"আমার ইন্দুর এই অবস্থা কেন করেছেন আপনারা,আমি এই ভরসায় ওকে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছি? আপনাদের যদি ওর উপর এতই সন্দেহ থাকে তাহলে নিয়েছেন কেন আমার থেকে রিকুয়েষ্ট করে?ওকে এভাবে হেনস্তা করার জন্য? "
ফোনের ওপাশ থেকে আরজুর কথা গুলোর কোনো উত্তর দিতে পারছিলো না আবির্ভাব। কি বলবে সে? ইন্দুর প্রতি যে অন্যায় হয়েছে তা তো অস্বীকার করতে পারবে না কেউই।
আরজুর কন্ঠ ক্ষয় হলো। ভাঙা গলায় বললো..
আমার ইন্দুটা এখনো অবুজের মতো। কি করে না করে বুঝতে পারে না নিজেও ঠিক মতো। যেখানে একটু আনন্দ পায়, সেখানেই ছুটে যায়। আর আপনারা কিনা ওকে এভাবে ...। ভেবেছিলাম আপনারা ওর পুরোনো ভয়, ক্ষতগুলো মুছতে সাহায্য করবেন কিন্তু আপনারা তো ওকে আরো কষ্ট দিলেন। শুনুন ভাইয়া, আমি চাইলেই আইনি পদক্ষেপ নিতে পারি, কিন্তু তা আমি করছি না, আপনাদের কাছে আমি টিকবোও না জানি। তবে এখন থেকে আর ইন্দুর কোনো প্রকার খোঁজ নিতে আসবেন না আপনারা কেউ। আর কোত্থাও যাবে না ও, আমার ইন্দু আমার কাছেই থাকবে। রাখছি। "
বলেই কল কেটে দিলো আরজু। আবির্ভাব হা হয়ে রইলো আনানের দিকে তাকিয়ে। রাত একটু আগেই চলে গেলো ইন্দুকে খুঁজতে। আবির্ভাব ভীত স্বরে বললো...
"আরজু ভীষণ রেগে গেছে ভাই। ইন্দু ওর কলিজা, আমরা তো কলিজায় আঘাত করে ফেললাম আরজুর। "
আনান জলদি দিয়ে বললো..
"যে করেই হোক তিয়াসকে ফেরাতে হবে আরজুর থেকে, না হলে রাত ভাই মেরেই ফেলবে আমাদের। "
তট মাথা নিচু করে বললো...
"সবটা আমার জন্য হয়েছে। আমি যদি কাল ওভাবে ভাইয়াকে না উষ্কাতাম..."
আনান তটের কাধে হাত রেখে বললো..
"এখন এসব ভেবে লাভ নেই তট ভাই।আগে চল রাত ভাইকে সামলাতে হবে। তিয়াসকে না পেলে তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলবে৷ "
--------
এদিকে ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এক কোনায়,দাঁড়িয়ে আবির্ভাবের সাথে কথা বলছিলো আরজু। ইন্দুর সামনে কথা গুলো বলা ঠিক হবে না হয়তো তাই, মেয়েটা এমনিতেই কেমন নেতিয়ে গেছে। গতকালকের ঘটনাটা আরজুকে বলার সময় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কী কান্না৷ আরজু নিজেকে ঠিক করে ক্লাসের ভেতরে গেলো। ইন্দুকে সামলাতে হবে। কিন্তু ক্লাসরুমে গুয়ে চোখ বুলাতেই দেখলো ইন্দু নেই। কোথায় গেলো মেয়েটা?
আরজু ছুটে ছুটে পুরো কলেজ খুঁজে ফেললো, কিন্তু ইন্দু নেই। ঘাম ছুটে গেছে আরজুর। কোথায় গেলো মেয়েটা? ওর কোনো বিপদ হলে আরজু যে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। মধ্য পথেই হাটু ভেঙে বসে পড়লো আরজু। কি করবে সে, কিচ্ছু বুঝতে পারছে না।হঠাৎ হাতে থাকা ফোনটি বেজে উঠলো তার। আবির্ভাব নামটি দেখে দ্রুত রিসিভ করে কানে তুললো আরজু। ভাঙা গলায় হ্যালো বলতেই আবির্ভাব ওপাশ থেকে প্রশ্ন করলো...
"তোমরা কোথায় আরজু? রাত ভাই তোমাদের ম্যাচে গিয়ে পেলো না তোমাদের। "
আরজুর মাথা ঠিন নেই। রাগ না দেখিয়ে নিজের দূর্বলতাটাই প্রকাশ করে ফেললো....
"আ্ আমি কলেজে আছি। ইন্দুকে খুজে পাচ্ছি না আমি। ও আ্ আমাকে না জানিয়ে কোথায় চলে গেলো.."
বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়লো আরজু। আবির্ভাব অবাক হয়ে বললো...
"খুঁজে পাচ্ছো না মানে? তুমি তো ওর সাথেই ছিলে।"
"ও্ ওকে ক্লাসে রেখে আমি একটু দুরে গিয়ে আপনার সাথে কথা বলছিলাম,এসে দেখি ও নেই। পুরো কলেজ খুঁজে ফেলেছি আমি,, কোত্তাও নেই ও। গায়ে ভীষণ জ্বর মেয়েটার, ঠিক মতো হাঁটতেও পারছে না।ওর কিছু হলে আমি কি করবো। "
"আরজু,,আরজু তুমি একটু শান্ত হও, কিচ্ছু হবে না। আমি আসছি কলেজে,, ইন্দুকে খোঁজার ব্যবস্থা করছি আমরা, তুমি চিন্তা করো না। "
তট আর আনান কে সব টা জানাতেই ভয় পেতে লাগলো তারা। রাত শুনলে যে অঘটন ঘটে যাবে। আবির্ভাব ছুটলো কলেজের দিকে, আরজু যে খুবই ভেঙে পরেছে। আনান আর তটও বেরিয়ে পড়লো ইন্দুকে খুঁজতে।
------------
মির্জা ভিলার সামনে এসে থামলো একটি সিএনজি। সেখান থেকে একটি অল্প বয়সী ছেলে নেমে গেইটে দারোয়ানের সাথে কথা বললো কি যেন। দারোয়ান দ্রুত গেইট খুলে দিয়ে বাড়ির অন্দরে গিয়ে খবর দিলো...
"তিয়াস মামুনিরে নিয়া একটা ছেলে আইছে সিএনজি কইরা। মামুনির তো হুঁশ নাই। "
ইন্দুর বিষয়ে চিন্তিত সকলের এতক্ষণে যেন প্রাণ ফিরে এলো। ছুটে গেলো বাড়ির বাইরেটায়, দেখলো একটি ছেলে মাত্রই ঘুমন্ত ইন্দুকে পাঁজা কোলে তুলে গেইট দিয়ে ঢুকে আসছে। ইন্দুকে এই অবস্থায় দেখে ছুটে গেলো সাবিহা। উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো...
"কি হয়েছে ওর? জ্ঞান হারালো কি করে? "
ছেলেটি খুবই নম্র। সুন্দর করে বললো...
"ওনার গায়ে জ্বর আন্টি। হয়তো জ্বরের কারনেই জ্ঞান হারিয়েছে। "
পৃথিবী এগিয়ে গিয়ে ছেলেটির থেকে ইন্দুকে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলো...
"আপনি কে? আর এখানে কি করে? "
"আমি তোহা ইসলাম, ডিপ্লোমা কোর্স করি। ওনাকে দেখলাম কলেজের সামনে থেকে বাসে উঠেছে। আমার পাশের সীটেই বসেছে। শুরু থেকেই তেমন ভালো ছিলো না শরীরের অবস্থা। কিছুক্ষণ পরেই জ্ঞান হারালো। আমি ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু অনেকবার ডাকার পরেও লাভ হয়নি দেখে, চেক করে দেখি প্রচুর জ্বর। তাই ভাবলাম এভাবে একা ছাড়া ঠিক হবে না,এই জন্য নিয়ে এলাম।"
ছায়া জিজ্ঞেস করলো...
"আমাদের বাড়িতে যে? ও ঠিকানা দিয়েছে? "
"জ্বী না আপু,ওনার সাথে তো কথাই হয়নি আমার। আপনাদের তিরিংবিড়িং চ্যানেলের ভিডিও দেখি মাঝে মাঝেই। গত কয়েকদিনের ভিডিওতে ওনাকেও দেখেছি, তাই ভাবলাম আপনাদের পরিচিত। আমি আপনাদের পেইজে মেসেজও দিয়েছি একটু আগে, কিন্তু কোনো রেসপন্স পাইনি, আর কন্টাক্ট নম্বরও নেই। এই জন্য বাড়িতে নিয়ে আসতে হলো। "
পৃথিবী হাফ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো...
"সকাল থেকে ওর টেনশনে অনলাইনেও যাওয়া হয়নি, তাই মেসেজ দেখিনি ভাই।অনেক উপকার করেছেন। আসুন ভেতরে আসুন।"
"না না ভাইয়া সমস্যা নেই, ভেতরে যাওয়া লাগবে না। আমার মনে হলো এটা আমার মানুষ হিসেবে দায়ীত্ব, তাই করেছি এইটুকু। যাই হোক এখন আসি। "
কান্তা ও কয়েকবার ছেলেটিকে অনুরোধ করলো ভেতরে এসে বসার জন্য। কিন্তু সে এলো না। অন্য একদিন আসবে বলে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো।
ইন্দু বাড়িতে খবর পাওয়া মাত্রই রাত দ্রুত রওনা দিলো বাড়ির দিকে। কিভাবে যে এতটা রাস্তা সে দশ মিনিটেই পাড় করে এসেছে আল্লাহ মালুম।
বাইরে থেকে ছুটে এসে ড্রয়িং রুমের সোফায় অচেতন ইন্দুকে দেখে ঝাপ্টে নিজের বুকে চেপে ধরলো। পুরো রুম জুড়ে এতো মানুষ, কারোর যেন তোয়াক্কা করলো না সে। কিভাবেই বা করবে? উত্তোলিত হৃদকম্পন যে কোনো মতেই স্বাভাবিক হচ্ছিল না এতক্ষণ রাতের। সারাটা পথ জুড়ে নিজেকে নিজে যে কতবার আঘাত করেছে তা অপ্রকাশ্য। বার বার মনে হচ্ছিলো, নিজের কারনে রাত তার তিয়াসকে হারিয়ে ফেললো। আর খুঁজে পাবে না সে তার স্বপ্নদর্শীকে। কি করে ফেললো সে, কি করে ফেললো।
দু হাতে ইন্দুকে জাপ্টে ধরে তার কপালে ঘন ঘন নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিচ্ছে রাত। বারবার ইন্দুর চুলে, গালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে। বিরস কন্ঠে বিরবির করে বলছেই সে...
"আ'ম সরি পাখি। অনেক অন্যায় করে ফেলেছি আমি, আমাকে তুমি শাস্তি দিও তিয়াস, শাস্তি দিও তুমি। চোখ খোলো একটু, তাকাও না কলিজা আমার? "
রাতের এমন উদ্বিগ্নতা দেখে হা করে তাকিয়ে রইলো সবাই।সাবিহা নিজের ছেলের এমন অবস্থা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। মনে ভীষণ সন্দেহ জাগছে। তার শক্তপোক্ত,বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বধারী ছেলেটাকি তবে এবার একটা পিচ্চি মেয়ের জন্য এতটা উতলা হলো?
রাত সোজা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে বললো...
"গাড়ি বের কর, তিয়াসকে হসপিটাল নিয়ে যাবো। ও উঠছে না কেন? "
পৃথিবী এগিয়ে এসে তাকে বললো...
"ডক্টর আসছে এক্ষুনি ভাই। একটু ধৈর্য ধর। "
রাত মানলো, ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়ছে এখনো তার। চুপচাপ নিজের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি যুকৃত গালটা ইন্দুর গরম কপালে ঠেকিয়ে রাখলো।
ইন্দুর গায়ের অতিরিক্ত তাপে রাত ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। তবুও সে ছাড়ছে না তাকে। কান্তা একবার একটু এগিয়ে গিয়ে বলতে নিলো...
"রাত বাবা, ওকে একটু শুইয়ে দে, তুই ঘামছিস তো.. "
রাত সরাসরি বললো...
"নাহ, ও এভাবেই থাকবে আমার কাছে৷ "
লিয়ানা বললো...
"আচ্ছা ঠিক আছে, এসিটা বাড়িয়ে দেই, তোর গরম কম লাগবে তাহলে। "
রাত এতেও সাথে সাথে বাঁধা দিয়ে বললো...
"নাহ, আমার তিয়াসের শীত লাগবে। কষ্ট পাচ্ছে ও। "
লিয়ানা আর বাড়ালো না এসি। কেউই কিছু বলতে পারছে না রাতের কথার উপর। একটু পরেই আনান আর তট ছুটে এলো। রাতের এমন অবস্থা দেখে ঢোক গিললো আনান। তট মনে মনে ভাবলো..
"আল্লাহ, কি করতে যাচ্ছিলাম আমি। এই মেয়েটাকে তাড়িয়ে দিতে চাইছিলাম, আমার ভাইয়ার কি হতো একে ছাড়া? "
ডাক্তার এসে চেক আপ করছে ইন্দুর। তখনও রাত ইন্দুকে ছাড়লো না, বাধ্য হয়ে ওভাবেই দেখতে হচ্ছে, রাত যে কারোর কথা শুনার পাত্র নয়৷
ততক্ষণে আবির্ভাবও আরজুকে নিয়ে এলো। ইন্দুকে দেখে ছুটে যেতে নিলেই আবির্ভাব তার হাত ধরে থামিয়ে বললো...
"একটু থামো না? ডাক্তার চেক-আপ করছে তো। "
আরজু নিজেকে শান্ত করলো। চোখমুখ ফুলে একাকার অবস্থা তার। ইন্দুর চিন্তায় যেন জান বেরিয়ে যাচ্ছিলো এতক্ষণ তার।
ডাক্তার চেক-আপ করে বললো...
"অতিরিক্ত জ্বর আর দূর্বলতার কারনে জ্ঞান হারিয়েছে। চিন্তার কিছু নেই, একটু পরেই জ্ঞান ফিরে আসবে। তখন সাথে সাথেই কিছু খাইয়ে দেবেন। আমি মেডিসিন লিখে দিচ্ছি, ওগুলো কয়েকদিন কন্টিনিউ করবেন। আশা করি খুব দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠবে। "
পৃথিবী ডাক্তারকে নিয়েই চলে গেলো ঔষধ গুলো আনতে। আনান এগিয়ে এসে রাতকে বললো...
"ভাই, তিয়াসকে রুমে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলে ভালো হতো না? "
রাত কড়া চোখে আনানের দিকে তাকাতেই আনান নিভে এলো। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখলো অহি বাড়িতে নেই। আরশি দাঁড়িয়ে আছে সবার সাথেই। মুখভঙ্গি দেখে বোঝার উপায় নেই তার মনে আসলে কি চলছে।
আরজু এখনো বেশ চিন্তিত। একটু পর পরই ঘেমে যাচ্ছে মেয়েটা। দৃষ্টি তার ইন্দুর দিকে নিবদ্ধ। আবির্ভাব ছায়াকে কিছু একটা ইশারা করতেই ছায়া এক গ্লাস পানি নিয়ে এলো আরজুর কাছে। বললো...
"তুমিই আরজু তাইনা? "
আরজু আস্তে করে উত্তর দিলো..
"হুম "
"তিয়াস ঠিক আছে, তুমি একটু শান্ত হও। বসো এখানটায়, পানি টফু খেয়ে নাও তো। "
আরজু আসলেই পানিটুকু প্রয়োজন ছিলো। তাই ছায়ার কথা আর ফেলতে পারলো না, চুপচাপ সোফায় বসে পানিটুকু খেয়ে নিলো। অপেক্ষা করছে ইন্দুর জ্ঞান ফেরার, তারপরই সে ইন্দুকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবে।
ইন্দুর জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে কারো শক্ত বাহুডোরে আবিষ্কার করলো। পিটপিট করে চোখ খুলতেই রাতের করুন মুখটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। বুক কেঁপে উঠলো তার। দূর্বল শরীর নিয়েই প্রচেষ্টা চালালো রাতের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার। কিন্তু পারছে না সে। ইন্দুর জ্ঞান ফিরেছে দেখেই স্বস্তি পেলো রাত, কোমল কন্ঠে ডেকে উঠলো...
"তিয়াস? "
নাহ, তিয়াস হয়তো রাতের কন্ঠের তীব্রতা বুঝতে পারলো না। মোচড়ামুচড়ি করতে করতেই হুহু করে কান্না করে উঠলো ইন্দু। কাতর কন্ঠে অনুরোধ করতে লাগলো...
"আমাকে মা'রবেন না প্লিজ। আমি কিচ্ছু করিনি। "
রাত থমকালো। সাথে বাকিরাও। ইন্দুর কান্নার গতি বেড়েই যাচ্ছে। আনান আস্তে করে রাতের কানের কাছে গিয়ে বললো...
"রাত ভাই, ও তোকে ভয় পাচ্ছে। একটু সময় দে ওকে, এভাবে চললে আরো অসুস্থ হয়ে যাবে। "
রাত কি সুন্দর ভাবে মেনে নিলো আনানের কথা। ইন্দুকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। আরজু এসে শান্ত করতে লাগলো ইন্দুকে...
"মা'রবে না ইন্দু, কেউ মা'রবে না তোকে। আমি আছি তো। ভয় পাশ না, আমি এক্ষুনি তোকে নিয়ে চলে যাবো এখান থেকে৷ "
আরজুর কথাটা বলতে দেরি, রাত হুঙ্কার দিয়ে উঠতে দেরি নেই...
"তিয়াস কোত্থাও যাবে না আমাকে ছেড়ে। ও আমার কাছেই থাকবে। "
কেঁপে উঠলো আরজু। আড়চোখে রাতের দিকে তাকাতেই আত্মা কেঁপে উঠলো যেন তার। রক্তলাল চক্ষু দুটি তার দিকেই নিবদ্ধ হয়ে আছে। যেই চোখের অনলে ভষ্ম হয়ে যেতে পারে খন্ডাংশ।
ডান হাতের তর্জনী আঙুল তুলে আরজুকে সতর্কবার্তা দিয়ে রাত গম্ভীর স্বরে বললো...
"আমার তিয়াসকে নিয়ে এই বাড়ি থেকে এক পা বের হলে তোমার এমন অবস্থা করবো আমি, জীবনে আর নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। তাই নিজের পরিবারের কথা চিন্তা করো আগে। "
ইন্দু ভয়ে কাঁপছে এখনো। জ্বরের তোপে সব মিলিয়ে মুখ দিয়ে গোঙানির মতো করে আওয়াজ বের হচ্ছে। সাবিহা রাতের কাছে গিয়ে বললো...
"রাত বাবা একটু শান্ত হ। দেখ তিয়াস ভয় পাচ্ছে তোকে। আমি ওর খেয়াল রাখছি, তুই একটু রুমে যা, ফ্রেশ হ। "
রাত তাকালো ইন্দুর দিকে। ইচ্ছে করছে এক্ষুনি নিজের বক্ষপাজরে আবদ্ধ করে ফেলতে তিয়াসকে। কিন্তু রাত নিরুপায়, তার তিয়াসের ভালোর জন্য হলেও দুরে থাকতে হবে।
পকেট থেকে ফোন বের করে মেইন গেইটের দারোয়ানকে কল দিয়ে জানিয়ে দিলো, তার অনুমতি ব্যতীত যেন বাড়ি থেকে কেউ বের না হতে পারে। তারপরই ধীর কদমে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলো সে।
------------
"দেখেছিস তো কি হলো। তোকে বলেছিলাম ভাইরা এতো কাচা না। দেখ এখন আবার রাত ভাই তিয়াস মেয়েটাকে মাথায় তুলে নিয়েছে। ভেবেছিলাম কোথায় বাড়ি থেকে বের করবে, তা না আরো বেশি করে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট দিচ্ছে। "
অহির কথায় খুব একটা ভাবান্তর হলো না এলমার মাঝে। চুপচাপ আয়নায় তাকিয়ে ঠোঁটে গাঢ় করে লিপস্টিক লাগিয়ে নিয়ে বললো...
"ডোন্ট ওয়ারি বেইবি। এই এলমা খান সব সময় প্ল্যান বি রেডি রাখে। "
অহি নড়েচড়ে বসলো। জিজ্ঞেস করলো...
"আবার কি করবি তুই? "
এলমা বাকা হেঁসে বললো...
"এবার তুই শুধু দেখে যা। "
------------
সন্ধ্যা প্রায় সাতটা বেজে গেলো। আরজু পারলো না তিয়াসকে নিয়ে যেতে। এমন কি তাকেই বের হতে দিচ্ছে না মির্জা বাড়ি থেকে। আজ প্রায় সব গুলো টিউশনই মিস গেলো তার।
ইন্দুর জ্বর কমেছে কিছুটা। সাবিহা,কান্তা এরা একটু পর পরই ডিম, দুধ,এটা সেটা বানিয়ে নিয়ে এসে খাওয়াচ্ছে ইন্দুকে জোর করে করে। এই যে এখনো সামনে সস আর নুডলস হাতে দাঁড়িয়ে আছে সাবিহা। আরজু ঠেলে ঠেলে ইন্দুর মুখে আপেল পুরে দিচ্ছে। একটা শেষ হতে না হতেই আরেকটা দেখে ইন্দু ঠোঁট গোল করে বললো...
" আল্লাহ, আমাকে কি তোমরা সবাই একদিনেই মোটা করে ফেলবে নাকি। "
তুরুলা বাহিনী আজ বলতে গেলে সারাদিনই ইন্দুর রুমেই ঘাটি গেঁড়েছে। কেউ বিছানায় বসে, কেও হাত পা ছড়িয়ে ফ্লোরে শুয়ে, কেউ চেয়ারে বসে খাটে পা তুলে দিয়ে রেখেছে। পুরো রুম ভর্তি,এমনকি বিছানা ও, ইন্দু বিছানার বোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছে মাঝখানে। তার চারপাশে বাকিরা সবাই।
পৃথিবী ডিভানে শুয়ে ফোন টিপতে টিপতে বললো...
"আজ তোর দিন তিয়াস,যত পারিস গিলতে থাক। "
সায়র বললো...
"হ্যা, তোর সুবাদে আমরাও খেতে পাচ্ছি তাই না? তুই বারণ করিস না, যা সামনে আনবে এক লোকমা খেয়ে আমাদের দিকে দিয়ে দিবি। "
কড়ি, সায়রের পিঠে সোফার কুশন ছুড়ে দিয়ে বললো...
"তোর তো শুধু খাই খাই। এমনি এমনি কি আর তোর গার্লফ্রেন্ড হয় না? খাইতে খাইতে যে বিবাহিতদের মতো পেটটা ফুলিয়ে ফেলছিস,মেয়েরা দেখলেই ভাববে তুই আকাম করিস। "
কড়ির কথায়,অবজেক্টশন জানিয়ে প্রভাকর বললো...
"তুই কি আমাকে অপমান করছিস? আমার ভুরি দেখলেই সবাই বুঝবে আমি আমার বউকে অনেক বেশি ভালোবাসি। তাই না কুঞ্জর? "
কুঞ্জর ধমক দিয়ে বললো...
"সামনে নিজের ছেলে দুটো আছে,তিয়াস, আরজু এখনো ছোট, সাঁজি ক'দিন পরে তোমার ছোট ভাই এর বউ হবে, এদের সবার সামনে এসব বলতে লজ্জা লাগছে না তোমার? "
আবির্ভাব বলে উঠলো...
"ভাবি, চোখেরও মাথা হয় নাকি? "
প্রভাকর বললো..
"রাখ তোর চোখের মাথা। কি বলছিলে কুঞ্জর? লজ্জা? এদের সামনে? সাঁজির সামনে কিসের লজ্জা? ওরা কি জানবে না? আনাইন্নার কি পেট বড় হবে না? কিরে আনান বল? আর তিয়াস তো এমনিতেই ক'দিন পরে রাতের....."
প্রভাকরের মুখের লাগাম ছুটেছে দেখে তাকে থামাতে আনান এবার দ্রিত বলে উঠলো...
"আমি ভাই কাল থেকেই জিমে যাওয়া শুরু করবো। ওসব ভুরি বের করে চলা সম্ভব না।"
ছায়া এবার সাঁজিকে শুনিয়ে বললো...
"দেখেছিস সাঁজি? তোর সাজানের কথা? বিয়ের পরও যাতে ফ্লার্ট করতে পারে অন্য মেয়েদের সাথে, তাই ভুরি বের করতে চাইছে না। "
ইন্দুর অসুস্থতার কথা শুনে সাঁজি বিকেলেই এসেছে। আনানের দিকে চোরা চোখে তাকিয়ে বললো...
"সবই দেখছি। তুই যা না জিম করতে, পারলে রাত ভাইয়ের মতো ফিট বডি বানিয়ে আয়, তারপর তো ভুরি কমানোর চিন্তা করিস। "
আনান এবার কোমরে হাত দিয়ে সাঁজির দিকে চোখ ছোট করে তাকিয়ে বললো...
"এই শা'কচুন্নি, তোর তো নিয়ত ভালা না দেখি, আমারে ছাইরা তুই রাত ভাই এর দিকে নজর দেস,, ছেহ তোরে বিয়া করুন নাহ। "
সাঁজিও মুখ ভেঙিয়ে বললো...
"আমার ভাইও তোর মতো ল্যাওড়ার কাছে বোন বিয়ে দিবো না। শা'লা আসছে ভুরি কমাইতে।"
ছবি বললো..
"তোরা এত লুচু,আমার আবির্ভাব ভাই এ ভালো,,ভুরি কমানোর জন্য জিম করবে না, ও নিজের অপারেশন নিজে করেই পার্মানেন্ট পেট কমিয়ে ফেলবে। "
আবির্ভাব মাথা চুলকে বললো...
"আরেহ, আমি তো পেট বড় হওয়ার মতো কোনো কাজই করবো না, তাই না আরজু? "
নিজের নাম শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আবির্ভাব থতমত খেয়ে বললো..
"ইয়ে মানে কিছু না, তুমি চুপ করে বসে আছো তো তাই.. "
আনান বুঝতে পেরে কথা ঘুরাতে বললো..
"আরে রাখ তোর আরজু, আগে কাহিনি বল পেট বড় হওয়ার মত কিছু করবি না মানে? গন্ডগোল লাগে রে তোরে.."
রণ বললো..
"আবির্ভাব ভাই,তুই কি গে*? "
আবির্ভাব রণের পিছনে লাথি মেরে বললো..
"শা'লা, ইজ্জত খাইস না। "
এদের সবার হাসির মাঝে দৃশ্য আর কল্প আধো আধো বুলিতে বলে উঠলো..
"তোমরা সবাই কি সব বলছো পেট বড় করবা? আমরাও পেট বড় করবো। "
পৃথিবী হেঁসে বললো...
"আরে বাচ্চো, পেট তো এমনি এমনি বড় হবে না তোদের। পেট বড় করতে হলে বিয়ে করতে হবে, বউকে আদর করতে হবে। তোদের বাপকে বল বিয়ে করাই দিতে তোদের৷ "
ব্যস, শুরু হয়ে গেলো পুরো বাড়ি জুড়ে দৃশ্য আর কল্পের বায়না, চিৎকার দিয়ে কান্না করতে লাগলো দুজন মিলে, তাদের দাবি তাদের বিয়ে দিতে হবে এক্ষুনি। তারাও বিয়ে করবে, বউকে আদর করে পেট বড় করবে।