সকাল ৫:৩০ মিনিটে শান্তর ঘুম ভাঙে অ্যালার্মের শব্দের আগেই। ফোনের মধ্যে টাইম দেখে তো শান্ত হতবাক! সে মনে মনে ভাবে “সূর্য আজকে কোন দিকে উঠলো? এত সকালে কোনো শব্দ বোমার আগেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। এইটাতো পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য হওয়ার দাবি রাখে।”
ভেবে কোনো কূল কিনারা না পেয়ে ফোন থেকে অ্যালার্ম গুলো অফ করে ফ্রেশ হতে বাথরুমের দিকে এগিয়ে যায় শান্ত। ফ্রেশ হয়ে নিজ রুমে বসে এই কাকভোরেই রবিকে কল দেয় সে। রবি কল ধরার পর তাদের কথোপকথন—
“হ্যালো, কিরে কী অবস্থা রবি। কেমন আছিস?” শান্ত জিজ্ঞেস করলো।
“এইতো, রিসোর্টে আসা অচেনা আগন্তকদের সাথে বক বক করেই দিন কেটে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ভালোই আছি। তোর কী অবস্থা বল?” জবাব দিয়ে রবি জিজ্ঞেস করল।
“আমি বহাল তবিয়তেই আছি। কম্পিউটারের সাথেই রাত দিন কাটছে, কথা বলতে বলতে।” শান্ত প্রত্যুত্তরে বলল।
“বিশ্ববিদ্যালয়ে কত করে বললাম যে একটা প্রেম কর একটা প্রেম কর, আমার কথা শুনলে আজকে কম্পিউটারের সাথে কথা না বলে বউয়ের সাথে কথা বলতে পারতি।” রবি একটু ফোড়ন কেটে বলল।
“আচ্ছা ওইসব কথা ছাড়, একটু পরে মাহির আর ভাবি যে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখবে জানিস তো নাকি?” শান্ত জিজ্ঞেস বলল।
“হ্যাঁ, জানি। গতকালকে বিকেলেও কথা হয়েছে মাহিরের সাথে।” রবি প্রত্যুত্তরে জানাল।
“আমি যাবো কিছুক্ষণ পর ওদেরকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে।” শান্ত বলল।
“হ্যাঁ, মাহির এইটাও বলেছে। আমিতো পারলে বলতাম যে ডিরেক্ট এয়ারপোর্ট থেকে আমার রিসোর্টে চলে আয়, কয়েকদিন থেকে তারপর বাসায় যাবি।” রবি হালকা হেসে বলল।
“আসবো আসবো, কয়েকটা দিন পরেই আসবো।” শান্ত বলল।
“হ্যাঁ, অবশ্যই আসবি। আমাকে কে যেন ডাকছে রে সাইফ; এই এক ঝামেলা, কিছু হলেই সবাই আমাকে খুঁজে।” রবি একটু তাড়াহুড়ো করে বলল।
“হ্যাঁ, আমার ও বেরিয়ে পড়তে হবে এক্ষুনি।” শান্ত বলল।
“এখন রাখি, ওরা পৌঁছালে মেসেজ করে আমাকে জানাতে ভুলবি না কিন্তু।” রবি বলল।
“আচ্ছা, জানিয়ে দেব।” শান্ত আশ্বস্ত করে বলল।
এই বলে ফোন রেখে দিল শান্ত। ফোন রেখে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়লো সকাল ৬:৩০ টায়।
৭:৩০ মিনিটে এয়ারপোর্টে পৌঁছে ৬ নম্বর গেইটে দাঁড়ালো শান্ত। এয়ারপোর্টের একজন অফিসার বলল, এই গেইট দিয়েই বাইরে আসবে হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে আসা বিমানের সব যাত্রী। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কয়েকজনের সাথে কথা বলে সময় কাটাচ্ছে শান্ত। মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে শুনতে পেল বিমান ল্যান্ড করেছে। আরো ৩০ মিনিট লাগবেই বাইরে বের হতে। এই চিন্তা করে শান্ত পাশের দিকে চেয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো; যাতে কেউ উঠলে সাথে সাথে সিটটা দখলে নিতে পারে নিজের। কয়েক মিনিট পরেই একজন উঠে গেল, আর শান্ত তড়িঘড়ি করে ওই সিটে বসে পড়ল। বসে পাশের জনকে জিজ্ঞাসা করলো, “ভাই, আপনার কেউ আসবে?”
“হ্যাঁ, আমার বোন আর দুলাভাই আসবে।” উত্তর দেয় পাশের জন।
উত্তর দিয়ে সে ফোনে গেম খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তেমন একটা পাত্তা না পেয়ে শান্ত আর কিছু বলল না লোকটাকে। বসে বসে ২৫ মিনিট পার হওয়ার পর শুনতে পারে হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে আসা বিমানের যাত্রীরা ১ নম্বর গেইট দিয়ে বের হচ্ছে। এটা শুনে বিমানবন্দরের ওই অচেনা অফিসারকে মনে মনে কয়েকটা গালি দিয়ে দৌড়ে ১ নম্বর গেইটে যায় শান্ত। এত মানুষের ভিড়ে দৌড়ানো কী সোজা কাজ? ধাক্কা খেয়ে মাঝে একবার মাটিতে গড়াগড়ি ও খায় শান্ত। ১ নম্বর গেইটে পৌঁছে এদিক ওদিক তাকিয়ে মাহিরকে খুঁজতে থাকে শান্ত। খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ পেছন থেকে আওয়াজ আসে, “শান্ত, এই শান্ত। আরে এদিকে এদিকে। পেছনে, বা দিকে তাকা।”
মাহিরের কণ্ঠ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখে তারা বের হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্গে পাত্তা না দেওয়া ওই লোকটা। এগিয়ে মাহিরের কাছে গিয়ে প্রথমেই বুক মেলায় শান্ত।
“কিরে তুই কই ছিলি এতক্ষণ? আমাকে নিতে এসে তো এখন তোকে খুঁজে পাওয়াই দেখি মুশকিল।” মাহির বলল।
“আর বলিস না রে, এক ফাউল অফিসার বলল তোদের বিমানের সবাই নাকি ৬ নম্বর গেইট দিয়ে আসবে। আমিও সেই মতো সেখানে গিয়ে বসলাম। হঠাৎ শুনি সবাই নাকি ১ নম্বর গেইট দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। তৎক্ষণাৎ দৌড় লাগাই। দৌড়ে আসতে গিয়ে মাটিতে লুটোপুটি ও খেয়েছি একবার।” শান্ত একটু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
“আচ্ছা, বুঝেছি।” মাহির বলল।
“আসসালামুয়ালাইকুম ভাই, কেমন আছেন?” তানিশা শান্তকে উদ্দেশ্য করে বলল।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাবি। আমি ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?” শান্ত জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“এইতো ভাই, আমিও ভালো আছি। এতক্ষণ বসে থেকে একটু ক্লান্ত আরকি।” তানিশা বলল।
“আচ্ছা শোন, এটা আমার শালা আকিফ।” মাহির ওই পাত্তা না দেওয়া লোকটির দিকে ইঙ্গিত করে শান্তকে বলল।
“একটু আগেই আমার পাশে বসেছিল তোর শালা। একবার জিজ্ঞেস ও করেছি কে আসবে? বোন আর দুলাভাই বলে গেমস খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।” আকিফের দিকে দৃষ্টি নিয়ে শান্ত বলল।
“আমি আপনাকে চিনি নাই ভাই, আপনি দুলাভাইয়ের বন্ধু তা মাত্র জানলাম।” আকিফ বলল।
“বেশ ক্লান্ত লাগছে। আগে বাসায় যাই তারপর সব কথা হবে।” বলল মাহির।
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস।” শান্ত সম্মতি দিয়ে বলল।
আকিফ সাথে গাড়ি নিয়ে এসেছিল। গাড়িতে করে যাত্রাবাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হয় তারা। মাহিরের বাবা মা ওইখানেই থাকেন। ছোট বোনের পড়াশুনার সুবিধার্থে মাহিরের বাবা মা এখানে বাসা নিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে।
গাড়িতে বসে মাহির ও শান্ত ছোট বেলার আলাপ জুড়ে দিল। ছোটোবেলায় তিনজনই অনেক চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। আর মাহির ছিল তাদের তিনজনের মধ্যে ভালো ছাত্র।
তাদের আলাপ শুনতে শুনতে মাহিরের শালা আকিফ বলে উঠল, “শান্ত ভাই, আমার একটা প্রশ্ন ছিল।”
“বলেন ভাই” শান্ত বলল।
“দুলাভাই প্রায়শই বলে, আপনারা নাকি ছোটোবেলায় মানুষের গাছের আম, পেয়ারা ও আমড়া এসব চুরি করে স্কুলে নিয়ে যেতেন। আর ওইখানে স্কুলের পুকুর পাড়ে বসে আয়েশ করে খেতেন।” আকিফ প্রশ্ন করল।
“শুধু কি তাই? আরো কত কি খেতাম চুরি করে, তার হিসেব না করাই ভালো। মূলত চুরি না, না বলে ফল খেতাম আরকি।” একটু গা বাঁচিয়ে শান্ত জবাব দিল।
“তাহলে আপু যে মাঝে মাঝে দুলাভাইকে ফল চোর বলে, তা ভুল কিছু না।” আকিফ বলল।
এটা শুনে হো হো করে হেসে উঠে শান্ত বলল, “একবারের কাহিনি যদি বলি তাহলে তো হেসেই কূল পাবে না। এর ওর গাছ থেকে পেড়ে ফল বেশিরভাগ সময় আমি আর রবিই নিয়ে আসতাম আর মাহির শুধু বাড়ি থেকে লবণ মরিচ নিয়ে আসতো।”
“কাহিনিটা কী ভাই? বলেন, আমরাও শুনি।” তানিশা বেশ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আচ্ছা, শোনো তবে।” শান্ত বলল।
“এই না না। ওই কাহিনিটা বলিস না শান্ত। পরে আর কোথাও টিকতে পারবো না, ঘরে টিকাই দায় হয়ে পড়বে।” শান্তকে মানা করে মাহির বলল।
“আপনি ওর কথা শুইনেন না তো ভাই। আপনি বলেন।” মাহিরকে আড় চোখে দেখে তানিশা বলল।
“আরে মাহির কিছু হবে না তো। বলি, সবাই যখন জানতে চাচ্ছে।” শান্ত বলল।
“বলেন বলেন…” গাড়ির সামনের সিট থেকে আকিফ বলল।