রেখো তোমার বাহুডোরে

পর্ব - ২২

🟢

"আকাশের মতো শুভ্র নীল পাঞ্জাবিতে আপনাকে বেশ মানিয়েছে। "

ফোনের অপর পাশ থেকে মেয়েকন্ঠের কথাখানা শুনে হাত থেমে গেলো তটের।মাত্রই দুহাত উঁচু করে পড়নের পাঞ্জাবিটা খুলতে নিচ্ছিলো,কিন্তু ওদিক থেকে এমন কথা শুনে পাঞ্জাবিটা খুললো না। বরং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দারুন ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো একটু। ওভাবেই বললো...

"তুমি কি করে জানলে? আমি যে নীল পাঞ্জাবী পড়েছি আজ?"

মেয়েটির হাসির রিনরিনে শব্দ ভেসে এলো।তট একটু কঠিন স্বরে বললো...

"এই মেয়ে, হাসছো কেন?"

"আপনাকে বড্ড কাছ থেকে দেখেছি যে আজ।বাই দা ওয়ে, ওটা নীল নাহ, ওটাকে বলে শুভ্র নীল রং।বুঝলেন মশাই?"

"আজ্ঞে দিদিমনি বুঝলুম।"

"আমায় কেমন লাগলো বললেন না যে?"

"আমি কি দেখেছি নাকি তোমাকে? "

"বোকা লোক।"

" তোমার নামটা কি যেন বলেছিলে মেয়ে? মনে পড়ছে না।"

"না জেনেই থাকুন না?"

তটের মন আজ ভীষণ রকম ভালো, তাইতো ফোনের অপর প্রান্তের মেয়েটির কথায় বিরক্ত না হয়ে নিজেই বলে উঠলো...

" ইউর উইশ,আমি নাহয় অপরিচিতা বলেই চিনলাম। "

"ভালো লাগলো। "

-----------

আয়না মির্জাদের গ্রামের বাড়িটা একটু ভিন্ন রকম।শখের বসে বাড়ি করেছে নিজের মন মতোই। বিশাল কোঠর নয়,ছোট্ট একটা একতলা বাড়ি। সেই বাড়িতেই নানা রকম প্রসাধনী দ্বারা নিজের মন মতো সাজিয়েছেন তিনি। আজ সেই বাড়িতেই চাদের হাট। ঘরের সামনের উঠোন জুড়ে শীতল পাটি বিছিয়ে বসেছে তুরুলা বাহিনী। আয়না মির্জা আজ সকলের মধ্যমণি। তার স্বামী জোমান আহমেদ একটু আগেই বাড়ি ফিরেছেন নানা রকম বাজার সদাই নিয়ে,তার ঘরে যে আজ মেলা জমেছে।

"কিভাবে যে তোদের আজ মতি হলো কে জানে,,একটা ছেলেমেয়েও আসলে রাতে থাকতে চায় না কখনো। "

আয়না মির্জার কথায় পৃথিবী হাফ ছেড়ে বললো...

"সবই ভাবীগনের আগমনের ফল আম্মু।"

আয়না মির্জা বুঝলো না, জিজ্ঞেস করলো...

"ভাবিগন মানে?"

পৃথিবী নিজের কথায় নিজেই খেই হারালো,ওদিক থেকে দু জোড়া চোখ সমানে তাকে ভস্ম করে দিচ্ছে যেন।আমতা আমতা করে বললো....

"ম্ মানে ত্ তুমি জানো না আম্মু? আনান আর সৌরাজির কথা? ওর কথাই বলছিলাম আরকি।"

আয়না মির্জা চমৎকার হেঁসে সাঁজির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন..

"সে আর বলতে? কি লক্ষ্মী মেয়েটা,বউ হিসেবেও একদম লক্ষ্মীই হবে। "

আয়না মির্জার কথায় পাশ থেকে নদী ঠোঁট উল্টে বললো...

"বাহ রে ফুফিমা, আমরা বুঝি কিছুই না?"

আয়না মির্জা ফিক করে হেঁসে দিলেন তার কথায়। এক মুহুর্তের পরিচয়েই নদী মেয়েটা সবার মন কেঁড়ে নিয়েছে যেন,তাকে দেখে মনেই হচ্ছে না সে হঠাৎ পরিচিত কেউ। আয়না মির্জা একে একে নদী,ইন্দু,আরজু, সাঁজি চারজনের মাথায় হাত বুলিয়েই কপালে চুমু খেলেন। একসাথে আগলে নিয়ে বললেন..

"তোরা চারটিই আমার অনেক পছন্দের রে মেয়ে। সবগুলোই মিষ্টি তোরা।"

হাসলো সবাই। বড়সড় আড্ডায় মশগুল হলো, রাতখানা ওভাবেই আনন্দের সহীত কেটে গেলো।

--------

"তিয়াস পাখি? এই তিয়াস? ওঠো প্রাণ.. "

নিস্তব্ধ পরিবেশে কারোর ফিসফিসে কন্ঠে নিজের নাম কর্ণকুহর হতেই ঘুমটা আলগা হতে লাগলো ইন্দুর। তবে পুরোপুরি ছুটলো না,নড়ে-চড়ে আবার ঘুমে তলিয়ে গেলো সে। নাকে এসে বারি খেলো তীব্র ঝাঁজালো রকমের ঘ্রাণ। নেশালো না? হ্যা, তেমনই মনে হলো তো ঘ্রাণটা। ইন্দু আরেকটু মুখ ডুবিয়ে নিলো সেই ঘ্রাণের উৎসে, প্রশান্তির ঘুম আবার জেঁকে ধরলো তাকে।

নিজ সময় মতো ঘুম হালকা হতেই আবারো সেই ঘ্রাণটা নাকে লাগলো ইন্দুর। এবার আর চোখ বুঁজে থাকলো না সে। আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে চোখ খুললেই মুখের উপর আবিষ্কার করলো রাতের দীঘল হাস্যোজ্জল মুখটি। পুরুষালি পুরু ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে বললো...

"শুভ সকাল নিদ্রান্বিতা।"

রাত প্রায়সই এমন নতুন নতুন নামে ডাকে তিয়াসকে। প্রথম দিকে অবাক হলেও এখন এটা স্বাভাবিক তার কাছে। মুচকি হেঁসে উত্তর দিলো..

"শুভ সকাল।"

রাত আর কিচ্ছুটি বললো না। এক দৃষ্টে হাসি মুখে তাকিয়ে রইলো নিজের কোলে থাকা ইন্দুর মুখের দিকে।নীরব পরিবেশে ইন্দুর কানে ভেসে এলো পাখিদের কিচিরমিচির, সাথে আরো একটি শব্দ,কি সেটা? ভ্রু কুঁচকে ভাবলো ইন্দু। অনুধাবন করতেই বুঝতে পারলো পানিল কলকল শব্দ কানে পৌছেছে তার। তড়িৎ গতিতে রাতের কোল থেকে মাথা তুলে উঠে বসতে চাইলো সে। তার এমন তাড়াহুড়ো দেখে রাত চকিত হয়ে তাকে সামলে নিয়ে বললো...

"আস্তে তিয়াস, পড়ে যাবে। "

ইন্দু উঠে বসে তাকালো চারদিকে। মুখ যেন আপনাআপনিই হা হয়ে গেলো তার। বিরবির করে বলে উঠলো...

"এখানে কি করে এলাম? "

রাত হাাসলো। পেছন থেকে ইন্দুর দু বাহু টেনে নিজের আরেকটু কাছে এনে বসালো। হাত দুটো দিয়ে ইন্দুর এলোমেলো চুল গুলো হাতখোপা করতে করতে বললো...

"কতবার যে ডাকলাম, বাবারে বাবাহ, তোমার যা ঘুম,সাধে কি আর নিদ্রান্বিতা নাম দিয়েছি?"

"" নৌকায় কি করে উঠিয়েছেন আমায়?"

রাতের সহজ সুন্দর স্বীকারোক্তি...

"কোলে করে। "

নদীর মধ্যস্থানে ছোট্ট এই পালতোলা নৌকাটি চলছে আপন গতিতে। তারই উপর ঠাই হয়েছে রাত আর ইন্দুর। রাত নৌকাটির একদম কিনারায় পিঠ দিয়ে বসে, তার সামনেই ইন্দু।

গ্রাম্য নদীর পথটা আঁকাবাকা, বর্ষা মৌসুমের আগমনের সময় চলছে, ভোর পাঁচটা বাজছে হয়তো। এই সময়টাতেও গ্রামের মানুষজন নিজেদের কাজে লেগে পড়েছে। স্নিগ্ধ কোমল হাওয়া গায়ে লাগতেই মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠলো ইন্দুর। প্রাণ খোলা হাসি দিয়ে দু হাত প্রসারিত করলো মেয়েটা। ছাউনির ওপাশে মধ্যবয়ষ্ক একজন লোক উল্টোদিকে ফিরে বৈঠা চালাচ্ছে। তাকে চোখে পড়তেই ইন্দু নিজের দিকে তাকালো একবার। হঠাৎই পেছনে ঝুঁকে চোখ গোলগোল করে ফিসফিসিয়ে রাতকে বললো...

"বালিশের পাশেই ওড়না রাখা ছিলো আমার। আনেন নি?"

রাত হাসলো। মেয়েটি নিঃসংকোচ রাতের সাথে কথা বলছে দেখেই শান্তি লাগছে রাতের। বা হাত উঁচিয়ে ইন্দুর ওড়নাটা দেখালো, হাতে পেচিয়ে রেখেছে সেটা। দেখেই বুকে হাত দিয়ে সস্থির নিঃশ্বাস ফেললো ইন্দু। ওড়না নেওয়ার প্রয়াশ চালালো না, সে জানে সময় হলে রাত নিজেই পড়িয়ে দেবে তাকে। তা ছাড়াও রাতে দৃষ্টিতে কখনোই কামুকতা দেখেনি ইন্দু, তাই সে রাতের সামনে অন্তত নিশ্চিন্ত, সুরক্ষিত।

"আমি পানি ধরবো?"

কি সুন্দর আবদার প্রেয়শীর। রাত কি তা কোনো ভাবে নাকোচ করতে পারে? কখনোই না। নীরবে বা হাতে ইন্দুর কোমড় জড়িয়ে ধরলো আলতো ভাবে, যাতে মেয়েটা পড়ার মতো কোনো সুযোগ না থাকে। তারপর ডান দিকে ঝুকতেই নৌকাটাও একটু কাত হয়ে গেলো। নদীর টলটলে পানি এবার ইন্দুর হাতের নাগালে। প্রফুল্ল চিত্তে মেয়েটা পানি নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠলো। এতটুকুও ভয় নেই মনে,তার ভরসা হয়ে রাত তো আছেই।

রাত হাসলো,বিরবির করে আপন কন্ঠে সুর তুললো..

"নয়া গাঙের পাড়ে গো বৃক্ষ,

বৃক্ষের চিরল চিরল পাতা,

কে তুমি সুন্দরও কন্যা?

তোমার মুখে নাই ক্যান কথা?"

প্রায় একঘন্টা নৌকা ভ্রমণের পর মাঝি পাড়ে এসে থামলো। রাত উঠে দাঁড়িয়ে নিজের হাতে পেঁচিয়ে রাখা ওড়নাটা স্বযত্নে ইন্দুর গলায় ঝুলিয়ে দিলো। তার পরপরই ইন্দুর হালকা পাতলা শরীরটিকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে সাবধানে পাড়ে উঠলো নৌকা থেকে। মাঝির ভাড়া শুরুতেই মিটিয়ে দিয়েছে সে।

রাত হাটছে বিবস গ্রামীণ রাস্তা ধরে,কোলে তার প্রণয়িনী। নামার প্রয়াস চালালো না ইন্দু,এক হাতে রাতের কাধ জড়িয়ে নিয়ে আরেকহাত মেলে দিলো শূন্যে, পদযুগল দুলছে তার, আঁখিদ্বয়ে যেন মাতোয়ারা নেশা লেগেছে আজ প্রকৃতির।

"জানেন, আমি এর আগে এরকম গ্রামে আসিনি কখনো। "

ইন্দুর কথায় রাত উত্তর করলো...

"এখন থেকে যখন যেখানে যেতে ইচ্ছে করবে তোমার, সেখানেই নিয়ে যাবো। "

"সত্যি তো?"

" তিন সত্যি, বলো কোথায় যেতে চাও? "

ইন্দু কিছুক্ষণ ভাবুক দৃষ্টিতে আকাশের পানে তাকিয়ে রইলো। মাথায় কিছু না আসতেই তড়িঘড়ি করে বললো...

"এখন মাথায় আসছে না। সময় হলে জানাবো।"

"আপনার যেমন ইচ্ছে ম্যাম।"

দুরে রাস্তার ধারে একটি খেজুর গাছের নিচে জড়োসরো হয়ে বসে থাকতে দেখলো কয়েকজনকে। চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই রাত আর ইন্দু বুঝতে পারলো ওখানে তুরুলা বাহিনী রয়েছে। রাতকে বললো..

"এবার নামিয়ে দিন?"

"তোমার পায়ে জুতো নেই তিয়াস। "

"কিছু হবে না, বাড়ি গিয়ে পা ধুয়ে নেবো। "

"প্রয়োজন নেই। এভাবেই চলো।"

রাত নামালো না ইন্দুকে। একেবারে তুরুলা বাহিনীর কাছে গিয়ে বাঁশের মাচার উপর বসালো তাকে। পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলো দুজন।একেক জনের অবস্থা একেক রকম।সাঁজি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার কাঁধেই মাথা দিয়ে রেখেছে আরজু। সায়র আর আফনান বালুময় রাস্তাতেই হাঁটু ভাজ করে টয়লেট করার পজিশনে বসে আছে। ছায়া, ছবি মাচায় বসে পা দোলাচ্ছে। বাকিরাও এদিক সেদিক ছড়িয়ে। কিন্তু সবার দৃষ্টি উপরের দিকে। যেখানে নদী মাচার উপর দাঁড়িয়ে একটি মাটির কলসি উঁচু করে ধরে রেখেছে খেজুর গাছের সাথে। তাকে এপ্রিশিয়েট করছে কড়ি,একটু পর পরই জিজ্ঞেস করছে...

"কিরে নদী, হলো? পড়লো? এক ফোটাও না?"

নদীও সিরিয়াস ভঙ্গিতে উত্তর দিচ্ছে...

"এবার মনে হচ্ছে পড়বে আপু,আর একটু। "

এদের এসবের আগামাথা কিছুই বুঝছে না রাত,গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো...

"কি হচ্ছে এসব?"

তট বড় করে একটা হামি তুলে বললো...

"খেজুর গাছ থেকে রস সংকলন।"

ইন্দু বললো..

"মানে? "

"মানে আর কি, এই কড়ি আর এই মেয়েটা,কি যেন নাম? হ্যা নদ-নদী,খাল-বিল।সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে তুলে নিয়ে এলো সবাইকে ইম্পর্ট্যান্ট কাজের কথা বলে। এসে দেখি এরা দুটোয় মিলে এই বর্ষায় খেজুরের রস উদঘাটন করতে নেমেছে। "

তটের কথায় ইন্দু হতভম্বের ন্যয় বললো...

"কিন্তু খেজুরের রস তো শীত কালে পাওয়া যায়।"

রণ কড়ির পায়ের গোড়ালিতে গুতা মেরে বললো...

"সেটা এই গাধা দুটোকে কো বোঝাবে, আধপাগলা দুটোই।"

রণের কথা শুনেই কড়ি তেড়ে বললো...

"এই রণর বাচ্চা, একদম গাল টেনে ছিঁড়ে ফেলবো তোর।"

কথার মাঝেই উপর থেকে উচ্ছাসিত কন্ঠে নদী বলে উঠলো...

"এই এই পড়েছে পড়েছে, ইয়াহুউউ.."

প্রত্যেকেই হতভাগ,এই বর্ষায় খেজুরের রস পড়েছে? তাও আবার এইভাবে?

নদী মাটির কলসিটি নিয়ে নিচে নেমে এলো। সবাইকে আঙুল দিয়ে দেখালো কলসির তলানিতে একফোঁটা রস।আঙুলের ডগা দিয়ে সেই রসটুকু তুলে বললো..

"এই দেখো,,বলছিলাম না পড়বে?"

ইন্দু ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গিয়ে ভালো করে পরখ করে দেখে ফিক করে হেঁসে দিলো। পরক্ষণেই বললো...

"ওহ নদী,,কাল রাতে বৃষ্টি হয়েছিলো বোধহয়,,গাছ থেকে বৃষ্টির পানিই তোমার কলসিতে এসে পরেছে। এই সময় খেজুরের রস পাওয়া যায় না বোন।"

নদীর মুখটা পাংসুটে হয়ে গেলো। সবাই তাকে নিয়ে হাসছে।

"ধ্যাৎ, ভাল্লাগে না..."

বলেই কলসিটা স্বশব্দে মাচার উপর রাখলো। মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে রইলো সে। হাসাহাসির মাঝেই তটের পকেটে থাকা ফোন বেজে উঠলো। কে ফোন করেছে চেক না করেই রিসিভ করে কানে তুললো...

"হ্যালো..."

সাথে সাথেই ওদিক থেকে একটা মেয়ের কন্ঠ ভেসে এলো...

"হেই, হু আর ইউ? নদীর বয়ফ্রেন্ড? ওহ হো,নদী তাহলে ফার্স্ট রু'মডেটে গেছে, ওয়াও।নদী কোথায়? ওকে বলবে আমার ট্রিটটা যাতে দিয়ে দেয়..."

তট হা করে রইলো,,কি সব বলছে মেয়েটা। কান থেকে ফোনটা নামাতেই দেখলো এটা তার ফোনই নাহ।মাচার উপরে উঠার সময় নদী নিজের ফোনটা তটের কাছে জমা করে রেখেছিলো,তার ফোনই এটা।তট দ্রুত ফোনটা নদীর দিকে এগিয়ে দিয়ো বললো...

"এই মেয়ে, ধরো তোমার ফোন। কি সব পাগলের প্রলাপ করছে।"

নদী ফোন হাতে নিয়ে নম্বরটা দেখেই মুখে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে তুললো। কানে দিয়ে বললো....

"কি সমস্যা আপু? কল দিয়েছো কেন?"

"তুই কোথায় গিয়েছিস জানতে,আমার কিছু স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট আনানোর জন্য। বাট তুই তো বললি না তুই রিলেশন করছিস? তার সাথে আবার ডেটেও গেলি?"

নদী খুবই বিরক্তির সহিত বললো...

"ফালতু কথা বলো না আপু,ইট'স দেয়ার ফ্যামিলি ট্রিপ। আ'ম নট লাইক ইউ, ক'দিন পর পর এক এক জনের সাথে ডেট করে বেরাবো। রাখো ফোন,ডিজগাস্টিং। "

বলেই নদী ফোন কেটে দিলো। ওদিকে তটের মাথায় ভর করলো অন্য চিন্তা।নাহ,নদী মেয়েটার সাথে আলাদা করে কথা বলতেই হবে এবার।

"আরজুরাণীর কি মন খারাপ?"

আবির্ভাবের কথায় ঘোর থেকে বের হলো যেন আরজু। গোপনে চোখের কোন থেকে অশ্রু মুছে ফিরে তাকালো আবির্ভাবের দিকে।মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটানোর চেষ্টা করে বললো...

"নদীর পানির মতো আমাদের জীবনটাও বহমান তাই না? যত ঝড়ই আসুক,কোথাও একটু সময়ও থামতে নেই। "

আবির্ভাব শুনলো,তারপর নীরবে বুকে দু হাত গুঁজে এক কদম এগিয়ে আরজুর পাশে বরাবর দাঁড়ালো, সামনে বহমান নদীর দিকে দৃষ্টি রেখেই বললো...

"কিন্তু, আমরা চাইলেই আমাদের পুরোনো, হারিয়ে ফেলা সময় গুলোকে নতুনত্বে রুপ দিতে পারি।যেগুলো আমাদের অন্তরে থাকে,কখনো ভুলতে দেয় না,সেসব কিছুই আমরা একটু অন্যরকম ভাবে হলেও আবার নিজের চলমান জীবনে নিয়ে আসতে পারি। "

নীরবতা বইলো কিছুক্ষণ। বেশ অনেকক্ষণ পর আরজু নিগুঢ় কন্ঠে বললো...

"আমি কখনো সাতার শিখার চেষ্টা করিনি। কারন আমি যতবারই জলে নামতাম, আমার সাহারা দেওয়ার মতো দুটো হাত ছিলো বিশ্বস্ত। আমার ভয় হতো না কিছুতেই, কারন আমি জানতাম সেই হাতদুটো সর্বদা আমাকে রক্ষা করার জন্যই তৈরি, আমার কিচ্ছু হতে দেবে না। "

"তারপর?"

আরজুর কন্ঠে বিষাদের ঢেউ নেমে এলো।মুখে হাসি, চোখে জল রেখেই তপ্ত স্বরে বললো...

"তারপর সেই বিশ্বস্ত হাত দুটি চিরতরে হারিয়ে গেলো আমার থেকে,আমিও আর কখনো জলাশয়ে নামার সাহস করিনি। "

আবির্ভাব চুপ রইলো। একটু পরেই ঠোঁটের কোনে তার চিরচেনা হাসিটি দিয়ে আরজুর হাত আঁকড়ে ধরে নিয়ে গেলো সবার কাছে। উচ্চকন্ঠে ঘোষণা করলো....

"গায়েজ, আজকের গোসলটা নদীতে হলে কেমন হয়?"

----------------

দুপুর থেকে মুষলধারে বৃষ্টি, বিকেলের শেষ প্রহরে একটু সুবিধা হতেই আয়না মির্জার বাড়ি থেকে রওনা দিলো তুরুলা বাহিনী। আকাশ ঘন মেঘে বিস্তৃত, বেশ কয়েকবার বলার পরও রাত আজকের রাতটা থাকে নি। কাল সকাল থেকেই ইন্দু, আরজুর কলেজ,পরিক্ষার আগে কোনো গাফেলতি দিতে চায় না রাত।নদীও তার পরিবারকে না জানিয়েই এসেছে,তার কথাও চিন্তা করেছে সবাই। তাই সব দিক ভেবে আজই রওনা দিলো আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে।গ্রামের সিক্ত কাদামাটি মাড়িয়ে নয়টি বাইক গিয়ে উঠলো পিচঢালা রাস্তায়।বাইকের স্পিড এবার যথারীতিই বাড়বে সবার। তটের পেছনে নদীর গা ছাড়া ভাব দেখে তট বিরক্তি হলো। এমনিতেই আজ সকাল থেকে তার অপরিচিতা একটি কলও করলো না,গতকাল রাতে তো স্বাভাবিক ভাবেই কথা বললো তট,তবে? নিজ থেকে কল করার কথা ভেবেও আর করে নি তট।কেমন যেন ছেছড়ামো হয়ে যাবে না?। মাথাটা হালকা পেছনে ফিরিয়ে বিরক্তিকর স্বরে বললো....

"ধরে বসো মেয়ে,স্পিড বাড়াচ্ছি। পড়ে গেলে দোষ দিও না।"

নদীর মন প্রফুল্ল হলো।দু হাত দিয়ে পেছন থেকে আপন চিত্তে ঝাপ্টে ধরলো তটের পেট।তট দাঁত খিঁচে সহ্য করলো। পরক্ষনেই সকালের ঘটনা মাথায় আসতেই কঠিন স্বরে নদীকে প্রশ্ন করলো...

"নীরা কে হয় তোমার?"

তব্দা খেলো নদী। এই সময়ে এমন একটা প্রশ্ন একদমই আশা করেনি সে। তাকে নীরব থাকতে দেখে তট কন্ঠে আরেকটু কাঠিন্য ফুটিয়ে বললো...

"চুপ থেকে লাভ নেই মেয়ে।আমি স্পষ্ট শুনেছি ওটা নীরার কন্ঠই ছিলো।সত্যিটা বলো।"

রেখো তোমার বাহুডোরে গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি -এর লেখা একটি জনপ্রিয় রহস্যে ঘেরা রোমান্টিক ও থ্রিলার গল্প