"কলেজের ক্যান্টিন থেকেই প্রায় সময় খাবার কিনে খেতাম আমরা, ভাইয়া।এছাড়া বাইরে তেমন কিছুই খাওয়া হয় না।কিন্তু ইন্দুর সাথে তো আমিও খাই,আমার তো এমন কিছুই হয়নি কোনোদিন।"
আরজুর কথায় নীরব রইলো রাত। এক নাগাড়ে ঘুমন্ত ইন্দুর চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে সে। এই মুহুর্তে এর থেকে যেন আর কোনো কাজই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
"ভাই,আমার মনে হয় ঐ ক্যান্টিনেই কোনো গন্ডগোল আছে। আমি এক্ষুনি যাচ্ছি... "
বলেই আনান কেবিনের বাইরে পা বাড়াতে গেলেই রাত গম্ভীর কন্ঠে বাঁধা দিলো তাকে...
" এখন নয় আনান।যা হবার কাল হবে। "
ড.রাসফি আর আবির্ভাব একত্রে এলো কেবিনে। সরাসরি দাঁড়ালো রাতের সামনে।বললো...
"আপনি খুবই ভালো ডিসিশন নিয়েছেন মি. মৃগাঙ্ক। খুব তারাতারিই পেশেন্টের শরীরের সমস্ত ব্লাড চেঞ্জ করতে হবে। ওর ব্লাডে ফয়'জন ছড়িয়ে পড়েছে ইতোমধ্যেই। "
ড. রাসফির কথায় উপর নিচ মাথা ঝাকালো রাত। আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো...
"এতে কি খুব বেশিই কষ্ট হবে আমার তিয়াসের?"
"দেখুন,,সাধারণত কিডনিতে সমস্যা জনিত রোগীদের ক্ষেত্রে এই ডায়াফ্রাম পদ্ধতিতে দূষিত রক্ত শরীর থেকে বের করা হয়।আমাদের কাছে সব থেকে সহজ পদ্ধতি এটাই মনে হলো। হয়তো দু একদিন একটু সমস্যা হবে,তবে চিন্তার কিছু নেই এতে। "
আবির্ভাব এবার বললো....
"কিন্তু ভাই,ইন্দুর ব্লাড গ্রুপ 'ও' নেগেটিভ। আর কমপক্ষে ৮-১০ ব্যাগ রক্ত লাগবে। আমি ব্লাড ব্যাংকে খোঁজ নিতে পারি,কিন্তু যেহেতু শরীরের সমস্ত রক্ত চেঞ্জ করা হচ্ছে তাই সরাসরি ইন্টেক রক্ত দেওয়াটাই বেটার হবে। মানে ডোনার রেডি করতে হবে। "
রাত ঢোক গিললো,তারপর হুট করেই মাথা তুলে বললো...
"তুই তোর মতো বাকি ব্যবস্থা কর আবির্ভাব। ডোনার রেডি করছি আমি। "
"এক দু জন নয় ভাই।৭-৮ জন তো লাগবেই। "
"আমি ম্যানেজ করবো। আমার তিয়াসের কিচ্ছু হতে দিবো না আমি। "
চারদিকে খোঁজ নেওয়া শুরু হয় ব্লাডের জন্য। বাড়িতেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তারা আজ রাতে আর ফিরবে না।আবরার মির্জা সহ বাকিরাও আসতে চাইলে আনান তাদের শান্ত করে বুঝিয়ে বললো আসার দরকার নেই।
সন্ধ্যা গড়িয়েছে প্রায়। বিকেল থেকে এই এতক্ষণ সময়ে ৬ জন ও নেগেটিভ ব্লাড ডোনার জোগার হয়েছে। আরো চারজন জোগার হলেই আবির্ভাব ইন্দুর ব্লাড চেঞ্জের কাজ শুরু করবে। আনান করিডোরে পায়চারি করছে, আর অনবরত ডোনার ম্যানেজ করার চেষ্টা করছে। রাতেরও একই অবস্থা ছিলো এতক্ষণ, একটু আগেই ইন্দুর ঘুম ভেঙেছে শুনে তার কাছে গেলো সে।
ইন্দু তিতি বিরক্ত,নাক কুঁচকে তাকিয়ে আছে রাতের দিকে। সামনেই রাত নিজের ফোনে কাউকে খুব মনোযোগ দিয়ে মেসেজ করছে। বিরক্ত নিয়ে ইন্দু আবার বলে উঠলো....
" আপনি আমার কথা শুনছেন না কেন বলুন তো? আমি তো সুস্থ আছি,তাহলে এখনো হসপিটালে কি করছি? বাড়ি চলুন না?"
রাত নীরবে পেছন ফিরে একবার তাকালো ঠোঁট উল্টে বসে থাকা ইন্দুর দিকে। পরক্ষণেই আবার মেসেজে মনোযোগ দিয়ে বললো...
"স্যুপ ঠান্ডা হচ্ছে তিয়াস।খেয়ে নাও। "
ইন্দু বিরক্ত হলো। স্যুপের বাটিটা সাইড টেবিলে শব্দ করে রেখে বললো...
"আমি খাবো না এসব,,,বাড়ি যাবো আমি। "
আওয়াজ কানে আসতেই এবার হাফ ছেড়ে ফোন পকেটে পুরলো রাত। এগিয়ে এসে বসলো ইন্দু বরাবর।মেয়েটাকে এখনো বলার সাহস হয়নি রাতের,যে তার একটু পর থেকেই ডায়াফ্রাম শুরু হবে। মেয়েটা যদি ভয় পায়? রাত পারলো না বলতে। মনের ভেতর তপ্ত এক গোপনতা রেখেই ইন্দুকে বললো...
" অপরিচিত কারোর গাড়িতে উঠার শাস্তি হিসেবেই আজ রাতটা তোমাকে হসপিটালে থাকতে হবে। "
ইন্দু ঠোঁট উল্টালো আবারও। বেডে হেলান দিয়ে শুয়ে বললো...
"ঠিক আছে, আমি ঘুমালাম।"
"খাবারটা খেয়ে তারপর ঘুমাও। "
ইন্দুর তীরের মতো উত্তর...
"খাবো না এটা।"
রাত এবার হালকা ধমক দিয়ে বললো...
" বাচ্চামো করছো তিয়াস। "
"হ্যা তো,কি করবেন? তখনকার মতো আবার থাপ্পড় মারবেন? একটা মেরে মন ভরে নি?"
থেমে গেলো রাত। কোমরে দু হাত গুঁজে দীর্ঘ নিঃশ্বাস এগিয়ে গেলো ইন্দুর দিকে। বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরানোর চেষ্টা করলো....
"এদিকে ফিরো তিয়াস। "
ইন্দু গাঁট হয়ে শুয়ে রইলো। রাত টেনে নিজের দিকে ঘুরালো তাকে। তবুও ইন্দু মুখ ঘুরিয়ে রইলো অন্যদিকে। রাত এবার প্রণয়িনীকে মানানোর চেষ্টাঔ করলো বোধ হয়।নরম কন্ঠে বললো...
"আচ্ছা সরি বাবাহ। এবার তো কথা বলো। "
"আমি দুপুর থেকে ভাত খাইনি। খিদে পেয়েছে। "
গোমড়া মুখে হলেও নিজের পেটের খবর যে মেয়েটা জানিয়েছে এতেই সস্তি পেলো রাত।
"আচ্ছা, তুমি বসো একটু। আমি খাবার নিয়ে আসছি বাইরে থেকে। আরজুকে পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমার সাথে। "
"আরজুকে বাড়ি পাঠিয়ে দিন,আমার শাস্তি ও কেন পাবে? ওর পড়ার ক্ষতি হবে। "
রাত আর কিচ্ছুটি বললো না। আস্তে করে বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে। করিডোরে তটকে দেখেই বললো...
"তুই আবার আসতে গেলি কেনো? বাড়িতে..."
তট এগিয়ে এসে বললো...
"তিয়াসের ও নেগেটিভ ব্লাড লাগবে সেটা জানাবি না? আমি আছি কি করতে?"
সত্যিই তারাহুরোয় সবারই মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিলো তটের ব্লাড গ্রুপ যে ও নেগেটিভ। আনানের মাথায় আসলেও একটু দ্বিধাবোধ করছিলো সে। কারন শুরু থেকেই তিয়াসের প্রতি তটের খুব একটা ভালো মনোভাব ছিলো না। এখন অবশ্য কোনো ঝামেলা না হলেও তটের মনের অবস্থা বুঝা দায়,যদি নাকোচ করে দিতো?
"থ্যাংকস ভাই। "
রাতের কথার প্রেক্ষিতে তট মাথা তুলে বললো...
"থ্যাংকস বলছিস কেন ভাইয়া? নিজের লোকের জন্য এটুকু করতে না পারলে নিজের কাছেই খারাপ লাগতো।"
কান থেকে পোন নামিয়ে মাত্রই রাতদের দিকে এগিয়ে এলো আনান।রাতকে উদ্দেশ্য করে বললো...
"সাঁজি আসছে ভাই,ওর ব্লাডগ্রুপও 'ও' নেগেটিভ। ব্লাড দিবে তিয়াসকে। তট সহ আটজন হয়ে গেছে, আর দুজন ম্যানেজ করতে পারলেই দশজন রেডি। তাহলে আমরা নিশ্চিন্তে শুরু করতে পারবো। "
আনানের কথা শুনে রাত ভ্রু কুঁচকে বললো...
"সাঁজি আসছে মানে? ও পারবে ব্লাড দিতে?"
"বলছে তো পারবে,এদিকের খবর শুনতেই রাজি হয়ে গেলো। আসুক না, দেখি।"
আবির্ভাব এসে দাঁড়ালো সবার সাথে। তটকে বললো...
"তোর হিমোগ্লোবিন পাক্কা আছে ভাই। দু ব্যাগ দিতে পারবি?"
তট উত্তর দিলো..
"সম্ভব হলে তিন ব্যাগ নিয়ে নে,তাহলে আর ডোনার খুঁজতে হবে না। "
আবির্ভাবও বললো..
"তিন ব্যাগ নেওয়া যায়,বাট তুই একটু দূর্বল হয়ে পরতে পারিস। "
"ও কিছু নাহ, কয়েকদিনের মধ্যেই আবার ফিট হয়ে যাবো। "
"আচ্ছা, তাহলে প্রথমে দু ব্যাগই নেবো। পরে যদি প্রয়োজন হয় তাহলে আরেক ব্যাগ দিয়ে দিস। "
ইতোমধ্যেই সাঁজি এসে উপস্থিত হলো। আনান এগিয়ে গেলো তার কাছে। জিজ্ঞেস করলো...
"সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। বলেছিলাম আমি গিয়ে নিয়ে আসি,বারন করলে। সমস্যা হয়নি তো?"
"আরে নাহ,ভাইয়াই নামিয়ে দিলো হসপিটালের সামনে। আসতেও চেয়েছিলো উপরে, অনেক কষ্টে বাঁধা দিয়েছি। "
"আচ্ছা,, তাহলে চলো,প্রথমেই তোমার থেকে নিয়ে নিতে বলি আবির্ভাব ভাইকে। তারপর আমি পৌছে দেবো বাড়ি।তুমি দিতে পারবে তো? ভয় করছে না?"
সাঁজি দ্রুত কদমে এগিয়ে যেতে লাগলো আনানের সাথে। বললো..
"আরে তারাহুরো করো না,ভাইয়া বলে দিয়েছি আমি আজ হসপিটালেই থাকবো বিভার সাথে।কাল বাড়ি যাবো।আর আসার সময় হিমোগ্লোবিন টেস্ট ও করে এসেছি,একদম পার্ফেক্ট আছে। দিতে পারবো আমি, চিন্তা করো না।"
রাতের সামনে আসতেই সাঁজি তরতর করে জিজ্ঞেস করলো...
"ভাইয়া,,বিভা কেমন আছে? ও কি বেশি অসুস্থ? আমি গিয়ে দেখে আসবো একবার?"
রাত উত্তর দিলো..
"ও ঠিক আছে।"
আরজু আস্তে করে সাঁজির হাত চেপে ধরলো..
"আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো আপু,,ইন্দুর জন্য আমি কিছুই করতে পারছি না।"
সাঁজি হাসলো মিষ্টি করে। আরজুকে আস্থা দিয়ে বললো...
"ধুর বোকা মেয়ে, বিভা তো আমার ছোট বোনের মতোই,আর তুমিও। এভাবে বলে না প্লিজ।"
রাতও এবার সাঁজিকে জিজ্ঞেস করলো...
"তুমি পারবে তো?"
সাঁজি দম নিয়ে বললো...
"ইনশাআল্লাহ ভাইয়া,আপনারা সবাই তো আছেনই।সমস্যা নেই। "
"তোমার ভাই জানে? বারন করেনি?"
"ভাইয়া আর যাই হোক কখনো কারোর উপকার করতে বারণ করে না। ভাইয়া নিজেও এমন, নিজে জীবনের রিস্ক নিয়ে হলেও অন্যদের বাঁচাবে। ব্লাড দেবো শুনেই বললো,কখন লাগবে,চল তোকে পৌছে দিই।এটাও জিজ্ঞেস করেনি, কাকে দেবো,বা চিনি কিনা।,আপনি আমার ভাইয়াকে নিয়ে চিন্তা করবে না ভাইয়া।"
রাত মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। সাঁজি আবার জিজ্ঞেস করলো...
"বিভা কোথায়? আমি যাই ওর কাছে?"
রাত বললো...
"আরজু সহ যাও,আর ওকে জানিও না কিছু এই বিষয়ে,প্যানিক করতে পারে।"
আবির্ভাব বললো...
" তাহলে আমি ড. রাসফিকে বলি কাজ শুরু করতে?"
"হুম,তার আগে আমি তিয়াসের জন্য খাবার নিয়ে আসি,আগে খেয়ে নিবে ও। তোর হসপিটালের পঁচা স্যুপ ওর পছন্দ হয়নি। "
আবির্ভাব চকিতে বললো..
"কি বলিস ভাই, তুই থাম, আমি আবার ভালো করে স্যুপ বানিয়ে আনতে বলছি। "
"না প্রয়োজন নেই। ও দুপুরেও লাঞ্চ করেনি। ভাত খাবে বলেছে। আমি বাইরে থেকে নিয়ে আসছি।"
-----
সারারাত ধরেই একের পর এক ডোনারের সাহায্যে ব্লাড দেওয়া হলো ইন্দুকে। রাতে খাওয়ার পর রাত নীরবে মেয়েটির মাথার কাছে বসে চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো...
"এবার ঘুমাও।"
ইন্দু শান্ত মেয়ের মতো ঘুমিয়েও পড়েছিলো।রাত ভেবেছিলো পুরো রাতে আর ঘুম ভাঙবে না। কিন্তু রাত যখন প্রায় তিনটা তখনই হুট করে ঘুম ছুটে যায় ইন্দুর। রাত তার পাশেই বসে ছিলো।ইন্দুকে জাগতে দেখেই ধরফরিয়ে উঠলো সে। এবার কি হবে? হাতে যে ক্যানেলা,যদি প্যানিক করে মেয়েটা। হাত আড়াল করার চেষ্টা করলো রাত। আমতা আমতা করে বললো...
"তু্ তুমি জেগে গেছো?"
ইন্দু ভ্রু কুটি করে পর্যবেক্ষণ করলো রাতকে। জিজ্ঞেস করলো...
"আপনি ঘুমাননি কেন?"
রাত উত্তর দিলো না।ইন্দু আবারও চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই দেখলো কেবিনের অন্য বেডে ঘুমিয়ে আছে সাঁজি। তার পাশেই টুলে বসে বিছানায় মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছে আনান।সাঁজির হাত থেকে একটি লতা নিজের বেডের দিকে আসতেই ইন্দুর চোখ পড়লো নিজের হাতের দিকে। সেটা লক্ষ্য করতেই রাত ঢোক গিললো।ইন্দুকে সাহস দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো...
"দেখো পাখি,তুমি ভয় পেও না প্লিজ। এটা তেমন কিছুই না।আমার দিকে তাকাও..."
ইন্দু ভয় পেলো না।নীরবে নিজের হাত থেকে চোখ তুলে তাকালো রাতের দিকে।নজরদারির ভঙ্গিতে বললো....
"তাহলে এই জন্যই আমাকে হসপিটালে রেখে দিয়েছেন। "
রাত চুপ রইলো। ইন্দু ফের বললো.....
"কি হয়েছে আমার? আর সাঁজিপু আমাকে ব্লাড দিচ্ছে কেন?"
রাতের শরীরে চিকন ঘাম দিচ্ছে। কি অদ্ভুত, শ'খানের ব'ন্দুকধারী শত্রুর সামনে যেই পুরুষটা বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছে বহুবার,অকুতোভয়ের মতো যুদ্ধ করেছে বহুজনের সাথে, সেই পুরুষই আজ একটা অষ্টাদশীর প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় পাচ্ছে। তার শরীর কাপছে সামান্য এই টুকুতেই। মেয়েটা তাকে দমিয়ে নিলো?
"আপনি ঘামছেন কেন?"
বলতে বলতেই ইন্দু নিজের বা হাত দিয়ে রাতের কপালের বেয়ে পড়া নোনাজল মুছিয়ে দিলো। চোখমুখে তার চিন্তা স্পষ্ট। রাতকে ভয় পেতে দেখে মেয়েটা চিন্তিত।রাত ইন্দুর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো না।ইন্দুর হাতখানা নিজের কপাল থেকে নিয়ে নিজের দুহাতে আঁকড়ে ধরলো। প্রশ্ন ছুড়লো করুন কন্ঠে....
"ত্ তুমি আমাকে ভুল বুঝো না পাখি,আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না।"
ইন্দুর মুখভঙ্গি কঠিনের মতোই। বললো....
"আপনি কি ভাবছেন? যে আমি আপনাকে সন্দেহ করছি? আপনি আমার খারাপ চাইছেন বলে এসব করছেন এটা ভাবছি?"
রাত উত্তর দিলো না,বরং উত্তর চাইলো ইন্দুর থেকেই। নীরবে চাতকের ন্যয় তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। ইন্দু উত্তর দিলো নিজ থেকেই...
"গত তিনমাস আমি আপনার সাথে একই বাড়িতে থাকছি, আপনাকে দেখছি। জানি না কেন,আর কারোর প্রতি না হলেও আপনার প্রতি আমার বিশ্বাস গাঢ়।আমি জানি আপনি আমার ক্ষতি চাইবেন না। আমার ভালোর জন্যই হয়তো আমাকে না জানিয়ে এভাবে এসব করছেন। আমি আপনাকে সদেহ করছি না,শুধু জানতে চাইছি কি হয়েছে আমার। "
রাতের চিত্ত পুলকিত হলো। মেয়েটা ম্যাজিক জানে। কয়েকটি বাক্য দিয়েই যে এতোক্ষনের ভয় কাটিয়ে দিলো রাতের, তা কি বুঝতে পারছে তার স্বপ্নদর্শী?
রাত সুস্থির হাসলো। পুলকিত মনে আস্তে করে নিজের দু হাতের আজলে থাকা ইন্দুর হাতের পিঠে চুমু খেলো দুটো। মেয়েটা ভয় পেয়ে বা ইতস্ততবোধ করেও হাত সরালো না।হয়তো এটাই প্রমান করে রাতের প্রতি তার বিশ্বাস কতটা দৃঢ়।
"তোমার যে পেটে ব্যাথা হচ্ছিলো এতদিন ধরে এটার জন্য টেস্ট করিয়েছিলাম।ইউ নো না,আমি তোমাকে নিয়ে কোনে রিস্ক নিতে চাই না।ব্লাডে ইনফেকশন পাওয়া গেছে তোমার,কেন পাওয়া গেছে তার কারন জানতে চাইবে না এবার প্লিজ।"
ইন্দু ঠোঁট এলিয়ে হাসলো।রাতের কথা মেনে নিয়ে বললো..
"আচ্ছা চাইবো না জানতে। পরে বলুন? সাঁজিপু এখানে কেন?"
"ইনফেকশনের কারনে তোমার ব্লাড চেঞ্জ করা হচ্ছে। সাঁজির ব্লাডগ্রুপ তোমার সাথে মিল,তাই ও তোমাকে ব্লাড দিচ্ছে। এর আগে আরো চারজন দিয়ে গেছে। তোমার তট ভাইয়াও দিবে সাঁজির পর। "
"উনিও এখনো হসপিটালেই?"
"হুম"
"আর কে আছে?"
"আবির্ভাব, আরজু আছে। সরিহ, আরজুকে বলার পরেও যায়নি বাড়িতে।"
"আমি জানতাম ও যাবে না। এখন কোথায়?"
"প্রায় দুটো পর্যন্ত তোমার কাছেই বসে ছিলো। ঘুমে টলছিলো দেখে আবির্ভাবের চেম্বারে পাঠিয়েছে অনেক কষ্টে। ওখানে ডিভান আছে। বলেছি কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে আবার আসতে পরে। "
"যাক ভালো হয়েছে। ও রাতে ঘুম ছাড়া থাকতেই পারে না জানে,,অসুস্থ হয়ে যায় মেয়েটা। টানা কয়েকমাস ঘুমের মেডিসিনের প্রভাব এমন ভাবে পড়েছে,এখন মেডিসিন না নিলেও রাতে ঘুম হানা দিবে ওর।এত সময় পরও এই জিনিসটা পরিবর্তন হলো না। "
" ঘুমের মেডিসিন কেন নিতো আরজু? ওর কি কোনো সমস্যা ছিলো?"
"সে অনেক লম্বা কাহিনি। পরে বলবো একদিন। এখন এখানটায় মাথা রেখে চোখ বন্ধ করুন। আপনার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। "
বলতে বলতেই ইশারায় নিজের মাথার পাশে বালিশে মাথা রাখতে বললো রাতকে। রাত নাকোচ করে বললো...
"উহুম,একটু পরেই আবির্ভাব, তট ওরা আসবে।"
"ওরা আসলে আপনি তখন উঠে যাইয়েন,এখন পাঁচ মিনিট ঘুমিয়ে নিন।"
রাত আবদার ফেললো না। ইন্দুর পাশেই মাথা রাখলো নিরবে।ভেবেছিলো ঘুমাবে না, এমনিই একটু চোখ বুঁজে থাকবে। কিন্তু ইন্দুবালা যে তার সিল্কি চুলের ভাঁজে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো,সেই আরামেই নিশ্চিন্তের ঘুম হানা দিলো রাতের চোখে। ঘুম বাবাজি তাকে এতটাই কাবু করে ফেলেছে যে, দরজায় আবির্ভাব কয়েকবার টোকা দেওয়াতেও ভাঙলো না সেই ঘুম।