“আমরা কি এখন এই গুলোই করবো? কোথায় যাবো কালকে ওইটা আগে ঠিক করা দরকার।” শান্ত বলল।
“চা বাগানে আগে যাবি নাকি রিসোর্টে ঘুরবি আগে। এইটা বল।” রবি জিজ্ঞেস করল।
“চা বাগানেই আগে যাই। কি বলো নীলা?” তানিশা জিজ্ঞেস করল নীলাকে।
“হ্যাঁ, চা বাগানেই আগে।” নীলা উত্তর দিলো।
“তাহলে কালকে চা বাগান আর পরশু দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টে যাবো।” রবি বলল।
“এটাই ভালো হবে।” বলে মাথা নাড়ল মাহির।
শান্তর কণ্ঠে গানের মাধ্যমে সন্ধ্যার আড্ডা শেষ হলো। আড্ডা শেষে সবাই নিজ নিজ রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ পরে রাতের খাবার শেষ করল। খাবারের টেবিলে তেমন একটা বিশেষ কিছু আলোচনা হয়নি। শুধু ঠিক হলো প্রথমে বৃন্দাবন ও পরে মধুপুর চা বাগানে যাবে সবাই।
পরদিন সকালের নাস্তা শেষে সবাই বের হয় চা বাগানের উদ্দেশ্যে। দিনটা বেশ চমৎকার ছিল, তেমন রোদ নেই বেশ ঠান্ডা গা শীতল করা একটা আবহাওয়া।
গাড়ি থেকে চা বাগানে নামতেই নীলা বলল, “চা বাগান এত সুন্দর? পাহাড়ের গা বেয়ে যেন সবুজ মখমলের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে প্রকৃতি।”
“এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কী কোনো উপমা চলে? মনে হচ্ছে, প্রকৃতি যেন নিজের সমস্ত সৌন্দর্য এই পাহাড় আর চা-বাগানের বুকে ঢেলে দিয়েছে।” হৃদয় জুড়ানো দৃষ্টি নিয়ে শান্ত বলল।
“ইশ! আমাদের বাসাটা যদি এখানে হতো তবে বৃষ্টি বিলাসের প্রকৃত আনন্দ পেতাম।” তানিশা বলল।
পাহাড় প্রকৃতি আর চায়ের সাম্রাজ্য বৃন্দাবন চা বাগানে বেশ কিছু ছবি তুলে মধুপুর চা বাগানে গেল সবাই। পথিমধ্যে শান্তর গান আর গিটারের সুরে সতেজতা হারায় নি কেউ। এই বাগানটাও বেশ পছন্দ হয় সবার। এখানেও স্মৃতিস্বরূপ বেশ কিছু ছবি তুলে রিসোর্টে ফিরে আসে সবাই।
আসতে আসতে তখন দুপুর প্রায় শেষের দিকে, বিকেল নামতে শুরু করল। শুক্রবার হওয়ায় একটি মসজিদের সামনে গাড়ি থামিয়ে নামাজও আদায় করেছিল শান্ত, মাহির, রবি আর গাড়ির ড্রাইভার। মাঝে একটা রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়ার ঝামেলাটা শেষ করে ফেলেছিল সবাই।
সারাদিন ঘোরাঘুরি আর পাহাড়ি রাস্তায় হেঁটে সবাই বেশ ক্লান্ত। সন্ধ্যা বেলায় সবার জন্য ডাক আসলো যাতে সবাই ছাদে যায়। কিন্তু এ কী? সবাই নিজ নিজ রুমে থাকলেও শান্ত তার রুমে নেই। ফোন রিং হলেও ধরছে না সে। তেমন চিন্তা না করে সবাই আড্ডা শুরু করে দিলো। বেশ কিছুক্ষণ পর আড্ডায় যোগ দিলো শান্ত।
“তুই কোথায় ছিলি? রুমে নেই, ফোন দিলে পাচ্ছিলাম না আবার মেসেজেরও কোনো রিপ্লাই দিস নি।” মাহির জিজ্ঞেস করল।
“রিসোর্টেই ছিলাম। আশপাশটা ভালো করে দেখতে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যার পর এইখানকার পরিবেশ এত সুন্দর হয় যার তুলনা শুধু একজনের সাথেই দেওয়া চলে। যদিও সে এই পরিবেশের চেয়েও একটু বেশিই আকর্ষণীয়।” একটু আনমনে কথা গুলো বলল শান্ত।
“কে? কার কথা বলছেন ভাই?” তানিশা জিজ্ঞেস করল।
“কই না তো। কিছু না।” জবাবে শান্ত বলল।
“তুই যে কি বলছিস তুই নিজেই বুঝছিস না।” রবি শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল।
“কিছু হয়েছে?” মাহির জিজ্ঞেস করল।
“আরে না না, তেমন কিছু না। চা বাগানের সৌন্দর্য বেশ মনোমুগ্ধকর, ওইটাই ভাবছিলাম।” এই বলে পাশ কাটিয়ে গেল শান্ত।
আড্ডা শেষে রাতের খাবার একটু আগেই শেষ করল সবাই।
আজ শনিবার। সকালটা বেশ ফুরফুরে। প্রকৃতির দেওয়া বাতাস যেন গা ছুঁয়ে দিয়ে নিজের কোমলতার জাহির করছে। আজকে সবার দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টে যাওয়ার কথা। সকালের নাস্তা শেষে সবাই বেরিয়ে পড়লো, আরেকটা স্মৃতিময় দিনের সূচনা করতে। “রুম ঝুম ঝুম ঝুম রুম ঝুম ঝুম” শান্তর কণ্ঠে এই বিখ্যাত নজরুল গীতি শুনতে শুনতে বেশ সানন্দেই সবাই রিসোর্টে পৌঁছায়। এই নজরুল গীতিটি শান্ত বেশ সুন্দর গায়। আর এটি তার ভীষণ পছন্দের একটি নজরুল গীতি।
রিসোর্টে প্রবেশ করে সুবিশাল প্রাসাদের মতো নান্দনিক ভবনটি মুগ্ধ করে সবার মন। প্রথমেই রিসেপশনে গিয়ে রিসোর্টটি ঘুরে দেখার জন্য সব কাজ সেরে আসে রবি ও মাহির। দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টটি ১৫০ একরেরও বেশি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। প্রথমে সবাই ব্যাটারি চালিত শাটল বাসে করে রিসোর্টটি ঘোরা শুরু করে। পরে হেলিপ্যাডের কাছে এসে পাহাড় প্রকৃতি আর নীল আকাশের মেলবন্ধন দেখতে শাটল বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করে সবাই।
হাঁটতে হাঁটতে নীলা বলে উঠলো, “এই ভ্রমণের কথা সারাজীবন ধরে মনে থাকবে আমার। কী নেই এখানে? প্রকৃতি যেন নিজের সবকিছু উজাড় করে সাজিয়েছে এই হবিগঞ্জকে।”
“এখনো তো সিলেট বিভাগের একটা কোনায় আছি আমরা, সমস্ত সিলেট যদি দেখতে পারতে তাহলে এখানেই থেকে যেতে চাইতে।” রবি বলল।
“আমার তো এখনি এইখানে থেকে যেতে ইচ্ছে করছে।” জবাবে নীলা বলল।
হেলিপ্যাডের চারপাশটা ঘুরে, রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে সবাই। পাহাড়ি গাছ গাছালি আর পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে রিসোর্টটি। হাঁটতে হাঁটতে কিডস প্লে গ্রাউন্ডের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায় সবাই। বাচ্চাদের খেলার জন্য বিভিন্ন আয়োজন দেখে তানিশা বলল, “এসব দেখে তো ছোট বেলায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে।”
প্লে গ্রাউন্ড থেকে একটু সামনে এগিয়ে মেইজ গার্ডেনে ঢুকে সবাই। মেইজ গার্ডেন হলো— গাছের বেড়া, ঝোপ বা দেয়াল দিয়ে গোলকধাঁধার মতো তৈরি করা পথ। এখানে এসে সবাই যার যার মতো করে হালকা দৌড়ে গোলকধাঁধার শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। অনেক বেশি বড়ো না হওয়ায় সবাই সফলভাবে শেষপ্রান্তে পৌঁছায়।
এসব করতে করতে দুপুরের খাবারের সময় হয়ে আসে। রিসোর্টের রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেতে বসলো সবাই। বসার খানিকটা সময় পরে রবির ফোনে জায়েদের কল আসে। ফোন ধরার পর ওপাশ থেকে জায়েদ বলল, “একটা বিপদ হয়ে গেছে, স্যার।”
“বিপদ? কি বিপদ?” রবি জিজ্ঞেস করল।
“১০৪ নম্বর রুমের মেয়েটা সকালে খাবার অর্ডার করেনি। খাবারের জন্য জন্য রুমের দরজায় টোকা দিলেও কোনো সাড়া শব্দ পাইনি। ভাবলাম ঘুমাচ্ছে। আগেও একদিন সকালে খাবার অর্ডার করেনি; পরে ডাকাডাকি করায় বেশ ধমক দিয়েছিল। তাই আজকেও খুব বেশি ডাকাডাকিও করি নি। এখন আবার ডাকলেও কোনো সাড়া শব্দ নেই। কিছু বুঝে উঠতে পারছি না, কী হয়েছে। আপনি যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি চলে আসুন। আরো দেরি করলে বিপদ হতে পারে।” এই বলে থামল জায়েদ।
“আমি আগেই বুঝেছিলাম এই মেয়ে একটা কাণ্ড ঘটিয়ে এসেছে বা ঘটাবে। নাহলে মানুষ কী সারাদিন রুমে বসে থাকে?” রবি বেশ চিন্তিত হয়ে বলল।
“এখন কী করবো স্যার?” জায়েদ জিজ্ঞেস করল।
“দরজা ধাক্কা দিতে থাকো, আমরা আসছি। যদি দরজা না খুলে তবে ভাঙতে হবে দরজা।” এই বলে ফোন রাখলো রবি।