এসব কথোপকথন আরম্ভ হওয়ার পর তানিশা নীলাকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। যাওয়ার সময় তানিশার মুখটা একটু ভার ভার লাগলো শান্তর কাছে।
“আচ্ছা শোন…” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহির বলল।
“বল।” শান্ত বলল।
“তোর সাথে সবশেষ কথা হওয়ার মোটামুটি এক সপ্তাহ পরে ডাক্তার মারফত জানতে পারি তানিশা কনসিভ করেছে। বেশ কিছুদিন যাবৎ একটু অসুস্থ থাকায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর এই নিউজ দিলো ডাক্তার। খবরটা শুনে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায় তানিশা আর আমার মনে। আমি প্রথম বারের মতো বাবা ডাক শুনতে পাবো এই ভেবে অনেক ভালো কাটছিল দিনগুলো। কিন্তু কিছু দিন পরেই তানিশা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে জানতে পারি ওর অ্যান্টিফসফোলিপিড সিনড্রোম হয়েছে, অনেক খারাপ অবস্থা। এই রোগের ছোবলে আমার বাচ্চাকে বাঁচাতে পারিনি অবশেষে। বেশ কিছুদিন যুদ্ধের পর অবশেষে সে মারা গিয়েছিল। তারপর তানিশার একটা অপারেশন ও হয়েছিল। এসব হওয়ার পর প্রথম প্রথম কথাই বলতো না তানিশা। পরে আস্তে আস্তে অনেক কষ্টে ঠিক করেছি। ওই সময়টার মতো খারাপ সময় আমার জীবনে আগে আর আসেনি।” বলে থামল মাহির।
এসব শুনে শান্ত নিজের নামের মান রক্ষা করে অনেক শান্ত হয়েই বসেছিল। চোখের কোণে হালকা পানি ও জমেছিল তার।
“আর ওই টাইমেই সিমটাতে সমস্যা হয়। ওই সিমেই তোদের নম্বর ছিল। এত সব হয়ে যাওয়ায় তখন আর নিজে থেকে কারো সাথে কথা বলতেও ইচ্ছে হয়নি।” আবার ও বলল মাহির।
“বুঝলাম মাহির। আমি কী বলে সান্ত্বনা দেবো বুঝে উঠতে পারছি না। আমি নিজেই মেনে নিতে পারছি না বিষয়টা।”
“কিছু বলতে হবে না তোর। এখন আর আগের মতো কষ্ট হয় না।” এই বলে উঠে রুমে চলে গেল মাহির। শান্ত নিজেও গেস্ট রুমে চলে গেল।
রাতে খাবারের টেবিলেও তেমন কথা হয়নি। সবাই নিশ্চুপ ভাবেই খেয়ে উঠল। রুমে যাওয়ার সময় মাহির বলে গেল, “সকাল সকাল উঠে পড়িস শান্ত, নাস্তা খেয়েই বেরিয়ে পড়বো।”
নাস্তা খেয়ে সকাল ৮টার দিকে রবিকে ফোনে বেরোনোর কথা বলে, সবাই রওনা হয় আগে থেকেই ঠিক করে রাখা গাড়িতে। ততক্ষণে সবাই চনমনে হয়ে গেছে। গতকালকে মাহিরের বাচ্চার ব্যাপারে বলার পর সবাই যেমন একটু নেতিয়ে গিয়েছিল, সেই ভাবটা এখন আর নেই। গাড়ি চলতে শুরু করল গন্তব্যের দিকে। গাড়ির সামনের সিটে বসল শান্ত; পেছনে মাহির, তানিশা আর নীলা বসেছে। গাড়িতে বসে সবাই একটু নিরব হয়েই ছিল প্রথমে। একপর্যায়ে নীরবতা ভেঙে শান্ত বলল, “আকিফকেও সাথে নিয়ে নিতি আমাদের সাথে, তাহলে আরো ভালো হতো।”
“ওর পড়াশুনায় বেশ চাপ চলছে। কয়েকদিন পর সেমিস্টার ফাইনাল। ও সোমবারেই চলে গিয়েছিল, নাহলে তো নিয়েই আসতাম।” এতক্ষণ চুপ থাকা মাহির বলল।
“ভাইয়া, একটা গান ছাড়েন তো স্পিকারে।” নীলা বলল শান্তকে।
“গান স্পিকারে কেন? স্পিকারে গান শুনাতেই কি শান্ত ভাই সাথে করে গিটারটা এনেছে?” তানিশা বলল।
কথা বলতে বলতেই বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টি শুরু হওয়ায় পর গিটারটা হাতে তুলে নিয়ে শান্ত গাইতে শুরু করল, “এই মেঘলা, দিনে একলা, ঘরে থাকে না তো মন। কাছে যাবো, কবে পাবো, ওগো তোমার নিমন্ত্রণ।”
গানটা গেয়ে শেষ করতেই গাড়ির পেছন থেকে করতালির আওয়াজ আসলো। নীলা করতালি দিচ্ছে। আর তানিশা বলল, “বাহ, বৃষ্টি ও নামলো আর শান্ত ভাই গান ও ধরলো। বেশ সুন্দর গলা তো আপনার শান্ত ভাই।”
অনেক রাস্তা পাড়ি দিয়ে গাড়ি এগোতে এগোতে যখন মাধবপুরে ঢুকল; তখন শান্ত ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সিলেট বিভাগের প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকলাম। সামনে চা বাগান ও রাবার বাগান আছে। গাড়িটা এখানে একটু ধীরে ধীরে নিয়েন ভাই।”
“আচ্ছা।” গাড়ির ড্রাইভার প্রত্যুত্তরে বলল।
চোখ জুড়ানো নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে করতে বাহুবল প্রবেশ করলো গাড়ি। আগে থেকেই দেওয়া রবির রিসোর্টের ঠিকানামত, দুপুর দুইটার কিছুটা আগে সবাই রিসোর্টে পৌঁছায় কোনো ঝামেলা ছাড়াই। গাড়ি থেকে নামতেই রিসোর্টের গেইটের উপর দিকে নজর পড়ল শান্তর। যেখানে বড়ো বড়ো কিন্তু বেশ চমৎকার একটি ডিজাইনে লিখা, “অরণ্য নীড়।”
গেইটের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা রবি ও জারার দিকে এতক্ষণে নজর পড়ল শান্তর। রবি কে দেখেই দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, “কেমন আছিস? আগে থেকে মোটা হয়ে গেছিস মনে হচ্ছে।”
“আমি ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?” জবাব দিয়ে রবি জিজ্ঞেস করলল।
“আমিও বেশ ভালোই আছি।” শান্ত জবাবে বলল।
“ভাবি আপনি কেমন আছেন?” জারার দিকে তাকিয়ে শান্ত জিজ্ঞেস করল।
“আল্লাহ অনেক ভালো রাখছে ভাই।” প্রত্যুত্তরে জারা বলল।
“ভাই, আপনার গিটারটা ফেলে গেছেন।” শান্তকে ডেকে বলল ড্রাইভার।
“আসছি…” বলে গিটার আনতে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল শান্ত।
শান্ত গিটার নিয়ে ফিরে আসতে আসতে, বাকি তিনজনও নেমে এসে কুশল বিনিময় করল রবির ও জারার সাথে। ফিরে এসে রবির দিকে তাকিয়ে মাহিরকে উদ্দেশ্য করে শান্ত বলল, “রবি আগের থেকে মোটা হয়ে গেছে, আর কিছুদিন পর ভুঁড়ি বেরিয়ে আসবে হয়ত।”
“আরে না। কই মোটা হয়েছি।” নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে রবি বলল।
“আচ্ছা, এসব কথা এখন থাক। আগে ভেতরে যাই, ফ্রেশ হই, তাঁর পরেও এসব আলাপ করা যাবে।” মাহির বলল।
“চল, ভেতরে চল।” সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে রবি বলল।
ভেতরে যেতে যেতে রিসোর্টের চারিদিকটা দেখে শান্ত বেশ মনোমুগ্ধ। সুইমিং পুল, বাচ্চাদের খেলার জায়গা, ফুলের বাগান আর বাছাই করা সুন্দর সুন্দর গাছ দেখতে দেখতে সে বলে উঠলো, “ওয়াও, বেশ সুন্দর করে সাজিয়েছিস রিসোর্টটা। একদম যে কারো পছন্দ হবে।”
“আমি আর জারা দুইজনের আইডিয়াতেই সবটার ডিজাইন হয়েছে।” প্রফুল্ল চেহারায় রবি বলল।
“এই রুমের চাবি গুলো নিয়ে আসো।” বলে হাঁক দিল জারা।
রিসেপশনে দাঁড়ানো অবস্থায় শান্ত লক্ষ্য করল পাশেই লিখা, “রবিউল হাসান— ম্যানেজার।” সবাই রবিউল কে ছোট বেলা থেকেই রবি বলে অভ্যস্ত।
ইতিমধ্যেই একজন এসে চাবি দিয়ে গেল। সবাইকে নিজ নিজ রুমে পৌঁছে দিয়ে, আধ ঘণ্টা পর দুপুরের খাবার দিবে বলে চলে আসলো রবি।