রেখো তোমার বাহুডোরে

পর্ব - ৩

🟢

তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে ভরা বাজারে হেঁটে চলেছে আবির্ভাব। হাতের ফোনে চোখ নিবন্ধ। আনান একটু আগেই আরজুর লোকেশন পাঠিয়েছে। সেইটা অনুসরন করেই এগিয়ে চলেছে আবির্ভাব। একটা জায়গায় এসে থামলো সে। লোকেশন অনুযায়ী আরজু তার আশে পাশেই আছে কোথাও। আবির্ভাব নিজের চার দিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিলো একবার। নজরে পড়লো একটা জুয়েলারি দোকানে আরজুর মতো দেখতেই কেউ একজন।আবির্ভাব এগিয়ে গেলো, কাছাকাছি যেতেই বুঝে গেলো এই সেই কাঙ্খিত ব্যক্তি।

পাশে গিয়ে দাঁড়ালো আবির্ভাব। আস্তে করে সালাম দিয়ে বললো...

"আমায়,চিনতে পেরেছো? "

আরজুর চোখের কোঠর দুটো লালছে। বিবর্ণ মুখে আবির্ভাবের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললো...

"জ্বী ভাইয়া। সকালে কল দিয়েছিলেন। আপনি এখানে যে? "

"একটা কাজে এসেছিলাম। এখানে তোমাকে দেখে এগিয়ে এলাম। কিছু কিনতে এসেছো? "

আরজু মুখ নামিয়ে আস্তে করে বললো...

"জ্বী নাহ। বিক্রি করতে এসেছি। "

আবির্ভাব ভ্রু কুঁচকে বললো..

"গয়না বিক্রি করছো হঠাৎ? "

"এমনি "

কথার মাঝেই দোকানের সেকরা একটা সোনার ব্রেসলেট হাতে এগিয়ে এসে বললো..

"আপনার ব্রেসলেটটায় ভালো সোনা আছে। ১৪ হাজার পরেছে দাম৷ "

আরজু একটা ঢোক গিলে বললো..

"ওহ, আমি ভেবেছিলাম ৮-৯ হাজার হবে। আচ্ছা যাই হোক, বিক্রি করবো।"

সেকরা ব্রেসলেটটা টেবিলে রেখে টাকা আনতে গেলো। তখনই আরজু করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ব্রেসলেটটার দিকে। মনে পরতে লাগলো কিছু সচ্ছ স্মৃতি, কারোর দেওয়া ওয়াদা, ইশশ কিচ্ছু ধরে রাখতে পারলো না আজ আরজু।

আলতো হাতে ব্রেসলেটটা ছুঁয়ে দিতেই চোখের কোঠরে জল এসে ভিরলো তার। বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে, কিন্তু পরিস্থিতির কাছে আজ সে অসহায়।

সেকরা আসতেই বললো..

"এই নিন আপনার ১৪ হাজার টাকা। "

আরজু আলতো হাতে ব্রেসলেটটা সেকরাকে দিতে গেলেই আবির্ভাব তার হাত ধরে বাঁধা দিয়ে বললো...

"তোমার টাকার প্রয়োজন হলে আমাকে বলতে পারতে। আমি তোমাকে বলেছিলাম যে কেনো প্রয়োজনে জানাতে। "

আরজু এবার একটু শক্ত দৃষ্টিতে আবির্ভাবের দিকে তাকালো..

"আমি আপনার থেকে টাকা চাইবো মানে? আমি আপনাকে ঠিক কতটুকু চিনি বলুন তো।এভাবে কারোর থেকে টাকা চাওয়া যায়? "

"ব্রেসলেট বিক্রি করার প্রয়োজন নেই। আমি টাকা দিচ্ছি তোমায়। "

"কোনো প্রয়োজন নেই ভাইয়া। আমি আমার ব্যপার ঠিক সামলে নেবো। "

বলেই আরজু কোনো প্রকার কথা না শুনে সেকরাকে ব্রেসলেটটা দিয়ে টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেলো দোকান থেকে। সে বের হতেই আবির্ভাব দ্রুত মানিব্যাগ থেকে ১৪ হাজার টাকা বের করে সেকরাকে দিয়ে ব্রেসলেটটা নিজেই কিনে পকেটে পুরে নিলো। তারপর দৌড়ে এসে আরজুর সাথে হাটা ধরলো।

"বাই এনি চান্স তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছো? "

আরজু একবার মুখ তুলপ তাকালো আবির্ভাবের দিকে। এরপর মুখ নামিয়ে বললো....

"আপনাকে আমি ঠিক ভাবে চিনি না ভাইয়া। আর অপরিচিতদের সাথে কথা বলাটা রিস্ক। "

আবির্ভাব ঠোঁট উল্টো করে বললো..

"খুবই ইন্টেলিজেন্স আর ম্যাচিউর তুমি। "

"পরিস্থিতি গড়ে তুলেছে এভাবে। "

"ইন্দুর ব্যপারে কিছু কথা বলতে পারি? পাঁচ মিনিট। "

আরজু হাঁটা থামিয়ে দিলো। আবির্ভাবের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আবির্ভাব তারাহুরো করে বললো..

"দেখো তুমি যা ভাবছো তা একদমই নয়। আমি কোনো প্রকার খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আসিনি। আমি একজন হার্ট সার্জেন্ট। তুমি চাইলে খোঁজও নিতে পারো আমার সম্পর্কে, তাও যাস্ট পাঁচটা মিনিট কথা শুনো। "

আরজু ভাবলো কিছুক্ষণ। তারপর আশপাশে তাকিয়ে বললো...

"কোথাও ছায়ায় গিয়ে বসি ভাইয়া? "

"শিওর.."

বট গাছের ছায়ায় বসতেই আরজু বললো..

"কি জানতে চান বলুন.. "

"সাধারণ কথা গুলোই। তোমার সাথে ইন্দুর সম্পর্ক,ওর ফ্যামিলি, রিলেশন এনিথিং৷ "

"আমি কি জানতে পারি, এসব জেনে আপনার কি লাভ? "

"আমার লাভ বলতে তেমন কিছুই না। মূলত আমার চাচাতো ভাই রাত, ইন্দুকে হয়তো কোনো ভাবে চেনে৷ তবে কিভাবে তা আমি জানি না। আমি ওকে যতদুর চিনি, ধারনা করছি ও ইন্দুকে পছন্দ করে। তাই ওর প্রয়োজনে... "

"দেখুন ভাইয়া। পছন্দ করতেই পারে। কিন্তু এতটুকু বলে রাখি আপনাদের স্ট্যাটাসের সাথে আমাদের যাবে না। ইন্দুর ছোট বেলা থেকেই মা বাবা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে। পরালেখায় ভালো বলে আশ্রম থেকেই ওখানকার প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে ওকে৷ সেখান থেকেই আমার সাথে ওর পরিচয়। আমি তখন আমার বাড়িতেই থাকতাম। এরপর স্কুলের শেষ সময়ে যখন আমাদের SSC শেষ হয়ে গ্যাপ চলছিলো তখন আমি বাড়ি ছেড়ে ম্যাচে উঠি। আর তারই কিছুদিন পর একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ইন্দুর সাথে দেখা হয় লিমা আন্টির। উনি একজন নার্স। প্রথমে কয়েকদিন নিজের বাড়িতে রাখলেও ছেলের বউয়ের চাপে পড়ে বেশি দিন ইন্দুকে নিজের কাছে রাখতে পারে নি। আমার সাথেই ময়াচে পাঠিয়ে দেয়। তবে ইন্দুর প্রয়োজনীয় সকল খরচ এতদিন উনিই দিতো। কলেজে ভর্তি করা ম্যাচ ভাড়া সব কিছুই। কিন্তু এখন তো আর উনি নেই। তাই ইন্দুর আপন বলতে আমিই। "

আবির্ভাব মনোযোগ দিয়ে শুনলো সবটা। আসলেই অনেকটা স্ট্রাগল করছে এরা। জিজ্ঞেস করলো...

"এখন তোমরা কিসে পড়ো? "

"সামনেই HSC দিবো একসাথেই। "

"তো হঠাৎ টাকার জন্য ব্রেসলেট বিক্রি করছিলে কেন? "

আরজু মাথা নামিয়ে নিলো। আস্তে করে বললো...

"বাড়িওয়ালা ম্যাচ ভাড়ার জন্য তাড়া দিচ্ছে। আমার, ইন্দুর দুজনেরই বাকি। লিমা আন্টি থাকলে ইন্দুর এত সমস্যা হতো না। "

" রাত ভাই ইন্দুর সাথে দেখা করতে চাইছে একবার। তবে আমি জানাবো সবটাই তাকে। তোমার সাথে কথা বলে তবেই ইন্দুর ব্যপারে সীদ্ধান্ত নেওয়া হবে। "

----------

মির্জা বাড়ির ড্রয়িংরুমটা পরিপূর্ণ বলা যায় এখন। মির্জা পরিবারের চার কর্তা সহ বাকিরাও উপস্থিত। রাতের বাবারা চার ভাই, দুই বোন। বড় ভাই আবরার মির্জা, তার স্ত্রী কান্তা মির্জা এবং তাদের তিন সন্তান প্রভাকর, আবির্ভাব আর কড়ি। প্রভাকর পারিবারিক ব্যবসা সামলায়, আবির্ভাব ডাক্তার আর করি এবার অনার্স ১ম বর্ষের স্টুডেন্ট। প্রভাকরের স্ত্রী কুঞ্জর আর তাদের ছোট্ট জমজ দুই ছেলে দৃশ্য আর কল্প।

মেঝো ভাই আসলশরাব মির্জা অর্থাৎ রাতের বাবা, রাতের মা সাবিহা মির্জা, তাদের দুই ছেলে মেহেরাব মৃগাঙ্ক মির্জা রাত নিজস্ব বিজনেস দাড় করিয়েছে , আর শেহরাব সুদৃশ মির্জা তট মাস্টার্স এই বছরই মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে।

সেজো ভাই আলভি মির্জা, তার স্ত্রী মিশি আর তাদেরও দুই ছেলে। আনান, রাত আর আবির্ভাবের সমবয়সী, সে রাতের কম্পানিতেই কাজ করে আর আফনান কড়ির সমবয়সী,এবং একই ক্লাসেই।

ছোট ভাই আয়ুশ মির্জা, তার স্ত্রী লিয়ানা। তাদের জমজ দুই মেয়ে ছায়া আর ছবি এবার ৪র্থ বর্ষের স্টুডেন্ট।

এবার বলি কর্তাদের দুই বোনের কথা। আবরার মির্জার ছোট আর বাকি সবার বড় বোন আরশি মির্জা, তার স্বামী মোয়াজ রাহমান, তাদের দুই সন্তান অহি তটের সমবয়সী আর সায়রের এবার মাস্টার্স রানিং। শহরে মোয়াজ রহমানের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। কিন্তু আরশি মির্জার কথায় তারা মির্জা ভিলাতেই জায়গা করে নিয়েছেন আজ বহু বছর ধরে। মোয়াজ প্রায় সময়ই নিজ বাড়িতে থাকে, তবে আরশি ও তার সন্তানরা আপাতত মির্জা ভিলাতেই আছেন। এই নিয়ে মির্জা পরিবারের কারোরই কোনো সমস্যা হয় না, তারা বরং আরো একসাথে থাকতেই যেন সুখ অনুভব করে।

আয়না মির্জা, আয়ুশ মির্জার বড় আর বাকিদের ছোট বোন তিনি। তার স্বামী জোমান হুসাইন আর দুই ছেলে পৃথিবী, তট আর অহির সমবয়সী আর রণ এবার অনার্স ৩য় বর্ষের স্টুডেন্ট। আয়না মির্জা তার স্বামীর বাড়িতেই গ্রামে থাকেন। গ্রামে পড়ালেখার ব্যবস্থা খুব একটা উন্নত নয় বলে রাত নিজ দায়িত্বে পৃথিবী আর রণকে মির্জা ভিলায় নিয়ে এসেছে। এবং বাকিদের সাথে একই ভার্সিটিতে পড়ার ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। প্রাইভেট ভার্সিটি হওয়ায় সবাই এক সাথেই থাকতে পারে।

[পুরো পরিবারকে চিনিয়ে দিলাম। মনে রাখতে পারলে ভালো, আর নাহলে শুধু তুরুলা বাহিনীকেই মনে রাইখেন পাঠক মহল।

]

অভ্রায়ীনি ঐশি -Avrayini oishi

------------

আবরার মির্জা ঘাড় ঘুরিয়ে তুরুলা বাহিনীর দিকে একবার তাকিয়ে সবাইকে পরখ করে বললো...

"আবির্ভাব কোথায়। এখনো ফিরে নি? "

বলতে না বলতেই আবির্ভাব এসে পৌছালো। ক্লান্ত হয়ে এসেই সোফায় লুটিয়ে পড়তে পড়তে বললো...

"আ'ম হিয়ার আব্বু।"

"আজ এতো দেড়ি যে তোর? হসপিটালে কি বেশি চাপ নাকি? "

আশরাবের কথায় আবির্ভাব নড়েচড়ে বসে বললো..

"আরে না চাচ্চু, হসপিটাল থেকে তো সেই কখন বের হলাম। তারপর এক যুদ্ধে গেলাম তাও তোমার ছেলের জন্য।"

আশরাব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো...

"কার জন্য? "

এরই মাঝে তুরুলা বাহিনীর মধ্যে থেকে তট হালকা চেচিয়ে আবির্ভাবকে বললো...

"ঐ, তুই ভাইয়ার নাম মুখে নিতে পারিস না। সবাই তো ভাববে আমি তোরে বিপদে ফেলতাছি৷ "

আবির্ভাব ভেঙচি কেটে বললো...

"তোর জন্য কেনো কাজ করতে আমার বয়েই গেছে। "

এবার আলভি মির্জা বললো..

"রাত তোকে আবার কোথায় পাঠালো?"

"আর বলো না সেজকা,তোমাদের রাত তো... "

মুখ থেকে বের করার আগেই বিকট শব্দে আবির্ভাবের ফোন বেজে উঠলো। হাতে নিয়ে দেখলো জ্বলজ্বল করছে 'Rat vai' নামটি। সেটি দেখেই আবির্ভাব বিড়বিড় করে বললো...

"এই রে। "

বলেই উপরের দিকে তাকাতেই দেখলো রাত দোতলার করিডোরে দাড়িয়ে তার দিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখের ইশারায় বোঝালো কল রিসিভ করতে। আবির্ভাব ফোন কানে তুলতেই ভেসে এলো রাতের কাঠ কাঠ কন্ঠস্বর...

"এক্ষুনি রুমে আয়। "

বলেই কল কেটে দিলো। আবির্ভাব উঠতে উঠতে বললো..

"আবির্ভাব, আজ তুই শেষ। "

সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে তুরুলা বাহিনীর দিকে তাকিয়ে বললো...

"জমের দুয়ারে যাচ্ছি গায়েজ৷ দোয়া দুরুদ পড় তোরা আমার জন্য। "

সাথে সাথেই তুরুলা বাহিনীর সবাই একত্রে বলে উঠলো..

"ইন্না-লিল্লাহি ওয়ান্নাহ ইলাহির রাজিউন।"

এদের কথা শুনে আবির্ভাব ধমক দিয়ে বললো...

"আস্তাগফুরিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ। এগুলা কইতে কইছি তোগোরে? বদের হাড্ডি গুলা। "

------------

পরদিন বিকেল প্রায় ৪ টার দিকে আরজুর সাথে তাদের ম্যাচে উপস্থিত হয় আবির্ভাব, আর রাত। আরজুর মন ভিষণ খারাপ৷ তাও পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে এখন রাতের কথাকেই ঠিক মনে হচ্ছে তার। দীর্ঘ একটা রাত ভাবার পরেই আরজু এই ইন্দুর ব্যপারে এই কঠিন সীদ্ধান্তটা নিয়েছে। ম্যাচে আসতেই দরজা খুলে দিলো আরজু আর ইন্দুর রুমমেট ছন্দা।ছন্দাকে আরজু একটু আগেই কল করে সবটা জানিয়েছে। তাই রাতদের দেখে খুব একটা রিয়েক্ট করলো না সে। আরজু ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে ছন্দাকে জিজ্ঞেস করলো...

"ইন্দু কোথায়? "

"রুমেই আছে। অনেক কষ্টে দুটোর দিকে জোর করে খাইয়েছি অল্প একটু। এরপর ওভাবেই পড়ে আছে। "

আরজু আবির্ভাব আর রাতকে বললো...

"আপনারা একটু বসুন ভাইয়া। আমি ইন্দুকে ডাকছি। "

বলেই একটু এগিয়ে গিয়ে ইন্দুকে ডাকলো আরজু।

রাতের তীব্র অনুভুতিরা আজ আবার তার তিয়াশের সামনাসামনি হতে চলেছে। কি হবে, কি হবে ভাবনার মাঝেই চোখে পড়লো পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা এক জোরা পা। রাতের দৃষ্টি ঠিক এখানেই আটকে গেলো৷ মুখ তুলে চাওয়ার সাধ্যি তার নেই যেন আজ। চঞ্চল আখিদ্বয় স্থির হয়ে চেয়ে রইলো আকুল নিবেদনে। একটা মুহুর্তের জন্য মনকে মনই প্রশ্ন করে উঠলো...

' এই কোমল দুটি পায়ের সান্নিধ্য আমি ধরে রাখতে পারবো তো তিয়াশ? "

নিজের প্রতি সন্দেহ ওখানেই মাটি চাপা দিলো রাত। মনে হতে লাগলো সে তিয়াশের যোগ্য নয়, কিন্তু রাত নিজেকে তিয়াশের যোগ্য করে তুলবে। তবুও তার লাগবে তিয়াশকেই।

"উনারা কারা? "

কি সুমধুর কন্ঠস্বর৷রাতের সকল চিন্তারা হুট করেই অবসান নিলো ঐ একটি কথাতেই। ইহাই কি তবে বি'ষ কন্ঠ? নাকি নারীর এক সসীম গুন এই কন্ঠস্বর। রাত ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকালো। ইন্দুর ছোট্ট আদলের মুখ খানায় বিরাজমান টানটান ভেজা চোখ দুটিতে চোখ মিলতেই রাতের গলা শুকিয়ে কাঠ, কপালের কার্নিশ বেয়ে চিকন ঘাম ছুটলো৷ মাথার উপর সিলিং ঘুরছে, তবুও রাতের মনে হচ্ছে সে কোনো মরুভূমির কাঠফাটা রোদে দাঁড়িয়ে। বলিষ্ঠ শরীরে সিটিয়ে থাকা হালকা রঙের শার্টটার কিছু অংশ মুহূর্তেই ঘামে ভিজে থকথকা হয়ে গেলো।

রাতের এমন অবস্থা দেখে আবির্ভাব আস্তে করে প্রশ্ন করলো..

"কি রে। গরম লাগছে বেশি? "

রাত চোখ সরিয়ে নিলো ইন্দুর থেকে। আস্তে করে বললো...

"কলিজা পুরে ছাই হচ্ছে ভাই।"

আরজু ঢোক গিললো। এক কদম, দু কদম এগিয়ে গিয়ে ইন্দুর মুখোমুখি দাঁড়ালো। আলতো করে ইন্দুর হাত খানা নিজের দু হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে চুমু খেলো সেখানটায়। তারপর মুখ তুলে এক হাতে ইন্দুর কপালে ছড়িয়ে পড়া এলোমেলো চুল গুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বললো...

"তুই আমায় বিশ্বাস করিস তো ইন্দু? "

ইন্দু নির্মল চোখ তুলে তাকালো আরজুর দিকে। ভাঙা কন্ঠে বললো...

"তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল? "

কি করুন কন্ঠস্বর। রাতের বুকটা হুহু করে উঠলো। তার স্বপ্নের মোনালিসার এতো কষ্ট কেন দিলো উপরওয়ালা? এই দেখাতেই মেয়েটাকে আগলে নিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে..

"আমি আছি তো তিয়াশ। এই এখন থেকে তোমার সব হবে। আর কোনো কষ্ট পেতে দেবো না তোমায়। "

কিন্তু সময়ের তাড়ায় কথাখানি আর মুখ ফুটে বললো না সে। মনের কথাখানা মনেই চেপে রাখলো কোনো এক দীর্ঘ নীলের জন্য।

"আমি যদি তোর ভালোর জন্য নিজে নিজেই কোনো সীদ্ধান্ত নিই, তুই শুনবি আমার কথা? "

আরজুকে সেই ছোট থেকে চেনে ইন্দু। এই মেয়েটার সব সীদ্ধান্তে ইন্দু চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারে। কারন আরজু ভেবে চিন্তেই কাজ করে। আর ইন্দু যে এখনো বলতে গেলে অপরিপক্ক। আরজু না থাকলে যে তার জীবনটা আরো বি'ষের মতোই হতো৷

"তুই শুধু একবার বল কি করতে হবে। তোর জন্য আমি সব কিছু করতে রাজি। "

ইন্দুর কথায় আরজু মলিন হাসলো। বুকে অদম্য সাহস নিয়ে বললো...

"তোকে যদি এক্ষুনি এই ভাইয়াদের সাথে তাদের বাড়িতে যেতে বলি, কিছুদিন থাকতে বলি, তুই যাবি? "

ইন্দু তড়িৎ গতিতে চোখ তুলে তাকালো রাত আর আবির্ভাবের দিকে। আরজু যে এমন কিছু বলবে তা ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারে নি ইন্দু। অবাকের চরম পর্যায়ে পৌছে ইন্দু আস্তে করে বলে উঠলো...

"আরজু!! "

আরজুর চোখে পানি ভীরলো। হাত ছেড়ে এবার নিজের দু হাতের আজলে ইন্দুর দু গাল ধরে বললো..

"প্লিজ ইন্দু। আমি জানি তুই এনাদের কাউকেই চিনিস না। কিন্তু আমার কাছে যে এই মুহুর্তে আর কোনো উপায় নেই বোন আমার। তুই তো জানিসই আমি কিভাবে চলছি। আমি সবটা সামলে উঠতে পারছি না ইন্দু। তোর নিরাপত্তার জন্য আমি এই সীদ্ধান্তটা নিতে বাধ্য হয়েছি। প্লিজ মেনে যা?"

ইন্দুর চোখের বাঁধ ভাঙলো। নাক টেনে টেনে কান্নারত কন্ঠে বললো...

"তুইও আমাকে নিজের বোঝা মনে করছিস? "

আরজু দ্রুত দু পাশে মাথা নাড়িয়ে বললো..

"নাহ ইন্দু...."

"আমি তো বলেছিলাম তোকে, দু একটা টিউশন পড়াই। তাহলে হয়তো নিজের টুকু নিজেই চালিয়ে নাম তে পারবো। তাও তো করতে দিস নি। এখন এভাবে দূর করে দিবি আমায়? "

"ইন্দু? আমি তোকে আর কোনো বিপদের মুখে ফেলতে চাই না। তোর কিছু হয়ে গেলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। আর শোন,, আমি একটু সবটা সামলে নেই, তারপর খুব দ্রুতই তোকে আবার আমার কাছে নিয়ে আসবো। আর আমি তোকে কথা দিচ্ছি, আমি রোজ তোর খোঁজ নিবো। আর কলেজে তো দেখা হবেই প্রতিদিন তাই না? প্লিজ বোন আমার। একটু বুঝার চেষ্টা কর।আমাদের সময়টা খারাপ যাচ্ছে। তুই শুনবি না আমার কথা? "

ইন্দু চুপ রইলো। ভেজা চোখে একবার রাত আর আবির্ভাবের দিকে তাকিয়ে আবার ডুকরে কেঁদে উঠে বললো...

"আরজু, আমার খুব ভয় করছে। "

আরজু শক্ত হলো, নিজ হাতে ইন্দুর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললো...

"এনারা ভালো মানুষ ইন্দু। কোনো ভয় নেই তোর। "

রাত দু কদম এগিয়ে এলো। ইন্দুর চোখে চোখ রেখে বললো...

"আমি বুঝতে পারছি তোমার ভয়ের কারন। কিন্তু আমি তোমায় কথা দিচ্ছি তিয়াস। এই মুহুর্ত থেকে ঠিক এক ঘন্টা পর আর তোমার এই ভয় থাকবে না। "

আরজু ইন্দুকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে বিরস কন্ঠে বললো...

"ইন্দু, আমায় আর একটু বিশ্বাস কর। আমি তোর কোনো ক্ষতি হতে দেবো না। তোর জীবনটা সুন্দর করে তোলা আমার গুরুদায়িত্ব। মা আর তুই ছাড়া যে আমারও আর কেউ নেই এখন। আমি তোকে সুখের ঠিকানা দিতে চাই, নিজের র'ক্ত জল করে হলেও তোকে ভালো রাখবো আমি। তুই শুধু আমার আরেকটু ভরসা কর প্লিজ।!"

রেখো তোমার বাহুডোরে গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে ঘেরা রোমান্টিক ও থ্রিলার গল্প