চিত্ত আকুল রাতের, তার স্বপ্নদর্শী একা একা কি করছে, বিরক্ত হচ্ছে কিনা এসব ভেবে ভেবেই পুরো মিটিংটা দ্রুত শেষ করে কনফারেন্সরুম থেকে বের হলো সে। আনান নীরবে পর্যবেক্ষণ করেছে রাতের পুরো সময়টার অস্থিরতা।
দ্রুত কদমে নিজের কেবিনের দিকে যেতে নিয়ে হঠাৎই রাতের চোখ আটকালো এম্প্লয়ি সেন্টারের দিকে। সবাই এক জায়গায় গোল হয়ে আছে, আর তাদের মধ্যমনি হয়ে কাউন্টারের উঁচু ডেস্কের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে ইন্দু। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছে এম্প্লয়িদের সাথে সে। সবাইও মাঝে মধ্যে তাল মিলাচ্ছে তার সাথে৷ রাত বাইরে দাঁড়িয়েই একখানা ক্লান্তময় নিঃশ্বাস ফেললো। আনান এসে আস্তে করে বললো...
"কিরে ভাই,ওকে একা কেবিনে রেখে এসেছিস বলে মিটিংটা কোনো মতে সেরে এলি৷ আর সেই কিনা দেখ,পুরো অফিস এক করে আড্ডা জুড়ে দিয়েছে। "
রাত একপলক আনানের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেলো ভেতরের দিকে। রাতকে আসতে দেখেই এম্প্লয়িরা সবাই ভয়ে মাথা নিচু করে সরি বলে যে যার জায়গায় বসতে লাগলো৷ রাত তাদের দিকে তাকিয়ে বরাবর দাঁড়ালো ইন্দুর সামনে। মাথা হালকা উঁচু করে জিজ্ঞেস করলো...
"তুমি এখানে কেন? "
ইন্দু আগের মতোই পা দুলাতে দুলাতে বললো..
"আপনার কেবিনে একা একা বিরক্ত লাগছিলো, তাই এখানে এসে সবার সাথে কথা বলছিলাম। "
"তো এত উপরে উঠেছো কি করে তুমি? "
"ওসব বাদ, আগে শুনুন তো আপনি.. "
বলেই ইন্দু একটু নিচের দিকে ঝুঁকতে লাগলো। তা দেখে রাত আরেকটু এগিয়ে আস্তে করে ইন্দুর গলার সাথে লাগানো ওরনাটা ভাজ টেনে বুক পর্যন্ত ঢেকে দিলো তার। ইন্দু রাতের কানের কাছে মুখ নিয়ে কিছু একটা বললো ফিসফিস করে, রাত উত্তর দিলো...
"শুনছি না কিছুই... "
ইন্দু এবার নিজের মুখটা আরেকটু কাছে নিতেই তার কোমল ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো রাতের কান সংলগ্ন অঞ্চলে। সাথে সাথেই আবেশে চোখ বুঁজে ফেললো রাত। ঢোক গিলে নিভৃতে চেষ্টা করলো নিজেকে সংযত করার।
"আপনার যে অফিসে একটা গার্লফ্রেন্ড আছে, তা কি বাড়ির কেউ জানে? "
ব্যস, রাতের আবেশ ফুস, মেয়েটা কিসব বকছে। চোখ খুলে নাক কুঁচকে বললো..
"কিহ?"
"হুমম,আমি তো জেনে ফেলেছি এখন। বাড়ির সবাইকে বলে দিলে তো ফেঁসে যাবেন আপনি।"
রাতের ভ্রু জোড়া কুঁচকানো। আস্তে করে বললো...
"এসব আজেবাজে কথা কে বলেছে তোমায়?"
ইন্দু এবারও আগের মতো রাতের কানে ফিসফিস করে বললো...
"ওসব বাদ,এখন শুনুন, আমি যা বলবো আপনাকে তা করতে হবে। নাহলে আমি বাড়িতে বলে দেবো। বুঝতে পেরেছেন? "
মেয়েটা রাতকে ব্ল্যাকমেইল করছে আল্লাহ,ভাবতেই কেমন যেন হাসি পাচ্ছে রাতের। তবুও নিজের হাসি সংযত রেখে বললো...
"কি করতে হবে আমায়?"
"আমাকে আপনার বাইকে চড়াতে হবে। আমি কখনো বাইকে চড়িনি৷ বলুন রাজি? "
রাত আলতো হেঁসে বললো...
"জ্বী কবুল। "
ইন্দু বিরক্ত হয়ে ঠিক হয়ে বসে এবার স্বাভাবিক ভাবেই বললো...
"কবুল বলছেন কেন? আপনার বিয়ে দিচ্ছি আমি? "
"তুমিই তো বললে ' বলুন রাজি "
ইন্দু ছোট্ট হাতে নিজের কপাল চাপড়ালো একবার। এক হাত কোমড়ে গুঁজে বললো...
"আমার শর্তে রাজি কিনা সেটা বলুন"
"রাজি ম্যাম, তবে কবে নিবো সেটা আমি ডিসাইড করবো। "
ইন্দু হেঁসে বললো..
"ওকেয় "
রাত এবার ইন্দুর কোমড়ে দু হাত দিয়ে তাকে ডেস্ক থেকে নামাতে নামাতে বললো...
"নেমে আসুন এবার ম্যাম, অনেক হয়েছে। "
এদিকে এমন দৃশ্য দেখে ভেতর ভেতর রাগে ফেটে পড়ছে তিশা। ইন্দু মেয়েটার প্রতি স্যারের এমন কার্যক্রম যেন সুবিধার মনে হচ্ছে না তার কাছে। সব সময় সবার সাথে গম্ভীর ভাবে কথা বলা মানুষটা হুট করেই এই একটা মেয়ের সাথে এত কথা বলছে, তাও অদ্ভুত ভাবে মুখে হাসি রেখেই।
"পেটে ব্যথা করছে এখন আর? "
ইন্দুর কপালের চুল গুলো কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে আস্তে করে কথাটা জিজ্ঞেস করলো রাত, ইন্দু দু পাশে মাথা নেড়ে না বোঝালো।
"খিদে পেয়েছে আপনার? "
ইন্দু এবারও না বুঝালো। রাত পকেট থেকে ফোন বের করে আবির্ভাবের থেকে জেনে নিলো ফ্রী আছে কি না। কিন্তু আবির্ভাব জানালো তার আজকে পর পর দুটো সার্জারি আছে আর ওয়াকেও যেতে হবে একবার। কল কেটে রাত বললো...
"আপনার আবির্ভাব ভাই আজ একটু বেশিই ব্যস্ত, হসপিটাল গিয়ে লাভ হবে না, রাতে আসলে বাড়িতেই চেকআপ করিয়ে নিবো আপনার। "
ইন্দু উত্তর দিলো..
"লাগবে না তো আর, আমি ঠিক হয়ে গেছি। এখন কি বাড়ি যাবো? "
"উহুম,আমার কিছু কাজ আছে, সেগুলো শেষ করে তারপর যাবো। "
ইন্দু বিরক্ত হলো না তেমন, উল্টো হেঁসে বললো...
"ঠিক আছে, আপনি কাজ শেষ করে নিন, আমি এখানে থাকি। "
"নাহ,,এখানে আর থাকতে হবে না চলো আমার সাথে। "
ইন্দু চেয়েও আর না করতে পারলো না, তার আগেই রাত তার হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগলো৷ এদিকে রাগে ফেটে পড়ছে তিশা। দৃষ্টি যেন ইন্দু আর রাতের দিক থেকে সরছেই না তার। আনান যেতেই আকাশ মিটিমিটি হেঁসে তিশার দিকে তাকিয়ে বললো...
"কিছু বুঝছো তিশা ? মনে হয় না তোমাকে আর ম্যাডাম বলে ডাকা লাগবে৷ মৃগাঙ্ক স্যারের ম্যাম তো অন্য কেউ। "
কাটা ঘায়ে যেন নুনের ছিটে পড়লো তিশার। হাতে থাকা ফাইলটা টেবিলে ছুড়ে ফেলে ধপাধপ পায়ে এগিয়ে গেলো ওয়াশরুমের দিকে।
--------
"আপনি এতো হ্যান্ডসাম কি করে হয়েছেন বলুন তো? "
উদ্ভট প্রশ্নে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে ডিভানে তাকালো রাত। এতক্ষণ সুন্দর মতো এক কোনায় বসে থাকলেও এখন প্রায় আধসোয়া হয়ে গেছে ইন্দু, হাতে রাতের ফোন। সেখানেই গ্যালারিতে একের পর এক রাতের ছবি দেখতে দেখতে আবার বললো...
"কি হলো, বলছেন না যে, আপনি এতো সুন্দর কি করে হয়েছেন? "
রাত এখনো বুঝতে পারছে না এই অদ্ভুত প্রশ্নটার উত্তর কিভাবে দেওয়া যায়, কিছু খুজে না পেয়ে হালকা উঁচু স্বরে রাত বললো...
"আজব প্রশ্ন করা ছাড়া কাজ নেই তোমার? "
ইন্দু পাত্তা দিকো না, আগের মতোই বলতে লাগলো...
"আপনার বউয়ের কপালে দুঃখ আছে রাত ভাই। "
"কেন? "
"এই যে আপনি এতো সুন্দর হয়েছেন, মেয়েরা তো দেখলেই নজর আটকে যায়, আপনাকে নিয়ে ভয় হবে আপনার বউয়ের। "
রাত গোপনেই হাসলো,মেয়েটা পাগলও বটে। ছয়টা বছর যাকে চোখের সামনে না দেখেই রাত মত্ত হয়েছিলো সেই মোনালিসায়, যার অস্তিত্ব ছিলো প্রতিদিন রাতে কয়েক মিনিটের জন্য, সেই স্বপ্নদর্শীর কারনে রাত এই জীবনে কোনো নারীকেই কাছে ঘেষতে দেয়নি, এখন তাকে এত কাছে পেয়েও কি করে অন্য নারীতে আসক্ত হবে যে, ইহা তো সূর্য পশ্চিমে উঠার মতোই অসম্ভব ব্যপার।
ইন্দু নীরব হয়ে গেলো, এতক্ষণের মতো আর একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ছে না রাতের দিকে। রাতও নিজের কাজে ব্যস্ত হলো। কাজের মাঝেই দেখলো ল্যাপটপের উপরে শো করছে " Ma calling "
অনলাইনে সচরাচর কল দেয় না সাবিহা রাতকে, মাঝে মধ্যে দেয়, কিছু একটা ভেবেই রাত রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে সাবিহার উদ্বিগ্ন কন্ঠ ভেসে এলো...
"বাবা,তিয়াস এখনো বাড়ি ফেরে নি। ড্রাইভার গেলো, অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছে কিন্তু তিয়াশ, আরজু কেউই কলেজে নেই। "
রাত কিছু না বলেই কল ক্যামেরা অন করলো। ফোন স্ক্রীনে ইন্দুকে গুটিসুটি হয়ে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে সাবিহা হাফ ছাড়লো। বললো...
"ওহ,,ও তোর কাছে? জানাবি না একবার,বাড়ির সবাই চিন্তা করছে। "
"মাথায় ছিলো না মা। আমিই নিয়ে এসেছি কলেজ থেকে, আর আরজু টিউশনে গেছে মনে হয়। চিন্তা করো না। "
সাবিহা বললো..
"হ্যা রে, তিনটা বাজতে চললো, ও খেয়েছে কিছু? "
রাত আস্তে করে উত্তর দিলো...
"উহুম,খাবে একটু পর। "
"ওমাহ,,মেয়ে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লো? এখন তো পাশে বোম ফাটলেও আর উঠবে না ও। "
"চিন্তা করো না মা, আমি উঠিয়ে খাইয়ে দেবো ওকে। "
" আচ্ছা, শোন এসির ঠান্ডা বাতাস যেন ওর গায়ে না লাগে বেশি। ঠান্ডা লেগে গেলে সমস্যা হবে ওর। "
রাত চুপ রইলো, দৃষ্টি দিলো ডিভানে এলোমেলো হয়ে ঘুমিয়ে থাকা ইন্দুর দিকে৷ তখনই দরজায় নক পড়ায় বললো...
"রাখছি আম্মু,, ও আমার সাথেই ফিরবে। "
কল কেটে রাত এগিয়ে গেলো ইন্দুর কাছে। দু হাতে রাতের ফোন বুকের কাছে চেপে রেখে ঘুমাচ্ছে। ফোনে ডোরেমন কার্টুন চলছে অনবরতই। ইন্দু এমন ভাবে ফোনটা চেপে রেখেছে, হাত থেকে নেওয়ারও সুযোগ নেই এখন। রাত আর ফোন নিলো না, একটা কুশন নিয়ে আলতো করে ইন্দুর মাথার নিচে দিয়ে দিলো। কেভিনেট থেকে পাতলা একটা ব্ল্যাঙ্কেট এনে বুক পর্যন্ত ঢেকে দিলো ইন্দুর, যাতে ঠান্না না লাগে ওর। আস্তে করে কপালে একটা চুমু খেয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো।
তিশা দাঁড়িয়ে , তাকে দেখে একটু সরে দাঁড়ালো রাত। তিশা চোখ বুলিয়ে একবার ডিভানে ঘুমিয়ে থাকা ইন্দুকে দেখলো। ঠোঁট বেকিয়ে মনে মনে বললো...
"উহ,কি আহ্লাদ মেয়ের দেখো, স্যারের রুমে আরামসে ঘুমিয়ে আছে, কত স্পর্ধা। আর স্যার, উনিও এক, যেন ছোট বাচ্চা মেয়েটা, ঘুম পাড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। হুহ, দরজা আঁটকে আর কি কি করছে কে জানে। এই মেয়েকে তো দেখে নেবো আমি। "
"কি চায় মিস তিশা? "
রাতের কথায় সংবিত ফিরলো তিশার, আমতা আৃতা করে হাতের ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বললো...
"মিড প্রজেক্ট আ্যালজেবরার ফাইলটি স্যার,, চেক করে দিলেই সাবমিট করে দেবো। "
রাত ফাইলটির দিকে তাকিয়ে বললো...
"ফাইল গুলো আনানের কেবিনে ট্রান্সফার করো, আপাতত যেন এসবের জন্য আমাকে কেউ ডিসটার্ব না করে। "
তিশা মাথা নিচু করে বললো..
"ওকেয় স্যার। "
" আর হ্যা, ক্যান্টিনে জানিয়ে দাও আমার রুমে ডাবল লাঞ্চ পাঠাতে। আইটেম গুলো যেন লাইট কিছু হয়, "
"শিওর স্যার.. "
বলতেই রাত তিশার মুখের উপর দরজা আটকে দিলো আবার। আর বাইরে দাঁড়িয়ে খোবে ফুলতে লাগলো তিশা।
-----------
হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিলো আরজু। রাত বাজে ৮:৩৭। মাত্রই টিউশন শেষ করে বেরিয়েছে সে। বাসস্টপে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরো প্রায় বিশ মিনিট, দেরি হয়েছে যে খেয়ালই করেনি আরজু।
দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে যেতে লাগলো সে, বাসস্টপে আবির্ভাব যে তার জন্য অপেক্ষা করছে তা বেশ জানে আরজু। লোকটা প্রতিদিনই তাকে নিতে আসে, বাসস্টপেই দাঁড়িয়ে থাকে প্রথম দিনের মতোই।
ভাবতে ভাবতেই হেঁটে যাচ্ছিলো সে। আবির্ভাব ভাই তাকে একটু বেশিই প্রায়োরিটি দেয়, আরজুর অবচেতন মন বার বার বলে এটা ঠিক নয়। আবির্ভাব ভাইয়ার এমন ব্যবহার, এতো যত্ন মোটেও আরজুর জন্য ভালো লক্ষন নয়। মন বলছে আবির্ভাব ভাইয়া তাকে পছন্দ করে। কিন্তু আরজু যে এটা বুঝেও খুশি হতে পারছে না।
মন জুড়ে তার অন্যজনার বসবাস, তাকে যে আরজু ভুলতে পারবে না। আর না কখনো তাকে ছাড়া অন্য কাউকে নিজের মনে জায়গা দিতে পারবে।
জিবনের হতাশা গুলো যেন মাঝ রাস্তায় নির্জনতায় বেশিই মনে পড়ে যায়। এই যে আরজু, বয়স আর কতই আঠেরো - উনিশ।কিন্তু ম্যাচিউরিটি ঘিরে ফেলেছে তাকে। পরিস্থিতি তাকে এতটাই বড় করে দিয়েছে, চঞ্চল বয়সের উড়ে চলার আশা গুলো কোথায় যেন ধামা চাপা পড়ে গিয়েছে তার।
নিজেকে নিয়ে আর ভাবতে পারে না মেয়েটি, ভবিষ্যৎ বলতে কিছুই নেই যেন তার, বেচে থাকার মতো তীব্র ইচ্ছেও কাজ করে না এখন, কি নিয়ে বাঁচবে সে? তার বক্ষ পিঞ্জরের পাখিটাই যে তার নেই আর। পালিয়ে গেছে সে, মনের কোনে কেউ যেন সুর তোলে..
"প্রাণ পাখি মোর উইড়া যায়..
খাঁচা ছেড়ে পালায় লো."
হ্যা,আরজুর প্রাণ পাখি পালিয়ে গেছে তার থেকে, চিরতরের জন্য পালিয়েছে, আর ফিরবে না সে কখনোই। আরজুর অশ্রু মুছিয়ে দেওয়ার মতো কেউ থাকলো না আর, সে চলে গিয়ে আরজুকেই অন্যের অশ্রু মুছিয়ে দেওয়ার জন্য রেখে গিয়েছে। চাইলেই যে আরজু নিজেকে শেষ করে দিতে পারবে না। এই শহরে তাকে টিকে থাকতে হবে সারাজীবন এক বদ্ধ প্রাণের বেড়ায়, বাঁচতে হবে তার মায়ের জন্য, ইন্দুর জন্য। আর তো কেউ নেই আরজুর আর। শহরটা বিষাদময়,এতো এতো মানুষের মাঝেও আরজু নিঃস্ব।
অন্তরের বিষাদ গুলো নিয়েই হাটছিলো আরজু,আবির্ভাবের কথাটা বেমালুম ভুলেই গেলো সে। হঠাৎ সামনে এসে থামলো কয়েকজন লোক। চেনে না আরজু। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো...
"কে আপনারা? পথ আটকেছেন কেন? "
লোক গুলোর মুখে বিচ্ছিরি হাসি ফুটে উঠলো। তাদের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠলো...
"একা কেন যাচ্ছো হানি, আজ আমাদের সাথেই চলো,অনেক এনজয় করবো আমরা। "
আরজুর বুক কাঁপছে, মন নিশ্চিত জানান দিচ্ছে অঘটন ঘটতে চলেছে। লোক গুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তার কাছে৷ নীরব রাস্তায় আশেপাশে একটা মানুষের চিহ্নও নেই। আর কোনো উপায় নেই।
হঠাৎই লোকগুলোকে ঠেলে পাশ কাটিয়ে প্রানপনে সরল রাস্তায় ছুট লাগালো আরজু। তাকে পালাতে দেখে লোকগুলোও ছুটলো পিছু পিছু, সাথে মুখ দিয়ে অশ্রাব্য গা'লি তো আছেই৷
আরজুকে বারবার থামতে বলছে, কিন্তু আরজু থামছে না। ছুটছে সে গতিশীল পায়ে। থামলেই যে তার ইতি ঘটবে আজ। কিন্তু তাকে তো বাঁচতে হবে, সম্মান বাঁচাতে হবে।
অনেকক্ষন পর্যন্ত ছুটে ক্লান্ত আরজু, লোকগুলো এখনো তার পিছনেই পড়ে আছে৷ আর পারছে না সে, শরীর চলতে চাইছে না যেন। পা দুটো ছিড়ে যাবে যেন এক্ষুনি। কি করবে সে, কিভাবে বাঁচাবে নিজেকে।
হঠাৎই সামনে এক পরিচিত সুপুরুষের দেখা পেলো সে। সফেদ রঙের শার্টটা ছিমছাম শরীরে এটেসেটে আছে। আরজুর শেষ ভরসা যেন ঐ চওড়া বক্ষস্থলই। ছুটে গিয়ে ঝাপটে ধরলো সামনে থাকা লোকটিকে। দু হাতে লোকটির শার্ট খামছে ধরে শক্ত বুকে মুখ গুজলো সে৷ ভয়ে তটস্থ কন্ঠে বলতে লাগলো...
"নিবিড় ভাই, আমায় বাঁচাও। "
নিজের মাথায় সেই পরিচিত হাতের স্পর্শ অনুভব করলো আরজু। লোকটি তার চুলের ভাজে ভরসার হাত রেখেছে, যেভাবে তার নিবির ভাই রাখতো আর কোমল কন্ঠে বলতো..
"চিন্তা নেই আরজু, তোর নিবিড় ভাই আছে তো। "
আরজু ভীষণ ভাবে অনুভব করলো, মানএষটা তার একদম কাছের। তার অন্তরালের খাঁচা ছেড়ে পালানো প্রাণপাখিটাই। হ্যা, এই লোকটাই আরজুর প্রাণপাখি,আরজুর ভরসাস্থল, আরজুর নিবিড় ভাই। চোখ খিঁচে বন্ধ করেই কম্পমান বক্ষে সুখের জোয়ার দোলা দিলো। রপ্তান্বিত কন্ঠ তার,ভয়ে,আনন্দে একাকার যেন সেই নারী, চঞ্চল কন্ঠে হাঁপাতে হাঁপাতেই বলতে লাগলো...
"তুমি এসেছো নিবিড় ভাই? "