রেখো তোমার বাহুডোরে

পর্ব - ১৮

🟢

ঝিল পাড়ের জায়গাটা ছোটখাটো একটা পর্যটনকেন্দ্রই বলা যায়।পাড়ে লোহার রেলিয়ের উপর দিয়ে ঝুলানো রঙ বেরঙের ছোটছোট টিউব লাইট। থেকে থেকে আবার ল্যাম্পপোস্টের আলোতে আলোকিত হচ্ছে ঝিলপাড়ের সরু পথ। পথ পেড়িয়ে উপর দিকে নানা রকমারি ছোট ছোট দোকান, ভ্যান।

মৃদু বাতাসে নড়ছে গাছের ডালপালা।নাহ,খুব একটা বেশি ভীড় নেই তবে মানুষজন আছে। কেউ এসেছে একেলা নিজের সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে আবার কেউ এসেছে বন্ধুবান্ধব,প্রেমিকে নিয়ে। সবাইকে একে একে পাড় ধরে আড্ডা দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছে তুরুলা বাহিনী। ইতোমধ্যেই আবির্ভাবও এসেছে।আনানও সাঁজিকে নিয়ে এসেছে। সবাই মিলে আজ আরজুর মন ভালো করারই চেষ্টা করছে শুধু। বেশ অনেকক্ষণ হাটাহাটির পর সবাই মিলে বসলো একটা বটতলায়। আবির্ভাব সবাইকে জিজ্ঞেস করলো....

"চা চলবে গায়েজ?"

তট সাথে সাথেই বললো...

"ডাক্তারের মাথা গেছে,এই গরমে নাকি চা খাবে। "

সাঁজি আঙুল তাক করে বললো...

"আবির্ভাব ভাই, ঐখানে ঠান্ডা লাচ্চি বিক্রি করে, এইটা টেস্ট করলে কেমন হয়? "

সবাই সম্মতি দিলো, আবির্ভাব গেলো সবার জন্য লাচ্চি অর্ডার দিতে। আরজু আশপাশে তাকিয়ে বললো...

"পরিবেশটা সুন্দর, তাই না? "

ইন্দুও আটজুর পাশেই বসা ছিলো। বললো...

"হুম,একটা গান ধরলে কেমন হয়? "

ছবি বললো...

"জোস আইডিয়া, হবে নাকি গান? "

রণ দাঁড়িয়ে বললো...

"তোরা থাক, আমরা আসছি একটু, সায়র ভাই, আফনান আয় তো একটু সাথে। "

আফনান উঠে দাঁড়াতে বললো...

"কোথায় যাবি আবার? "

"গাড়ির কাছে, চল। "

একটু পরেই তারা ফিরে এলো হাতে কয়েকটা ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে। গিটার, ইউকালেলে,কাহন,জিপসি,বাঁশের বাশি, বায়া এইসব।এসব দেখে সাঁজি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো..

"এই সব কোথা থেকে এলো?"

সায়র গিটারের ব্যাগ খুলতে খুলতে বললো...

"এই ওয়েদার গান ছাড়া জমবে না জানতাম, বাড়ি থেকেই নিয়ে এসেছি। "

ছায়া হেঁসে বললো...

"আমি জানতাম তোরা এসব নিয়ে আসবি।"

ছবি হাত বাড়িয়ে বললো..

"দে আমায় বাঁশি দে আজ। "

ইন্দু জিজ্ঞেস করলো...

"তুমি এটাও বাজাতে পারো ছবিপু?"

ছবি হেঁসে বললো...

"হ্যা,তুই পারিস? "

"হ্যা একটু একটু। "

ছবি এবার হাতের বাঁশিটা ইন্দুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো...

"তাহলে তুই-ই বাজা?"

সাথে সাথেই আরজু বারণ করে বললো...

"না আপু, ওকে বাঁশি দিও না, শ্বাসকষ্ট হবে ওর পরে। "

ছবি আবার নিয়ে নিলো বাঁশিটা। বললো...

"তাহলে থাক বোইন। তোর কিছু হইলে রাত ভাই আমায় খত'ম করো ফেলবে৷ "

সায়র গিটার হাতে দাঁড়ালো, আনানের হাতে ইউকালেলে,আফনান বসলো কাহন বক্সের উপর, বসতে বসতেই কাহনে দু তিনটা বারি দিয়ে বললো...

"ওওহ,বাতাসের জন্য আওয়াজ ফ্লো হবে,, বেশ দারুন।"

অহি বায়া হাতে বসলো বটতলায়,পৃথিবী নিজের ক্যামেরার পজিশন ঠিক করতে ব্যস্ত,কোন দিক থেকে ভিডিও ভালো আসবে এটাই দেখছে। রণ পায়ের উপর পা তুলে বসতে বসতে বললো...

"নে ধর এবার। "

---

ঝিল থেকে একটু দূরে গাড়ি পার্ক করে মাত্রই নেমে দাঁড়িয়েছে রাত। সাইকেলের বেল,চা ওয়ালার ডাক সব ছাড়িয়ে কানে এসে বাজলো নারী কন্ঠের টান...

"আতর গোলাপ চন্দন মারো বন্দের গায়ে..//

ঠিক পরপরই কাহনে দুটো বারির আওয়াজ। আবার কানে বাজলো..

" ছিটাইয়া দাও সোহাগ জল,ঐ রাঙা চরণে.."

রাত তৃপ্তিময় শ্বাস ছাড়লো। মনোরম পরিবেশে এমন মনোরম সাবেকি গান যাকে তাকেই প্রশান্তি দিতে পারে। রাত গাড়ির দরজা লক করে হেলান দিয়ে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়ালো। তারপরই ভাবলো, নাহ ভেতরে যেতে হবে,তার তিয়াস কি করছে কে জানে?,

চোখ বন্ধ করে ইন্দুর স্নিগ্ধ মুখখানা একবার মনে করে, দূর থেকে ভেসে আসা ঐ নারী কন্ঠের সাথেই আস্তে সুর তুলে পা বাড়ালো রাত...

"আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম,//"

গানের তাল জোড়ালো হলো, তেমনি জোর কদমে এগিয়ে গেলো রাতও। হঠাৎই কয়েক কদম দূর থেকে এক অনায়াসী দৃশ্য দেখে পা থেমে গেলো তার। আপন মনেই প্রশ্ন করলো..

"আমার প্রণয়িনী গাইছে?"

রাতের পা থামলেও ইন্দুর গান থামলো না তখনও৷ রাতের মুখের হাসিখানা আরো বিস্তৃর্ণ হলো। সামনে গেলো না,ওখানেই ঝিলের ধারে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বুকে দু হাত গুঁজে দাঁড়ালো। দৃষ্টি নিবদ্ধ তার তিয়াসের পানে। মেয়েটা তাকে খেয়াল করেনি এখনো, হাতে জিপসিটা বার বার বা হাতে ঝাকিয়ে তাল মিলাতে ব্যস্ত সে। মুখরাটা সবাই মিলেই গাইছে, ইন্দুর গাইতে থাকা গানের সাথে মুখের চঞ্চল হাসি,মাথা দুলানো,অঙ্গভঙ্গি সব কিছুতেই যেন আটকে যাচ্ছে রাত। বাতাসের অহনায় ইন্দুর পড়নের গাঢ় নীল রঙের স্কার্টটা ছড়িয়ে উড়ছে,সাথে তার লম্বা, সিল্কি খোলা চুল। নিজেকে দূরে আটকে রাখতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে রাতের, বুকের ভিতর ধ্রীম ধ্রীম আওয়াজ জোড়ালো হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যেই, নিজের ডান হাত খানা শার্টের উপর দিয়েই বুকের বা পাশে চেপে ধরে হাপিয়ে যাওয়া কন্ঠে বলে উঠলো...

"আর কত ভাবে আমায় মাতাল করবে মেয়ে তুমি? "

উত্তর কি আদেও এলো ভেতর থেকে? নাকি ইন্দুই তার পরবর্তী কলিখানায় বুঝিয়ে দিলো এই প্রণয় পুরুষকে..

"দিনহীন আর যাবে কোথায় বন্দের চরন বিহনে//

রাঙা চরণ মাথায় নিয়ে, দিনহীনা কান্দে...

আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম..."

রাত মিহি হাসলো।আপনা আপনিই বিড়বিড় করে বললো...

"উহুম,,আপনার স্থান আমার চরনে নয়,আপনাকে আমি সর্বদা বুকে আগলে রাখবো রায়কামিনী। "

গান শেষ করেই সবাই লাচ্চি হাতে তুলে নিলো। রাতও এগিয়ে এলো সবার কাছে। ইন্দু কয়েক ঢোক খেয়ে গ্লাস খানা মুখ থেকে নামালো,চোখ উঁচিয়ে দেখলো রাতকে। রাতের মুখে হালকা হাসি। ইন্দুও সৌজন্যে হাসলো। আবির্ভাব বললো...

"রাত ভাই কখন এলি? লাচ্চি অর্ডার দিচ্ছি তোর জন্য। "

রাত সাথে সাথেই হাতের ইশারায় বারণ করলো। দৃষ্টি নিবদ্ধ তার তিয়াশে। ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি রেখে আস্তে করে বললো...

" পাশা খেলতে চান ম্যাম? কিন্তু আপনার শ্যামের সাথে পাশা খেলতে তো অনেক দেরি,আজ তো হবে না ম্যাম। "

ইন্দু কি আদেও বুঝলো রাতের ইঙ্গিতপূর্ণ কথা? বুঝলো না,উল্টো উচ্ছাসিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল...

"আপনি আমার গান শুনেছেন? "

"ইয়েস ম্যাম "

ইন্দু মাথা কাত করে আহ্লাদী স্বরে বললো...

"কেমন হয়েছে? "

"যাস্ট মাইন্ডব্লোয়িং। আপনার শ্যাম পাগল হওয়ার দশা হয়েছে। এখন আমায় আপনার পাশে একটু বসতে দিবেন? কখন যানি আপনার অটোগ্রাফ নিতে লোকজন জড়ো করে ফেলে, তখন তো আমাকে চিনবেনও না আপনি। "

রাতের এমন রসিকতার কথা শুনে ইন্দু ফিক করে হেঁসে দিলো। একটু সরে বসে রাতকেও বসার জায়গা দিলো। ইন্দুর রেখে দেওয়া লাচ্চির গ্লাসটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো...

"শেষ করোনি কেন? "

ইন্দু স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো...

"মিষ্টি কম,খেতে ইচ্ছে করছে না। "

রাত এক চুমুক খেয়ে বললো...

"কি বলছো,,এটায় তো অনেক মিষ্টি। খেয়ে দেখো?"

ইন্দু ভ্রু কুচকে রাতের বাড়িয়ে দেওয়া গ্লাসটায় ছোট একটা চুমুক দিয়ে বললো...

"কোথায় মিষ্টি? "

রাত এবার নিজে আবার গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললো...

"উউহম,এখন তো আরো বেশি মিষ্টি লাগছে। "

ইন্দু চোখ ছোট ছোট করে তাকাতেই রাত নিজের বা হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা ইন্দুর ঠোঁটের উপর লেগে থাকা লাচ্চিটুকু মুছে দিতে দিতে বললো...

"ইহা যে একটি মিষ্টির ভান্ডার,তা জানেন না আপনি?"

ইন্দু কিছু বললো না।অপ্রস্তুত হয়ে এদিক ওদিক দৃষ্টি দিলো। পৃথিবী বললো...

"আরেকটা হবে নাকি? সময় তো আছে এখনো। "

সবাই সম্মতি দিলো। আরজুকে আনমনে বসে থাকতে দেখে ছায়া বলে উঠলো....

"এবার আরজু ধর একটা। "

নিজের নাম কানে আসতেই সংবিত ফিরলো আরজুর, সাথে সাথেই বলে উঠলো...

"নাহ। "

ইন্দু নীরবে তাকালো তার দিকে। সায়র, রণ এরাও বলতে লাগলো..

"হ্যা হ্যা, আরজু ধর এবার। কোনটা গাইবি বল তাল ধরি। "

আরজু বললো...

"আমি গাই না গান। "

আবির্ভাব তাকালো আরজুর মুখপানে, আবদারের সুরে বললো...

"একটাই তো, তুমি শুরু করলো, না পারলেও সমস্যা নেই,আমরা সবাই তো আছি। "

আরজু হঠাৎই হালকা চেঁচিয়ে বললো...

"বললাম তো গান গাই না আমি। কেন বার বার জোর করছেন? "

সবাই চুপ হয়ে গেলো হঠাৎ আরজুর এমন কথায়। আরজুর চোখ টলমল করছে, বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে বললো...

"আ'ম সরি।।"

ইন্দু হাফ নিঃশ্বাস ফেলে আরজুর সামনাসামনি নিচে বসলো। আরজুর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো স্বরে বললো...

"এভাবে আর কতদিন আরজু? "

আরজু করুন চোখে তাকালো ইন্দুর দিকে। ইন্দু আবার বললো...

"তুই তার কথা রাখছিস না। আরো বেশি দূরে সরে যাচ্ছিস। সে তো তোকে এরকম চলতে বলে নি। "

আরজুর চোখ টলমল করছে,বিরস কন্ঠে বললো...

"আমি পারবো না ইন্দু,আমার দ্বারা হবে না এসব।"

"সবাই কত করে বলছে, গা না একটা গান। সে এখানে থাকলে ঠিক তোকে গাইতে বলতো।"

"আমি পারবো না ইন্দু৷ "

বলেই উঠে গিয়ে ঝিলের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো আরজু ওপাশ ফিরে। ঝিলের টলটলে পানিতে দৃষ্টি রেখে আমুল তৃষ্ণায় বুক ভাঙলো তার, ইন্দু ঠিকই বলেছে, নিবিড় ভাই এখানে থাকলে জোর করে হলেও আরজুকে দিয়ে গান গাওয়াতো। কিন্তু সে তো নেই। চোখ বুঝলো আরজু, নিবিড় ভাইয়ের মায়াবী মুখটা ভেষে উঠলো চোখের পাতায়, সেদিনের সেই স্বচ্ছ দৃশ্য। এরকমই এক রাতে বারান্দার গ্রীল পেড়িয়ে মৃদু বাতাস বইছিলো। এলোমেলো, অগোছালো চুল,রুক্ষ চেহারার সেই তৃষ্ণাক্ত আঁখি দুটি নিবন্ধ হয়েছিলো আরজুর চোখে। নিবিড় ভাই তার পুরুষালী হাতের মাঝে আরজুর কোমল হাতদুটি বন্ধি করে আবদার করেছিলো...

"আমার স্মৃতি গুলো নিজের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখিস আরজু, কখনো হারিয়ে যেতে দিস না। "

চোখ খুললো আরজু, সেদিন যদি একটিবারের মতো বুঝতো তার নিবিড় ভাই তাকে ছেড়ে চলে যাবে, তাহলে আরজু কখনোই সেদিন মুখের উপর 'পারবো না' বলে ফিরে আসতো না। শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে রাখতো তার নিবিড় ভাইকে, কোত্থাও যেতে দিতো না।

নিজেকে শান্ত করে ফের এগিয়ে এলো আরজু। বটতলায় শানের উপর রাখা ইউজালেলেটা হাতে তুলে নিলো নীরবে। তা দেখেই ইন্দুর মুখে হাসি ফুটলো, চোখের ইশারায় আফনানকে বললো কাহনে তাল ধরতে। আফনানও বসে পড়লো কাহন বক্সের উপর। ইন্দু জিপসি হাতে তুলে নিলো। আরজু ইউকালেলে তে দু একবার টুংটাং শব্দ তুলে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলো....

"জীবনের ঐ পাড়ে যদি আরেক জনম থাকে..

সাধের জীবন বন্ধক দিয়া, পাই যেন তোমারে "

ইন্দুর মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেলো। আরজুর দিকে হা হয়ে তাকিয়ে বুক কাপলো তার। এই গানটাই কেন ধরলো মেয়েটা? নিজের ক্ষততে আর কত ঘাঁ করবে? যেদিন নিবিড় ভাই হাতে ইউকালেলে তুলে এই গানটা গাইছিলো সেদিন আরজু বিতৃষ্ণায় মুখ ফিরিয়ে ছিলো নিবিড় ভাইয়ের থেকে। কিন্তু আজ আরজু সেই গানটাই ধরলো।

আরজুর ঠোঁট দুটো তীরতীর করে কাঁপছে, হাতও কাপছে। ঐ কাপা কাপা হাতেই ইউকালেলে তে তাল তুলার চেষ্টা করছে মেয়েটা। আরজুর স্বর থেমে আছে বলে আবির্ভাব এবার আরজুর দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে পরের লাইন ধরলো..

"তোমারে পাইলাম না আমি, তাতে দুঃখ নাই.. "

আরজুর ঘোর কাটলো, তপ্ত শ্বাস ফেলে সে গেয়ে উঠলো...

"তোমারে পাইলাম না আমি, তাতে দুঃখ নাই,,

আমি যে তোমার হইয়াছি, এই ভেবে সুখ পাই// "

নাহ,গানটা আর শেষ করতে পারলো না আরজু। মাঝপথেই তাল থামিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠলো সে। শরীরের ভর ছেড়ে মাটিতেই বসে পড়লো। ইন্দু দ্রুত হাতের জিপসিটা ফেলে রেখে ছুটে গিয়ে জাপ্টে ধরলো আরজুকে। বার বার শান্তনা দিতে দিতে বললো...

"কিচ্ছু হয়নি আরজু,,সব ঠিক আছে। তুই পারবি, তুই একটু হলেও পেরেছিস আজকে। দেখ আমার দিকে? অনেক ভালো হয়েছে, একদম কাদবি না জান।"

আরো নানান কথায় আরজুকে থামানোর চেষ্টা করলো ইন্দু। আবির্ভাব সহ বাকিরাও এগিয়ে এলো আরজুর হঠাৎ কি হয়েছে দেখতে। পরিস্থিতি বুঝে আরজু নিজেকে সামলে নিলো। চোখ মুছে উঠে দাঁড়িয়ে বললো...

"ঠিক আছি আমি। চিন্তা করো না তোমরা। "

আবির্ভাব ঢোক গিললো, মেয়েটার মুখের দিকে তাকালেই কেমন বুকটা কেঁপে উঠছে তার। এত কিসের যন্ত্রণা তার? জানতে হবেই আবির্ভাবকে। কিন্তু এখন নাহ। এখন আর মেয়েটাকে এসব জিজ্ঞেস করে মন খারাপ করে দিতে পারবে না আবির্ভাব। নীরবে নিজের বা হাতে আরজুর হাত মুঠোবন্দি করে বললো...

"ঠিক আছে, চলো চোখ মুখে একটু পানি ছিটিয়ে নেবে, ভালো লাগবে একটু। "

আরজু না করলো না, এগিয়ে গেলো আবির্ভাবের সাথে। হাত ছাড়ানোর প্রয়াসও করলো না, শুধু পেছন থেকে আবির্ভাবকে দেখে গেলো সে, একদম তার নিবিড় ভাইয়ের গড়ন ঠিক যেন।

রাত উঠে দাঁড়ালো,, ইন্দুর হাত জরিয়ে বললো...

"তোরা থাক, আমি একটু হেঁটে আসি। "

"জানেন, আরজু আজ প্রায় দু বছর পর গান গেয়েছে। ইউকালেলে হাতে নিয়েছে। "

রাত হাঁটতে হাঁটতেই তাকালো ইন্দুর দিকে, ইন্দুর দৃষ্টি দূরে থাকা আবির্ভাব আর আরজুর দিকে। আবির্ভাব একটা বাবল বোতলে ফু দিয়ে বার বার আরজুর মুখের সামনে বাবল ছুড়ছে, আর আরজু হাত দিয়ে সেগুলো ভেঙে দিচ্ছে, মুখে তার হালকা হাসি। সেই হাসি দেখেই তৃপ্তিময় হাসলো ইন্দু। বললো...

"ওর মুখে সহজে হাসি ফোটানো যান না এখন আর। আবির্ভাব ভাই পেরেছে দেখুন? "

রাত জিজ্ঞেস করলো...

"ওর কি কিছু হয়েছে? কোনো কিছু নিয়ে ডিপ্রেসড লাগে ওকে। "

ইন্দু এবার দৃষ্টি সরিয়ে তাকালো রাতের দিকে। বললো..

"পরে একদিন বলবো। এখন চলুন সবার সাথে। "

বেশ অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর সবাই এসে থামলো গাড়ির কাছে। তাদের দুটো গাড়ি আর দুটো বাইক। বড় মাইক্রোটায় বাড়ি থেকে সবাই এসেছে, আবির্ভাব আর আনান নিজেদের বাইক নিয়ে এসেছে, আর রাত নিজের কালো রঙের রোলস রয়েস গাড়িটা নিয়ে এসেছে। বাইক দেখেই ইন্দু খুশিতে লাফিয়ে বলে উঠলো...

"আমি বাইকে যাবো।"

সাথে সাথেই রাতের মানা..

"নাহ,তুমি গাড়িতে যাবে আমার সাথে। উঠো। "

ইন্দু মানলো না, আনান বললো...

"তিয়াশ,আমার তো সাঁজির মাকে বাড়ি পৌছে দিতে হবে,আমি তোকে অন্য একদিন নিয়ে যাবো প্রমিস। "

ইন্দু এবার আবির্ভাবের দিকে তাকিয়ে বললো...

"তাহলে আমাকে তুমিই নিয়ে চলো আবির্ভাব ভাই। "

আবির্ভাব কিছু বলতে যাবে তার আগেই রাত ফের বললো...

"নাহ,আবির্ভাব আরজুকে নিয়ে যাবে। আরজুর এখন একটু ফ্রেশ এয়ার দরকার। "

ইন্দু জেদ ধরে বললো...

"নাহ আমি বাইকে যাবো। "

রাত জোর করে গাড়িতে বসালো ইন্দুকে। নিজে ড্রাইভিং সীটের দিকে ঘুরে আসতে নিলেই ইন্দু ফট করে নিজের সাইডের দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লো আবার। রাত হাফ নিঃশ্বাস ছেড়ে আবারো টেনে তুললো ইন্দুকে। বললো...

"চুপচাপ বসো। "

"আমি গাড়িতে যাবো না। "

ছটফট করে ফের বেরোতে নিলেই রাত এবার হঠাৎ করেই ইন্দুর গলা থেকে স্কার্ফটা টেনে নিয়ে ইন্দুর দু হাত বেঁধে দিলো শক্ত করে। ইন্দু আর চেষ্টা করেও গাড়ির দরজা খুলতে পারছে না। রাত এসে নিজের সীটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। এদিকে ইন্দু হাত খুলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কোনো ভাবেই পারছে না। রাত মিটি মিটি হাসছে আর ড্রাইভিং করতে করতে ইন্দুর কান্ড দেখছে। ইন্দু এদিক সেদিক করতে করতে দু হাত উপরে তুলতেই পড়নের স্কার্টের উপরের পার্টের গেঞ্জিটা একটু উপরে উঠে গেলো। রাত একবার তাকিয়ে বা হাতে গেঞ্জিটা টেনে নামিয়ে দিয়ে বললো...

"হাত উপরে উঠাবে না। "

ইন্দুও মুখের উপর বললো..

"একশ বার উঠাবো।"

বলেই আবারও হাত উপরে তুললো ইন্দু, রাত আগের মতো আবার ইন্দুর জামা টেনে ঠিক করে দিলো। যতবারই ইন্দু হাত তুলছে ততবার রাত জামা ঠিক করে ইন্দুকে বারণ করছে। ইন্দুও এবার রাতকে জ্বালানোর জন্য ইচ্ছে করেই বার বার হাত উপরে তুলছে। এক পর্যায়ে এসে রাত হুট করেই রাস্তার এক পাশে গাড়ি ব্রেক কষলো। ন্যানো সেকেন্ডের মাথায় নিজের সীটবেল্টটা খুলে ইন্দুর দিকে ঝুকে মাথা নামিয়ে তার ফর্সা কোমল পেটে নিজের মুখ চেপে ধরলো। মুহুর্তেই জমে গেছে ইন্দু। শ্বাস যেন গলায় এসেই আটকে গেছে তার। সারা শরীর যেন অবস হয়ে গেছে তার। কি করছেন উনি এটা?

রাত নিজের খোচাখোচা দাঁড়িযুক্ত মুখখানা ঠেকিয়ে রেখেছে ইন্দুর পেটে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ছোঁয়ায় ইন্দুর বাকশক্তি লোপ পেয়েছে যেন, হাত দিয়ে যে রাতকে সরিয়ে দেবে সেই শক্তিটুকুও যেন পাচ্ছে না সে।

হঠাৎ রাত নিজের পুরু ওষ্ঠ ছোয়ালো ইন্দুর নাভিতে, সাথে সাথেই চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেললো ইন্দু। বদ্ধ হাত দুটি দিয়েই রাতের মাথার সিল্কি চুলগুলো খামছে ধরলো সে। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না তার, অনুভব করলো তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, সারা শরীরে এক অসহ্য শিহরন বয়ে যাচ্ছে তার, এ কেমন কামুকতাময় অনুভুতি হচ্ছে তার, কি করছে রাত এটা তার সাথে, তাকে কি অভিনব কৌশলে মৃ'ত্যুদন্ড দিচ্ছে?"

রেখো তোমার বাহুডোরে গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে ঘেরা রোমান্টিক ও থ্রিলার গল্প