রেখো তোমার বাহুডোরে

পর্ব - ১৭

🟢

সন্ধ্যার আগে আগেই বাড়ি ফিরেছে রাত আর ইন্দু। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে পড়তে বসেছে সে। ফিজিক্সের ইকুয়েশন আজ কিছুতেই যেন মিলাতে পারছে না ইন্দু। দু বার করে গিয়ে আবির্ভাবের রুম থেকে ঘুরে এলো, কিন্তু সে এখনো আসেই নি। ভেবেছিলো আবির্ভাবের ফোন থেকে আরজুকে কল দিয়ে জেনে নেবে। কেন যেন আজকাল পড়ায় মনই বসতে চায় না ইন্দুর। স্টাডি টেবিলে বইটা বন্ধ করে রেখে খাটের উপর এসে উপুর হয়ে শুয়ে পড়লো ইন্দু। ঠিক কতক্ষণ হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে খেয়াল নেই। হঠাৎই দরজার দিক থেকে রাতের রাশভারি কন্ঠ ভেসে এলো...

"কি সমস্যা তোমার? "

কন্ঠ খানা কানে যেতেই আচম্বিত উঠে বসলো ইন্দু। আমতা আমতা করে বললো...

"ভালো লাগছিলো না,তাই একটু.... আমি একটু পরেই আবার পড়তে বসছি। "

রাত বুকের কাছে ভাজ করে রাখা হাত দুটো নামিয়ে এগিয়ে এলো ইন্দুর কাছে। চিন্তিত হয়ে ইন্দুর কপালে হাত ঠেকিয়ে চেক করলো জ্বর আছে কিনা।

"জ্বর তো নেই। শরীর খারাপ লাগছে তোমার? "

ইন্দু দু পাশে মাথা নাড়লো। রাত পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বললো...

"এই আবির্ভাবটাও নাহ,,এতক্ষণ কি করছে কে জানে। সেই কখন থেকে ফোন করছি। "

বলতে বলতেই ফের কল করলো আবির্ভাবের নম্বরে। এইবার আবির্ভাব কল রিসিভ করে বললো...

"রাত ভাই? "

"এত লেট কেন তোর? আরজু কোথায়? "

"আমার সাথেই আছে ভাই, ফিরছি আমরা। "

"তারাতাড়ি আয়। "

বলেই কল কেটে দিলো রাত।

-----------

"সমস্যা কি তোমার বলো। আজ তোমাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে৷ "

আবির্ভাবের ধমকানো কন্ঠে দু কদম পিছিয়ে গেলো আরজু। নীরব আরজুর মুখখানা দেখে আবির্ভাব ফের চেঁচিয়ে উঠলো...

"চুপ করে থাকবে না আরজু, কথা বলো তুমি। তোমার এতো ইগো ভালো লাগছে না আমার.. "

বলতে বলতেই হাতে থাকা লাঠিটা ছুড়ে ফেললো রাস্তায়। যেই লাঠিটা দিয়ে এতক্ষণ এলোপাতাড়ি লোক গুলোকে পিটিয়েছে।

আরজু এখনো চুপ। আবির্ভাব নিজের মতোই চেঁচিয়ে গেলো...

"তোমাকে বলেছিলাম এতরাত পর্যন্ত টিউশনের কোনো প্রয়োজন নেই, তুমি শুনলে না। বলেছিলাম টিউশন শেষ হলে আমায় কল করতে, তুমি করো না, এক্সাক্ট লোকেশনটাও বলো না তুমি। নিজেকে কি ভাবো তুমি? সুপার ওমেন? সব সমস্যার সমাধান একা একাই করতে পারবে তুমি? "

থেমেই রক্তলাল চোখে আরজুর দিকে তাকিয়ে কয়েকটা শ্বাস নিলো আবির্ভাব, ফের বললো...

" আশপাশে একটা মানুষ দেখতে পাচ্ছো তুমি? আছে একটা মানুষ? আজ যদি একবার ঐ রাসকেল গুলোর হাতে পরতে তুমি কি হতো তখন? যাস্ট এটা ভেবে দেখেছো তুমি? "

আরজুর মুখ নামানো, হাত পা এখনো কেমন কাঁপছে তার। স্বল্প স্বরে বললো...

"সরি "

"কিসের সরি হ্যা? সরি বললেই সব কিছু ঠিক হয়ে যায় না আরজু। কোনো ধারনা আছে তোমার এখনকার পরিবেশের? তোমার কিছু হয়ে গেলে তোমার আম্মুকে কে দেখবে? ইন্দুর কি হবে? আমার... "

থেমে গেলো আবির্ভাব। অসময়ে মনের কথা গুলো মুখে চলে আসা ভিষণ রকমের ভুল, তাই নীরবেই কথাখানা গিলে নিলো সে। নিজেকে শান্ত করলো সে, কন্ঠ গম্ভীর তবুও ধীরে বললো...

"কাল থেকে তোমার টিউশন পড়ানো বন্ধ। "

বলেই গাড়ির কাছে যেতে নিলে পেছন থেকে আরজু বলে উঠলো....

"আমার সীদ্ধান্ত গুলো আমিই নিবো.."

সাথে সাথেই আবির্ভাব ঝড়ের গতিতে পেছনে ফিরে বললো...

"না তোমার সীদ্ধান্ত তুমি একা নিতে পারবে না। তোমার কোনো অধিকার নেই একা একা সীদ্ধান্ত৷ নেওয়ার। তোমার একটা ভুল সীদ্ধান্তের কারনে অন্য কারোর জীবন নষ্ট করার অধিকার নেই তোমার। বয়স কত তোমার? ছোট ছোটর মতো থাকতে পারো না? এখনই কেন নিজেকে বড়দের মতো এসবে জড়িয়ে ফেলছো তুমি মেয়ে? জীবনটা এভাবে চলে না, বাঁচতে হলে জীবনে আনন্দসময় লাগে। "

আরজু নীরব, কোনো প্রকার কথা নেই তার মুখে। আবির্ভাব শান্ত দৃষ্টিতে আরজুর অশ্রুসিক্ত নয়নের দিকে তাকলো, ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলে হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আরজুর চোখের পানিটুকু মুছিয়ে দিয়ে বললো...

"সরি,,ভয় পেও না,আমি আছি। "

আরজু কানে বাজলো কথাখানা। সেই পরিচিত কন্ঠ, আবারো উদ্বিগ্নতা ঘিরে ধরলো তাকে। তড়িৎ গতিতে বলে উঠলো...

"নিবিড় ভাই?"

বলেই মাথা তুলে তাকাতেই বুক ভেঙেছে তার। নাহ,এটা তার নিবিড় ভাই নয়,,এটা আবির্ভাব ভাইয়া। আবির্ভাব ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে তার দিকেই। আরজু এলোমেলো হয়ে গেলো যেন,,এখন কি বলবে আবির্ভাবকে সে? ভাগ্য ভালো থাকায় আরজুকে আর কিছু বলতে হয়নি, আবির্ভাব নিজেই বললো...

"তোমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে আরজু,,বাড়ি চলো,,রেস্ট নিলে ভালো লাগবে। "

আরজু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। আবির্ভাব এগিয়ে গিয়ে গাড়ির ফ্রন্ট সীটের দরজা খুলে দিলেই আরজু নীরবে উঠে বসলো। দরজা আটকে আবির্ভাব পেছনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে দেখেই আরজু একটু ভয়ে বলে উঠলো...

"কোথায় যাচ্ছেন?"

আবির্ভাব পেছনে ফিরে বললো...

"ভয় পেও না,আসছি। "

আরজু গাড়ির কাচ নামিয়ে তাকিয়েই রইলো আবির্ভাবের দিকে। আবির্ভাব গিয়ে রাস্তা থেকে আরজুর কলেজ ব্যাগ খানা তুলে নিয়ে হাত দিয়ে হালকা ঝেড়ে মুছে নিয়ে এগিয়ে এলো। আরজু ঢোক গিললো,ব্যাগের কথা বেমালুম ভুলেই তো গেছিলো সে।

---------------

পরদিন শুক্রবার, বাড়ির পুরুষ সদস্যরা গেছে মসজিদে নামাজ আদায় করতে। শুধু আবির্ভাব ছাড়া, সে মাত্রই হসপিটাল থেকে ফিরেছে, ড্রয়িং রুমে বসে হাকলা জিরোচ্ছে।একটু পরেই গোসল সেড়ে নামাজ পড়তে যাবে। সোফায় বসে সাবিহা ইন্দুর চুলে তেল লাগিয়ে দিচ্ছে আলতো হাতে। ইন্দুও আবেশে তৃপ্তি চোখ বুঁজে আছে। ঠিক সেই সময় বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ালো আফরোজা বেগম। কান্তা তাকে দেখে ভেতরে আসতে বললো।

চোখে মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট, ইন্দু তার এমন অবস্থা দেখে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো...

"কি হয়েছে আন্টি? তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে? "

আফরোজা বেগম আমতা আমতা করে সাবিহাদের দিকে তাকিয়ে বললো...

"আমার আরজুটার কিছু হয়েছে।"

কথাটা শুনেই সোফা ছেড় উঠে দাঁড়ালো আবির্ভাব।

"মেয়েটা কাল রাত থেকে দরজা আটকে বসে আছে, সারাটা রাত ঘুমোয় নি একটুও, কান্না করে গেছে। আমি দরজা খুলতে বলছি খুলছে না,,বারবার বলছে ওকে একটু একা থাকতে দিতে। যদি কিছু মনে না করেন আপা,,ইন্দুকে আমি একটু নিয়ে যাই? ওর কথায় হয়তো মেয়েটা দরজা খুলতেও পারে। এভাবে আমার মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়বে। "

ইন্দু চিন্তিত কন্ঠে সাথে সাথেই বললো...

"আমি যাবো আন্টি,,চলো। "

আবির্ভাব বললো...

"আমিও আসছি। "

কান্তা, সাবিহাও মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো।

ফ্ল্যাটে গিয়ে আরজুর বদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ইন্দু ডাকলো আরজুকে...

"আরজু,দরজা খোল বোন আমার। একা একা কি করছিস তুই? "

ভেতর থেকে কোনো শব্দ এলো না। ইন্দু আবারও দরজা ধাক্কালো..

"আরজু প্লিজ দরজাটা খোল,আমার সাথে কথা বল একটু। "

আরজুর আওয়াজ পাওয়া গেলো না, আবির্ভাবের ভয়ে ঘাম ছুটছে কপাল বেয়ে। এবার নিজেই ডাকতে যাবে তখনই দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে থেমে গেলো আবির্ভাব।

আরজু দরজা খুলতেই ইন্দু ভেতরে ঢুকে ঝাপ্টে ধরলো আরজুকে। হুহু করে কান্না করে উঠলো আরজু। ইন্দু ভারাক্রান্ত মনে জড়িয়ে রাখলো আরজুকে।

আবির্ভাব থমকে দাঁড়িয়ে রইলো আরজুর পানে চেয়ে। একটা রাতেই মেয়েটা নিজের চোখ মুখের কি অবস্থা বানিয়ে ফেলেছে। কি হয়েছে আরজুর? মেয়েটার মধ্যে এমন বিভীষিকাময় গোপনতা কেন? কেন তার এতোটা গম্ভীরতা?

"আমি আর পারছি না ইন্দু, আমার সহ্য হচ্ছে না। আমার নিবিড় ভাইকে এনে দে প্লিজ, আমি তার কাছে একটিবার ক্ষমা চাইবো। নিবিড় ভাইকে লাগবে আমার ইন্দু... "

উদ্ভ্রান্তের মতো কথা গুলো বলতে বলতেই কাঁদছে আরজু। ইন্দু তাকে থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আবির্ভাব এক নজরে পুরো ঘরটা তাকিয়ে দেখলো, জিনিসপত্র সব এলোমেলো করে ফেলেছে। এটা ওটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আবির্ভাবের চোখ আটকালো পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটি ছবিতে, আরজু। আরজুর মুখখানা বুঝতে পেরেই ছবিখানা তুলে নিলো আবির্ভাব।

আফরোজা বেগমের চোখে জল। তার এক রত্তি মেয়েটার বুকের ভেতর যে দহন হচ্ছে তার তাপোত্তশ্মি ঠিক কতটা তা বুঝে তিনি। চোখের সামনে মেয়েটা কত কিছু সহ্য করেছে, কত কিছু হারিয়েছে, সে যে আর সইতে পারে না।

"আমার মেয়েটা কি আর কখনোই আগের মতো হাসিখুশি হতে পারবে না আল্লাহ? "

আফরোজা বেগমের করুন কন্ঠের মিনতি কানে পৌঁছালো আবির্ভাবের। ঢোক গিলে আফরোজা বেগমকে শান্তনা দিয়ে বললো...

"আরজু আবার স্বাভাবিক হবে আন্টি, যা কিছু হয়েছে সবটা ঠিক হবে আবার। চিন্তা করো না তুমি। "

হাতের ছবিখানা চোখের সামনে মেলে ধরে ধীর কন্ঠে বললো..

"আমার আরজু আবার হাসবে,ঠিক এভাবেই প্রাণোচ্ছল হাসি। "

আবরার মির্জার আদেশে আরজু আর আফরোজা দুজনকে নিয়েই মির্জা ভিলায় ফিরলো আবির্ভাব, ইন্দু। তারা ফিরতেই দেখলো ড্রয়িংরুম ভরপুর। আবরার মির্জা আরজুকে ডাকলো...

" আরজু মা, এদিকটায় আসো? "

আরজুর চোখ মুখ ফুলে আছে এখনো। মাথা নিচু করে আবরার মির্জার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আবরার মির্জা নিজের পাশে বসতে বললে বসলো আরজু।

"কি হয়েছে তোমার আম্মু? শুনলাম তুমি নাকি সারারাত ঘুমাও নি কান্না করেছো? "

আরজু মিনমিনিয়ে বললো..

"একটু মন খারাপ ছিলো আঙ্কেল। "

আবরার মির্জা আরজু মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন...

"দেখো আম্মু, তুমি আমার মেয়ের মতোই, কড়ি যেমন আমার মেয়ে, তেমনি তুমি, তিয়াস বাদবাকিরাও আমারই ছেলে মেয়ে। ওরা সবাই আমাকে বড় আব্বু বলেই ডাকে। তোমার মুখ থেকেও আমি তাই শুনতে চাই। "

আরজু উত্তর দিলো...

"ঠিক আছে ব্ বড়আব্বু।"

"কিন্তু শুধু ডাকলেই হবে না। এই বাড়িতে সবাইকে নিজের আপন মনে করবা এখন থেকে। আপন জনকে নিজের মনের কথা শেয়ার করবা, দেখবা কষ্ট একটু হলেও কমবে। তোমাদের সামনে এখনো উজ্জল ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে, নিজেকে এই বয়সেই এতটা গুটিয়ে ফেলছো কেন তুমি আম্মু? সময়টা তো উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে দেওয়ার, তুমি যদি এই সময়টা এভাবে বিষাদে কাটাও, তাহলে পরবর্তী সময় গুলো তো তোমার কাছে আরো কঠিন মনে হবে।তোমার মায়ের কথা চিন্তা করেছো তুমি? সকাল থেকে খাওনি তুমি, তোমার চিন্তায় তোমার আম্মুও খায়নি নিশ্চয়ই। "

আরজু মুখ তুলে নিজের মায়ের দিকে তাকালো। আফরোজা বেগম কান্না ভেজা কন্ঠে বললো...

"আমার মেয়েটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে ভাই সাহেব।ওকে এরকম যন্ত্রের মতো দেখতে ভালো লাগে না আমার। "

আবরার মির্জা ফের বললো...

"দেখলে তো আরজু মা? তোমার আম্মুও কষ্ট পাচ্ছে। আম্মুকে নিজের কাছে নিয়ে এনে রাখছো ভালো কথা। কিন্তু তাকে তো সময়ও দিতে হবে একটু তাই না? আবির্ভাব বললো কলেজ শেষ করে তুমি অনেক গুলো টিউশন পড়াও? "

"জ্বি। "

"আমি জানি তুমি আর্থিক সমস্যার কথা চিন্তা করেই নিজের শ্রম দিচ্ছো এতটা। তোমার আম্মুকে, তিয়াশকে ভালো রাখতে চাও বলেই এমন করছো। কিন্তু আম্মু, তোমার নিজের দিকেও তো একটু খেয়াল রাখতে হবে। সামনেই তোমার পরিক্ষা,এই সময়ে নিজের এমন বেহাল দশা করলে কি চলবে বলো? তাই বলছি, আপাতত টিউশন গুলো ছেড়ে দাও"

"কিন্তু বড়আব্বু..."

আবরার মির্জা আরজুকে থামিয়ে বললো...

"আমি বুঝতে পারছি তুমি কি বলবে। শোনো আম্মু, আমি তোমাকে একেবারেই ছেড়ে দিতে বলছিনা, বাচ্চাকাচ্চা পড়ানোও একটা প্রতিভা, আমি বলছি আপাতত বন্ধ রাখো,অন্তত তোমাদের পরিক্ষাটা শেষ হওয়া পর্যন্ত। তারপর না হয় আবার টিউশন পড়িও তুমি। আর আমি জানি তুমি খুব স্ট্রং মেয়ে, যার তার থেকে এমনি এমনি সাহায্য নিবে না, আমি তোমাকে তা করতেও চাইছি না। তবে আপাতত তোমার সমস্ত প্রয়োজন খরচ আমাকে বহন করতে দাও, পরে যখন তুমি বড় হবে,ভালো একটা চাকরি করবে তখন না হয় ধীরে ধীরে শোধ করে দিও। আমি তো তোমার বাবার মতোই, তাই আশা করছি আমার এই টুকু আবদার তুমি রাখবে আম্মু। "

আরজু কি বলবে বুঝতে পারছে না। নীরবে একবার আফরোজা বেগমের দিকে তো আবার ইন্দুর দিকে তাকিয়ে বললো...

"আপনি আমার ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছেন বড়আব্বু।এমনিতেই ইন্দু আমার....."

ইন্দুর কথা উঠতেই এবার রাত বলে উঠলো...

"তোমাকে ওর কথা চিন্তা করতে হবে না আরজু। তিয়াশ আমার দায়িত্ব।"

ইন্দু এক পলক তাকালো রাতের দিকে। রাত চোখের ইশারায় আস্বস্ত করে বুঝালো আরজুকে সামলাতে,সাহস দিতে। ইন্দু বুঝে সম্মতি দিলো।

"আমি ভেবে দেখবো বড়আব্বু। "

আরজুর কথায় আবরার মির্জা বললো...

"ভেবে দেখো, তবে এতো রাত করে টিউশনের বিষয়টা যেন আর না হয়। আমি চাইনা আমার মেয়েরা কোনো বিপদের সম্মুখীন হোক।কথাটা মাথায় রেখো। "

-------------

সন্ধ্যার দিকে রাত, আনান, আফনার বেরিয়েছে বাইরে। বাদ বাকিরা বাড়িতেই আছে। ইন্দু আর আরজু ইন্দুর রুমে। কান্তা,সাবিহাদের আদেশে আফরোজা আর আরজু আজ সারাদিন মির্জা বাড়িতেই থাকতে হয়েছে, রাতে ডিনার সেরে তারপর ফ্ল্যাটে যাবে।

"আরজু, আমি এইদিকটা মিলাতে পারছি না দেখ তো। "

খাতায় চোখ রেখে আরজুকে প্রশ্ন করলো ইন্দু। কিন্তু আরজুর দিক থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না। ইন্দু তাকিয়ে দেখলো আরজু আনমনেই তাকিয়ে বসে আছে। হাফ নিঃশ্বাস ফেললো ইন্দু, মেয়েটার মন খারাপ যেন কিছুতেই কমাতে পারছে না আজ। সবার সাথে থাকলে একটু হলেও ভালো থাকে, তারপর একা হলেই আবার বিষাদে ঘিরে ধরে আরজুকে।

ইন্দু বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো। আরজুর হাত টেনে বললো...

"চল। "

আরজুর ঘোর কাটলো, জিজ্ঞেস করলো...

"কোথায় যাবো? পড়া বাকি অনেক। "

"সে যে তুই কত পড়ছিস তা ঢের দেখতে পাচ্ছি আমি। চল তো। "

বলতে বলতেই টেনে নিয়ে চললো আরজুকে। করিডোরের দিয়ে এগিয়ে যেতে দেখলো দোতলার পিছনের খোলা বারান্দায় দাড়িয়ে গল্প পরছে ছায়া-ছবি,অহি আর আফনান। ইন্দু আর আরজু সেদিকেই এগিয়ে গেলো। তাদের দেখে ছায়া জিজ্ঞেস করলো...

"পড়া শেষ তোদের? ডিসটার্ব হবে বলে তোদের রুমে যাইনি। "

ইন্দু বললো..

"পড়া শেষ না, তবে আজ পড়ায় মন বসছিলো না, আরজুরও মন খারাপ। তাই বেরিয়ে এলাম। "

আফনান বললো...

"আজ বাইরেটায় হাওয়া দিচ্ছে, গরমে ফ্রেশ হাওয়া ভালো লাগছে তাই এখানে এসে দাঁড়ালাম।"

ইন্দু ছোট্ট করে বললো...

"হুম।!"

তখনই কানে ফোন গুজে বিরক্তকর স্বরে কথা বলতে বলতে এগিয়ে এলো তট...

"তুমি নদী হও বা সাগর হও, তাতে আমার কি। আজাইরা পেচাল পারো ক্যান? "

"---------"

"এই মেয়ে, একদম মাথা গরম করবে না, ফা'লতু, ওয়ার্কলেস মেয়ে। আর একবার যদি আমায় কল দিয়েছো পিঠের ছাল তুলে ফেলবো একদম। "

"-------"

" আমার নাম জেনে তোমার কাম কি? নিজের চরকায় তেল দেও মেয়ে, আইছে আমার ছোট গাঁয়ের ছোট নদী, রাখ ফোন।"

বলেই কল কাটলো তট। তাকে বিরক্ত দেখে আফনান জিজ্ঞেস করলো...

"তোর আবার কি হইলো ভাই? "

"আর বলিস না, দু দিন ধরে একটা আননোন নম্বর থেকে একটা মেয়ে খুব জ্বালাচ্ছে। ব্লক করে আবার অন্য নম্বর থেকে কল দেয়। "

ছায়া হেঁসে বললো...

"মিললো ভাই, তোরও মিললো। "

তট বিরক্ত হয়ে বললো...

"ধুর, ফালতু বকিস না তো,,এমনেই বিরক্ত লাগছে। আমি যাই বাইরে থেকে ঘুরে আসি একটু৷ "

ছবি বলে উঠলো...

"সবাই মিলে যাই? আজকপর ওয়েদারটাও ভালো। ঘুরেফিরে আসি, মজাও হবে। "

অহি বললো...

"ওয়াও, তাহলে আমি এক্ষুনি রেডি হতে যাচ্ছি। "

ইন্দু বললো...

"ভালোই হয়,, আমার আরজু বেবিরও মনটা একটু হালকা হবে তাহলে। "

তট একটু চুপ থেকে বললো...

"ঠিক আছে, বাকিদের বল রেডি হতে। আমি রাত ভাইকে ফোন করে জানিয়ে দিই যাচ্ছি যে, না জানিয়ে গেলে এক জনেরও আস্ত থাকবে না। "

হুটহাট পরিকল্পনা গুলো আসলেই দারুন হয়,এই যে এখন সবাই মিলে গাড়ির সামনে এসেছে,, একে একে গাড়িতে উঠছে। পৃথিবী তো তার তেই পরিচিত ক্যামেরা ধরে শুরু করলো....

"হ্যালো গায়েজ,,আজকের তিড়িংবিড়িং চ্যানেলের তুরুলা বাহিনী যাচ্ছে রাতের শহর পাড়ি দিতে৷ গা ছমছম, কি হয় কি হয়, জানতে হলে যুক্ত থাকুন আমাদের তুরুলা বাহিনীর সাথে। লেটস গো পোলাপাইন...."

রেখো তোমার বাহুডোরে গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে ঘেরা রোমান্টিক ও থ্রিলার গল্প