বলিস না? ও হ্যাঁ, ইগো। সম্পর্কের মধ্যে এই জিনিসটা রাখতে নেই। এই ছোট্ট শব্দটা অশনী ঝড়ের মতো সবকিছু তছনছ করার জন্য সর্বদা তীব্র দাপটে মুখিয়ে থাকে। সেটা বোঝার বা দেখার মতো দিব্যজ্ঞান এখনো তোদের হয় নাই। তোর এখনও কিশোরী চপল মন। অস্বাভাবিকভাবে অস্থির হয়ে থাকবে, এটা তো স্বাভাবিক। তুই কথায় কথায় বেচুইন অনুভব করবি, পাগলামি করবি।' দাদির কথা শুনে ঝিলমিল অতল ভাবনায় ডুবে গিয়ে উপর নিচ মাথা নাড়াতে লাগল। চিন্তা মগ্ন হয়ে পড়েছে সে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় প্রবলভাবে জানান দিচ্ছে, এক্ষুনি এবং এই মুহূর্তে তার রোদ্দুরকে ফোন করা উচিত।
'যা গিয়ে তোর সোয়ামির সাথে কথা বলে আয়, তাহলে মনটা ভালো লাগবে।' চট করে দাদির কন্ঠে সংবিৎ ফিরে ফিরে পেতেই ঝোড়োগতিতে উঠে দাঁড়াল। দাদির মুখপানে চেয়ে বলল, 'আচ্ছা, আমি আসছি।'
ওই ঘর ছেড়ে বারান্দা দিয়ে নিজের ঘরে আসার সময় হঠাৎ হাতের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ঝলঝল করে রোদ্দুরের নামটা ভাসতে দেখে মলিন মুখে হাসি ফুটে উঠল। তৎক্ষণাৎ ফোন রিসিভ করল। লজ্জিত, অপ্রস্তুত এবং উৎকণ্ঠিত মনটা খোলসে ঢেকে বলল, 'হুঁ?'
রোদ্দুর ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করল, 'তোর কি মনখারাপ নাকি?'
'না তো। কে বলল?'
'বলবে আর কে? আমাকে তো রীতিমতো রাগারাগী করা হচ্ছে। ওরা তো অলরেডি চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ফেলছে। তুই কি এখনও ঘরের মধ্যে?'
'না। কে কি বলেছে?'
'তিন্নি আপু ফোন করেছিল। আমাকে বলছে, আমি নাকি তোর সাথে ঝগড়া করে তোর মন খারাপ করে দিছি। এখন তুই রাগ করে ঘরের মধ্যে গিয়ে বসে আছিস। আমি ভাবতেছি, আমি আবার তোকে কি বললাম? আচ্ছা, তুই কি আমার উপর রাগ করে আছিস?' রোদ্দুর খুব সাবধানে জিজ্ঞেস করল।
ঝিলমিল হেসে বলল, 'না। একদম না।'
'তাহলে ওদের ওখানে যা। একা একা ঘরে বসে থাকতে চাইলে আমার সাথেই চলে আসতি। এখানে তো সবসময় একাই থাকিস, ওখানে এখন সবার সাথে আনন্দ ফুর্তি কর।'
সে ঠিক কথাই বলেছে। কিন্তু ওখানে সারাদিন একা একা থাকার পরেও দিনশেষে শান্তি পাওয়া যায়। রোদ্দুরের সাথে সামনাসামনি কথা বলা, ওকে দেখা কিংবা ওর সাথে ঝগড়া করা— রীতিমত ঝিলমিলের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে; ছেড়ে থাকতেই ইচ্ছে করে না।
দু'জনের মধ্যে আরও কিছুক্ষণ করা হলো। রোদ্দুর বলল, সে এখন একটু বের হবে। রাতে ফোন দিয়ে কথা বলবে।
ঝিলমিল ফোন রেখে খুশিমনে সামনের দিকে হাঁটা দিল। মনের মধ্যে যে মেঘের ঘনঘটা ছিল, তা এক নিমিষেই উধাও হয়ে গেল। নাহ, আর একপক্ষীয় ইগো রাখা যাবে না। তাহলে মনের মধ্যে শুধু অশান্তি লাগে, মাথা ভার হয়ে থাকে, কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না, সবকিছু বিরক্তিকর ব্যাপার মনে হয়।
ঝিলমিল ছাদে এসে দেখল, কোনোরকম সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে ওরা পাটি বিছিয়ে বসে কী কী যেনো খেলছে। ঝিলমিল'ও যোগ দিল। ওকে আর কেউ কিছু বলল না।
ঝিলমিলের একটা ভালো স্বভাব হচ্ছে, সে খুব সহজেই মানুষের সাথে মিশে যেতে পারে। এতক্ষণ মনমালিন্য চলছিল, ওকে দেখে বোঝাই গেল না। ওদের মধ্যে সেই সবথেকে বেশি মজা করল। হাসিঠাট্টা সবকিছুতে ঝিলমিল এগিয়ে গেল। কে বলবে, এই মেয়ে একটু আগে রাগ করে ঘরে মুখ লুকিয়ে বসে ছিল!
তিন্নি অবশ্য হেসে বলল, 'ঝিলমিল, আমি তো তোকে দেখে অবাক হচ্ছি রে। নিশ্চয়ই রোদ্দুরের মাথা খেয়ে এসেছিস। তাই এত খুশি খুশি লাগছে।'
ঝিলমিল হেসে মাথা নাড়াল। ওর সাথে সাথে সবাই হেসে উঠল। ওরা অনেক রাত পর্যন্ত ছাদে আড্ডা দিল। রোদ্দুর এরমধ্যে একবার ফোন করেছিল। যখন শুনেছে ঝিলমিল এখনও ওখানে আছে তখন বলেছে, 'আচ্ছা, ঘরে গেলে তুই ফোন দিস।'
তো ঘরে যেতে যেতে প্রায় দু'টোর কাছাকাছি। ঝিলমিল রোদ্দুরের ঘরেই এলো, এ ঘরে এলে ওর গায়ের সুন্দর একটা ঘ্রাণ পাওয়া যায়। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ইতস্তত বোধ করল। রোদ্দুর কি এখনও জেগে আছে? কাল তো অফিস, নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ফোন করতে বলেছিল তো। ফোন না করলেও খারাপ দেখায়!
নিচের ঠোঁটটা দাঁতের কামড়ে চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে রোদ্দুরের নম্বরে ডায়াল করল। তৎক্ষণাৎ ফোন কেটে দিয়ে রোদ্দুর ব্যাক করল। জোরসে গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'গল্পগুজব এত তাড়াতাড়ি শেষ তোদের?'
ঝিলমিল বলল, 'অনেকটা দেরি হয়ে গেল। ভাবলাম, আবার ঘুমিয়ে পড়েছিস কিনা!'
'ঘুম আসছিল না।'
'কেনো? রাত তো অনেক হয়েছে।'
'ওই আর কী! তোর ঘুম পেলে ঘুমিয়ে পড়তে পারিস।'
এই উত্তরে কি বলতে হয়, ঝিলমিলের জানা নেই। সে ক্ষণে ক্ষণে অপ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। রোদ্দুরের সাথে কোনোরকম কথা শেষ করে মনে হলো, তাকে একটা কথা বলা হয় নাই অথচ ওই কথাটা বলা উচিত ছিল। পরক্ষণেই মনে হলো ভালোবাসা একটা গভীর বিষয়, এটা মুখে বলা যায় না; অন্তত তার পক্ষে সম্ভব নয়। তারচেয়ে লিখে দেওয়া যায়, রোদ্দুর বরং সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবে। ঝিলমিল বারবার মেসেজ লিখছে আর কেটে দিচ্ছে। কথা সাজাতে পারছে না। শেষে লিখে দিল, 'আই লাভ ইউ!' আবার ইংরেজিতে ভালো লাগছিল না বলে বাংলায় লিখল, 'ভালোবাসি!' তবুও পাঠাতে পারল না, কেটে দিল। জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে ভাবল, থাক সকালে পাঠাব। তারপর সে শুয়ে পড়ল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙ্গল সকাল সকাল। ফ্রেশ হয়ে এসে ফোন হাতে নিতেই রোদ্দুরের একটা মেসেজ চোখে পড়ল। ওপেন করে দেখল সেখানে লেখা আছে, 'তোকে ছাড়া ভালো লাগবে না জানলে আমি এখানে আসতাম না। কেমন জেনো সব ফাঁকা ফাঁকা, খালি খালি। তুই ছাড়া আমার জীবনটা যে ধূ ধূ মরুভূমি তা ভালো করেই বুঝতে পারছি। ভালোবাসার কথা তো আগেই বলেছি, তোর বোঝার অপেক্ষা শুধুমাত্র। কবে বুঝবি, কবে উপলব্ধি করবি জানিনা। বলেছিলাম, অপেক্ষা করব; তাই করছি। আই সে এগেইন "ভালোবাসি"।'
.