এ কী বুদ্ধি দিলে তুমি?

পর্ব - ১

🟢

একটি সফট ইনস্ট্রুমেন্টালের শব্দে ঘুম ভাঙলো শান্তর। ফোনের দিকে তাকিয়ে মাহির নামটা ঝাপসা ঝাপসা দেখেই ফোন ধরলো সে। তারপর তাদের ফোনালাপ—

“হ্যালো, মাহিন বল।” শান্ত বেশ অস্পষ্ট ঘুমকাতুরে একটা কণ্ঠে বলল।

“কেমন আছিস শান্ত?” ফোনের অপর পাশ থেকে প্রশ্ন এল।

“এই সুন্দর বিকেলে সুখী মানুষের মতো কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছিলাম। ফোন করে দিলি আমার ঘুমটা ভাঙিয়ে, এখন তুই-ই বল কেমন আছি।” শান্ত জবাবে বলল।

“বেশ সুখেই আছিস তাহলে, আচ্ছা আঙ্কেল-আন্টি কেমন আছে রে? আর ভাবি কেমন আছে?” মাহির জিজ্ঞেস করল।

এমন প্রশ্ন শুনে উঠে বসে ফোনের দিকে নজর দিলো শান্ত। ফোনটা দেখা মাত্রই বেশ চওড়া কিন্তু নিঃশব্দ একটা হাসি দিয়ে সে বলল, “আরে মাহির, তুই কল দিয়েছিস। আমি ভাবছিলাম আমার খালাতো ভাই মাহিনের কল।”

“না না, মাহিন না। আমি মাহির।” ফোনের অপর পাশ থেকে মাহির বলল।

“হ্যাঁ, এখন তো চিনতে পারছি নাম দেখেই। তখন ঝাপসা চোখে মাহিরকে মাহিন দেখেছিলাম” শান্ত বেশ খুশি মনে বলল।

“তোর এই বেশি ঘুমানোর অভ্যাসটা এখনো গেলো না?” মাহির ব্যঙ্গ করে জিজ্ঞেস করল।

“আচ্ছা এসব বাদ দে। কেমন আছিস তুই? কতদিন পরে তোর সাথে কথা হচ্ছে। সেই সাত মাস আগে কলে কথা হয়েছিল, তারপর তো ফোন দিয়েও আর পাইনি তোকে। ফেসবুকেও তো ছিলি না।” শান্ত কৌতূহল নিয়ে বলল।

“আমি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আমার এই সিমটায় সমস্যা ছিল লাস্ট কয়েক মাস। বাংলাদেশি সিম তো, পরে বেশ ঝক্কি ঝামেলা করেই ঠিক করতে হলো।” মাহিরের পাশ থেকে জবাব এল।

“বুঝতে পারছি, তার পরেও সাত মাস কী কম সময়? তুই তো অন্যভাবে যোগাযোগ করতে পারতি।” শান্ত জিজ্ঞেস করল।

“সাত মাস কম সময় না। শুধু সিমের ঝামেলার কারণে না, অন্য একটা কারণ ও আছে। আমি তোকে সব বলবো। কিছু দিন সবুর কর।” মাহির বলল।

“আচ্ছা, ভাবি কেমন আছে?” শান্ত জিজ্ঞেস করল।

“তানিশা ভালো আছে। তুই বললি না ভাবি কেমন আছে? আঙ্কেল-আন্টি কেমন আছে?” উত্তর দিয়ে মাহির জিজ্ঞেস করল।

“আব্বু-আম্মু ভালো আছে। কিন্তু তুই ভাবি-ভাবি করছিস কেন? আমি কি বিয়ে করেছি নাকি?” শান্ত অনুসন্ধিৎসু ভঙ্গিতে বলল।

“এখনো বিয়ে করিস নি? লাস্ট যেদিন কথা হলো তখন তো বলছিলি মেয়ে দেখা হচ্ছে।” মাহির বলল।

বিজ্ঞাপন

“হ্যাঁ, তা দেখা হচ্ছে এখনো। আমার পছন্দ হয় না, তাই বিয়ে করিনি। আর তোকে ফোনে পাইনি কতদিন, তোকে ছাড়া আমি বিয়ে করবো নাকি?” শান্ত একটু হতাশ হয়ে বলল।

“আমরা দেশে আসছি সামনের রবিবার। এইবার দেশে এসে তোকে বিয়ে করিয়েই ফিরবো, তার আগে নয়।” মাহির বলল।

“আচ্ছা আগে দেশে আয়, তারপর বিয়ে নিয়ে ভাবা যাবে।” শান্ত বলল।

“আর দেশে এসে আরেকটা কাজ আছে…” মাহির বলল।

“কী কাজ?” শান্ত কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“রবির রিসোর্টের ব্যাপারে তুই তো সবই জানিস।” মাহির বলল।

“হ্যাঁ, জানি তো।” জবাবে শান্ত বলল।

“গতকালকে ওর সাথে কথা হচ্ছিল। তো রবি খুব করে ধরেছে আমাকে, এইবার দেশে ফিরলে যেন অবশ্যই ওর রিসোর্টে যাই, তানিশাকে আর তোকে নিয়ে।” মাহির বলল।

“আচ্ছা, যাওয়া যায়। অনেক দিন ঘুরা হয়না, আগে তুই দেশে আয়। সব হবে।” শান্ত বলল।

“আচ্ছা, আজকে রাখি। দেখা হচ্ছে দেশে এসেই।” মাহির বলল।

“এয়ারপোর্টেই দেখা হচ্ছে, আমি আসবো তোদেরকে নিতে এয়ারপোর্টে।” বলে জানাল শান্ত।

“আচ্ছা আসিস।” সম্মতি দিয়ে মাহির বলল।

“আচ্ছা তাহলে, রাখ।” শান্ত এটা বলার পর ফোন কাটলো মাহির।

কৈশোরের প্রথম প্রহরে, ষষ্ঠ শ্রেণির এক শ্রেণিকক্ষে জন্ম নিয়েছিল শান্ত, মাহির ও রবি এই তিনজনের বন্ধুত্ব। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত একই সাথে পড়াশুনা করে তিনজন। পরবর্তীতে শান্ত ও রবি একই সাথে ভর্তি হয় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। নিজেদের প্যাশন ফলো করে শান্ত সিএসই ডিপার্টমেন্টে ও রবি ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে ভর্তি হয়। আর মাহির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়। তাদের শিকড় একই মাটিতে গাঁথা— কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নে। তবে একই ইউনিয়নের সন্তান হলেও তাদের বেড়ে ওঠা তিনটি ভিন্ন গ্রামের আঙিনায়। শান্তর বাড়ি গোপালপুরে, মাহিরের হোসেনপুরে, আর রবির গজারিয়ায়।

তিন বন্ধুর মধ্যে শান্ত সাহেব দেখতে সবচেয়ে সুদর্শন, চেহারার গঠন বেশ সুন্দর ও ফর্সা। ‘সাহেব’ শব্দটি নামের শেষে কেন যুক্ত মনে প্রশ্ন জাগেনি? মূলত তার সুদর্শন গঠন ও ফর্সা চেহারার জন্য সবাই তাকে শান্ত সাহেব বলে ডাকে অনেক সময়। শান্ত ঢাকায় একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে প্রোগ্রামার হিসেবে কর্মরত এবং তার পরিবার ও তার সাথেই থাকে। শান্ত বেশ ভালো গিটার বাজায়, এটা তার নিত্য অভ্যাসের মধ্যেই পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই প্রেম করে বিয়ে করে মাহির ও তানিশা। একই ডিপার্টমেন্টে পড়তো দুইজন। পরবর্তীতে একই সঙ্গে স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ড পড়াশুনা করতে যায় তারা। পরে ওইখানেই নাগরিকত্ব পেয়ে বসবাস শুরু করে।

আর রবির ছোটোবেলা থেকেই নিজের একটি রিসোর্ট দেওয়ার স্বপ্ন। এই বলে বলে সে শান্ত ও মাহিরের মাথা ব্যথা ধরিয়ে দিত ছোটোবেলায়। অবশেষে গত বছর সে তার স্বপ্ন পূরণ করে একটি সুন্দর রিসোর্ট দেয় বাংলাদেশের বৃহত্তম ও সুন্দর গ্রাম বাহুবলে। বাহুবলের পুটিজুরিতে। রবি পারিবারিকভাবে গত বছর তাসনিম জারার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বর্তমানে রবি ও জারা তাদের রিসোর্টটি দেখাশোনায় ব্যস্ত জীবন পার করছে।

আজ শনিবার, রাত ১০ টায় ইংল্যান্ডের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে মাহির ও তানিশার ফ্লাইট বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে। ফ্লাইট টাইম ৯ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট হওয়ায় বাংলাদেশ পৌঁছাতে তাদের সকাল হয়ে যাবে। শান্ত রাতে তার ফোনে ৪টা অ্যালার্ম সেট করে; যাতে সকাল ৬টার আগেই ঘুম ভাঙে আর ৭:৩০টার মধ্যেই সে এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে পারে।

বিজ্ঞাপন
এ কী বুদ্ধি দিলে তুমি? গল্পটি মীর মোঃ তানজিরুল ইসলাম-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও ফ্যামিলি ড্রামা