সূর্যের প্রখর তাপ মনুষ্যলোককে ছুয়ে দেওয়ার আগেই আজ নিদ্রা ত্যাগ করেছে মির্জা বাড়ির সকলে। সকাল সকাল আনন্দঘন দিনের আমেজখানা নষ্ট করার কোনো মানেই হয়না আমাদের ইন্দুবালার কাছে। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে ঢুকলো ওয়াশরুমে। হাত মুখ ধুয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সোজা গোসল সেরে বেরিয়ে এলো। গতকাল রাতেই আবরার আর আশরাব মির্জা একত্রে এসে তাকে দুটো ড্রেস দিয়ে গেলো। ইন্দু ভেবে নিলো এখন সেখান থেকেই একটি জামা পড়বে, কারন সাবিহা কড়া করে বলে দিয়েছে সকালে সবাইকে নতুন জামায় দেখতে পায়। খাটের উপর পাশা পাশি দুটো ড্রেস রাখলো সে। একটি গাঢ় নীল রঙের রাউন্ড, আর একটি সাদা স্টোনের কাজ করা কাটা থ্রি পিস।প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে চিন্তা করে গেলো কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়বে সে। পরক্ষণেই তুরি বাজিয়ে দুটো ড্রেস নিয়েই কাজ শুরু করলো ইন্দু। নীল রাউন্ড জামাটা পড়ে সাদা থ্রি পিসটার গর্জিয়াস ওরনা আর পাজামাটা পড়ে নিলো সে। ভেজা চুল হালকা করে পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে বেঁধে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো সে। করিডোর দিয়ে এগিয়ে যেতেই সামনে পড়লো শুভ্র পাঞ্জাবী গায়ে রাতকে৷ ইন্দুর ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো। এগিয়ে গিয়ে নিচু হয়ে রাতের দু পা ধরে সালাম করে উঠে দাঁড়িয়ে বললো...
"ঈদ মোবারক।"
রাতও বা হাতে ইন্দুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো...
"ঈদ মোবারক। সুন্দর লাগছে আপনাকে শাহজাদি। "
ইন্দু মিষ্টি হাসলো।বললো...
"বড় আব্ব আর মেঝো আব্বু দিয়েছে ড্রেস দুটো।মিলিয়ে পড়েছি। "
রাত হাসলো। পকেট থেকে এক হাজার টাকার দুটো নোট বের করে ইন্দুর হাতে দিয়ে বললো...
"এটা আপনার ম্যাম।"
ইন্দু বাঁধা দিয়ে বলতে নিলো...
"আমার লাগবে না তো..."
"সালামি দিলে ফিরিয়ে দিতে নেই আজকের দিনে। "
ইন্দু নিলো টাকাটা। রাত একবার তাকিয়ে ইন্দুর ওরনাটা টেনে মাথায় ঘোমটা দিয়ে বললো...
"আব্বুরা সবাই নিচে আছে, সালাম করে নেও গিয়ে দ্রুত। একটু পরেই কুরবানির জন্য বেরিয়ে পড়বে। আমি চেঞ্জ করে আসছি। "
বলেই রাত এগিয়ে গেলো নিজের রুমের দিকে। পেছন থেকে ইন্দু আস্তে করে ডাকলো তাকে..
"শুনুন.."
রাত থামলো। পেছনে ফিরে ভ্রু নাচাতেই ইন্দু বললো...
"পাঞ্জাবিতে আপনাকে মানিয়েছে বেশ।"
বলেই আর থামে নাকি সে। ছুট্টে গেলো নিচের দিকে, প্রতিত্তোরের আশাও করলো না রাতের থেকে। রাত নিষ্পলক তাকিয়ে কিয়াৎক্ষন বুঝতে চেষ্টা করলো কি হলো আসলে। তারপরই তার ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো এক প্রশান্তিময় হাসি।
-----ড্রয়িং রুমে পৌছাতেই দেখলো সকলে নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরেছে। আবরার মির্জা মাত্রই সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে, তার পাশাপাশি আফরোজা বেগম আর আরজুও। মূলত তাদের আনতেই আবরার মির্জা নিজে গিয়েছেন ঐ ফ্ল্যাটে। ইন্দু গিয়ে আবরার মির্জাকে সালাম করলো। তারপর আরজু আর সে মিলে আশরাব মির্জাকে সালাম করে দাঁড়াতেই আশরাম দু জনের মাথায় দু হাত বুলিয়ে বললো...
"আমাদের বাড়ির দুই রত্ন, সব সময় ভালো থাক তোরা আম্মু।"
একে একে সবাইকেই সালাম করলো তারা। কান্তা আরজুর দিকে তাকিয়ে বললো...
"বাহ মেয়ে, মিষ্টি লাগছে তো তোকে, সত্যিই আমার আবির্ভাবের পছন্দ আছে বলতে হয়। "
থতমত খেয়ে গেলো আরজু। কি বলছেন উনি? তার মুখভঙ্গি বুঝতে পেরেই আবির্ভাব পেছন থেকে এগিয়ে এসে আমতা আমতা করে বললো...
"ইয়ে মানে, তোমার ড্রেসের কথা বলছে আম্মু। "
কান্তাও বুঝতে পেরে জিব কেটে বললো..
"হ্যা, ড্রেসটার কথাই তো বলছি। "
আরজু মিনমিনিয়ে আবির্ভাবের দিকে তাকিয়ে বললো...
"ধন্যবাদ এত সুন্দর ড্রেস দেওয়ার জন্য।"
ততক্ষণে রাত নেমে এলো রুম থেকে। পড়নে পুরোনো একটি টিশার্ট আর টাওজার। পাঞ্জাবি পাল্টে ফেলেছে দেখেই ইন্দুর কেমন যেন মন খারাপ হয়ে গেলো। রাত দেখেও না দেখার মতো রইলো। একটু পরেই বাড়ির পুরুষ সদস্যরা রওনা দিলো পশু কুরবানির জন্য।
----------
বিছানার উপর রাখা তটের ফোনটা অনবরত বেজেই চলেছে। একটু আগেই সবাই বাড়ি ফিরেছে, শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ফোনটা বাজতে দেখেই এগিয়ে গেলো তট সেদিকে। ফোন হাতে নিয়ে দেখলো স্ক্রীনে "Unwanted " লিখাটা। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেললো তট, আবার সেই বিরক্তিকর মেয়েটা।আজও জানলো না সে ফোনের ওপাড়ে থাকা মেয়েটা আসলে কে। তাই প্রতিবারের মতোই বিরক্ত হলো তট। দু- তিনবার ইচ্ছে করেই কল কেটে দিলো। পরক্ষণেই ভেবে নিলো আচ্ছা করে কয়েকটি কথা শুনিয়ে দেবে আজ মেয়েটাকে। এই ভেবেই কল রিসিভ করে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ভেসে এলো মেয়েটির সুমিষ্ট কন্ঠ...
"আসসালামু আলাইকুম সুদৃশ সাহেব,ঈদ মোবারক। "
থেমে গেলো তট। কর্কট কন্ঠে কিছু বলতে নিয়ে বললো না। কিয়াৎক্ষন চুপ রইলো সে। উপেক্ষা করাটা কঠিন, এতো মোলায়েম কন্ঠের বিপরীতে রুঢ় আচরণ করা কি ঠিক হবে? নাহ, আজকের দিনটায় অন্তত ঠিক মতোই কথা বলবে তট। ওদিক থেকে আবার ভেসে এলো মেয়েটির কন্ঠ...
"কি হলো,সালামের উত্তরটাও দিবেন না?"
তট স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিলো...
"ওয়ালাইকুম সালাম। ঈদ মোবারক।"
"কেমন আছেন?"
"ভালো, আপনি? "
"জ্বী ভালো। আজ আপনি করে সম্মোধন করছেন যে? এক দেখাতেই মনে ধরে গেলো আমাকে? "
তট ভ্রু কুঁচকালো। বললো...
"আজব,আপনার সাথে আবার কখন দেখা হলো আমার? "
মেয়েটির অবাক কন্ঠ ভেসে এলো..
"কি বলেন? আপনি আমায় চিনেন নি?"
তট উত্তর দিলো...
" হ্যা চিনেছি তো। যে প্রতিদিন শুধু শুধুই আমাকে কল দিয়ে বিরক্ত করে এতো ইগ্নোর করার পরও।"
"আর কোনো ভাবে চিনেন নি?"
"নাহ,আর কিভাবে চিনবো?"
চুপ রইলো মেয়েটি। তট আবার বলে উঠলো...
"তো আমাকে এরকম কল দেওয়ার কারন কি, চিনেন না জানেন না এরকম রং নম্বরে কল দিয়ে এসব করে কি মজা পান আপনি?"
"তুমি করেই বলুন না, প্রতিদিনের মতো। "
তটের মুখে হাসি ফুটলো। কানে ফোন রেখেই বারান্দায় গিয়ে টাওয়েলটা মেলতে মেলতে বললো...
"ভালো ব্যবহার করছি সহ্য হচ্ছে না তোমার? প্রতিদিনের মতো বাজে ব্যবহার করলে ভালো লাগবে?"
"না না,ভালোই লাগছে আজকে, তবে তুমি করে বলতে বলছি। আপনার থেকে বয়সে অনেক ছোট আমি।"
"আচ্ছা। তো নাস্তা করেছো?"
"নাহ, রেডি হচ্ছে একটু পরেই করবো।"
তট দুষ্টুমি করে বললো...
"তো রুটি বানাতে পারো না তুমি? ফোনে কি করছো?"
" ওমাহ,বাড়িতে এতজন কাজের লোক থাকতে আমি কেন রুটি বানাতে যাবো শুধু শুধু। তারাই করছে সব। "
"হুমম,বুঝলাম। "
"আপনি নাস্তা করেছেন? "
"নাহ, কলটা রাখলে নাস্তা করতে যাবো আরকি নিচে। আমাদের আবার সবাই এক সাথেই করে,অন্তত আনন্দের দিন গুলোতে। "
"ওহ আচ্ছা, তাহলে আপনি নাস্তা করে নিন। আমি পরে কল করবো।"
"আবার কেন?"
"ঈদের সালামি হিসেবে আপনার ভালো ব্যবহারটা কি আরেকবার শুনতে পারি না?"
"দেখা যাবে পরে, নাও হতে পারে। রাখছি, ভালো থেকো।"
কল কাটলো তট। প্রতিদিনের মতো চেচামেচি করে নয়, বরং সুন্দর ও সাবলীল ভাবেই। আজকাল এই অপরিচিত মেয়েটদকে নিয়ে একটু একটু ভাবনা আসেই তটের মাথায়,কিন্তু বারবার কি একই ভুল করা ঠিক হবে তার?
---------
ডায়নিং এর সামনের বড় খোলা জায়গাটায় নিচে বসে রুটি বেলছে ইন্দু। আরজু একটু আগেই আটা মেখে দিয়ে গেছে। দুপুরের জন্যই মূলত এই রুটি আর গোস্ত। ডায়নিং টেবিলটা আজ পরিপূর্ণ। সাবিহা আবরারদের পাতে নাস্তা দিতে দিতে ডাকলো ইন্দুকে...
"তিয়াস,বাকি গুলো পড়ে করিস,আগে নাস্তা করে যা।"
ইন্দু একটু হাক ছেড়ে উত্তর দিলো...
"আর অল্প একটুই বাকি আছে আম্মু."
আম্মু,শুধু আম্মু ডাকটা শুনে কাজের মাঝেই হাসলো সাবিহা। সে নিজেও জানে ইন্দু মূলত বুঝতে পারেনি তাকে কে ডাকছে, তাই-ই বড় আম্মু, মেঝো আম্মু এসব না বলে একবারেই আম্মু ডেকেছে। তবুও প্রশান্তি লাগছে তার।মিশি এসে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো..
"কি মেঝো ভাবি? হঠাৎ এতো খুশি যে?"
সাবিহা আস্তে করে বললো...
"তিয়াস আমাকে ঈদের উপহার দিয়েছে, শুনলি না মাত্র?"
উৎফুল্ল ভাবটা চোখেমুখে আছড়ে পড়ছে সাবিহার। সকলের মুখে তৃপ্তির হাসি। আরজু দেখলো তা, চোখের কোনা ভিজে এলো তার। ইন্দুকে নিয়ে এত চিন্তা তার, আজ নিজেকে সার্থক মনে হচ্ছে। এই পরিবারটা তার ইন্দুকে অনেক সুখে রাখবে, আরজু তো উপরওয়ালার কাছে সব সময় এমনই কিছু চেয়েছিলো ইন্দুর জন্য।
রাত উঠে গেলো ইন্দুর কাছে। রুটি বেলছে দ্রুত হাতে সে।খুব একটা খারাপ হচ্ছে না রুটির আকৃতি। পিঠে এলিয়ে পরা চুল গুলো যেন বেশ বিরক্তই করছল ইন্দুকে। রাত আস্তে করে গিয়ে চুল গুলো গুছিয়ে নিয়ে হাত খোঁপা করে দিলো। জিজ্ঞেস করলো...
"কষ্ট হচ্ছে? রেখে দাও, বাকিরা সামলে নেবে। "
ইন্দু বললো..
"নাহ সমস্যা নেই,এইতো শেষই। "
দু মিনিটের মাথায় কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ালো ইন্দু। বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এসে নিজেও টেবিলে বসলো সবার সাথে। খাওয়ার মাঝেই আবরার মির্জা বললো...
"তোরা তো জানিসই প্রতিবছর এই ঈদে তোদের দাদার ঐতিহ্য অনুযায়ী আমরা গ্রামের দিকে অসহায়,দরিদ্রদের কুরবানির গোস্ত দিই। এইবারও আমরা বেরোবো চার ভাই মিলে, ভাবছি এবার তোদের আম্মুদেরও নিয়ে যাবো। তোরা কি যাবি?"
পৃথিবী বললো...
"বড়আব্বু,, আম্মু বলেছে বাড়ি যেতে সবাইকে নিয়ে।"
আবরার বললো...
"হুম, আয়না আমাকেও কল করে বারবার বলেছে যেতে। কিন্তু আজ তো আমাদের যাওয়া হবে না, ওদিকের কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতেই রাত হয়ে যাবে। তোরা সবাই মিলে বরং ঘুরে আয়।"
আবরার মির্জার কথায় সকলেই সায় জানালো। ঠিক করা হলো বিকালের দিকেই রওনা দিবে তাদের ছোট ফুফু আয়না মির্জার বাড়ির দিকে।
--------
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর সকলেই জিরিয়ে নিলো একটু। আরজু,ইন্দুর রুমেই। একটু পরই ছায়া এসে আরজুকে নিয়ে গেলো নিজের সাথে। ইন্দুকেও বলে গেলো ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নিতে।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে হাত মুখ মুছে রুমে থাকা ওয়ারড্রবটা খুললো ইন্দু। সবগুলো জামার একদম উপরে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে এলো তার।মাঝারো সাইজের একটা বক্স রাখা সেখানটায়। কে রাখলো?
আস্তে করে বক্সটা নিয়ে খাটের উপর রাখলো ইন্দু। খুলতেই চোখ ছানাবড়া তার। রঙিন চিঠিখানা হাতে নিয়েই ঠোঁট নাড়িয়ে পড়লো লিখাখানা...
" আজ না হয় একটুকরো বউয়ের মতো করেই রক্তজবার ন্যয় ধরা দিন আমার মহলে।"
ইন্দুর সচল মস্তিষ্ক মুহুর্তেই সিদ্ধ হইল। ঠোঁটের কোনের হাসি খানা আরো রাঙা হলো। বিরবির করে উচ্চারণ করলো...
"রাত ভাই.."
বাড়ির বাইরেটায় সারিতে দাঁড়িয়ে আছে নয়টা বাইক। সাথে বাইকের ড্রাইভাররাও।ছায়া,ছবি,কড়ি,অহি, আরজু আর ইন্দু একত্রে বেরিয়ে এলো। বাইক দেখেই খুশিতে লাফিয়ে উঠলো ইন্দু। ছায়া হেঁসে বললো...
"সরি গার্লস এতক্ষণ আমরা একসাথে থাকলেও এখন আমাদের আলাদা আলাদা হয়ে যেতে হবে। নাও চয়েজ ইউর বাইক একন্ড ড্রাইভার। বলতে বলতেই তট বাইক স্টার্ট দিয়ে বললো...
" আমার বাইকে কাউকে নিচ্ছি না তোদের,বায় বায়।"
ছায়া,ছবি, কড়ি গিয়ে যথারীতি রণ, সায়র, আফনানের বাইকে উঠে বসলো। প্রভাকর বললো...
"আমি ভাই আজ আমার বউকে নিয়ে ঘুরবো। "
কুঞ্জর বললো..
"হ্যা,এই জন্যই বুঝি ছেলে দুটোকে বড়দের সাৎে পাঠিয়ে দিলে?"
প্রভাকর ভ্যাবলার মতো বললো...
"আমি কই পাঠালাম,আম্মুরাই তো বললো আজ ওদের সামলে নিবে।"
"হয়েছে আর ঢং করতে হবে না।চলো।"
আবির্ভাব বাইকে উঠে বসে ডাকলো আরজুকে...
"আরজু ম্যাডাম।আমার বাইকে বসতে আশা করি কোনো সমস্যা হবে না আপনার?"
আরজু এগিয়ে গিয়ে বললো..
"আম্মুর জন্য চিন্তা হচ্ছে। আমাকে ছাড়া রাতে থাকবে কি করে.."
"আরেহ,,তুমি এই নিয়ে এত চিন্তা করছো? আমার আম্মুরা তো আছেই। উঠে বসো তো এখন।"
আরজু ধীরে সুস্থে উঠে বসলো আবির্ভাবের বাইকে।
গুটি গুটি পায়ে ইন্দু গিয়ে দাঁড়ালো রাতের সামনে। মন বলছে রাত থমকে দাঁড়াবে ইন্দুকে দেখে। একরাশ মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখবে রক্তজবার ন্যয় ইন্দুকে। কিন্তু আশায় আহত হলো ইন্দু। রাত এমন কিছুই করলো না। হেলমেটটা পরে নিয়ে ইন্দুর দিকে আরেকটি হেলমেট এগিয়ে দিয়ে বললো..
"পড়ে নাও।"
রাত সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছে ইন্দুকে। তবে কি ইন্দুর ধারনা ভুল, এই ড্রেস, কসমেটিকস এসব কিছুই রাত ভাই দেয় নি তাকে? ইন্দু কি একটু বেশিই ভেবে ফেলেছে? একবার জিজ্ঞেস করে দেখবে রাতকে?
না না, যদি বলে যে সে দেয়নি তাহলে? ইন্দু তো তখন লজ্জার মুখে পড়ে যাবে। জিজ্ঞেস করা যাবে না। হেলমেটটা না নিয়েই ইন্দু আবার কদম বাড়ালো ঘরের দিকে।রাত হাত চেপে ধরলো তার..
"কোথায় যাচ্ছো?"
"ড্রেসটা চেঞ্জ করে আসি, বাইকের সাথে লেগে যেতে পারে। "
রাতের ভ্রু জোড়া কুঁচকানো, যেন প্রচুর বিরক্ত সে, দ্রুত বললো...
"গখন সময় নেই এতো,,চেঞ্জ করতে হবে না আর।উঠে বসো দ্রুত,বাইকে প্যাচাবে না জামা। "
ইন্দু আর না করলো না,লোকটা এমনিতেই প্রচুর বিরক্ত। রাতের পেছনে বাইকে উঠে বসতেই রাত দুপাশ থেকে ইন্দুর ড্রেস ঠিক করে নিয়ে বাইক স্টার্ট দিলো।.......
"আগে কখনো বাইকে উঠেছো?"
হঠাৎ রাতের এমন কথায় ইন্দু উত্তর দিলো...
"না তো।"
"তো ধরে বসছো না কেন? "
ইন্দু এবার জিভ কেটে একহাত রাখলো রাতের কাঁধে। রাত চুপটি করে কাঁধ থেকে ইন্দুর হাতটা নামিয়ে নিজের পেটের দিকে চেপে ধরলো। মুহুর্তের কান্ডখানা বুঝতে না পেরে ইন্দু কিছু বলে উঠতে গেলেই রাত তাকে বাঁধা দিয়ে বললো...
"ঠিক করে ধরে না বসলে বাইকে যাওয়ার দরকার নেই। গাড়িতে যাবো।"
বলতে না বলতেই ইন্দু দ্রুত রাতকে দু হাতে পেঁচিয়ে বসে বললো...
"না না না,,বাইকেই যাবো,এইযে ঠিক করে ধরে বসেছি। "
মেয়েটার অগোচরেই জয়ের হাসি হাসলো রাত, আস্তে করে বললো...
"গুড,এভাবেই থেকে যেও সারা জীবন।"
--------
নয়টি বাইক গিয়ে থামলো একটি পার্কের সামনে। মূলত এখানে পাশেই সাঁজিদের বাসা, সেখান থেকেই আনান তাকে নিয়ে আসতে গেছে,আর তাদের জন্যই সবাই অপেক্ষা করছে। গুরুত্বপূর্ণ একটা কল সেরে নিয়ে রাত পেছন ফিরে ইন্দুর দিকে তাকাতেই দেখলো পার্কের মাঝে অনেকগুলো পথশিশু ঘিরে রেখেছে ইন্দুকে। ইন্দুও তাদের সাথে হাসি তামাশায় মসগুল। রাত একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলো ইন্দু ব্যাগ থেকে টাকা বের করে শিশু গুলোকে দিচ্ছে। টাকা পেয়ে বাচ্চা গুলো আনন্দে আত্মহারা, বার বার ইন্দুকে জড়িয়ে ধরছে। তারা যেতেই ইন্দু হাসি মুখে এগিয়ে এলো রাতের কাছে।...
"নিজের টাকা গুলো দিয়ে দিলে? আমায় বলতে পারতে?"
ইন্দু হেসে বললো...
"সমস্যা নেই,আর আমি কিই বা করবো টাকা দিয়ে বলুন? ওরা তো নিজেদের জন্য ভালো কিছু কিনে খেতে পারবে তাই না?"
রাত নীরবে হাসলো। মেয়েটার অপরুপ হাসিখানা যেন এই অল্প একটু মুহুর্তেরই ফল,পারেও বটে মেয়েটা।
"আরেহ,,নদী না?"
ইন্দুর কথার প্রসঙ্গে রাতও তাকালো সেদিকে৷ সেদিনের মেয়েটি বসে আছে পার্কের একটি বেঞ্চে।রাত,ইন্দু সহ সবাই এগিয়ে গেলো তার দিকে। সবার সাৎে পরিচয় করিয়ে দিলো নদীকে৷ ইন্দু জিজ্ঞেস করলো...
"তা নদী,এখানে একা বসে যে? আজ ঘুরতে যাওনি?"
নদী বললো...
"না আপি,,আমার ঈদ বাকিদিনের মতোই কাটে।তোমরা কোথায় যাচ্ছো?"
ছায়া উত্তর দিলো...
"ফুফির বাড়ি যাচ্ছি। ইশশ রাতে না থাকলে তো তোমাকেও নিয়ে যেতাম এখন।"
ছায়ার কথা শুনে নদী উচ্ছাসিত হয়ে বললো...
"আমায় নেবে তোমরা?"
ইন্দু বললো...
"যেতে তো পারতে, কিন্তু তোমার মা বাবা কি এভাবে যেতে দিবে? রাতে তো থাকবো আমরা সেখানে। "
"আরেহ সমস্যা নেই, আমি যাবো।আর বাড়িতে কেয়ারটেকার আঙ্কেলকে ফোন করে জানিয়ে দেবো তাহলেই হবে।প্লিজ আমায় নিয়ে চলো,আমি কখনো এরকম ঘুড়তে যাইনি কারোর সাথে। "
রাত বললো..
"তো তোমার বাবা মা.."
"আমার বাবা বিজনেস ট্রিপে ইতালি আছে, আর মা ও সোসাইটির আন্টিদের সাথে কলনিয়াল ওয়ার্কে। আমি বাড়িতে থাকা না থাকা নিয়ে তাদের তেমন চিন্তা নেই।"
নদীর প্রবল ইচ্ছের কাছে হার মানলো অন্য সকল বাঁধা। অতপর ঠিক করা হলো নদীও যাবে তাদের সাথে। আনান সাঁজিকে নিয়ে আসতেই রাত তটকে ডেকে বললো...
"ভাই,তোর বাইকে তো আর কেউ নেই। নদীকে তোর সাথে নিয়ে নে।"
হুট করেই যেন ঝটকা খেলো তট।হ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে দু হাতে নিজের দিকে ইশারা করে বললো..
" আবার আমিই কেন আল্লাহ?"