রেখো তোমার বাহুডোরে

পর্ব - ৯

🟢

মির্জাবাড়ির ড্রয়িংরুম শান্ত। একটু আগের ঘটে যাওয়া ঘটনা যেন কারোরই মাথায় ঢুকছে না ঠিক মতো। তখন অবস্থা বেগাতিক দেখে আনান, প্রভাকর,তট মিলে অনেক কষ্টে রাতকে ছাড়িয়েছে। সেই যে ইন্দুকে ছেড়ে রুমটার জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে গেলো নিজের রুমে, আর বের হলো না। ইন্দু এখনো নিজের রুমেই, রাত যাওয়ার পরেই সাবিহা কড়া কন্ঠে নির্দেশ দিলো..

"ঐ মেয়ের রুমে যাতে কেউ না যায়।কাল সকালেই ওকে বাড়ি থেকে বিদায় করতে হবে। "

মেঝো মায়ের নির্দেশে ভয়ে আর কেউ যায়নি ইন্দুর কাছে। এসে বসলো ড্রয়িংরুমে। একটু পরেই সিঁড়ি বেয়ে হাসি মুখে ঘরের পোশাকেই নিচে নামলো আবির্ভাব। ড্রয়িং রুম শান্ত দেখে জিজ্ঞেস করলো...

"কিরে,আজ বাড়ি এতো শান্ত? কাহিনী কি?"

আবির্ভাবকে দেখে যেন সবাই ভুত দেখার মতো চমকালো। আনান সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো...

"তুই কখন এলি?"

আবির্ভাব স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো...

"আমি তো সেই বিকেলেই এলাম বাড়িতে। হসপিটালে তেমন ইমার্জেন্সি নেই, তাই চলে এসেছিলাম আজ। "

ছায়া বললো...

"বিকেলে এসেছিস মানে? কেউই তোকে দেখেনি?"

"আরেহ, তোরা সবাই গীতিচর্চা পরিষ্কার করছিলি, আমি একবার গিয়ে উঁকি দিয়ে চলে এসেছি রুমে ফ্রেশ হতে, আর মায়েরাও কেউ ড্রয়িংরুমে ছিলো না, তাই দেখেনি কেউ। ক্লান্ত থাকায় রুমে গিয়ে ঘুম দিয়েছি। "

কড়ি অবাক কন্ঠে বললো..

"আমি যে তোর রুমে গেলাম, তুই তো ছিলি না তখন? "

"কখন গেলি?"

"দশ মিনিট হচ্ছে "

"আরেহ, আমি আধঘন্টার মতো ছাদে ছিলাম। মাত্রই তো নামলাম ছাঁদ থেকে। তোরা সবাই মিলে এভাবে প্রশ্ন করছিস, কি হয়েছে?"

তট এসে সরাসরি দাঁড়ালো আবির্ভাবের। জিজ্ঞেস করলো...

"তিয়াস বলছিলো ওকে নাকি তুই ফোন দিয়েছিলি,ওর কোন ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলার জন্য। এটা কি সত্যি? "

"আরে হ্যা রে বাবা সত্যি। আরজু কল দিয়েছিলো ক্লাসের নোট নিয়ে নাকি ইন্দুর সাথে কথা ছিলো। আমি নিজেই গিয়ে ইন্দুকে ফোন দিয়ে এলাম। কথা শেষ করে ইন্দু আবার আমাকে আমার ফোন দিয়েও গেলো রুমে। তারপরই তো আমি ছাঁদে গেলাম।।হয়েছেটা কি বলবি আমায় কেউ?? "

একটু আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাটা শুনতেই আবির্ভাব হা হয়ে রইলো। মাত্র কিছু সময়ে এতকিছু হয়ে গেলো অথচ সে টেরই পেলো না, আল্লাহ। বিরস কন্ঠে বললো...

"তোরা কেউ আমাকে একটা কল দিতে পারতি। "

ছায়া বললো...

"তখন এতকিছু মাথায় ছিলো না।"

আবির্ভাব চিন্তিত কন্ঠে বললো...

"আমাকে এক্ষুনি রাত ভাই এর সাথে কথা বলতে হবে। "

বলেই যেতে লাগলে তট তাকে বাঁধা দিয়ে বললো...

"তুই থাক, আমি ভাইয়ার সাথে কথা বলছি এই বিষয়ে। "

বলেই দ্রুত সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে উঠলো তট। মাথার ভেতর চিন্তারা ঘুরপাক খাচ্ছে, সে কি ঠিক করছে? নাকি শুধু শুধুই ঐ মেয়েটাকে...

ঢোক গিললো তট। শব্দবিহীন পায়ে এগিয়ে যেতে নিলেই থমকে দাঁড়ালো কারো কান্নারত কন্ঠ শুনে। এটা যে তিয়াস তা বুঝতে দেরি হলো না তটের। কিছু একটা ভেবেই ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো ইন্দুর রুমের সামনে। দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভেতরের সব এলোমেলো জিনিস পত্র চোখে পড়লো তার। সেই সবের মাঝেই খাটের কার্নিশে পিঠ ঠেকিয়ে বসে দু হাটুতে মুখ গুঁজে কাদছে ইন্দু। বারবার এলোমেলো ভাবে কতকিছুই না বলছে সে। সামনে থাকা আয়নায় তাকিয়ে বারবার বলছে...

"আমাকে কেউ কেন বিশ্বাস করছে না আল্লাহ। আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই। আমি চিনি না কাউকে। কেন বিশ্বাস করছে না কেউ। "

হাত পা ছড়িয়ে কাঁদছে মেয়েটি। তট স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। আদেও তিয়াসের কোনো দোষ নেই তো?

"আমি এখানে থাকবো না, নাহ থাকবো না আমি।আমাকে মেরে ফেলবে উনি। এমন অবিশ্বাস নিয়ে আমি থাকতে পারবো না। কিছুতেই নাহ। আমার কেউ নেই, ছিলোও না, আর হবেও না। প্রয়োজন নেই কারোর আবার জীবনে, কারোর প্রয়োজন নেই.."

চিৎকার দিয়ে কথা গুলো বলতে বলতে ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কতগুলো ইমুজি বল জোর গতিতে আয়নায় ছুড়তে লাগলো সে। এভাবে করতে করতে এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে খাটে হেলান দিয়ে চোখ বুঝলো ইন্দু। ক্লান্ত স্বরে বললো...

"আমায় নিয়ে যাও আল্লাহ, জন্মের পর থেকে সবার বোঝা হিসেবে থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত। আমার জন্য আর কারো ক্ষতি আমি চাই না। "

তট এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইন্দুর দিকে। কিছু বলার মতো খুঁজে পাচ্ছে না সে। কি করবে না করবে বুঝে উঠতে পারছে না। হঠাৎই লক্ষ্য করলো ইন্দু কেমন যেন ছটফট করছে। হুট করেই মেয়েটার ছটফটানি বাড়তে লাগলো। তট বুঝতে পেরেই তারাহুরো করে ভেতরে এগোতে নিলো, পরক্ষণেই ভাবলো, তিয়াস তাকে দেখলে আরো ঘাবড়ে যেতে পারে। তাই আর ভেতরে না গিয়ে সোজা ছুটলো মায়ের রুমের দিকে। রুমে গিয়ে সাবিহা আর আশরাব দুজনকেই পেলো। তটকে এমন ছুটে আসতে দেখে সাবিহা চিন্তিত হয়ে বললো...

"কি হলো তট, এভাবে ছুটে এলি? "

তট ঘনঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে বললো...

"মা, অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে আমাদের। "

"মানে, কি বলছিস তুই?"

"তিয়াস খারাপ না মা। ও নির্দোষ, ওকে কেউ ফাঁসাচ্ছে। "

"মানেটা কি তট? তখন তো... "

"সবটা পরিকল্পিত মমা, আমি জানি এই কাজ কে করতে পারে। কিন্তু তিয়াস কিচ্ছু জানে না এসব নিয়ে। এখন একটু চলো,ও কেমন করছে। "

সাবিহা একবার চিন্তিত হয়ে আশরাবের দিকে তাকিয়ে ফের তটকে জিজ্ঞেস করলো...

"কেমন করছে মানে? "

"ও শ্বাস নিতে পারছে না। অসুস্থ লাগছে ওকে। প্লিজ মা একটু চলো। "

সাবিহা হাতের কাজ রেখে দ্রুত ছুটলো তটের সাথে। তার সাথে সাথে আশরাবও চিন্তিত হয়ে এগিয়ে গেলো। ইন্দুর রুমে ঢুকতেই দেখলো মেয়েটা জানালার নিচে বসে। একহাতে বার বার নিজের বুক চেপে ধরছে, আরেক হাতে জানালার থাই গ্লাসটা খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। শ্বাস নিতে পারছে না সে, মুখ হা করেও যেন অতি কষ্ট হচ্ছে তার।

সাবিহা দ্রুত ছুটে গিয়ে দু হাতে আগলে ধরলো তিয়াসকে। বারবার গালে চাপর দিয়ে বলতে লাগলো..

"কি হয়েছে তোর? এই মেয়ে, কোথায় কষ্ট হচ্ছে আমায় বল? কি হলো?"

ইন্দু জ্বলজ্বল চোখে একবার সাবিহার দিকে তাকিয়ে হাত উচিয়ে জানালা টা খুলে দেওয়ার জন্য ইশারা করলো, মুখ ফুটে ঠিক মতো কথাও বলতে পারছে না। আশরাব ইশারা বুঝে দ্রুত থাই গ্লাসের লক খুলে দিলো। এগিয়ে গিয়ে বারান্দার দরজাটাও খুলে দিলো হাক করে। সাথে সাথেই বাইরে থেকে মৃদু বাতাস এসে শীতল হতে থাকলো রুমটি। ইন্দু পাগলের মতো মুখ উঁচু করে শ্বাস নিচ্ছে, নাকের সামনে হাত দিয়েই বাতাস করছে।

সাবিহা বারবার মাথায় হাত বুলিয়ে ইন্দুকে শান্ত করার চেষ্টা করছে...

"কিচ্ছু হবে না মেয়ে, শান্ত হ একটু, সব ঠিক আছে। "

একটু স্বাভাবিক হতেই ইন্দু নিভু নিভু চোখে পানি চাইলো। ঘরের জগ গ্লাস সব ভেঙে চুরে একাকার অবস্থা। তট এতক্ষণ দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো। ইন্দুর মুখে পানির কথা শুনে দ্রুত গিয়ে নিচ থেকে এক গ্লাস পানি এনে দিলো সাবিহার হাতে। সাবিহা নিজ হাতে ইন্দুকে পানি খাইয়ে দিয়ে স্বযত্নে নিজের বুকে আগলে নিলো। ইন্দুও ক্লান্ত চোখ বুঝে সাবিহার বুকেই লেপ্টে রইলো।

বেশ অনেকক্ষণ ওভাবেই কাটলো। তট গিয়ে একবার রাতের দরজায় কড়া নাড়লো, ভেতর থেকে কোনো উত্তর এলো না। তট আবারও ডাকতে ডাকতে বলতে নিলো..

"ভাইয়া, তিয়াসের শরী...."

তার আগেই ভেতর থেকে রাত হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলো...

"আমি এখন কারোর সাথে কোনো কথা বলতে চাই না তট। চলে যা এখন। "

তট হার মেনে ফিরে এলো আবার ইন্দুর রুমেই। আগের মতোই সাবিহার বুকে লেপ্টে থাকা ঘুমন্ত ইন্দুকে দেখে ধীর গতিতে রুমে এলো সে।

"মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে মা। আমরা মেয়েটাকে অযথাই সন্দেহ করছিলাম।আর আজ তো আমিই ভাইয়াকে উষ্কে ছিলাম, যার ফলে তিয়াসের এখন এই অবস্থা। "

আশরাব বলে উঠলো...

"আমি তোমাদের বলেছিলাম সাবিহা। মেয়েটা ভালো,, সহজ সরল। তোমরা শুধু শুধুই ভুল বুঝলে। "

তট আস্তে ধীরে সবটা বুঝিয়ে বললো সাবিহাকে। সাবিহাও এবার নিজের ভুলটা বুঝতে পারলো। ইন্দুর ক্লান্ত, কোমল মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের প্রতি অপরাধবোধ অনুভব করলো যেন। তট বললো...

"বাড়ির কাউকে এখন কিছু জানিও না তোমরা। কারন যাকে সন্দেহ করছি, সে বুঝে ফেললেই সমস্যা। তাই আগে ভাইয়ার সাথে কথা বলতে হবে ঠান্ডা মাথায়। "

বলেই তট আস্তে করে সাবিহার কোল থেকে ইন্দুকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিলো। তারপর সাবিহাকে বললো...

"তুমি বরং আজ রাতটা ওর কাছেই থেকো মা।ভেতর থেকে দরজা লক করে দিও। ভাইয়ার মাথা গরম এখনো, কখন আবার এসে ওকে.... "

সাবিহা বুঝতে পেরে বললো..

"ঠিক আছে তট বাবা। আমি থাকবো। "

সম্মতি জানিয়ে তট এগিয়ে গিয়ে তখনকার ভাঙা মোবাইলটা তুলে নিলো। নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখে সেটি পকেটে পুরে নিয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।

--------

প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী ঘুম ভাঙতেই সাবিহা তাকালো নিজের পাশে। সাথে সাথেই আবিষ্কার করলো ইন্দুর ঘুমন্ত মুখখানি। মেয়েটা তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। হুট করেই সাবিহার মুখে ফুটে উঠলো কোমল হাসি। মাথায় এক অব্যাপ্ত ভাবনা এসে জরো হলো..

"আচ্ছা আমার যদি একটা মেয়ে থাকতো তাহলে কি সেও এভাবে আমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো?"

হাসলো সাবিহা,যাক মেয়েটা যদি ভালোই হয় তাহলে সাবিহা এবার থেকে তাকে নিজের মেয়ের মতো করেই রাখবে।

ইন্দুকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে উঠতে নিলেই খেয়াল করলো মেয়েটা কেমন গুঁজো হয়ে শুয়ে কাপছে। সাবিহা তার কপালে হাত দিয়ে বুঝতে পারলো ইন্দুর জ্বর আসছে। দ্রুত এসি বন্ধ করে দিয়ে গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে দিলো সাবিহা তার গায়ে। তটকে বলবে ডাক্তার ডাকতে,এই ভাবতে ভাবতেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সাবিহা।

ন'টার দিকে গম্ভীর মুখ নিয়ে নিজের রুম থেকে একেবারে ফর্মাল গেটআপে বের হলো রাত। ব্রেকফাস্ট টেবিলের সামনে এসে একগ্লাস পানি খেলো। সাবিহা তাকে দেখে বললো...

"রাত বাবা, বোস আমি ব্রেকফাস্ট দিচ্ছি। "

সাথে সাথেই রাত নাকোচ করে দিলো। তারপর বললো...

"তিয়াস খেয়েছে? "

সাবিহা উত্তর দিলো...

"নাহ, ওঠেনি এখনো ও। "

রাত সিঁড়ি বেয়ে আবার উঠতে নিলেই সাবিহা দ্রুত বাঁধা দিয়ে বললো...

"থাক না ও, ঘুমোচ্ছে ঘুমাক একটু। "

থেমে গেলো রাত। হাফ নিঃশ্বাস ফেলে বললো...

" রাতে খায়নি ও, উঠলে ভারি নাস্তা দিও। আর বাড়ি থেকে যেন কোথাও না যায় ও খেয়াল রেখো সবাই। "

বলেই আর এক মুহুর্ত ও দাঁড়ালো না রাত। হনহনিয়ে বেরিয়ে চলে গেলো। সাবিহা হাফ নিঃশ্বাস ফেলে কান্তার দিকে তাকিয়ে বললো...

"মেয়েটার গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ ফুলে লাল হয়ে উঠেছে। ব্যাথায় জ্বর আসছে। এখন আবার রাত ওর কাছে গেলে কি না কি হয়।"

কান্তা চিন্তিত হয়ে বললো...

"কি বলছিস মেঝো? তিয়াসের জ্বর? "

"হ্যা গো ভাবি। খুব খারাপ লাগছে মেয়েটার জন্য। আমিও তো কম করিনি বলো.."

"আমি বলেছিলাম ও কিছুতেই খারাপ হতে পারে না।এখন বুঝলি তো। "

"হুম,এবার রাতকে একটু বুঝাতে পারলেই হলো। "

কান্তা হাফ নিঃশ্বাস ফেলে বললো...

"আচ্ছা, আমি বরং দেখে আসি ওকে একটু। "

ইন্দুর রুম ঘুরে এসে কান্তা চিন্তিত হয়ে বললো...

"তিয়াস তো রুমে নেই। "

উপস্থিত সকলেই অবাক। পুরো বাড়ি খুজেও পাওয়া গেলো না মেয়েটাকে। অবশেষে গেটের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই বললো ইন্দু আরো প্রায় ঘন্টাখানেক আগেই বেরিয়ে গেছে।

-----

সময় প্রায় সাড়ে দশটা। রাত চুপচাপ কাজ করছে। কারোর সাথেই তেমন কোনো কথা বলছে না। আনানের কাছে মাত্রই বাড়ি থেকে ফোন এসেছে, তিয়াস যে বাড়ি নেই। ভয়ে কেউ এতক্ষণ সাহস পায়নি রাতকে জানাতে। আনান খবরটা কি ভাবে রাতকে জানাবে সেই চিন্তায় আছে। পরবর্তী কথাটা চিন্তা করেই তার ঘাম ছুটে যাচ্ছে। তিয়াসের কপালে দুঃখ আছে আজ। রাতের কেবিনে গিয়ে আমতা আমতা করে মাত্রই কথাটা বলতে নিচ্ছিলো আনান, তখনই কেবিনে এলো আবির্ভাব আর তট। তটকে দেখেই ভ্রু কুঁচকালো রাত আর আনান। আনান জিজ্ঞেস করলো...

"তট ভাই,,তুই অফিসে? "

"ভাইয়ার সাথে কিছু জরুরি কথা বলার আছে আমার,, যেগুলো হয়তো বাড়িতে বলা ঠিক হবে না। "

রাত সরাসরি বললো...

"আমি এখন কারোর সাথে কোনো কথা বলতে চাই না।"

তট এবার অনুরোধের সুরে বললো...

"আ'ম সরি ভাইয়া, কিন্তু তোকে এখন কথা গুলো শুনতে হবে। আর মাথা ঠান্ডা রেখেই শুনতে হবে। "

রাত এবার সামনে থাকা ল্যাপটপটি বন্ধ করে সরাসরি তটের দিকে তাকালো। তট দম নিয়ে বললো....

"কাল যে তিয়াস আবির্ভাব ভাই এর ফোন দিয়ে তার বান্ধবীর সাথেই কথা বলছিলো, তা হয়তো এতোক্ষণে শুনেছিস তুই। "

রাত চুপ রইলো। তট এবার পকেট থেকে গতকালের ভাঙা ফোনটা বের করে রাতের সামনে টেবিলে রেখে বললো....

"এই যে কালকের ফোনটা। আইফোন 14 প্রো। যেটা কেনার মতো সাধ্য যে তিয়াস বা তার বান্ধবী আরজু কারোরই নেই, তা হয়তো বুঝিস তুই। আর আসল কথা হলো এই ফোনে থাকা দুটো সিমকার্ড, যেগুলোর একটা নন রেজিষ্ট্রেড, যেটায় কাল তুরগ লাহোরের কল এসেছিলো। আর একটা সিম যেটা অন্য এক জনের নামে রেজিষ্ট্রেশন করা। "

রাত ভ্রু কুচকে তাকাতেই তট বললো...

"সিমটা এলমা খানের নামে রেজিষ্ট্রেশন করা। আর লক খোলার জন্য প্লাশ দেওয়ার কারনে ফোনের সব ছবি ফাইল উধাও হলেও খুটিনাটি বিষয়, যেমন ফোন রেজিষ্ট্রেশন নেইম, এড্রেস, টাইম, ব্লুটুথ নেইম, হটস্পট নেইম সব কিছুই এলমা খানের নামেই। ধারনা করছি ফোনটা এলমার পুরোনো ফোন, নতুন ফোন কিনায় হয়তো রেখে দিয়েছিলো, এখন সময় বুঝে এটাই কাজে লাগিয়েছে। এক রাতের মধ্যে এই টুকুই জানতে পেরেছি ভাইয়া। তিয়াস সম্পূর্ণ নির্দোষ। "

রাত স্তব্ধ হয়ে রইলো। এতো কিছু তার মাথাতেও আসেনি। কি করে ফেললো সে।

আনান আমতা আমতা করে বললো...

"কাল রাতে আমিও ভেবে দেখলাম অনেক কিছু। ফোনে তখন তুরগ বলছিলো তিয়াস তারাহুরো করে কল কেটে দিয়েছিলো রাত ভাইকে দেখে। আমরা যখন রাত ভাইয়ের সাথে তিয়াসের রুমে গেলাম তখন তিয়াস ছিলো আয়নার সামনে। আর ফোনটা ছিলো দরজার পাশে ফুলদানিতে। মানে ফোনটা রাখতে হলে তিয়াসকে অবশ্যই দরজার সামনে পড়তে হবে। কিন্তু আমরা কেউই কিন্তু তিয়াসকে দরজার সামনে দেখিনি সিঁড়ি থেকেই।"

আবির্ভাবও বললো....

"আর তোরা বললি তুরগ ওকে তিয়াস বলেই ডাকছিলো। কিন্তু ভাবার বিষয় হলো,ওর আসল নাম বিভাবরী হাসনাত ইন্দু। বাইরের যে কেউ ওকে ঐ দুটো নামেই চেনে। তিয়াস তো রাত ভাইয়ের নিজের দেওয়া নাম, সেই সুবাদে শুধু মাত্র আমাদের বাড়ির সকলে ওকে তিয়াস নামে ডাকে। মানেটা বুঝতে পারছিস তোরা? "

তট বললো...

"হুম, তুরগ লাহোর তিয়াসকে তিয়াস বলে ডাকার কথাই নাহ। কিন্তু ডেকেছে কারন ও তিয়াসের আসল নাম দুটো জানেই না। ইভেন যে ওকে কল করতে বলেছে, সেও তিয়াস বলেই পরিচয় করিয়েছে।আর এলমা খান যেহেতু অহির ফ্রেন্ড, তাই আমি শিউর বলতে পারি এই কাজটা এলমার সাথে মিলে অহি করেছে, ইভেন আরশি ফুপিও যুক্ত থাকতে পারে৷ "

রাত দু হাতে মুখ ঢেকে ফেললো৷ মাথা কাজ করছে না তার। চিন্তিত কন্ঠে বললো....

"তোরা এসব এতক্ষণে আমাকে বলছিস? "

তট বললো...

"কাল রাতেই আমি তোকে ডাকতে গিয়েছিলাম তওয়াসের শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল বলে। কিন্তু তুই বললি কারোর সাথেই কথা বলবি না।আমারও কিছু প্রমানের দরকার ছিলো। তাই এই এতক্ষণে বলছি। "

রাত আকষ্মিক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, ভীত কন্ঠে বললো...

"তিয়াসের শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল? "

"হ্যা,,চিন্তা করিস না। মা বাবা আর আমি মিলে সামলে নিয়েছি। "

রাত অবাক হয়ে বললো...

"মা ও জানতো এটা, অথচ আমাকে সকালে কিছুই বললো না?"

কথার মাঝেই আবির্ভাবের ফোনটা বেজে উঠলো। ফোন স্ক্রীনে আরজু নামটা দেখেই রিসিভ করে কানে তুললো সে। সাথে সাথেই ওপাশ থেকে আরজুর কর্কশ কন্ঠ ভেসে এলো...

"আমার ইন্দুর গালে দাগ কেন? ওর এই অবস্থা কি করে হলো উত্তর দিন আমায়৷ "

আবির্ভাব ঘাবড়ালো।আমতা আমতা করে বললো....

"ত্ তুমি কি করে জানলে?"

"ও আমার সামনে বসে আছে। আমি নিজ চোখে দেখেছি। আমায় উত্তর দিন আপনি,, আমি এই ভরসায় আপনাদের বাড়িতে পাঠিয়েছি ওকে?"

আবির্ভাব অবাক হয়ে বললো..

"ইন্দু তোমার কাছে? "

সাথে সাথেই রাত ভ্রু কুঁচকে তাকালো, তা দেখেই আনান বললো...

"ওহ সীট,,কথায় কথায় তো ভুলেই গেছিলাম। তিয়াস বাড়িতে নেই। সকাল সকাল কাউকে কিছু না জানিয়ে আমাদের আগেই বেরিয়ে গেছে ও বাড়ি থেকে। "

কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই রাত গর্জে উঠে টেবিলে থাকা ছোট্ট কাঁচের সোপিজটা ছুড়ে ফেললো ফ্লোরে। গর্জে উঠে বললো...

"আমার তিয়াসের কিছু হলে আমি কাউকে ছাড়বো না, বলে রাখলাম। "

রেখো তোমার বাহুডোরে গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে ঘেরা রোমান্টিক ও থ্রিলার গল্প