রেখো তোমার বাহুডোরে

পর্ব - ৪

🟢

তিন তিনটে প্রান গাড়িতে, তবে কারোর মুখেই কোনো প্রকার টু শব্দও নেই। আবির্ভাব ব্যস্ত ড্রাইভ করতে, রাত ব্যস্ত মিররে তার তিয়াসকে মুগ্ধ নয়নে দেখতে আর ইন্দু? ভেজা চোখে জানালা দিয়ে বাইরে প্রকৃতি দেখতে। মনের ভেতর তুমুল ঝড়। কি হবে কি হবে করে। আরজুর মুখটা বেশ মনে পড়ছে ইন্দুর। আসার সময় মেয়েটা ইন্দুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিস্তব্ধ হয়ে রয়েছিলো।

ইতোমধ্যেই ইন্দু সামনে থাকা দুই জন ব্যক্তির নাম জেনে নিয়েছে। তবে তাদের সাথে নিজ থেকে কথা বলার মতো সাহস পাচ্ছে না। এরও বিশেষ কয়েকটি কারন রয়েছে। ইন্দু সভাবতই একটু বাচাল প্রকৃতির মেয়ে,বেশিক্ষণ চুপ করে থাকতেই পারে না। কিন্তু এখন ভয় হচ্ছে এনারা তাকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, আর নিয়ে যাওয়ার কারনও অজানা। আরজুর ভরসাতেই তো ইন্দু এতটা এগিয়ে এসেছে আজ, তারউপর লিমা আন্টিও নেই এখন, ইন্দু যে তাকেও ভীষণ মিস করছে। এবার কোনো বিপদ হলে তাকে যে বাঁচানোর মতো কেউ নেই।

এদিকে রাত ঠিক বুঝতে পারছে তার তিয়াসের মনের অবস্থা। কিন্তু এই মুহুর্তে সে একটা কথাও বলচে না তার সাথে। অপেক্ষা বাড়ি পৌছানোর। তিয়াসের মন থেকে সকল ভয় দূর করে তবেই রাত তার তিয়াসের সাথে স্বাভাবিক হবে।

--------

সন্ধ্যার সময়টায় মির্জা বাড়ির প্রায় প্রতিটি সদস্যই বাড়িতে থাকার চেষ্টা করে। আজও তেমনি আছে। বড়সড় ড্রয়িং রুমটার এক পাশে গোল করে সোফা সেট বিছানো। সেথায় জায়গা করে নিশয়েছে বাড়ির কর্তারা। আর সিঁড়ির সামনেটায় গোল করে বসেছে তুরুলা বাহিনী। সবার মাঝে চলছে কাগজ আর ইশারার খেলা 'কি'লার কি'লার'। দরজায় বেল পড়ায় সায়র উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো, সাথে সাথেই সবার নজরে পড়লো আবির্ভাব রাত আর তাদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ে। পড়নে তার একটি ছিমছাম গোল জামা, উপরে কোটি, মাথার লম্বা চুল গুলে মাঝখানে সিঁথি করে দুটো বেনি করা।

শুধু মাত্র আনান ছাড়া ইন্দুকে আর কেউই চিনে উঠতে পারে নি। এদিকে বাড়ির শান্ত পরিবেশ ছাড়িয়ে পৃথিবী গোল থেকে উঠে দ্রুত ক্যামেরা চালু করে এগিয়ে এলো রাতদের সামনে। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো...

"গায়েজ, গায়েজ, দেখুন আমাদের রাত ভাই কোথা থেকে একটা পুতুল কুড়িয়ে এনেছে। "

কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই রাত ধমক দিতে যাবে। ঠিক তখনই পাশ থেকে কারো উচ্ছল হাসির শব্দে থমকে গেলো সে। তড়িৎ গতিতে তাকাতেই দেখলো তার তিয়াস হাসছো। হাসির দরুন তার চোখ গুলো ছোটছোট হয়ে গিয়েছে। রাতের দুনিয়া যেন ওখানেই আঁটকে রইলো। মনে প্রশান্তি অনুভব হলো এই ভেবে যে 'যাক, তিয়াসের ভয় হয়তো কিছুটা হলেও কেটেছে। '

"এখানে কি কোনো অনুষ্ঠান চলছে? এতো মানুষ যে? "

তিয়াস হাসি মুখে রাতের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করছে। এটা যে অবিশ্বাস্যই ঠেকলো রাতের কাছে। তার তিয়াস নিজ থেকে তার সাথে কথা বলছে। রাত হালকা হেঁসে উত্তর দিলো...

"নাহ তিয়াস, এরা সবাই আমাদের বাড়ির লোক।"

এবার ইন্দু অবাক চোখে তাকালো সবার দিকে।

তুরুলা বাহিনীর সবাই এতোক্ষনে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে।একের পর এক আবির্ভাব আর রাতের দিকে প্রশ্ন আসতে লাগলো...

"এই মেয়েটি কে.."

রাতের আগেই উত্তর দিলো ইন্দু।হাসি মুখে বললো...

"আমার নাম বিভাবরী হাসনাত ইন্দু। আমি.. "

ইন্দুকে থামিয়ে দিয়ে এবার তট শক্ত কন্ঠে রাতকে প্রশ্ন করলো....

"ভাইয়া, এই রকম অচেনা কাউকে হুট করে বাড়িতে নিয়ে এসেছিস, কাউকে তো আগে থেকে কিছুই জানালি না। "

রাত এবার বললো...

"ও হলো তিয়াস। আমার বহুকালের পরিচিত। আপাতত ও আমাদের সাথেই থাকবে এখানে। "

বাড়ির কর্তারা নিশ্চুপ, কারন আবরার মির্জার আগে অন্য ভাইরা কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছে না। আর আবরার মির্জা চুপ রয়েছে, কারন রাতকে তিনি চেনে। আর তিনি এটাও জানে রাত তাদের সবটাই বলবে, শুধু একটু সময়ের অপেক্ষা।

তটকে হালকা চিন্তিত দেখালো।তেজি কন্ঠে না'কোচ করে বললো...

"মানেটা কি ভাইয়া। এভাবে হুট করে কাউকে বাড়িতে নিয়ে আসা যে কতটা রিস্কি তা আমার থেকে তুই- ই ভালো জানিস। তার উপর ঐ তুরগ লাহোর এখনো চুপচাপ। কোনো হাঙ্গামা ছাড়া যে ঐ এরকম প্ল্যান করে পাঠায় নি একে তার কতটুকু নিশ্চয়তা আছে? "

রাতের কন্ঠ দৃঢ় হলো। তটের দিকো তাকিয়ে সরাসরি বললো...

"আমি যা সীদ্ধান্ত নিয়েছি আর যা করছি তা ভেবে চিন্তেই করছি তট। এই নিয়ে আমি কারোর পরামর্শ নিতে চাই না। "

তটের রাগ বাড়তে লাগলো। ভাইকে যে বলে কিছুই বুঝানো যাবে না তা ভালো করেই বুঝে গেছে সে। এই মুহুর্ত মা ছাড়া আর কারোর সাথে কথাটা বলা যুক্তিযুক্ত মনে হলো না তটের। তাই রাগে গজগজ করতে করতে ছুটলো মায়ের রুমের দিকে।

রাত নজর দিলো না সেথায়। কন্ঠস্বর কোমল করে ইন্দুর দিকে তাকিয়ে বললো...

"তিয়াস, ভয় লাগছে আর? সি, এখানে আমরা একা না। এখানে সব সময় সবাই এক সাথেই থাকে। "

ইন্দু তটের যাওয়ার দিকে আঙুল তাক করে বললো..

"ঐ ভাইয়াটা রেগে গিয়েছে আমি এসেছি বলে? "

"ওসব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাকে এখনো কেউ ঠিক করে চিনে উঠতে পারে নি তো তাই এমন টা হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই সবটা ঠিক হয়ে যাবে। এখন তুমি পাঁচ মিনিট ঐ রুমটায় গিয়ে বসবে। পারবে? "

রাতের চোখের ইশারায় দেখানো রুমটার দিকে একবার তাকিয়ে ইন্দু 'আচ্ছা' বলে এগিয়ে গেলো সেথায়। ইন্দু চলে যেতেই রাত এগিয়ে এলো তুরুলা বাহিনীর কাছে। বললো...

"তোরা সবাই হয়তো ভাবছিস ও কে আর কেনই বা ওকে আমি নিয়ে এসেছি এখানে। "

কেউ উল্টো প্রশ্ন করার সাহস পেলো না রাতকে। শুধু একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। তা দেখে রাত বললো...

"ও তিয়াস। আমি স্বইচ্ছায় ওকে নিয়ে এসেছি। দেখতেই পাচ্ছিস তোদের সবার থেকেই বয়সে ছোট ও৷ তবে লাইফটা তোদের মতো নর্মাল না ওর। মা- বাবা নেই ছোট থেকেই, যাকে নিজের আপন ভাবতো তিনিও গত তিনদিন আগে মারা গিয়েছেন। তো আশা করবো তোরা ওর সাথে এমন কোনো আচরন করবি না যাতে ও কষ্ট পায়। আর তোদের দায়িত্ব ওকে দেখে রাখা, ভালো খারাপ যাই হবে আমাকে আপডেট দিবি। পারবি? "

সবাই একসাথে বলে উঠলো..

"ওকেয় ভাই। "

এবার অহি প্রশ্ন করে বসলো...

"কিন্তু ভাই, এভাবে অচেনা কাউকে বাড়িতে আনার কারন কি? "

"সেই সব নিয়ে আমি বড়দের সাথে কথা বলবো। আর হ্যা, এই প্রশ্নটা যেন কেউ ভুলেও ওকে না করে, এটা মাথায় রাখবি। "

সবাই সম্মতি জানালো। রাত সবাই কে চোখের ইশারায় যেতে বললেই সবাই রওনা দিলো গেস্ট রুম অর্থাৎ যেখানে ইন্দু আছে সেই রুমের দিকে।

আর রাত বড়দের সাথে ইন্দুর ব্যপারে প্রয়োজনীয় কথা বলে নিলো।

রুমের জানালার দিকে মুখ করে তাকিয়ে বসে আছে ইন্দু। একটু আগের হাসিখুশি ভাবটা এখন আর নেই। একা হলেই যে সকল চিন্তারা ঘিরে ধরে মেয়েটাকে৷ কিন্তু এই মন খারাপটা আর বেশিক্ষণ থাকতে পারলো না। তুরুলা বাহিনীর আগমনেই ফের হাসি ফুটলো ইন্দুর মুখে। সবাই খাটের সামনে নিচে ফ্লোরে বসতে দেখেই ইন্দুও সবার সাথেই নিচে নেমে বাবু হয়ে বসলো। ছায়া বললো...

"তুমি ওখানেই বসো না সমস্যা নেই। "

ইন্দু হেসে বললো..

"সবাই নিচে বসছেন যে। আমি উপরে বসে দেখতে ভালো লাগছে না৷ নিচেই বসবো। "

সায়র হেসে বললো...

"আসলে আমরা এতজন একসাথে একবার খাটের উপরে বসেছিলাম, দু মিটিনের মধ্যেই খাটের তক্তা ভেঙে সবাই নিচে। সেই থেকে ভয়ে আর সবাই এক সাথে খাটে বসি না। "

সায়রের কথায় মুহূর্তেই হাসির ফোয়ারা বইলো রুমটায়, সেই সাথে তাল মেলালো ইন্দুও। রণ বললো...

"তিয়াস কিন্তু আমাদের সবারই ছোট। আর আমরা কিন্তু কাউকে তুমি আপনি করে বলি না,তাই তিয়াশকেও তুই করে বলবো হুহ।"

কড়িও তাল মিলিয়ে বললো...

"হ্যা হ্যা,,তিয়াস তোমার কি খারাপ লাগবে তুই করে বললে? "

"একদমই না,, আপনারা আমাকে তুই করেই বলতে পারেন। কাছের মানুষ মনে হয়। "

আফনান বললো....

"তাহলে তুইও আমাদের তুই করেই বলবি? "

সাথে সাথে দু হাতে মানা করলো ইন্দু..

"না না, আপনারা আমার থেকে অনেক বড়, আমি আপনাদের তুই করে বলতে পারবো না। আর আমি আমার আরজুকে কথা দিয়েছি ওকে ছাড়া এরকম কাউকে তুই করে বলবো না। তুমি করে বলি??"

সবাই একসাথে বললো...

"আচ্ছা, ঠিক আছে। "

হুট করেই ইন্দু এক হাত দিয়ে কপালে চাপড় দিয়ে বললো...

"এই রে। তোমাদের সাথে কথা বলতে বলতে আমি আমার আরজুর কথা তো ভুলেই গেলাম।"

আবির্ভাব পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বললো..

"দেখোছো, আমিও তো ভুলে গেলাম। কল দিচ্ছি ওকে।"

সবাই এবার চোরা চোখে আবির্ভাবের দিকে তাকাতেই আবির্ভাব ভ্যাবলার মতো জিজ্ঞেস করলো..

"কি? তোরা এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?"

এবার সবাই একত্রে টেনে টেনে বললো...

"আরজু কে ভাইইই?"

আবির্ভাব আমতা আমতা করে কি বলবে বুঝতে পারছিলো না। তার আগেই ইন্দু উত্তর দিলো..

"আরজু আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। "

এবার আবির্ভাবও তাল মিলিয়ে বললো..

"হ্যা হ্যা,ইন্দুর বেস্টফ্রেন্ড। ওর সাথে যোগাযোগ করার জন্যই তো এতো কিছু..."

বলেই আরজুর নম্বরকে কল দিলো। রিসিভ করতেই আরজু সালাম দিলো। আবির্ভাব সালামের প্রতিত্তোর দিতেই আরজু প্রশ্ন করলো...

"ইন্দু কোথায়? ও কি কাঁদছে এখনো? "

"নিজেই কথা বলো.."

বলেই ইন্দুকে ফোন দিলো আবির্ভাব। ইন্দু সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো..

"তুই এখনো কাদছিস আরজু? "

আরজু উত্তর না দিয়ে বললো..

"তোর কথা বল, কি করছিস? "

"এইতো সবার সাথে কথা বলছি। জানিস আরজু এখানে সবাই কত্তো ভালো আর খুব মজার৷ "

ইন্দুর হাসি হাসি ভাবটা বুঝতে পেরে আরজুও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। বললো...

"তাই? তোর মন ভালো হয়েছে? "

"হ্যা, খুব ভালো। কিন্তু তোকে খুব মিস করছি আমি। "

"মন খারাপ করে না বোন আমার। আমাদের খুব শীঘ্রই দেখা হবে আবার। "

ইন্দু আরো কিছুক্ষণ আরজুর সাথে টুকটাক কথা বললো। কল কাটতেই পৃথিবী বললো...

"জানিস তিয়াস, আমার একটা চ্যানেল আছে, নাম তিড়িংবিড়িং। তুইও একটু সাবস্ক্রাইব করে দিস। "

ইন্দু বললো..

"কিন্তু আমার তো ফোন নেই। "

এবার পৃথিবী কপালে হাত চাপড়ে বললো...

"আহহা,, কি শুনাইলি বোইন এইডা। এই কথা ডা শুনার আগে মরন হইলো না ক্যান আমার। "

পৃথিবীর মাথায় গাট্টা দিয়ে সায়র বললো....

"আসলে তিয়াস,এই ষাঁড়ের চ্যানেল পেইজ সব কিছুতেই অসংখ্য ভিডিও কিন্তু ভিউজের বেলায় গোল্লা। তাই যাকেই পায় তাকেই বলে পিলিজ সাবস্ক্রাইব। পিলিজ ফলো। "

সবার হাসি ঠাট্টার মধ্যেই কুঞ্জর এসে হাজির হলো হাতে একটা খাবারের ট্রে নিয়ে। তাকে দেখিয়ে আনান বললো...

"এই দেখ তিয়াস,,পরিচয় করিয়ে দিই। এইডা হইলো গিয়া আমাদের সবার একমাত্র ভাবি। সবার মানে সবার,,জাতির ভাবি। "

প্রভাবর এবার চোখ কুঁচকে বললো...

"ঐ, সবার ভাবি মানে। আমার ভাবি নাকি হ্যা? "

প্রভাকরের কথায় রণ বলে উঠলো..

"ওহ সরি সরি। একটু মিষ্টেক হইলো, এটা আমাদের সবার ভাবি আর প্রভাকর ভাইয়ের আম্মা। এবার ঠিক আছে না?"

প্রভাকর এবার এক পা দিয়ে রণ কে লাথি মেরে বললো...

"ঐ শা'' আমার একটা মাত্র বউকে আম্মা বানিয়ে দিচ্ছিস কেন বে? তোর কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি আমি? "

সবাই হাসতে লাগলো। এবার ইন্দু সবার আকর্ষণ নিয়ে বললো..

"এই শোনো শোনো, আমার লিমা আন্টির ছেলের বউ এর নাম হলো মিতা। তো আন্টির ছেলে তার ফোন নম্বর হয়তো তারাহুরোয় ভুল করে মাতা দিয়ে সেইভ করে ফেলেছে। এটা একদিন আন্টির ছেলের বউ এর চোখে পড়তেই সে কি মাইরটাই না দিলো তাকে। বার বার বলছিলো, আমি তোর মাতা? বল আমাকে দেখে তোর মা মনে হয়?"

একের পর এক মজার মজার কথায় যেন সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা। তখনই রুমের দরজা থেকে ভেসে এলো কঠিন এক কন্ঠ...

"কি হচ্ছে কি এখানে? "

সবাই দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো সাবিহা কাঠকাঠ মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই আনান স্বাভাবিক ভাবে ইন্দুকে দেখিয়ে দিয়ে বলতে নিলো...

"মেঝো মা, দেখো এ হলো তি...."

সাথে সাথেই সাবিহা এক হাত তুলে বললো...

"থাক। আলাদা করে আমাকে বুঝাতে হবে না। "

সাবিহা এবার সরাসরি ইন্দুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো....

"এই মেয়ে, এখানে কেন এসেছো তুমি? কে পাঠিয়েছে তোমায় সত্যি করে বলো?"

সাবিহার কন্ঠ এতটাই তীব্র ছিলো যে ইন্দু কেঁপে উঠলো ভয়ে। এতক্ষণের হাসি হাসি মুখটা নিমেষেই আঁধারে ঢেকে গেলো। ঘন ঘন ঢোক গিলতে লাগলো ভয়ে সে। তার থেকে কোনো উত্তর আসছে না দেখে সাবিহা আবারও একটু চেঁচিয়ে বললো...

"কি হলো তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি আমি। উত্তর দিচ্ছো না কেন?"

ইন্দুর মাথায় আসছে না কি বলবে সে। তার বান্ধবী আসতে বলেছে বলেই চলে এসেছে এটা বলবে? কিন্তু এটা যে গ্রহনযোগ্য উত্তর নয়। তাহলে??

মাথা নামিয়ে নিলো সে। ভয়ে ভয়ে নিচু কন্ঠে বলতে নিলো....

"আমি এখানে... "

তার আগেই দরজার কাছ থেকে আরো একটা পরিচিত কন্ঠ ভেসে এলো...

"ওকে আমিই নিয়ে এসেছি মা। যা প্রশ্ন করার আমাকে করো। "

রাতের সবল মনোবল দেখে সাবিহা ফিরে তাকালো তার দিকে। ছেলেকে কখনোই তিনি কোনো প্রকার বিপদে ফেলতে চান না, তাই বললেন...

"রাত বাবা। তুই কেন এভাবে না জেনে শুনে এরকম একটা মেয়ে কে বাড়িতে নিয়ে এসেছিস? চার দিকে তোর এমনিতেই শত্রুর অভাব নেই। এই মেয়েও যে তাদেরই পাঠানো কেউ নয় তা কে জানে? "

"মা, তুমি তিয়াসের ব্যপারে তেমন কিছুই জানো না এখনো। কয়েকটা দিন সময় দাও ওকে,তারপর না হয়... "

"আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না রাত। একে এক্ষুনি বের কর বাড়ি থেকে৷ আমি আমার বাড়ির কারো কোনো প্রকার ঝুঁকি চাই না। "

"ও কোথাও যাবে না মা "

"যাবে না মানে? আমিই ওকে বের করবো বাড়ি থেকে। "

রাতের কন্ঠ আরেকটু শক্ত হলো৷ ইন্দুর দিকে তাকিয়ে বললো...

"ও যদি এই বাড়িতে না থাকে তাহলে আমিও বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবো মা। "

"রাত! তুই একটা সামান্য মেয়ের জন্য আমার থেকে দূরে যাবি বলছিস? "

"ও কোনো সামান্য মেয়ে নয় মা। ও আমার কাছে খুব স্পেশাল। একটু বুঝার চেষ্টা করো মা। "

সাবিহা আর একটি কথাও বলতে পারলো না রাতকে। যত যাই হোক, তিনি জানে তার এই ছেলে যা একবার বলে তা করেই। আর তিনি কখনোই তার ছেলেকে হারাতে চান না। তাই রাগী চোখে একবার ইন্দুর দিকে তাকিয়ে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। পেচনে থাকা তট এবার রাত বরাবর এসে বললো...

"তুই ভুল করছিস ভাইয়া। একটু ভেবে চিন্তে দেখিস। "

বলেই তট ও চলে গেলো রুম থেকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রাত এবার সবার মধ্য দিয়ে এসে হাটু ভাজ করে বসলো ইন্দুর সামনে। ইন্দুর ভয়াতুর মুখখানায় একবার দৃষ্টি বুলালো। ইন্দুর চোখ দুটিও রাতের চোখে নিবদ্ধ। রাত এবার মুচকি হাসলো।। প্রথম বারের মতো তার স্বপ্নের মোনালিসাকে ছুঁয়ে দিলো রাত। বা হাত খানা খুব সন্তর্পণে ইন্দুর মাথায় রাখলো। সাথে সাথেই রাতের শরীর কেঁপে উঠলো যে ঝঙ্কার দিয়ে। এতো কি আছে এই মেয়ের মধ্যে, এই সামান্য স্পর্শেই যে রাতের মতো সবল লোকটিকে দূর্বল করে তুলছে? সবার মাঝে নিজেকে অতি চাতুরতায় সামলে নিলো রাত। ঢোক গিলে নিরের চিত্তকে শান্ত করার বৃথা প্রয়াশ চালিয়ে ফের চোখ রাখলো ইন্দুর চোখে। বললো...

" ভয় পেও না তুমি। আমি সব সময় আছি তোমার সাথে। হুম? "

ইন্দু ওভাবে থেকেই ডান পাশে মাথা কাত করে সম্মতি জানালো। রাত আবার প্রশ্ন করলো...

"সবার সাথে কথা হয়েছে? "

"হ্যা, এখানে ভাইয়া আপু সবাই খুব ভালো আর মিশুকে ও। আমার অনেক পছন্দ হয়েছে সবাইকে। "

রাত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো...

"যাক। যে কোনো প্রয়োজনে এদের মধ্যে যে কাউকে বলবে৷ আর আমি যতক্ষণ থাকবো বাসায়,ততক্ষণ তো সমস্যা নেই আশা করি। চলো তোমার রুম দেখিয়ে দিই। "

ইন্দু উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগ হাতে নিলো৷ রাত এবার সবার দিকে নজর দিতেই দেখলো তারা সবাই মিলে কিছু একটা নিয়ে ফিসফিস করছে।.

"কি নিয়ে কথা হচ্ছে শুনি? "

থেমে গেলো সবাই।আনান আমতা আমতা করে বললো...

"ইয়ে মানে ভাই। আমরা সবাই মিলে শপিং এ যাবো ভাবছি তিয়াসের জন্য । "

ইন্দু বলে উঠলো...

"আমার তো কিছু লাগবে না, প্রয়োজনীয় জিনিস আমি নিয়েই এসেছি। "

আবির্ভাব বললো..

"ওসব তো তোরই। কিন্তু এটা আমাদের রিচুয়াল, নতুন অতিথি আসলে আমরা তার জন্য কিছু গিফট কিনি। তাই না করা যাবে না। "

পৃথিবীও এগিয়ে এসে বললো..

"প্লিজ রাত ভাই, না করিস না। আমিও নতুন ভিডিও নিতে পারবো তাহলে। "

রাত এক মিনিট চুপ থেকে বললো..

"ঠিক আছে। তবে এখন অনেক রাত হয়েছে৷ আর তিয়াসও টায়ার্ড। তাই যেখানে যাওয়ার কালকে যাবি। "

কড়ি এসে বললো..

"ভাই, তিয়াসকেও সাথে নিতে পারবো? "

"সেটা কালকে ভেবে জানাবো। চলো তিয়াস। "

এদিকে ধীরে সুস্থে সবার থেকে আলাদা হয়ে আড়ালে গিয়ে অহি কল করলো নিজের এক পরিচিত নম্বরে। দু বার রিং হতেই কল রিসিভ হলো আর অহি চাপা কন্ঠে বলে উঠলো...

"এলমা রে,, তোর মৃগাঙ্ক মির্জার বউ হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে রে৷ রাত ভাই কোন একটা মেয়েকে তুলে এনেছে। আমি ড্যাম শিউর রাত ভাই আর ঐ মেয়ের মধ্যে কিছু একটা আছে। একে না তাড়ালে তোর আর গতি নেই দোস্ত। "

রেখো তোমার বাহুডোরে গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে ঘেরা রোমান্টিক ও থ্রিলার গল্প