খাটের উপর বইখাতা ছিটিয়ে তারই মাঝে অবস্থান করছে আরজু। কিন্তু আজ যেন পড়া মাথায় ঢুকতেই চাইছে না তার। বিভোর চিন্তায় নিমগ্ন সে। গতকালের সেই ঘটনা গুলো মন থেকেই সরছে না যেন। দুটো বছর পর আরজু নদীতে নেমেছে। নেমেছে বললে ভুল হবে, আবির্ভাব টেনে নামিয়েছে তাকে। পুরোটা সময় আরজুকে প্রোটেক্ট করেছে নিজ মতোই। আরজুর নিবিড় ভাইয়ের মতো করে একদম।
'যাদের হারিয়ে যাওয়া অনিবার্য, তাদের সাথেই কেন জীবনের সেরা মুহুর্ত গুলো কাটে?'
উত্তর পেলো না মেয়েটা। চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো আরজুর। অতি যত্নে ফ্রেমে বাঁধানো কারো হাস্যোজ্জল মুখের ছবিখানা বুকে চেপে ধরলো সে। বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে তার, এই অরোগ্য দহন কি কোনোদিনও থামবে না তার? কেন এতোটা যন্ত্রণা তার হলো? বিধাতা কি আরো একবার তাকে ক্ষমা করতে পারতো না?
"আমায় কেন এতটা কষ্ট দিলে নিবিড় ভাই? কেন বুঝলে না তোমাকে ছাড়া আমি মৃ'ত্যু যন্ত্রণায় কাতরাবো পুরোটা জীবন? কেন নিবিড় ভাই,কেন?"
--------
শহরের কোলাহল ছাপিয়ে গলির মাথায় টং দোকানে ঠাই হয়েছে তটের,সঙ্গে রয়েছে সুহাসও। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খানিক চিন্তিত কন্ঠে সুহাস বললো....
"তার মানে তুই এখন নীরাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ওর ছোট বোন, মানে নদী মেয়েটাকে ব্যবহার করবি?"
তট নীরবে তাকালো অদূরে।মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের করলো না। এইবার সুহাস নিজের কন্ঠের তীব্রতা বাড়িয়ে বললো...
"ভাই মানলাম নদী নীরার আপন ছোটবোন। বাট মেয়েটা এখনো আন্ডার 18, আর তুই তো বুঝিসই মেয়েটা তোকে পছন্দ করে, তাহলে কেন এভাবে কাউকে হার্ট করবি তুই?"
তটের কন্ঠ রোধ হলো, চিবিয়ে চিবিয়ে বললো...
"যাস্ট ফা* হার এইজ। আর পছন্দ মানে? এগুলো ওর চাল সুহাস। এই মেয়েটাও তার বোনের মতোই ফাঁসাতে চাইছে আমাকে নিজের জালে। ওরা দুবোনই একই রকম। ওরা আমাদের বিলাসবহুল জীবন আর টাকার প্ডেমে পড়ে।ইট’স নট রিয়েল লাভ।"
সুহাসের কন্ঠ নেতিয়ে এলো। বিরস কন্ঠে বললো...
"তাই বলে তুই বাচ্চা একটা মেয়ের সাথে লাভ গেইম খেলবি?"
"আরেহ আমি তো আর বাড়াবাড়ি কিছু করছি না।কিছুদিন পরেই সব নরমাল হয়ে যাবে। "
"তবুও ভাই,নদী মেয়েটাকে একবার চান্স দেওয়া যায় না?"
তট চায়ের কাপে চুমুক দিলো। আস্তে করে বললো...
"অসম্ভব, আমি অন্যকারোর প্রেমে পড়েছি। "
সুহাস হতভম্ব, বললো...
"আবার কে?"
"অপরিচিতা। "
------------------
নিজ কক্ষে বসে বইয়ে মনোযোগ দিয়েছেন আবরার মির্জা। সামনেই কান্তা মির্জা বসে, দরজায় টোকা দিয়ে আলভি মির্জা বললো...
"ভাই আসবো?"
আবরার মির্জা অনুমতি দিলেন। আলভি মির্জা এসে বসলো বড় ভাইয়ের পাশে। আবরার মির্জা বইখানা পাশের টেবিলে রেখে শুধালো...
"কিছু বলবি?"
"হ্যা ভাইয়া, আনানের বিষয়ে কিছু কথা ছিলো। ছেলে গুলো তো বড় হয়েছে। সৌরাজি মাকেও আমরা সবাই-ই মোটামুটি চিনি। ভালো মেয়ে। আমি বলছিলাম কি, আর কতদিন এভাবে থাকবে ওরা, এবার কি সৌরাজির ভাইয়ের কাছে প্রস্তাব নিয়ে যাওয়া উচিত না? আমাদের পরিবারের সবাই ওদের সম্পর্কের বিষয়ে জানলেও মেয়েটার ভাই তেমন কিছুই জানে না। সাঁজি ভয়ে নিজের ভাইয়ের কাছে বলছে না কিছু। মেয়েটার তো বাবাও নেই।"
আবরার মির্জা ভাবুক হলেন।বললেন..
"সৌজন্য চৌধুরী, কম্পানিতে দু একবার বিভিন্ন প্রোজেক্ট নিয়ে আসতে দেখেছি। আচরণ ভালো,এইবার বোনের ব্যপারে কেমন তা তো বুঝতে পারছি না। ঠিক আছে, আনানের সাথে কথা বলে নিই আমরা আগে,তারপর নাহয় সাঁজির ভাই সৌজন্য চৌধুরীকে একবার কম্পানিতে ডেকে কথা বলবো ওদের ব্যপারে।"
রুমের সামনে দিয়ে রাতকে যেতে দেখেই আবরার মির্জা গলা উঁচিয়ে ডাকলো তাকে। ভেতরে এলো রাত। আবরার মির্জা বললেন...
"আনানের বিয়ের ব্যপারে কথা বলছিলাম। আবির্ভাব, আনান দুজনই তোমার থেকে দু এক মাসের হলেও ছোট। তুমি কি বলো এতে?"
রাত ভ্রু কুঁচকালো। বললো...
"কি ব্যপারে জানতে চাইছো তোমরা? "
আলভি মির্জা শুঁকনো কাশি দিয়ে বড় ভাইয়ের দিকে তাকালেন। আস্তে করে বললেন...
"ভাই,,মেঝো ভাইকে কি ডাকবো?"
আবরার মির্জা বারণ করলেন তাকে। রাতকে বললো...
"বড় হিসেবে বিয়েটা আগে তোমার হওয়া উচিৎ না?"
রাত বা হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে নিজের কপাল চুলকে বললো...
"বড় আব্বু,সাঁজি আর আনান দুজনই দুজনকে পছন্দ করে। তাদের বিষয়টা স্বাভাবিক। কিন্তু আবির্ভাব আরজুকে পছন্দ করলেও আরজু এই ব্যপারে এখনো কিছুই জানে না। আর আমি চাইছিও না ওদের এক্সামের আগে এসব কিছু নিয়ে কথা উঠুক। তিয়াস নিতান্তই বাচ্চা মনোভাবের এখনো। তাই আমি চাইছি না এতো তারাতারি বিয়ে সংসার এসবের ভার পরুক মেয়েটার উপর। আমার ওকে আরো জানতে হবে বড়আব্বু,ওর ইচ্ছে, শখ, না হওয়া সব কিছু আমি পূরন করবো। কোনো অপূর্ণতা রাখবো না তিয়াসের। তাই আমাদের বিষয়টা আপাতত বন্ধ থাক।অন্যদিকে তোমরা আরজুকে চেনো আশা করি। মেয়েটা ম্যাচিউর, নিজের সীদ্ধান্ত নিজেই নিতে পছন্দ করে। ভালো হয় আবির্ভাব আর আরজুর মধ্যে নিজেদের কথা হোক,তারপর বাকিটা বোঝা যাবে। আশা করি তোমরা বুঝতে পেরেছো আমার কথা। "
আবরার মির্জা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন৷ আলভি মির্জা বললেন..
"তাহলে আপাতত আনানের বিষয়টাই দেখবো বলছো?"
"নাহ, আপাতত বিয়ে সম্পর্কিত সব কিছু স্টপ। তিয়াসের এক্সামের আগে কোনো বিয়ে হবে না বাড়িতে। আমি চাই না ওর পড়ায় ব্যঘাত ঘটুক। বিয়ে নিয়ে কোনো আলোচনাই হবে না, এক্সাম শেষ হলেই তোমরা সাঁজির ভাইয়ের সাথে কথা বলো।ওদেরও সময় দাও আরেকটু৷ "
বলেই কক্ষ ত্যাগ করলো রাত। আবরার মির্জা মেনে নিলো রাতের কথাই,সাথে আলভি মির্জাও। ছেলেটাকে এই কারনেই ভালো লাগে আবরার মির্জার। সব সময়ই আগে পরে চিন্তা করে সঠিক সীদ্ধান্তটা নেয়।
---------
সময় বহমান। এগিয়ে আসছে ইন্দুদের পরিক্ষা, এইতো আর হাতে গোনা কয়েকটা দিন বাকি। কলেজ ছুটির পরে আরজু চলে গেলো টিউশনের উদ্দেশ্যে। আপাতত একটাই টিউশন পড়ায় সে আর বাকি গুলো আবরার মির্জার অনুরোধে ছেড়ে দিয়েছে। গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে বাড়ির গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে ইন্দু। বেশ কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামলো তার সামনে। কিন্তু গাড়িটাকে তার পরিচিত মনে হলো না। এমনকি ড্রাইভারও তার পরিচিত নয়। ড্রাইভারটি গাড়ি থেকে নেমে ইন্দুর সামনে এসে বললো...
"ম্যাম চলুন।"
ভ্রু যুগল কুঁচকালো ইন্দু। বললো...
"আপনি কে? আর আহমেদ চাচা কোথায়?"
ড্রাইভার ছেলেটি আমতা আমতা করে বললো....
"ম্ মৃগাঙ্ক স্যার অফিস থেকে পাঠিয়েছেন আমাকে। আপনাদের বাড়ির ড্রাইভার, মানে আহমেদ চাচা ছুটিতে আছেন। "
ইন্দু ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলো ড্রাইভারটিকে। মনে পরছে না একে দেখেছে কিনা কোনোদিন। সন্দেহ নিয়ে বললো...
"আমি আগে কথা বলবো রাত ভাইয়ের সাথে। কল দিন উনাকে। "
ড্রাইভার ছেলেটি কিছুটা ঘাবড়ে গেলো যেন। আমতা আমতা করে বললো...
"দ্ দু মিনিট ম্যাম।"
বলেই একটু দুরে গিয়ে ফোনে কিছু একটা যেন করলো। পরক্ষণেই এগিয়ে এসে ইন্দুর হাতে ফোন দিয়ে বললো...
"কথা বলুন স্যারের সাথে। "
ইন্দু ফোন কানে তুলতেই ওদিক থেকে রাতের কন্ঠ ভেসে এলো....
"হেই তিয়াস।গাড়ি আমি পাঠিয়েছি, চলে এসো তুমি। "
কথার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্দু আচ্ছা বলতেই কেটে গেলো কলটা। ড্রাইভার ছেলেটি বললো...
"এই বার চলুন ম্যাম।"
আর কিছু না বলেই গাড়িতে উঠে বসলো ইন্দু।তা দেখেই পেছনে থাকা আরেকটি গাড়িও চলতে শুরু করলো। কুটিল হাসলো তুরগ লাহোর। পরিচিত নম্বরে কল করেই খুশির খবরটা দিয়ে বললো...
"এলমা বেইবি। কাজ হয়ে গেছে। মেহরাব মৃগাঙ্ক মির্জার জান এখন আমার কবলে।"
---------
হাইওয়ের রাস্তায় অকস্মাৎ ব্রেক কষতে বাধ্য হলো তুরগ লাহোরের হয়ে কাজ করা ড্রাইভারটি। সাথে সাথে তুরগের গাড়িটাও থামতে হলো। সামনে উঁকি দিতেই দেখতে পেলো কালো রঙের রোলস রয়েস গাড়িটির ফ্রন্টে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং মৃগাঙ্ক মির্জা। আয়েশি ভঙ্গিতে লেদার প্যান্টের পকেটে দু হাত গুঁজে।
আকাশ ভেঙে ছুপছুপে বৃষ্টি পড়ছে। থেকে থেকে মেঘের গর্জনও শোনা যাচ্ছে। তবে সেসবের কিছুই যেন স্পর্শ করতে পারছে না রাতকে। বৃষ্টিতে ভিজে গায়ের কালো রঙের শার্টটা আঁটসাঁট হয়ে লেপ্টে আছে শরীরে। ফুলে ফেঁপে ওঠা বক্ষস্থল, দু হাতের বাইসেপস যেন শার্ট ফেটে বেরিয়ে আসার উপক্রম। দুর থেকেই ভয়ে ঢোক গিললো তুরগ লাহোর। ভীত স্বরে উচ্চারণ করলো...
"ওহ নো..!!"
তড়িৎ গতিতে ফোন করলো সামনে থাকা গাড়ির ড্রাইভার ছেলেটিকে।বললো.....
"গাড়ি ব্যাকে নে, কুইক।"
ততক্ষণে তুরগ নিজের গাড়িটা ঘুরিয়ে পালাতে ব্যস্ত। তার কথা অনুযায়ী সামনের গাড়ির ড্রাইভার ছেলেটিও যখন গাড়ি পেছাতে যাবে তখনই খেয়াল করলো তার পাশে জানালা দিয়ে একটি ভেজা হাত পি'স্তল ঠেকিয়েছে কপালের ডান পাশে৷ ভয়ে ভয়ে মিররে তাকাতে দেখতে পেলো আনানের ভয়ঙ্কর হাসিমাখা মুখটি।
ইন্দুর সেদিকে খেয়াল নেই, সামনে থেকে রাতকে এগিয়ে আসতে দেখে নিজেই কাঁদতে কাঁদতে গাড়ি থেকে নামলো সে। রাতের সামনে দাড়িয়েই কান্নারত কন্ঠে বিচার দিলো সে.....
"আ্ আপনি এই লোকটাকে কেন পাঠিয়েছেন? আ্ আমি কতবার বলেছি, আমার প্ পেট ব্যথা করছে, আমাকে আপনার কাছে নিয়ে যেতে, ক্ কিন্তু এইলোকটা আ্ আমাকে অন্য রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আ্ আমাকে ব্ বকেছেও।আপনি....."
আর বলতে পারলো না ইন্দু, তার আগেই সপাটে একটা থাপ্পর এসে পড়লো তার গালে। এলোমেলো হয়ে গেলো যেন সবটা। রাত ভাই তাকে মেরেছে। চোখ তুলে তাকাতেই রাতের শক্ত, কঠিন চোয়ালখানা স্পষ্ট হলো।রক্তলাল চক্ষুদ্বয় নিবদ্ধ ইন্দুর দিকেই। ইন্দু বুঝলো না তার রাগের কারন।এই মুহুর্তে বুঝতে চাইলোও না। দু হাত পেটে চেপে ধরে চাপা আর্তনাদ করে আবার সেই রাতের কাছেই সাহারা চাইলো.....
"আ্ আমার সহ্য হচ্ছে না, ব্ ব্যথা... অসহ্য ব্যথা..."
রাত কঠিন স্বরে কিছু বলতে গিয়েও চকিত হলো। কি হলো মেয়েটার? ইন্দু অনবরত কাশি দিচ্ছে। শরীরের অবস্থা নাজেহাল, টলছে মেয়েটা। রাত শক্ত দু হাতে নিজের কাছে এনে সামলাতে চাইলো তাকে,তখনই ইন্দু অকস্মাৎ ঢলে পড়ে রাতের গায়েই অনর্গল বমি করে দিলো।
------------
হসপিটালের করিডোরে ঘনঘন পায়চারি করছে রাত। একটু আগেই ইন্দুকে নিয়ে আবির্ভাবের হসপিটালে এসেছে সে। এই নিয়ে প্রায় পাঁচ ছয়বার মেয়েটার এমন পেটে ব্যথা সাথে বমি। প্রথম দিকে স্বাভাবিক মনে হলেও এখন মোটেও তেমন মনে হচ্ছে না রাতের। আবির্ভাব একটু আগেই ইন্দুকে নিয়ে গেছে কিছু টেস্ট করানোর জন্য। বাইরে অপেক্ষমান রাত।
একটু পরেই আবির্ভাব বেরিয়ে এলো। রাত জিজ্ঞেস করলো...
"কি বুঝছিস?"
আবির্ভাবের মুখে কেমন যেন চিন্তার ছাপ,আস্তে করে বললো...
"আমার কেমন যেন সুবিধার লাগছে না ভাই। ড. রাশফি এমনি এমনি টেস্ট করাতে বলেননি মনে হয়। রিপোর্ট আসুক,তারপর ক্লিয়ার হওয়া যাবে বিষয়টা।"
রাত স্তব্ধ হলো।কি হলো তার তিয়াসের আবার? কি কঠিন সমস্যা?
অন্তরের অন্তঃরালে অন্তহীন অস্থিরতা বিরাজ করছে রাতের। তার অবস্থা বুঝতে পেরে আবির্ভাব তার কাঁধে হাত দিয়ে বললো...
"আপাতত ইন্দু সুস্থ আছে। যা ওর কাছে। আর বাইরে ওয়েট করতে হবে না। এই কেবিনেই থাক কিছুক্ষণ তোরা,সমস্যা নেই। আমি চাইছি,একেবারে রিপোর্ট দেখে সবটা ক্লিয়ার হয়ে তারপরই বাড়ি ফিরবো।"
রাত মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। আবির্ভাব বললো...
"ভেতরে যা। "
কেবিনে ঢুকতেই দেখলো ইন্দু বেডে পা মেলে বসে আছে। তার পায়ের দিকটায় কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করছে ড. রাসফি। রাত এগিয়ে গেলো।জিজ্ঞেস করলো....
"এনি প্রবলেম ডক্টর?"
ড. রাসফি চিন্তিত কন্ঠে বললেন...
"হুম,,আমি কিছু সন্দেহ করছি মি. মৃগাঙ্ক। আই উইশ তা যেন সত্যি না হয়। "
ভয় হচ্ছে রাতের। কি বলতে চাইছেন উনি? জিজ্ঞেস করলো...
"কি সন্দেহ?"
"আপনি একটু লক্ষ্য করুন, মিস বিভাবরীর হাত-পায়ের আঙুলের ডগা গুলো কেমন নীলচে লাগছে না? শুধু এই টুকুই নয়।"
বলেই ড. রাসফি আঙুলের ইশারায় ইন্দুর দিকে দেখিয়ে দেখিয়ে বললো...
"এই যে তার কানের লতিতে,গলায়,ঠোঁটের চারপাশেও সেইম অবস্থা। "
রাত খেয়াল করে দেখলো, ড. রাসফি ঠিকই বলেছে। এটা এতদিন কি ছিলো? নাকি আজই? বুঝলো না রাত। নিজের দিকেই দোষ দিতে লাগলো মনে মনে। মেয়েটাকে সে ঠিক মতো দেখে রাখছে না কেন?
"বি পেশেন্ট মি. মৃগাঙ্ক। আমি এখনো শিউর দিয়ে কিছু বলতে পারছি না, টেস্টের রিপোর্ট আসুক। তারপরই ক্লিয়ার বলা যাবে। অপেক্ষা করুন একটু।আসছি আমি। "
বলেই বিদায় জানালো ড. রাসফি। রাত ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো ইন্দুর দিকে। আস্তে করে তার বরাবর বসে কোমল গালে হাত বুলিয়ে দিলো।
"কেমন লাগছে এখন? "
রাতের প্রশ্নে ইন্দু স্বাভাবিক উত্তর দিলো...
" ভালো, কিন্তু ডক্টর এসব কি বলে গেলো?"
"ওসব তোমায় ভাবতে হবে না এখন। "
ইন্দু রাতকে পর্যবেক্ষণ করে বলে উঠলো...
"আপনি এখনো ভেজা কাপড় পড়ে আছেন?"
"আনান স্যুট নিয়ে আসলে চেঞ্জ করবো। "
"ততক্ষণ এভাবে থাকবেন নাকি? ঠান্ডা লেগে যাবে তো। শার্টটা খুলুন।ঐ যে সোফায় একটা টাওয়াল আছে, ঐটা দিয়ে আপাতত মাথা মুছে নিন।"
রাতের ইচ্ছে করলো না তর্ক করতে। ইন্দুর কথা মেনেই পড়নের ভেজা শার্ট আর ভেতরের গেঞ্জিটি খুলে রাখলো। টাওয়াল নিয়ে এসে ইন্দুর হাতে দিয়ে বললল...
"মুছিয়ে দাও। "
ইন্দুও নাকোচ করলো না। রাতের সিল্কি চুলগুলো মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো...
"তখন আমায় মারলেন কেন?"
রাত তাকালো ইন্দুর লাল হয়ে যাওয়া গালের দিকে। বা হাতে সেই জায়গায় আলতো বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো...
"ভয় পেয়েছো?"
ইন্দুর সাবলীল উত্তর..
"না, একটু কষ্ট পেয়েছিলাম। "
রাত থামলো। ঝোঁকের মাথায় যে মেয়েটার গায়ে হাত তুলে ফেলবে তা নিজেও ভাবতে পারেনি তখন।ইন্দুর হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে পাশে রেখে বললো...
" তুমি কেন ওমন অচেনা কারোর গাড়িতে উঠেছো? তোমার কোনো আইডিয়া আছে, ওরা কারা ছিলো?"
"আমি কি করবো? বাড়ি থেকে তো আহমেদ চাচাও যায় নি গাড়ি নিয়ে, ঐ লোকটা বললো চাচা নাকি ছুটিতে গেছেন। আর আপনিই নাকি অফিস থেকে গাড়ি পাঠিয়েছেন আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। "
রাত দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে বললো...
"তোমার আহমেদ চাচাকে মাঝরাস্তায় ট্র্যাপে ফেলে আটকেছে তারা। তোমাকে ওরা আমার নাম বললো আর তুমিও বিশ্বাস করে নিলে?"
"করিনি তো।কিন্তু ওই লোক তো কল দিয়েছিলো আপনাকে,আমি স্পষ্ট আপনার কন্ঠ শুনেছি। "
রাত ভ্রু কুঁচকালো, পুরোটা শুনতেই দাঁতে দাঁত চেপে বললো...
"ওটা ভয়েজ চেঞ্জার ছিলো তিয়াস।ওরকম কন্ঠ নকল এখন অহরহ হয়।"
ইন্দু মাথা নুইয়ে ফেললো। আমতা আমতা করে বললো...
"আমি কি জানতাম নাকি এত কিছু?"
একটু পরেই আনান এলো,হাতে একটা প্যাকেট রাতের দিকে এগিয়ে দিতেই রাত ওয়াশরুম থেকে চেঞ্জ করে এলো। ইন্দুকে এড়িয়ে আস্তে করে আনানকে জিজ্ঞেস করলো...
" ওদিকের কি খবর?"
" লোকটা আমাদের কাছেই বন্ধি আছে ভাই। ওকে তুরগ লাহোর হায়ার করেছে তিয়াসকে তুলে নেওয়ার জন্য, পুরো প্ল্যান তুরগ এরই।"
"আমি জানতাম ঐ রাসকেলটাই এসব করছে। ও আমার তিয়াসের সন্ধান পেয়ে গেছে আনান।আমার প্রাণের দিকে হাত বাড়িয়েছে আজ।ওর দিন ঘনিয়ে আসছে।"
"কম্পানির সমস্যাটা মিটিয়ে নিই আগে ভাই, এর আগে কিছু করলে সন্দেহ থেকে যাবে। "
"যা করার তারাতারিই করতে হবে আনান।আমার তিয়াসকে রিস্কজোনে রাখতে পারবো না আমি কিছুতেই।"
আনান রাতকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। ওদিকে ইন্দুর দিকে তাকাতেই দেখলো ম্যাডাম বেডের উপরই গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে। হাটু ভাজ করে গালের নিচে এক হাত দিয়ে কি নিশ্চিতের ঘুম দিচ্ছে সে। হুট করেই রাত খেয়াল করলো মেয়েটার পেটের দিকের জামা কিছুটা সরে গিয়েছে। আড়চোখে আনানকে অন্যমনষ্ক থাকতে দেখে ইন্দুর কাছে গিয়ে জামাটা ঠিক করে দিতে গেলেই খেয়াল হলো পেটের দিকটায় কেমন যেন হালকা নীলাভ হয়ে আছে তার। ভ্রু কুচকালো রাত, ভালো করে পরখ করতেই দেখলো সে ভুল দেখছে না। পুরো শরীরের জায়গায় জায়গায় এমন অদ্ভুত জিনিস খুব ভাবাচ্ছে রাতকে। ড. রাসফি কিসের কথা বলে গেলো? সিরিয়াস কিছু?..
ভাবনার মাঝেই কেবিনে ঢুকলো ড. রাসফি আর আবির্ভাব। মুখ তার ভার, আড়চোখে ইন্দুর দিকে একবার তাকিয়ে বললো...
"ওহ, ঘুমাচ্ছে ইন্দু।ভালোই হলো,একটু রেস্ট নিক।"
রাত এগিয়ে গেলো আবির্ভাবের কাছে। জিজ্ঞেস করলো...
"রিপোর্ট এসেছে? সব নর্মাল আছে তো?"
আবির্ভাবের মুখে রা নেই। মাথা নিচু করে রেখেছে সে। ড. রাসফি বললো..
"ড. আবির্ভাব, বলুন উনাকে বিষয়টা? "
আবির্ভাব মাথা তুলে তাকালো রাতের দিকে। রাতের চোখে মুখে ভয়,তটস্থ কন্ঠে বললো..
"কি হয়েছে আমার তিয়াসের?"
" ওর শরীরে স্লো ফয়'জেনিং হচ্ছে ভাই। কেউ ওকে অনেকদিন ধরে বি'ষ খাওয়াচ্ছে। "