রেখো তোমার বাহুডোরে

পর্ব - ১১

🟢

স্নিগ্ধতায় ঘেরা সকালের মলিন রোদ ধীরে ধীরে গ্রীষ্মের তেজস্ক্রিয় রুপ ধারন করছে। বিছানার বাম দিকে একটি জানালা, রাতে সাবিহা ইচ্ছে করেই খোলা রেখে গিয়েছে ইন্দুর রুমে। হাওয়া বাতাস চলাচল করলে ঘর ঠান্ডা থাকবে এই ভেবেই। প্রখর রোদের আলোক রশ্মি এসে ঘুমন্ত ইন্দুর মুখের উপর পড়তেই রাত দ্রুত গিয়ে জানালার পর্দা টেনে এলো। বসলো বিছানার কিনারায় ফ্লোরে।দু হাত ভাজ করে বিছানায় রেখে সেথায় নিজের মাথা ঠেকলো, একদম ইন্দুর মুখ বরাবর।

মেয়েটার দু চোখের ঘন পাপড়িগুলো বেশ চমৎকার। ঠোঁট জোড়া ঘুমের মাঝে কেমন করে যেন খিঁচিয়ে রেখেছে। যার দরুন তার নিম্ম ঠোঁটে কয়েকটি ভাজ পড়েছে। রাত নিগুঢ় হাসলো।

তার সাতাশ বছরের জীবনে গত ছয়টা বছর সে নিজের স্বপ্নে একটু একটু করে বুনে এসেছে এই মায়াবী মুখটি। আদেও সত্যিকারের এমন কেউ আছে কিনা তা নিয়েও কোনো নিশ্চয়তা ছিলো না রাতের। তবুও সে প্রতিটা দিন স্বপ্নে এই মানবীটিকে দেখার প্রয়াস চালাতো। প্রেম নামক বস্তুর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে এই স্বপ্নদর্শীর জন্যই। রাতের এখনো মনে আছে, প্রায় তিন বছর আগে একটি মেয়ে তাকে প্রপোজ করার পর রাত উত্তর দিয়েছিলো 'ভেবে দেখবো'। আর সেদিন রাতের স্বপ্নেই প্রথমবারের মতো এই মায়াবিনীর মুখে হাসি ছিলো না। অভিমানে মুখ ভার করেছিলো তিনি।রাত বুঝে উঠতে পারছিলো না তার স্বপ্নদর্শীর হঠাৎ এমন অভিমানের কারণ। দুটো দিন এভাবেই অভিমানি হয়েছিলো এই মেয়েটি। রাতের সেই দুটো দিন কি যে অশান্তিতে কেটেছিলো, এক মাত্র সেই জানে। কাজে মন বসছিলো না, কারোর সাথে কথা বলতে ভালো লাগছিলো না, শুধু মাথায় একটি চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিলো। স্বপ্নদর্শীর হঠাৎ এমন অভিমানের কারন কি?

পরে অনেক চিন্তা করে দু দিন আগের প্রপোজ করা মেয়েটির কথা মাথায় আসতেই সাথে সাথে ছুটে গিয়ে মেয়েটিকে বলেছিলো...

"সরি, আমি তোমার অফার নিতে পারছি না। আমি একজনকে ভালোবাসি। "

মেয়েটি প্রশ্ন করেছিলো..

"কে সেই মেয়ে? "

রাত ঘাবড়ালো,কি নাম বলবে সে? তার স্বপ্নদর্শীর যে নাম জানে না রাত। ভেবে দেখলো তার স্বপ্নদর্শী তার সারা দিনের ক্লান্ততা মেটায়, সে যে রাতের মনের তৃষ্ণা, তাই ভেবে তার উত্তর দিলো...

"সে আমার তিয়াস "

তবে এই ছয় বছরে রাত ভেবেছিলো তার তিয়াস হবে হয়তো কোনো ২৩-২৪ বছরের কোনো নারী। কিন্তু বাস্তবতা এতো ভিন্ন, মায়াবিনীর মায়া মুখখানি মিল রেখে বাকি সবই অমিল। এই যে তার সামনে থাকা মেয়েটি নিতান্তই বাচ্চা একটা মেয়ে, সদ্য আঠেরোয় পা দিয়েছে কিনা কে জানে। দেহের গড়ন, চলাফেরা, আচার-আচরণ সবকিছুই এখনো বাচ্চাসুলভ। এই যে এখনো কেমন করে বাচ্চাদের মতোই দু হাত গালের নিচে দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

রাত এক হাত এগিয়ে নিয়ে ইন্দুর ঠোঁটের পাশে আঙুল দিয়ে ঠোঁট দুটো স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। সাথে সাথেই নড়ে-চড়ে উঠলো ইন্দু। ঘুমের মাঝেই সরু জিহ্বাটা বের করে ঠোঁট ভেজালো সে।

সাথে সাথেই রাত মাথা ঘুরিয়ে নিলো অন্যদিকে। মেয়েটার এমন কাজগুলো খুব টানে রাতকে। এই যে এখনো কেমন ভেতরটা কেঁপে উঠলো ইন্দুর ঠোঁট ভেজানোর দৃশ্য দেখে। রাত নিজেকে সংযত করলো,এখনো সময় হয়নি এসবের।

রাত উঠে গিয়ে ইন্দুর পড়ার টেবিলের সামনে গিয়ে টুকটাক বই খাতা চেক করতে লাগলো। একটু পরেই ইন্দুর ঘুম ভাঙতেই চোখ খুলে দুরে কাউকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে ঘুমুঘুম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো....

"কে? "

রাত মাথা ঘুরিয়ে ফিরে তাকালো। তাকে দেখেই ইন্দু তড়িৎ গতিতে উঠে বসে বিছানার এক কোনায় সিটিয়ে গেলো। ভয়ে ঢোক গিললো সে। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না যেন। রাত এগিয়ে এলো। মুখভঙ্গি স্বভাবতই গম্ভীর তার। ইন্দুর একদম কাছে এসে দাঁড়াতেই ইন্দু আবার সরে যেতে লাগলো, সাথে সাথেই রাত তার বাহু চেপে ধরে আটকালো। কপালে গালে হাত ঠেকিয়ে চেক করলো জ্বর নেই তেমন। গম্ভীর স্বরেই জিজ্ঞেস করলো....

"দূর্বল লাগছে? "

ইন্দু দ্রুত দু- পাশে মাথা নাড়ালো। রাত আবার প্রশ্ন করলো...

" হাটতে পারবে ঠিক মতো? "

ইন্দু এবারও চুপচাপ উপরনিচ মাথা নাড়ালো। রাত বললো...

"দেখি তাহলে নামো তো? "

ইন্দু একবার মুখ তুলে রাতের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে আস্তে করে নামলো বিছানা থেকে। রাত এবার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার তাকালো ইন্দুর দিকে৷ মেয়েটার পড়নে হ্যালো কিটির একটা গেঞ্জি আর প্লাজু। রাত ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো...

"Are you comfortable with this?"

আঙুলের ইশারায় ইন্দুর জামা বোঝাতেই ইন্দু নিজের দিকে তাকালো। অবস্থা বুঝতে পেরেই জিভ কেটে দ্রুত পেছন ফিরে বিছানার পাশ থেকে ওড়না নিয়ে পড়ে নিতে নিতে বললো...

"এ্ এটা কড়ি আপুর গেঞ্জি। কাল রাতে অতিরিক্ত গরম লাগছিলো বলে আপু জোর করে পড়িয়ে দিয়ে গেলো। "

রাত হাফ নিঃশ্বাস ফেলে বললো...

"ওয়ারড্রবের ৩য় ড্রয়ারে তোমার প্লাজু আর গেঞ্জি রাখা আছে। ওগুলো আরেকটু লম্বা নিচের দিকে, বাড়িতে থাকলে ওগুলোই পড়তে পারবে সমস্যা নেই। এখন ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে পাঁচ মিনওটে নিচে এসো।"

বলেই আর অপেক্ষা করলো না রাত। বেরিয়ে যেতে নিয়ে দরজার সামনে থেমে আবার বললো...

"পাঁচ মিনিট মানে পাঁচ মিনিটই। আমি যেন আর উপরে উঠে আসা না লাগে। অপেক্ষা করছি। "

চলে গেলো রাত। ইন্দু তার কথা মতো ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে নিলেও নিচে নামার নাম নিলো না। মনে মনে বললো...

"সে কিছুতেই এই লোকের সামনে পড়বে না আর। "

এই ভেবেই চুপ করে খাটের এক কোনায় বসে আছে ইন্দু। এদিকে পাঁচ মিনিটের জায়গায় দশ মিনিট পেরিয়ে গেলেও ইন্দু আসার নাম নিচ্ছে না। রাত বেশ অনেকক্ষণ ধরেই ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে রেডি হয়ে। কান্তা এই নিয়ে তৃতীয় বার ডাক পারলো...

"রাত বাবা, আর কতক্ষণ ওভাবে বসে থাকবি? নাস্তা করে নে?"

আবরার রা চার ভাইও তখন ব্রেকফাস্ট টেবিলেই ছিলো। আশরাবও নাস্তা করতে করতে রাতকে ডাকলো...

"কিরে আয়? অফিসে যাবি না তুই? "

রাত উত্তর দিলো..

"যাবো "

"তো লেইট হচ্ছে না? আয় নাস্তা করে নে। "

রাত উত্তর দিলো না। সোফা ছেড়ে উঠে আবার গেলো ইন্দুর রুমের দিকে। রাতকে নিজের রুমে আসতে দেখেই ইন্দু সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ভয়ে জুবুথুবু হয়ে রইলো। গোলগোল চোখে একবার রাতের দিকে তাকাতেই চোখে পড়লো রাতের কঠিন দৃষ্টি, চোয়াল শক্তকরে রাখার দৃশ্য। বিরূপ রাগ মুখে ফুটেছে দেখে ভয়ে চোখ নামিয়ে ফেললো ইন্দু, এই বুঝি না আবার কয়েকটা থাপ্পড় মেরে দেয় রাত ভাইয়া তাকে।

কিন্তু রাত তেমন কিছুই করলো না। ধীর কিন্তু শীতল কন্ঠে বললো..

"নিচে চলো এক্ষুনি। "

কন্ঠের তীব্রতায় টিকতে পারলো না ইন্দু। নিজের জান বাচানোর একমাত্র পন্থা হিসেবে বেছে নিলো পালানো। যেই ভাবা সেই কাজ। চুপচাপ মাথা নিচু করে রাতকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। রাতও পিছননপিছন নিচে নামলো তার। ব্রেকফাস্ট টেবিলের সামনে আসতেই রাত একটা চেয়ার টেনে ইন্দুকে বোঝালো এখানে বসতে। ইন্দুও চুপচাপ বসলো। টেবিলে থাকা সবাই নীরবে দেখতে লাগলো রাতের হাবভাব।

লিয়ানা আর সাবিহা মিলে ইন্দু আর রাত দুজনেরই খাবার দিলো দু রকম।ইন্দুর জন্য চিজ পাস্তা, সাথে দুটো সেদ্ধ ডিম আর এক গ্লাস দুধ।আর রাতের জন্য ব্ল্যাক কফি উইথ হোয়াইট সুগার আর ব্রেড এন্ড বাটার।

রাত সুন্দর মতো প্রথমে পাস্তার বাটিটা এগিয়ে দিলো ইন্দুর দিকে। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো....

"তিন মিনিট সময়, শেষ করো এটা। "

ইন্দু ভ্যাবলার মতো বলে উঠলো...

"এ্যা!!"

রাত ইন্দুর হাতটা টেনে এনে চামুচ ধরিয়ে দিয়ে খেতে ইশারা করলো। ইন্দু আর কি করবে? সিংহের ক্ষপ্পরে পড়েছে এখন তো কথা মতোই চলতে হবে। চুপচাপ খাওয়া শুরু করলো।

রাত আগের মতোই ইন্দুর চেয়ারে এক হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন খুব মনোযোগ দিয়ে ইন্দুর খাওয়া পর্যবেক্ষণ করছে সে।

কান্তা হাসলো এমন কান্ডে। রাতকে বললো...

"রাত বাবা, ও খাচ্ছে তো তুইও এবার খেয়ে নে। "

রাত কিচ্ছু বললো না। আগের মতোই চুপ রইলো। পাস্তা শেষ হতেই একে একে ডিম দুটো আর গ্লাসের দুধটুকুও খাওয়ালো ইন্দুকে। তারপরই আস্তে করে নিজের সামনের ব্রেড এন্ড বাটারের প্লেটটাও এগিয়ে দিলো ইন্দুর সামনে। তা দেখেই চক্ষু চরক গাছ ইন্দুর। গোলগোল চোখ করে রাতের দিকে মুখ তুলে তাকাতেই রাত বললো...

"শেষ করো দ্রুত। "

ইন্দু এবার কাঁদো কাঁদো মুখ করে কান্তা, সাবিহা এদের দিকে তাকাতেই রাত এক হাতে ইন্দুর থুতনি ধরে মুখ ঘুরিয়ে বললো...

"ওদিকে তাকিয়ে লাভ নেই। তোমাকে খেতে বলছি আমি। "

ইন্দু ফেঁসে গেছে। মেয়েটার এমন করুন মুখ দেখে আবরার বলে উঠলো...

"ছেড়ে দে না ওকে রাত,, ওরটা তো খেয়েছেই। তোর খাবার তুই খেয়ে নে। "

রাত প্লেটে থাকা একটি বাটার মাখানো ব্রেড হাতে তুলে নিতে নিতে বললো...

" তিয়াস অসুস্থ বড় আব্বু। ওর বেশি বেশি খাওয়া প্রয়োজন। "

বলেই ইন্দুর মুখের সামনে ব্রেডটা ধরলো। বললো..

"হা করো। "

ইন্দু আবারও করুন দৃষ্টিতে সাবিহার দিকে তাকালো। সাবিহা নিজের ছেলেকে খুব চেনে। সে যখন একবার সীদ্ধান্ত নিয়ে ইন্দুকে খাওয়াবে, তাহলে তাই করে ছাড়বে। তাই চোখের ইশারায় ইন্দুকে হা করতে বললো...

ইন্দুও আর উপায় না পেয়ে রাতের হাতেই খেতে লাগলো ব্রেড। একটা শেষ করে আরেকটায় দুটো বাইট দিয়ে আর পারছিলো না খেতে। করুন চোখে রাতের দিকে তাকিয়ে বললো...

"আর পারছি না আমি। "

রাত কিয়াৎক্ষণ ইন্দুর দিকে তাকিয়ে কি মনে করে যেন ব্রেডটা নামিয়ে রাখলো প্লেটে। নিজের কফির কাপটা এগিয়ে দিলো ইন্দুর দিকে। চোখের ইশারায় বোঝালো এটা খেতে। ইন্দু এক চুমুক দিতেই ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত খিঁচিয়ে উঠলো তার। এত্তো কড়া আর তেতো খেতে কফিটা, রাত কি করে এমন কফি খায় ভেবেই পেলো না।

উপায় না পেয়ে ইন্দু এবার নাক টেনে টেনে কান্না শুরু করে দিলো। কাঁদতে কাঁদতেই বললো...

"আপনার আমাকে অপছন্দ হলে বাড়ি থেকে বের করে দিন, কিন্তু এভাবে খাওয়াচ্ছেন কেন এগুলো। "

রাত কথার উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করলো...

"আর আমার কথার অমান্য হবে?"

ইন্দু কাঁদতে কাদতেই চোখ বন্ধ করে দু পাশে মাথা নাড়িয়ে সুর টেনে বললো...

"নাআআ"

মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তুরুলা বাহিনী হাসতে হাসতে টেবিলেই যেন গড়াগড়ি খাচ্ছে। তট আস্তে করে বললো...

"ভাইয়া, ওকে থামাও। কাঁদলে ওর শ্বাসকষ্ট হয়। "

শুনেই রাত বললো..

"তিয়াস স্টপ। "

ইন্দু থামার নাম নিলো না। রাত এবার আরেকটু জোরে চেচিয়ে বললো...

"ন্যাকামো বন্ধ করো তিয়াস। "

কে শুনে কার কথা। ইন্দু কাঁদতে কাঁদতেই বললো...

"আমি ন্যাকামো করছি না। "

"আমি তোমাকে মারছিনা যে এভাবে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদবে তুমি।চুপ করতে বলছি তোমায়। "

ইন্দু শুনলো না। এবার রাত আরো ক্ষেপা স্বরে চেঁচিয়ে বললো...

"আই সেইড স্টপ তিয়াস। "

ধমকের তোপে থেমে গেলো ইন্দু। ভয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। রাত কন্ঠ নিচে নামিয়ে বললো...

"আর যেন কাঁদতে না দেখি কোনোদিন। "

ইন্দু আর থামলো না, ভো দৌড়।

সাবিহা বললো...

"তুই বস, আমি আবার নাস্তা আনছি। "

"প্রয়োজন নেই "

বলেই রাত চেয়ারে বসে ইন্দুর আধখাওয়া ব্রেডটা খেতে লাগলো। টেবিলের সবাই হা হয়ে রইলো। কি দেখছে তারা এটা। রাত নীরবে হুঙ্কার ছুড়লো...

"খাওয়া শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। জিরিয়ে নেওয়া শেষ হলে উঠে যা সবগুলা। "

নীরবে যে রাত সবাইকে একটা বড়সড় সতর্কবার্তা দিয়ে দিলো তা বুঝতে দেরি হলো না কারোরই। সাথে সাথেই উটে পালাতে লাগলো সবাই।

রাত ব্রেডটা শেষ করে ইন্দুর চুমুক দেওয়া কফিটা খেতে খেতে আনানকে বললো...

"তিয়াসকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে তারপর অফিস যাবি তুই৷ "

আয়ুশ বললো..

"ও তো মাত্র একটু সুস্থ হলো। আজকে না হয় কলেজে নাই যাক. "

রাত সাথে সাথে উত্তর দিলো..

"না ছোটকা, টেস্ট এক্সামে তিয়াস অপশনালে ফেল করেছে। সামনেই ওর ফাইনাল এক্সাম, আমি চাইনা কোনো গা ছাড়া ভাব থাকুক ওর এই সময়। "

আর কেউ উত্তর করতে পারলো না রাতের কথার উপর। চুপচাপ খাওয়া শেষ করে চলে গেলো রাত।

----------

সন্ধ্যারাতের দিকেই আবির্ভাব ফিরে এসেছে হসপিটাল থেকে। ফ্রেশ হয়ে এগিয়ে গেলো গীতিচর্চা রুমের দিকে। আজকাল তুরুলা বাহিনীর আড্ডাটা বেশি ঐ রুমটাতেই হয়। আজও তার বিপরীত হলো না। রুমের সামনে গিয়েই দেখলো ইন্দুর হাতে ইউকালেলে। রণ ইন্দুকে তাল শিখিয়ে দিচ্ছে একটু একটু করে সেটার। পৃথিবী ব্যস্ত আর ব্লগিং নিয়ে। আজকাল রিচ বেশি হওয়ার কারনে পৃথিবী আগে থেকেও বেশি এক্টিভ হয়েছে তার তিড়িংবিড়িং চ্যানেল+পেইজ এর কাজে। আর তার ভিডিওর মুল উদ্দেশ্যই তুরুলা বাহিনী।

আবির্ভাব সামনে থেকেই ইন্দুকে ডাকলো...

"ইন্দু, একটু বাইরে আসবি? তোর সাথে কথা ছিলো একটু। "

ইন্দু হাসি মুখে আসছি বলেই উঠে বেরিয়ে এলো। করিডোরে দাঁড়িয়ে ইন্দু জিজ্ঞেস করলো...

"হ্যা ভাইয়া, বলো?"

আবির্ভাব আমতা আমতা করে বললো...

"আসলে, কি ভাবে যে বলি, "

ইন্দু হেঁসে বললো...

"আরে ভাইয়া,এতো আনইজি ফিল করছো কেন, আমরা আমরাই তো। বলে ফেলো?"

আবির্ভাব হাসলো। বললো...

"তোর ফ্রেন্ড নাকি বাসা খুঁজছে? ওর আম্মুকে নিয়ে আসবে বললো.."

"হ্যা ভাইয়া। আরজুর আম্মু তো থাকে ওদের বাড়িতেই। ওর আব্বু নেই, এখন বাড়িতে ওর চাচাদের সাথে একটু সমস্যা হচ্ছে তাই আরকি আন্টিকে নিজের কাছেই নিয়ে আসতে চাইছে আরজু। আন্টিরও তো আরজু ছাড়া কেউই নেই তাই। "

"বুঝলাম। আমি বলছি কি, আমি খোঁজ নিয়েছি আমাদের বাড়ির সামনেই যে ফ্ল্যাটবাড়িটা আছে, সেখানে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া দেবে। আরজু চাইলে সেখানে উঠতে পারে ওর আম্মুকে নিয়ে। এতে করে তুইও ওর কাছাকাছি থাকতে পারবি আর আশা করি ওরও তেমন সমস্যা হবে না। "

ইন্দু ভাবলো। চিন্তিত হয়ে বললো...

"কিন্তু ভাইয়া। দামি ফ্ল্যাটে থাকতে গেলে ওর একটু সমস্যা হয়ে যাবে না? আসলে বুঝতেই তো পারছো ফিনানশিয়ালি সমস্যাটা। "

"আ্ আমি সবটা ভেবেই তো বলছি। ঐ ফ্ল্যাটটা ছোট তো, তাই বাড়িওয়ালা তেমন ভাড়াও রাখছে না, ঐ মাসে দুই - আড়াই হাজারের মধ্যে হয়ে যাবে। "

ইন্দু অবাক হয়ে বললো..

"এতো কমে?"

আবির্ভাব ঘাবড়ালো, তবুও সামলে নিয়ে বললো..

"হ্যা, তাই তো ভাবলাম আরজুর সুবিধা হবে হয়তো। "

ইন্দু বললো..

"আচ্ছা আমি বলে দেখবো ওকে। "

আবির্ভাব দ্রুত বললো...

"শুধু বললেই হবে না, ওকে রাজি করাতে হবে। "

ইন্দু কোমরে দুহাত গুঁজে ভ্রু কুঁচকে বললো...

"রাজি করালে কি পাবো আমি? "

আবির্ভাব হাসলো। পকেট থেকে একটা ডেইরিমিল্ক বের করে ইন্দুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো...

" দৃশ্য কল্পের জন্য এনেছিলাম, এটা বাড়তি রয়ে গেছে।আপাতত এটা নে, কাজ শেষ হলে যা চাইবি দিবো, তবে ও যেন না জানে যে এটা আমি বলেছি। "

ইন্দু প্যাকেটটা নাড়িয়ে চাড়িয়ে বললো...

"এমনিতেই বেচে যাওয়া চকলেট দিচ্ছো, আচ্ছা তাও মেনে নিলাম। হয়ে যাবে কাজ চিন্তা করো না, পরে যা চাইবো তা দিতে হবে কিন্তু। "

বলেই ইন্দু আবার গীতিচর্চার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলে আবির্ভাব ডেকে বললো...

"আরে ওখানে নিচ্ছিস কেন,বিচ্ছু গুলো চকলেট নিয়ে নেবে তো। "

ইন্দু যেতে যেতেই বললো...

"সবাই মিলেই খাবো। ভাগ চাইলে তারাতারি এসে পড়ো তুমিও। "

আবির্ভাব হেঁসে নিজেও এগিয়ে গেলো সেদিকে।

এদিকে নিচতলা থেকে এতোক্ষন করিডোরে ইন্দু আর আবির্ভাবকে একসাথে এতো হেঁসে হেঁসে কথা বলতে দেখে কান্তা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। কি কথা বললো তা শুনেনি ঠিক, কিন্তু ছেলে-মেয়ে দুটো যে একে অপরকে পছন্দ করে তা ঠিক বুঝে নিলো কান্তা, তা না হলে সবাইকে ছেড়ে এতো আলাদা করে কিই বা আর বলবে ওরা। সুস্থির হেঁসে পাশে থাকা, মিশি আর লিয়ানাকে বললো...

"আমার ছেলেটাও তিয়াসকে পছন্দ করে দেখলি তোরা? শুভ কাজে আর দেরি করবো না আমি। আজই ওদের বিয়ের ব্যপারে ছেলের বাবার সঙ্গে কথা বলবো আমি। "

রেখো তোমার বাহুডোরে গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে ঘেরা রোমান্টিক ও থ্রিলার গল্প