শান্ত বলতে শুরু করল, “তোমাদেরকে তো বললামই যে বেশিরভাগ সময় আমি আর রবিই ফল পেড়ে আনতাম অন্যের গাছ থেকে। তো একবার হয়েছে কী…, এই নিয়ে আমি বেশ বিগড়ে যাই। যে সবসময় শুধু আমরাই সব করি আমরাই ফল পাড়ি, আমরাই চুরি করি মাহির তো কিছুই পারে না। ও শুধু খেতে পারে। এইটা শুনে মাহির আমাদের সাথে চ্যালেঞ্জ নেয় যে সে আলিফদের শসা ক্ষেত থেকে কালকে শসা চুরি করে খাওয়াবে। যেই কথা সেই কাজ, সকালে স্কুল খোলার বেশ কিছুক্ষণ আগেই আমরা স্কুলে পৌঁছে যাই। পৌঁছে আলিফদের শসা ক্ষেতের দিকে যাই। ক্ষেতটাতে যেতে স্কুল থেকে মাত্র ৭ মিনিট লাগতো। কিছুক্ষণের মধ্যেই শসা ক্ষেতের কাছে চলে যাই আমরা। আমরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে মাহিরকে শসা পাড়তে যেতে বলি। মাহির বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে যেই না দুইটা শসা পেড়ে তিন নম্বর শসায় হাত দিল তখনই ক্ষেতের অপর পাশ থেকে আওয়াজ আসে, “এই কে রে ওইখানে?” এইটা শুনে মাহির দিতে যায় দৌড়। দৌড় দিতে গিয়ে পাশের বেড়ার একটা বাঁশের সাথে লেগে ধপাস করে পড়ে। আর এই শব্দ শুনে ওইদিকে আলিফের বাবা আরো জোরে দৌড়ে আসতে থাকে মাহিরকে পাকড়াও করবে বলে। আচমকা ঘটে যাওয়া এইসব কাহিনিতে হতভম্ব হয়ে যায় মাহির। তারপর তাড়াতাড়ি উঠে এমন দৌড় লাগায়, যেন পেছনে পাগলা কুকুরের পাল তাড়া করেছে। আমরাও দৌড় লাগাই, এক দৌড়ে ৭ মিনিটের পথ ২ মিনিটে অতিক্রম করে সোজা স্কুলে। এরই মধ্যে আলিফের বাবা চলে গিয়েছিল পেছন থেকে। স্কুলে পৌঁছে মাহির বলে— এই একদিন আমি চুরি করতে গেয়েছিলাম, আর আজকেই তাড়া খেতে হল।” এই বলে থামল শান্ত।
সবকিছু শুনে আকিফের তখন হেসে লুটোপুটি খাওয়ার অবস্থা। তানিশা ও নিজের জামাইয়ের কুকীর্তি শুনে বেশ হাসল।
“কোনো শসা কি নিয়ে আসতে পেরেছিলেন দুলাভাই?” আকিফ রসিকতা করে প্রশ্ন করল।
“কোনোমতে প্রাণ নিয়ে দৌড়ে এসেছিলাম। আবার শসা…” মাহির জবাবে বলল।
এই কথা শুনে আবারও একরাশ হাসল সবাই। হাসতে হাসতে প্রায় সবার পেট ব্যথার জোগাড়।
ইতিমধ্যেই গাড়ি এসে দাঁড়াল মাহিরদের বাসার নিচে। ব্যাগ-পত্র সব নিয়ে বাসার তৃতীয় তলায় উঠে গেল সবাই। মাহিরের বাবা মা তিন তলাতেই নিয়েছিল বাসা। ওঠে সবাই সবার সাথে কুশল বিনিময় করল। শান্ত নিজেও মাহিরের মা বাবা আর বোনের সাথে কুশল বিনিময় করল। কিছুক্ষণ বসেই সে বলল, “আমি তাহলে আসি আজকে, আমার অফিসে যেতে হবে রে মাহির।”
“আজকেও অফিস করবি?” মাহির জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, নাহলে যখন রবির ওইখানে যাওয়ার সময় আসবে, তখন ছুটি ম্যানেজ করা কঠিন হবে।” শান্ত প্রত্যুত্তরে বলল।
“আরে রবিকে তো বলাই হলো না পৌঁছে গেছি।” মাহির বলল।
“গাড়িতে থাকতেই আমি মেসেজ করে বলে দিয়েছি।” শান্ত জানাল।
“আচ্ছা, তাহলে কবে যাওয়া যায় ওর ওইখানে?” মাহির প্রশ্ন করল।
“সামনের বৃহস্পতিবারে গেলে আমার জন্য ভালো হয়। এর আগে হাতের দুইটা প্রজেক্ট শেষ করতে হবে।” শান্ত জবাবে বলল।
“আচ্ছা, আমরা বৃহস্পতিবারই রওনা হবো তাহলে…” মাহির বলল।
“ভাবির কোন সমস্যা আছে কি না জিজ্ঞেস করে নে।” তানিশার দিকে তাকিয়ে শান্ত বলল।
“না ভাই আমার কোন সমস্যা নেই। আমি আরো এক্সাইটেড এই ভ্রমণ নিয়ে।” তানিশা পাশ থেকে বলল।
“তাহলে ওই কথাই রইলো, বৃহস্পতিবার সকাল সকাল আমার এইখান থেকে রওনা হবো।” মাহির বলল।
“আচ্ছা, আমি বুধবার অফিস শেষ করে চলে আসবো তোদের বাসায়। আর সকালে বেরিয়ে পড়ব।” শান্ত বলল।
“হ্যাঁ, ওইটাই ভালো হবে।” মাহির সম্মতি দিয়ে বলল।
সব কথা শেষ করে বিদায় নিয়ে চলে যেতে উঠলো শান্ত। তৎক্ষণাৎ পেছন থেকে মাহিরের ছোট বোন নীলার ডাক ভেসে আসল, “শান্ত ভাইয়া, ও শান্ত ভাইয়া।”
ডাক শুনে পেছনে তাকিয়ে সাইফ দেখলো নীলা এসে হাজির। সে বলছে, “আমিও আপনাদের সাথে ঘুরতে যাবো কিন্তু ভাইয়া আমাকে নিতে রাজি হচ্ছে না। আমার নাকি পড়াশুনার ক্ষতি হয়ে যাবে। এই চার পাঁচ দিনে কি এমন হবে। আপনি একটু বলেন না ভাইয়াকে যাতে আমাকে যেতে দেয়।”
“কিরে মাহির, আমরা তো আর অনেক দিনের জন্য যাচ্ছি না। ওই বড়োজোর চার থেকে পাঁচ দিন। ও আমাদের সাথে গেলে এই চার পাঁচ দিনে পড়াশুনায় তেমন জোয়ার ভাটা হবে না, নীলাকে নিয়েই চল। সবাই মিলে বেশ মজাই হবে।” শান্ত বলল।
“না না, ওকে নেওয়া যাবে না। এমনি পড়াশুনার যেই অবস্থা শুনেছি।” মাহির নীলার দিকে তাকিয়ে বলল।
এই কথা শুনে শান্ত নীলাকে আশ্বস্ত করে বলল “তোমার মাহিরের কথায় কান দিতে হবে না। তুমি তো আমারও বোন, তুমি আমার সাথেই যাবে। রেডি করে নিও ব্যাগ-পত্র। আর আমিতো বুধবার আসছিই তোমাদের এখানে, সমস্যা নেই।”
“এতো লাই দিস না, পরে মাথায় উঠে নাচবে।” বোনের দিকে তাকিয়ে একটু খোঁচা মেরে কথাটা বলল মাহির।
“নাচুক। আচ্ছা, আমি এখন যাই।” শান্ত বলল।
“আচ্ছা, যা।” মাহির বিদায় দিল।
মাহিরের ছোট বোন নীলা। কয়েক মাস আগে সে উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছে।
দেখতে দেখতে বুধবার এসে গেল। সকালেই ব্যাগ-পত্র সব গুছিয়ে রেখে তারপর অফিসে যায় শান্ত। তার ভিতরেও বেশ উত্তেজনা বিরাজ করছে এই ভ্রমণ নিয়ে। সারাদিন অফিস করে বিকেলে এসে বাসা থেকে ব্যাগ-পত্র আর তার চিরচেনা গিটার নিয়ে মাহিরের বাসায় পৌঁছায় সে। বাসার দরজায় এসে কলিং বেল দিতেই দরজা খুলে তানিশা। খুলে হাতে গিটার দেখার পর তানিশা বলে, “বাহ, শান্ত ভাই। বেশ ভালো কাজ করেছেন, গিটারটা নিয়ে এসে। বোরিং লাগলে গান গেয়ে মাতিয়ে তুলবেন সবাইকে।”
“হ্যাঁ, ভাবি। এই গিটার ছাড়া আমার দিন কাটতে চায় না।” এটা বলতে বলতেই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল শান্ত।
শান্তর কণ্ঠ কানে যেতেই রুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে মাহির বলল, “কিরে, চলে আসছিস?”
“হ্যাঁ, চলে আসলাম। তোদের ব্যাগ পত্র গুছিয়ে ফেলেছিস তো?” শান্ত জিজ্ঞেস করল।
“মোটামুটি গোছানো শেষ। তানিশার কিছু কাপড় চোপড় এখনো ব্যাগে ঢোকানো বাকি। হয়ে যাবে ওইসবও।” মাহির উত্তর দিল।
এইভাবে কথা বলতে বলতেই সন্ধ্যা নেমে আসলো। নীলা আর তানিশা সবার জন্য নাস্তা নিয়ে আসলো।
“বাহ! দুধপুলিটা তো দারুণ খেতে হয়েছে। কে বানিয়েছে?” বেশ হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় শান্ত জিজ্ঞেস করল।
“ভাবি বানিয়েছে। ভাবি পিঠা তৈরিতে অনেক পিঠাওয়ালিকেও হার মানিয়ে দেবে। এক কথায় অসাধারণ তার পিঠা তৈরির হাত।” মুখে পিঠা রেখেই নীলা বলল।
“তাইতো দেখছি। থ্যাংক ইয়ু ভাবি, এমন স্বাদের পিঠা খাওয়ানোর জন্য।” শান্ত মৃদু হেসে বলল।
হাসি মাখা মুখে তানিশা বলল, “ওয়েলকাম ভাই।”
“মাহির, এইবার বলতো কেন সাত মাস তোর কোনো খোজ খবর পাই নাই?” শান্ত জিজ্ঞেস করল।
“সে অনেক কথা…” মাহির উত্তর দিল।
“শর্ট করে বলে ফেল।” শান্ত বলল।