দফায় দফায় নীলা তানিশা সবাই এসে একই প্রশ্ন করে গেল। কেউ শান্তকে বিশ্বাস করছে না। সন্ধ্যা নেমে আসলো। সবাই এই ব্যাপারে শান্তর উপর বেশ রাগান্বিত। সে কী বুদ্ধি দিয়েছিল?
আবারও সবাই নাবিহার রুমে আসে। পানি ছিটানোর পর ওঠে বসেই নাবিহা আবারও বলে, “এ কী বুদ্ধি দিলে তুমি শান্ত?”
এই কথা বলে নাবিহা আরও বলে, “এই আপনারা যান তো এখান থেকে, আমাকে ডিস্টার্ব করছেন কেন?
আবারও একই কথা বলায় শান্ত বেশ রেগে যায়। রেগে গিয়ে জোরে জোরে ধমক দিতে শুরু করে নাবিহাকে। শান্ত বলে, “এই ইরা, তুমি ওঠো তো। একটু পর পর বলছো আমি কি বুদ্ধি দিয়েছি। আমিতো নিজেই জানি না কবে কি বুদ্ধি দিলাম।”
“ইরা? ইরা কে?” তানিশা বেশ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“কে ইরা?” শান্ত জিজ্ঞেস করল।
“তুই ই তো মাত্র বললি, ইরা তুমি উঠো তো।” মাহির বলল।
“না, আমি ইরা বলি নি। নাবিহা বলেছি।” শান্ত আওয়াজ নিচু করে বলল।
“এইবার মনে পড়েছে আমার। নাবিহা রুম নিতে এসেও আমাকে ওর নাম ইরা বলেছিল। আমি মনে করতে পারি নাই, তাই ফর্মে নাম দেখে আসছিলাম।” জারা বলল।
এইবার আর কারো মনে কোনো সন্দেহ রইল না। সবাই নিশ্চিত শান্তই কিছু করেছে। শান্তই কোন বুদ্ধি দিয়েছে নাবিহাকে। এইবার রুম থেকে বেরিয়ে সবাই বেশ চেপে ধরেছে শান্তকে। সবার কথায় আর হট্টগোলে শান্ত জোরে বলে উঠলো, “চু….প, দয়া করে চুপ করো সবাই। গত শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে ইরার সাথে আমার জানালা দিয়ে কথা হয়েছিল। কিন্তু তখন আমি ওকে কোনো বুদ্ধি দিই নি।”
“তোর যে কথা হয়েছে এটাও তো আগে বলিসনি।” মাহির বলল।
“বলিনি তার জন্য সরি। আমি চাই নাই এই কথাটা কেউ জানুক, তাই বলিনি। কিন্তু তাই বলে আমি ওকে কোনো বুদ্ধি দিয়েছি তার কি কোনো প্রমাণ মিলে? শান্ত বেশ জোরে জোরে প্রশ্নটা করল সবার উদ্দেশ্যে।
“আচ্ছা এখন এসব নিয়ে আলোচনা বাদ দেই, সবাই সবার রুমে যা। আমি আমার পরিচিত একজন ডাক্তারকে নিয়ে আসছি। উনি যদি খারাপ কিছু বলে তবে রাতেই হাসপাতালে নিয়ে যাবো। কিন্তু মনে হয় না তেমন কিছু। প্রথমে অজ্ঞান ভেবেছিলাম কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মেয়েটা ঘুমাচ্ছে।” রবি বেশ ঠান্ডা মাথায় কথাটা বলল।
কথাটা বলার সাথে সাথে শান্ত নিজের রুমে চলে গেল। সবার অতিরিক্ত সন্দেহ প্রবণতা আর ইরার মুখের এমন কথায় রাতের খাবার তার গলা দিয়ে নামেনি। আর খোঁজ ও নেয়নি রাতে। সারা রাত ছটফট করেছে, ঘুমাতে পারেনি।
পরদিন সকালের নাস্তার জন্য সবাই ডাকছে শান্তকে। কিন্তু সে যাচ্ছে না। পরে মাহির এসে নিয়ে গেল নাস্তার টেবিলে। শান্ত নাস্তা করতে বসতেই রবি বলল, “গতকালকে রাতে ডাক্তার এসেছিল। আমি গিয়ে নিয়ে আসছিলাম। স্বাভাবিক ভাবে তো কোন সমস্যা ধরা পড়েনি। সবই ঠিক আছে।”
“এখন ইরাকে জিজ্ঞেস কর, আমি কি বুদ্ধি দিয়েছিলাম?” শান্ত রবির দিকে তাকিয়ে বলল।
“হ্যাঁ, তা তো জিজ্ঞেস করতেই হবে। সবাইকে রীতিমত নাকানিচোবানি খাইয়ে তুলেছে মেয়েটা।” মাহির বলল।
খাবার খেয়ে সবাই ইরার রুমে গেল। সেখানে আগে থেকেই বসা ছিল জারা। এসে শান্ত ইরাকে জিজ্ঞেস করল, “এখন কেমন লাগছে? শরীর ঠিক আছে?”
“জি, এখন অনেকটা হালকা আছি আগের থেকে।” বেশ আস্তে আস্তে ইরা বলল।
“আচ্ছা, আমি আপনাকে কি বুদ্ধি দিয়েছিলাম বলেন তো।” শান্ত ইরাকে জিজ্ঞেস করল।
“বুদ্ধি? কী বুদ্ধি দিয়েছিলেন?” কিছু বুঝতে না পেরে ইরা জিজ্ঞেস করল।
“গতকালকে আপনি একদম অজ্ঞানের মতো ছিলেন। পানি ছিটিয়ে দিলে উঠে বসেই বার বার বলছিলেন, ‘শান্ত, এ কী বুদ্ধি দিলে তুমি?’ এই নিয়ে তো সবাই আমাকে ভুল বুঝলো।” শান্ত বেশ নরম সুরেই কথা গুলো বলল।
এসব ঘটনা শুনে হো হো করে হেসে উঠে ইরা। ইরার হাসি দেখে সবাই বোকা বনে গেলো। সে হাসছে কেন?
সবাই বোকা বনে গেলেও শান্তর দৃষ্টিতে এই হাসি যেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসার চেয়েও বেশি সুন্দর। যেন শিশিরভেজা গোলাপের পাপড়ি হালকা বাতাসে দুলে উঠেছে। যেন পূর্ণিমার চাঁদ হঠাৎ মেঘ সরিয়ে মুখ দেখিয়েছে।
“হাসছেন কেন?” প্রশ্ন করল নীলা।
“বলছি, বলছি…” ইরা হাত নাড়াতে নাড়াতে বলল।
“হ্যাঁ, বলেন।” তানিশা জানতে চাইল।
ইরা বলতে শুরু করল, “গত পরশু সন্ধ্যায় আমি বাইরে তাকিয়ে ফুলের বাগানটা দেখছিলাম। তখনই হঠাৎ শান্ত সাহেবকে এই দিকে হাঁটতে দেখতে পাই। ওনাকে হাঁটতে দেখে জানালা থেকে হাতের ইশারায় ডাকি আমি। জানালার সামনে আসার পর দুজনে পরিচিত হই। আসলে এর আগের দিন বিকেলে, উনার সাথে একটু খারাপ ব্যবহার করেছি বলে বেশ খারাপ লাগছিল আমার মনে মনে। তাই ডেকে সরি বলি। তারপর কথায় কথায় আমার মাথা ব্যথার কথা বলেছিলাম উনাকে। গত কয়দিন ধরে বেশ মাথা ব্যথা করছিল আমার। উনি বললেন— কোনো চিন্তা না নিয়ে, একদম ফ্রেশ মনে একটা ঘুম দিন। একবার ভালোমতো ঘুম হলে আর মাথা ব্যথা করবে বলে মনে হয় না, যদি না অন্য কোনো সমস্যা থাকে।” বলে থামলো ইরা।
“তারপর?” নীলা কৌতূহলী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল।
“তারপর বিদায় নিয়ে শান্ত সাহেব চলে যায়। আর রাতের খাবার খেয়ে আমি ভাবি, ‘আমার আসলেই ঘুম হয় না, তাই দুইটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিলে ভালো ঘুম হবে মনে হয়।’ এই চিন্তা করে দুইটা ঘুমের ট্যাবলেট খাই। তারপর এই আজকে সকালে উঠেছি। শান্ত সাহেব যে ঘুমের কথা বলেছিলেন তাই জন্য মনে হয় আনমনে তাকেই জিজ্ঞেস করেছি, ‘এ কী বুদ্ধি দিলে তুমি?’ মাঝের কিছুই মনে নেই কী করেছি কী বলেছি।” বলে থামলো ইরা।
“আপনার কাছে ঘুমের ট্যাবলেট ছিল?” তানিশা জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, ছিল।” ইরা জবাবে বলল।
“ঘুমের ট্যাবলেট তো সচরাচর কারো কাছে থাকে না। আপনি কী অসুস্থ?” জারা জিজ্ঞেস করল।
“না, আত্মহত্যা করার জন্য কিনেছিলাম।” ইরা বেশ স্বাভাবিক ভাবেই কথাটা বলল।
“কী?” হতচকিত হয়ে শান্ত বলে উঠলো।
“আমি আগেই বলেছিলাম, ওর মধ্যে এরকম চিন্তা আছে।” রবি জারার দিকে তাকিয়ে বলল কথাটা।
“এসব চিন্তা করছিলেন কেন? জীবন কি এতই সস্তা?” নীলা জিজ্ঞেস করল।
“কী হয়েছে আপনার সাথে বলেন তো?” শান্ত জিজ্ঞেস করল।
“কিছুদিন আগে, আমার খালাতো ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করে বাবা। অস্ট্রেলিয়া থেকে আসলেই বিয়ে করাবে ঠিক করেছিল। বিয়েতে আমার মত নেই জানার পরেও বাবা আমার কথা শুনতে রাজি নয়। তাই বাধ্য হয়েই বাসা ছেড়ে চলে আসি। মাঝে বাবার সাথে কথা বলতে কল দিয়েছিলাম। ‘আমার কোনো মেয়ে নেই’ বাবা সাফ সাফ এই কথা জানিয়ে দিলো আমায়। তাই আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় এসেছিল।” বলে দম নিল ইরা।
“এজন্য আত্মহত্যা করতে হবে? বোকা মেয়ে।” মাহির বলল।
“আচ্ছা, আপনি টাকা পেলেন কোথায়? এখানেই তো আছেন বেশ কয়দিন, এক সপ্তাহ প্রায়।” রবি জিজ্ঞেস করল।
“আমার একটা পেইজ আছে। অনলাইনে হাতে আঁকা শাড়ি বিক্রি করি আমি। এটা আমার শখ। রং তুলি আর কাপড় নিয়েই আমার ছোট্ট দুনিয়া।” ইরা জবাবে বলল।
“আপনার বাবা কি আপনাকে খুঁজছে?” জারা জিজ্ঞেস করল।
“নাহ, বাবা তো আমাকে মেয়ে স্বীকার করতেই নারাজ। কিন্তু আমার মামা খুঁজছে। সে সিআইডি অফিসার। এইজন্যই বাইরে বের হই না।” ইরা বলল।
“অনেক দখল গেল আপনার উপর দিয়ে। বাইরে হাঁটতে বের হইয়েন, ভালো লাগবে। দরকার হলে ছাদে গিয়ে বসবেন। তাও তো বাহিরের বাতাস লাগবে শরীরে।” শান্ত বলল।