রেখো তোমার বাহুডোরে

পর্ব - ৬

🟢

রাতের অনুমতি নিয়েই বিকেল প্রায় চারটার দিকে তুরুলা বাহিনী এসে হাজির হলো শপিং কমপ্লেক্সে। আসেনি শুধু তট। যেখানে ইন্দু থাকে সেখান থেকেই তট চলে যায়। তেমনি আজও ব্যস্ততা দেখিয়ে আসলো না সবার সাথে। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে একেক জন একেকটা দোকানে ঘুরে ঘুরে জিনিসপত্র নিচ্ছে। ইন্দু আপাতত ছায়া -ছবি আর কড়ির সাথে একটা দোকানে বসে ড্রেস দেখছে। একটু পরেই ছায়া তাকে বললো..

"এই তিয়াস দেখ, রাত ভাই.. "

ছায়ার ইশারা অনুযায়ী ইন্দু একটু ঘুরে পেছনে তাকাতেই দেখলো দোকানের বাইরে বরাবর সাইড রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাত। দু হাত পকেটে গুজে রাখা,দৃষ্টিতে আবদ্ধ ইন্দু। ইন্দু সৌজন্যতার সহীত হালকা হাসলো। তারপর আবার মুখ ঘুরিয়ে সামনে তাকাতেই কড়ি বলে উঠলো...

"কিরে, যাস নি? "

ইন্দু ভ্যাবলার মতো বললো...

"কোথায় যাবো?"

"কোথায় যাবি মানে, রাত ভাইয়ের সাথে দেখা করে আয়।"

"দেখা করবো কেন? "

ইন্দুর এমন প্রশ্নে ছায়া আর কড়ি একে অপরের দিকে তাকালো। তারপর ছায়া ইন্দুকে ঠেলে উঠিয়ে বললো...

"সবাইকে শপিং এ আসার অনুমতি দেওয়ার জন্য সবার পক্ষ থেকে ভাইকে একটা থ্যাংকস জানিয়ে আয় যা। "

ইন্দু ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো রাতের সামনে। লোকটার ভাব ভঙ্গি বুঝে উঠতে পারছে না ইন্দু। কেমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইন্দুর চোখের দিকে। কোনো নড়চড় নেই। ইন্দু এবার একটু সাহস নিয়ে দু হাত কচলাতে কচলাতে বললো....

"শুনুন.... "

সাথে সাথেই রাত দৃষ্টি সরিয়ে নিলো অন্য দিকে। ঠোট গোল করে হোহ করে নিঃশ্বাস ফেলে ইন্দুর এক হাত চেপে ধরে হাটা ধরলো একদিকে।

ইন্দু একবার জিজ্ঞেস করলো...

"কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, ভাইয়াদের ঐ দিকে?"

উত্তর এলো না কোনো। আর না সে ইন্দুর দিকে ফিরে তাকালো। গিয়ে থামলো গকটা ইলেক্ট্রনিক সোরুমের সামনে। সেখান থেকে একটি হেয়ার ড্রায়ার কিনতেই ইন্দু আবার জিজ্ঞেস করলো....

"এটা হেয়ার ড্রায়ার তাই না? এটা দিয়ে চুল শুকানো হয়। "

রাত শুধু আস্তে করে উত্তর দিলো...

"হুম "

ইন্দু আবার নিজের মতোই বকতে লাগলো...

"আমি এটা দেখেছি লিমা আন্টির বাসায়। ভাবি,মানে লিমা আন্টির ছেলের বউ এর কাছে আছে এরকম একটা। একবার তো আমি.... "

বলতে বলতেই দোকানে থাকা লোক গুলোর দিকে চোখ যেতেই লজ্জা পেলো ইন্দু। বুঝতে পারলো কি পাগলের মতোই না বক বক করছিলো সে। বুঝতে পেরেই চুপ হয়ে গেলো সে, ভাবতে লাগলো রাত ভাইয়া কি ভাববে তাকে নিয়ে এবার।

এদিকে ইন্দুর হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়ায় রাত দৃষ্টি নামিয়ে ইন্দুর দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই তাকালো দোকানের ছেলেগুলোর দিকে। ইন্দু লজ্জা পেয়েছে বিষয়টা বুঝতে পেরেই রাত বললো...

"একবার তো কি? "

রাতের কথা শুনে ইন্দু মুখ তুলে রাতের দিকে তাকালো। যখন বুঝতে পারলো রাত বিরক্ত হচ্ছে না, তখন ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো ইন্দুবালার। হেসেই মাথা কাত করে বললো...

"পরে বলবো। "

রাত হেয়ার ড্রায়ারটা কিনে বিল পরিশোধ করে ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে বললো...

" কাস্টমাররা কে কি বলছে এত দিকে খেয়াল না করে সেলিং এ মনোযোগ দেওয়াটাই বেটার। "

ছেলে গুলো বুঝতে পেরে মুখ নামিয়ে নিয়ে বললো..

"সরি স্যার,"

তারপর আবার ইন্দুর দিকে তাকিয়ে বললো..

"সরি ম্যাম "

ইন্দু হা করে রাতের দিকে তাকাতেই রাত মুচকি হেসে বললো..

"যাওয়া যাক? "

ইন্দু মাথা নাড়ািয়ে সম্মতি দিতেই রাত এগিয়ে গেলো, ইন্দুও তার পেছন পেছন হেঁটে চললো। ট্রায়ার রুমের সামনে এসেই রাত হেয়ার ড্রায়ারটা ইন্দুর হাতে দিয়ে বললো..

"এক্ষুনি চুল শুকিয়ে নেবে। "

ইন্দু সাথে সাথেই বললো..

"এমাহ, আমি এটা দিয়ে চুল শুকাতে পারি না তো। তখন বলছিলাম না,একবার ভাবির হেয়ার ড্রায়ারটা নিয়ে নিজে নিজে চুল শুকাতে গিয়ে পুরো চুলে পেচিয়ে ফেলেছি। ভাবি সেই কি রাগ। তারপর লিমা আন্টি এসে অনেক কষ্টে কিছুটা জট ছাড়িয়েছে, পুরোটা না ছাড়াতে পেরে কেটেই দিয়েছিলে অনেকটা চুল। "

রাত যেটার থেকে দুরে থাকতে চাইছিলো মেয়েটা ঠিক সেই দিকেই এগিয়ে নিচ্ছে রাতকে। হাফ নিঃশ্বাস ফেলে ইন্দুকে নিয়েই ট্রায়াল রুমে ঢুকলো সে। দরজা হালকা ভিড়িয়ে দিলো, পুরোপুরি আটকালো না। লোকে কি ভাববে সেসবে রাত কোনো চিন্তা করে না। দরজা আটকালো এই কারনে যাতে তার তিয়াস কোনো ভাবে তাকে ভয় না পায়, তিয়াসের মনে কোনো প্রকার খারাপ ধারনা সৃষ্টি করতে চায় না রাত।

ট্রায়াল রুমে থাকা বড় আয়নার সামনে ইন্দুকে দাঁড় করিয়ে তার পেছনে দাঁড়ালো রাত। আয়নায় ইন্দুর সম্পূর্ণটাই দৃশ্যমান। ইন্দুও আয়নায় তাকিয়ে দেখতে পাচ্ছে রাতের কাজ গুলো। তার সুইচবোর্ডের সাথে হেয়ার ড্রায়ারটা সেট করে নিয়ে আস্তে ধীরে ইন্দুর চুলগুলো নেড়ে নেড়ে শুকাতে লাগলো।

"গোসল করেছো প্রায় দু ঘন্টা আগে। এতক্ষণ চুল ভেজা কেন? "

"গোসল করার পর খেতে বসেছিলাম। তখন চুল বেঁধে রেখেছি। তারপর আপুদের সাথে আপনাদের পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখেছি। গরমে আর চুল খুলিনি। এখন আসার সময় কড়ি আপু বললো ছেড়ে দিয়ে আসতে, গাড়িতেও হাওয়া আছে আর মলেও এসি আছে গরম কম লাগবে, আর শুকিয়ে ও যাবে। "

এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে থামলো ইন্দু। রাত আয়নায় একবার ইন্দুর মুখভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করে নজর ফেরালো। চুল শুকানোর কাজে মনোযোগ দিতে দিতেই বললো...

"এমনিতেই হুট করে অনেকক্ষণ পুলের পানিতে গোসল নিয়েছো, তারউপর চুল ঠিক করে মুছোও নি তুমি। ঠান্ডা লাগলে মারবো কিন্তু আমি। "

ইন্দু দুষ্টামির ছলে চোখ উঠিয়ে বললো...

"আপনি মারবেন আমায়? "

রাতের হাত থেমে গেলো। আয়নায় ইন্দুর ভাবভঙ্গি দেখে বুঝলো,মেয়েটা এতটাও শান্ত নয় যতটা দেখা যায়। রাত আবার নিজের কাজে মন দিয়ে বললো..

"কেন, মনে হচ্ছে না মারতে পারি যে?ভয় লাগছে না আমায়? "

"আপু ভাইয়ারা দেখলাম আপনাকে জমের মতো ভয় পায়। কিন্তু আমার তো ভয় লাগছে না। "

"ভয় লাগছে না কারন আমি চাইছি না। আমি যখন চাইবো তখন তুমি আমাকে ভয় পেতে বাধ্য হবে। "

ইন্দু ঠোঁট বেঁকিয়ে বললো...

"দেখা যাবে। "

রাত অবাক হওয়ার কথা থাকলেও সে মনে মনে খুশিই হচ্ছে, তিয়াস,তার সাথে স্বাভাবিক হচ্ছে দেখে। চুল শুকানো শেষ হতেই ইন্দুকে একবার পর্যবেক্ষন করে রাত বিরক্তিকর সুরে বললো...

"জামাটাও ভিজিয়ে ফেলেছো পেছনে। "

ইন্দু আয়নায় তাকিয়েই ক্যাবলা হাসলো। রাতের কি আর সেই হাসি উপেক্ষা করে কিছু বলার সাধ্য আছে? বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো...

"এখানেই থাকো দু মিনিট। আমি আসছি আবার। "

তিন মিনিটের মাথায় ফিরে এলো রাত। হাতে ছয়টা মেয়েদের ওয়ানপিস আর একটা সাদা রঙের বড় মোটা কাপরের টাওয়েল।ড্রেস গুলো ইন্দুর হাতে দিয়ে বললো...

"যেটা ফিট হয়, পড়ে নেও। "

হাতে থাকা টাওয়েলটা সামনের আয়নাটায় দিয়ে পুরো ঢেকে দিলো। রাতের মন বলছে আয়নাটা স্বাভাবিক না, এটা ডাবল সাইডার মিরর। কাজ শেষ করেই ইন্দুর দিকে ফিরে তাকিয়ে বললো...

"চেঞ্জ করার আগে আয়না থেকে টাওয়েলটা সরাবে না। "

"কেন? আয়নায় আবার কি? "

"তুমি বুঝবে না। যেটা বলেছি সেটাই করবে। আমি বাইরে আছি, তোমার চেঞ্জ করা হলেই ডেকো হুম? "

ইন্দু স্বভাবতই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। রাত বেরিয়ে গেলো। সেই মুহুর্তে রাতের ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসতেই রিসিভ করে কানে তুললো সে। অপর প্রান্তের লোকটির কথা শুনে রাতের হাতের মুষ্টি বদ্ধ হয়ে এলো। রাগে কল কেটে দ্রিত পায়ে সরে এলো সেই স্থান থেকে।

-------

"সাঁজির মা? ওওও সাঁজির মা, একটু রাগ কমাও না সাঁজির মা। "

আনানের এতো মোহিত সহিত ডাকেও যেন রাগ কমলো না তার সাঁজির মার। তেতে উঠে পেছন ফিরে আনানের দিকে আঙুল তাক করে বললো....

"আনাইন্নার বাচ্ছা, তোরে আমি জুতা দিয়া পিডামু। "

আনানের যেন হেলদোল হলো না। সে আগের মতোই সাঁজির কামিজের কোনা ধরে পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে বললো...

"ওও সাঁজির মা, তুমি সাঁজিরে বোঝাও না। সাঁজির বাপ.. থুক্ক আমি তোমার বাপ না, সাঁজির জামাই কান ধরিছে সাঁজি মানছে না। "

সাঁজি এবার রাগে গর্জে উঠে পেছন ফিরে আনানের মাথার এক গোছা চুল চেপে ধরে ধুমধাম কয়টা কিল বসিয়ে দিলো আনানের পিঠে। গজগজ করতে করতে বললো...

"আর বলবি সাঁজির মা? ই'তরের ছানা তুই, আমি সাঁজি, বুঝলি তুই, সাঁজি আমি, সাঁজির মা না, বুঝলি? বল বুঝেছিস কিনা? "

আনান কিল খেতে খেতে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললো...

"শেষ করে দিলো রে,, ডায়নিটা আমায় পৃথিবী দেখতে দিলো না। থুক্কু পৃথিবী বদরে তো প্রতিদিনই দেখি, রা'ক্ষুসিটা আমায় দুনিয়া দেখতে দিলো না। এই শাঁকচুন্নি থাম কইতাছি, থাম তুই। "

কে শুনে কার কথা। সাঁজি আরো জোরে জোরে মারতে লাগলো আনানকে। তাদের মারামারির মাঝেই ভাড়ি কন্ঠের স্বর কানে এলো...

"আনান? "

ডাক খানা দুজনের কানে যেতেই মাইর থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সাঁজি। চোখের সামনে রাতকে দেখেই আনানের পেছনে লুকিয়ে কাচুমাচু করে বললো...

" স্ সরি ভাইয়া। আসলে... "

সৌরাজি চৌধুরী সাঁজি। আনানের সাথে যতবারই রাতকে দেখেছে ততবারই রাতের মনোভাব গম্ভীর থেকেও গম্ভীরতর ছিলো। আর আনানের মুখেও বার বার এই মৃগাঙ্ক মির্জার ভয়াভহ রুপের বর্ণনা শুনতে শুনতে সাঁজি রাতকে য'মের মতো ভয় পায়৷ যেই আনানকে এমনিতে লাথি মারতেও পা কাপেনা সাঁজির, সেই আনানের পা ধুয়ে পানিও খেতে পারবে সাঁজি একবার রাত বললে।

রাত একবার আনানের দিকে তাকাতেই দেখলো আনান মিটিমিটি হাসছে। সাঁজিকে আরেকটু ভয় পাওয়ানোর জন্য বললো...

"দেখ রাত ভাই। সাঁজির কত সাহস, ভরা মার্কেটে আমাকে এভাবে মারছিলো। এই শাঁ'কচুন্নি এখন আমার পেছনে লুকাচ্ছিস কেন? যা ভাই এর সামনে যা। এবার মার আমায়? "

সাঁজি ভয়ে চুপসে গিয়ে আনানের হাত আরেকটু চেপে ধরে মাথা নিচু করে নিলো। রাত সেসবে পাত্তা না দিয়ে আনানের দিকে তাকিয়ে বললো...

"পৃথিবীকে বলবি ওকে যেন বাড়ি পৌঁছে দেয়, আধ ঘন্টার মধ্যে আবির্ভাবের হসপিটালে দেখতে চাই তোকে। "

বলেই ধপাধপ পায়ে চলে গেলো রাত। সে যেতেই এবার সাঁজি পেছন থেকে বেরিয়ে এসে আনানের মাথায় গাট্টা মেরে বললো..

"যা শয়'তান যা তুই৷ আমি বাড়ি যাচ্ছি। "

"ভাই যখন একবার বলেছে তোমাকে পৃথিবীদের সাথেই বাড়ি ফিরতে হবে, তার মানে তাদের সাথেই ফিরতে হবে। চলোওও.."

এদিকে চেঞ্জ করে দরজা খুলে রাতকে দেখতে না পেয়ে কয়েকবার 'রাত ভাইয়া,রাত ভাইয়া' বলে ডাকলোও ইন্দু। কিন্তু রাতের কেনো সাড়া নেই। চলে আসবে ভেবে ইন্দু আর দরজা আটকালো না। আয়না থেকে টাওয়েলটা সরিয়ে রাতের রেখে যাওয়া নতুন হেয়ার ব্রাশটা দিয়ে চুল গুলো আচরিয়ে নিচ্ছিলো ইন্দু। এর মধ্যেই কড়ি আর সাঁজি একসাথে আসলো। কড়ি ইন্দুকে তাড়া দিয়ে বললো...

"তিয়াস, তোর হয়েছে? তারাতারি চল,রাত ভাই বলেছে বাড়ি ফিরতে দ্রুত। "

"উনি কোথায়? "

"ভাই কোনো একটা কাজে চলে গিয়েছে। তুই তারাতারি কর। "

সাঁজি ইন্দুকে একবার দেখে বললো..

"এই সেই মেয়ে?"

ইন্দু একবার সাঁজির দিকে তাকিয়ে কড়িকে জিজ্ঞেস করলো...

"উনি কে আপু?"

কড়ি ইন্দুর বাদবাকি ড্রেস গুলো প্যাক করতে করতে বললো...

" ও হলো সৌরাজি চৌধুরী, আনান ভাইয়ের একমাত্র প্রেমিকা। দোয়া কর যাতে খুব শীঘ্রই আমাদের ভাবি হয়ে যায়। "

ইন্দু হেসে সাঁজির দিকে তাকিয়ে বললো...

"আমি বিভাবরী হাসনাত ইন্দু আপু। প্রার্থনা করি যেন খুব দ্রুত আপনি আপু থেকে ভাবি হয়ে যান। "

সাঁজিও হেঁসে বললো...

"তুমি বয়সে আমার ছোট হলেও আমিও প্রার্থনা করি যেন তুমিও আমার ভাবি হয়ে যাও খুব দ্রুত। "

কড়ি এবার একটু গলা উঁচু করে বললো...

"এই, এসব আপনি আজ্ঞে বন্ধ কর৷ আমরা তিয়াসকে তুই করেই বলি, আর তিয়াস তুই সাঁজিকে আমাদের মতো করেই তুমি করে বলবি, ভাবি হলে ভিন্ন হিসাব।সেটা পরে ভাবা যাবে৷ "

ইন্দু হেঁসে মাথা কাত করে বলে সম্মতি দিলো। সাঁজি এবার ইন্দুর গাল টেনে বললো...

"আমি তোকে বিভা বলেই ডাকবো, এটা কিউক।"

ইন্দু আরেকটু চওড়া হেঁসে বললো...

"ঠিক আছে আপু।"

-----------

মির্জা বাড়ির কর্তীরা চারজন আর আরশি মির্জাও উপস্থিত কিচেনে। সন্ধ্যার নাস্তা হিসেবে ঘরোয়া ভাবে আজ মোমো আর চাটনি বানানো হচ্ছে। ছোটরা এখনো ফিরেনি, তাই বাড়ি কিছুটা শান্ত। সদর দরজা দিয়ে তট ঢুকে কিচেনে এসে একবার সবার দিকে তাকিয়ে সাবিহাকে উদ্দেশ্য করে বললো...

"মা, সময় পেলে আমাকে এককাপ কফি দিও। "

বলেই সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমের দিকে হাটা ধরলো তট। তার দিকে তাকিয়েই সাবিহা হাফ নিঃশ্বাস ফেলে বললো...

"আমার ছেলেটা সবার থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে কেমন। সব ঐ মেয়েটার জন্য। "

আরশি বেগম মোমোর ময়দা মল্ট করতে করতে বাকা হেঁসে সাবিহার সাথে তাল মিলিয়ে বললো...

"হ্যা রে সাবিহা। রাত যে কোন উদ্দেশ্যে ঐ মেয়েকে বাড়িতে এনে রেখেছে। আমার তো একটুও সহ্য হয় না মেয়েটাকে। সারাক্ষণ কেমন কামলা কামলা মুখ করে থাকে দেখেছিস? "

সাবিহা রাগে গজ গজ করতে করতে কাজ করছে। আরশির কথা শুনে এবার আবরার মির্জার স্ত্রী অর্থাৎ মির্জা বাড়ির বড় কর্তি কান্তা বললেন...

"মেয়েটার মধ্যে কি খারাপ দেখেছিস তোরা? কি সুন্দর লক্ষী লক্ষী একটা ভাব আছে ওর মধ্যে। আমার তো এক দেখাতেই ভালো লেগে গেছে। আর রাতকে তো তোরা চিনিসই, ও নিশ্চয়ই ভাবনা চিন্তা না করে কাউকে এভাবে নিয়ে আসবে না,নিশ্চয়ই কোনো কারন আছে। "

সাবিহা এবার বললেন...

"মুখটা শুধু লক্ষীর মতো হলেই হবে ভাবি? মনে যদি বি'ষ থাকে? "

কান্তা এবার সরাসরি সাবিহাকে বললো..

"তুই ওর সাথে ঠিক করে দুদন্ড কথা বলে দেখেছিস মেঝো? ওর মনে বি'ষ না মধু বুঝলি কি করে?"

সাবিহা চুপ রইলো। এবার আস্তে ধীরে ছোট কর্তী লিয়ানা বললো...

"মেয়েটা খারাপ না মেঝোভাবি। তুমি একটু খেয়াল করিও, কথা বলে দেখিও, তুমিও বুঝে ফেলবে। "

এবার মিশিও বললো...

"হ্যা রে ছোট, আমারও সন্দেহের কিছু মনে হয়নি ওকে। "

আরশি মির্জা এবার টেনে টেনে বললেন...

"তোমরা তো বাপু এক দেখাতেই কত কিছু বলে ফেলছো,দেখো পরে পস্তাইবা। "

কান্তা বললো...

"তোরা যা ইচ্ছে ভাব। আমার বেশ পছন্দ হয়েছে তিয়াসকে। আমি ভাবছি একবার প্রভাকরের বাবার সাথে কথা বলে দেখবো। আবির্ভাবের বউ হিসেবে মন্দ হবে না তিয়াস মেয়েটা। খুবই লক্ষীমন্ত মেয়ে। "

কথাটা শুনেই মিশি আর লিয়ানা আড়চোখে একে অপরের দিকে তাকালো, মিশি বিড়বিড় করে বলেই ফেললো..

"রাত বাবা শুনলে তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়ে পেলতো এখানেই। "

কান্তার কথা শুনে আরশি চোখ বড় বড় করে বললো...

"এটা কি বলছো ভাবি, চালচুলোহীন, পরিচয়ের নেই ঠিক, এরকম একটা রাস্তা থেকে উঠিয়ে আনা মেয়েকে তুমি মির্জা বাড়ুর বউ করতে চাইছো? মাথা ঠিক আছে তোমার? "

কান্তা এবার কঠিন স্বরে আরশির দিকে তাকিয়ে বললো...

"আমার ছেলের বউ আমি কেমন আনবো, কাকে বানাবো সে নিয়ে ভাবার জন্য আমি আর তোমার বড় ভাই আছে আরশি। তোমার এতো চিন্তা করতে হবে না। "

----------

আবির্ভাবের হসপিটালে নিজস্ব চেম্বারে মুখোমুখি বসে আছে রাত, আনান আর আবির্ভাব। রাত কিছু একটা বলবে বলেই এতো জরুরি আলোচনা।কিন্তু এসেছে ধরেই এখনো চুপ সে৷ আবির্ভাব এবার একটু গলা ছেড়ে বললো...

"রাত ভাই, কিছু কি সমস্যা হয়েছে? তোকে খুব চিন্তিত লাগছে। "

রাত আগের মতোই চুপ রইলো একটু। দু মিনিট পাড় হলো। আনান এবার আস্তে করে বললো..

"ভাই? "

রাত বড়সড় এক নিঃশ্বাস ফেলে বললো...

"তুরগ লাহোর কল দিয়েছিলো আমাকে। "

ভ্রু কুঁচকালো আনান আর আবির্ভাব। রাত আবার বললো...

"আমাদের বাড়ির সব খবর সে পেয়ে যাচ্ছে। কেউ না কেউ ওকে খবর দিচ্ছে অনবরত। ঐ সময় আমরা শপিং মলে কে কোথায় ছিলাম, কি করছিলাম সবই ও বলছিলো। এমন কি বাড়িতে কে কি করে তাও বলে দিচ্ছিলো সে। "

আবির্ভাব ভেবে বললো...

"নতুন একটা ফাঁদ। হয়তো পৃথিবীর ভিডিও থেকে জেনেই আমাদের কনফিউজড করার চেষ্টা করছে। "

রাত বললো...

"নাহ, পৃথিবীর ভিডিওতে নেই এমন এমন কয়েকটা ঘটনাও ও বলেছে। "

আনান এবার ঢোক গিয়ে তাকালো রাতের দিকে। ভয়ে ভয়ে সন্দেহি কন্ঠে বললো...

"ভাই,, তাহলে কি তিয়াস? "

রেখো তোমার বাহুডোরে গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে ঘেরা রোমান্টিক ও থ্রিলার গল্প