“কিরে কী হয়েছে? দরজা কেন ভাঙবি?” শান্ত জিজ্ঞেস করল।
“তুই যে জানালা দিয়ে দেখেছিলি ওই মেয়ে সকাল থেকে দরজা খুলে নি। এখনো খুলছে না। বল তো কী একটা বিপদে পড়লাম! এখন যদি এই মেয়ের কিছু হয়, আমার রিসোর্ট শেষ হয়ে যাবে। মান সম্মান সব যাবে, সাথে আইনি ঝামেলা তো আছেই। রিসোর্ট সিলগালা অবধি হতে পারে।” এইসব বলতে বলতে মাথায় হাত দিয়ে দিল রবি।
কোনোমতে প্লেটের খাবার শেষ করে দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে পড়ে সবাই। গাড়িতে যেতে যেতে রবি বলে, “থানায় খবর দিয়ে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে যাবো নাকি বুঝতে পারছি না। কিছুই মাথায় আসছে না।”
“আগেই পুলিশে খবর না দিয়ে আমরা দেখি কী হয়েছে। যদি দরকার হয় তার পর পুলিশে খবর দেওয়া যাবে। আর যেহেতু সিসি ক্যামেরায় সবটা নিয়ন্ত্রিত, সমস্যা হওয়ার কথা না।” রবির কাঁধে হাত দিয়ে জারা বলল।
“এখন এটা নিয়ে একটা ঝামেলায় পড়লে কী হবে বলতো? তুমি না জেনে শুনে একটা মেয়েকে এইভাবে রুম দিয়ে দিলে, যদি আত্মহত্যা করে ফেলে মেয়েটা?” রবি বেশ চিন্তিত কণ্ঠে বলল।
“এত চিন্তা করিস না রবি। আমরা আছি তো সাথে। যা হবে দেখা যাবে। আর এখনি পুলিশকে জড়ানো ঠিক হবে না। আমরা গিয়ে পরিস্থিতি দেখি কী হয়েছে। তারপর বাকিটা আল্লাহ ভরসা।” মাহির এই বলে রবিকে সান্ত্বনা দিল।
“চিন্তা কইরেন না রবি ভাইয়া। দেখবেন তেমন খারাপ কিছু হবে না।” নীলা বলল।
সামনের সিটে বসা শান্ত একদম নিরবতা পালন করে কী যেন ভাবছে। আর একটু পর পর ড্রাইভারকে বলছে, “তাড়াতাড়ি চলেন ভাই, ওইদিকে কী হচ্ছে কে জানে।”
জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গাড়ি এসে থামলো অড়ণ্য নীড়ে। গাড়ি থেকে নেমেই সবাই তাড়াতাড়ি হেঁটে ১০৪ নম্বর রুমের দরজায় হাজির হলো। ওইখানে জায়েদ আর রুম সার্ভিসের বেশ কিছু কর্মী দাঁড়িয়ে আছে আগে থেকেই। রুমের সামনে এসে দরজা ধাক্কাতে থাকে রবি। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ আসে না।
মাহির বলল, “দরজা ভেঙে ফেল। দরজা ভেঙে যদি দেখি গলায় ফাঁস দিয়ে আছে।”
“দাঁড়া আমি জানালা দিয়ে দেখে আসি কিছু দেখা যায় নাকি।” শান্ত বলল।
“সবাই চল। জানালার ফাঁক ফোকর দিয়ে কিছু দেখা যেতেও পারে।” মাহির বলল।
“চল, চল…” বলে রুমের সামনে থেকে জানালার দিকে এগোতে থাকে রবি। পেছন পেছন সবাই আসে।
থাই গ্লাস ভেতর থেকে লক করা, পর্দাও একদম লাগানো পুরো জানালা জুড়ে। একটা দিকে পর্দা কিছুটা সরে আছে দেখে তানিশা বলল, “এই দিক দিয়ে হয়ত দেখা যাবে।”
“দেখেন তো ভাবি কী দেখা যায়।” শান্ত বলল।
“আমার ভয় করছে। আপনারাই কেউ দেখেন।” তানিশা জবাব দিল।
“এই নীলা তুই দেখতো কি দেখা যায়।” নীলার দিকে তাকিয়ে মাহির বলল।
“তোমরা এত জন থাকতে আমি কেন? ভেতরে যদি খারাপ কিছু দেখি?” নীলা উত্তর দিলো।
“এই সরো তো, আমি দেখছি।” বলে সামান্য ফাঁক দিয়ে এক চোখ বন্ধ করে তাকায় রবি। একটু সময় তাকিয়ে থেকে সরে আসে সে।
“কি দেখেছো?” জারা জিজ্ঞেস করল।
কোনো কথা বলে না রবি। শুধু বলল, “তোমরা দেখো আমার মাথা কাজ করছে না।”
এরপর মাহির এগিয়ে এসে দেখলো। জিজ্ঞেস করায় সে ও একই কথা বলল। সবার কপাল ঘেমে চিন্তার রেখা স্পষ্ট। এরপর শান্ত এসে দেখলো। দেখে বেশ চিন্তা মাখা কণ্ঠে বলল, “বিষ খেয়েছে নাকি?”
“কী বলছেন ভাই?” বলে জারা ও উঁকি দিয়ে দেখলো।
ভেতরে মেয়েটা বিছানার মধ্যে কোনাকুনি হয়ে পড়ে আছে। মাথার নিচে বালিশ ও নেই। রবি পুলিশকে খবর দিতে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু শান্ত বাঁধা দিয়ে বলে, “এমন ও তো হতে পারে, মেয়েটা অসুস্থ। আমরা আগে দরজা ভেঙে দেখি কি হয়েছে।”
শান্তর কথায় সবাই সম্মতি দিল। কারণ ফাঁক দিয়ে যতটুকু দেখা গেছে তাতে আত্মহত্যার কোনো সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। আরো বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে রুমের দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়।
জোরে ধাক্কা দিয়ে দরজার ছিটকিনি ভেঙে ঘরের ভেতরে হুড়মুড়িয়ে পড়ে শান্ত আর রবি। তারপর রুমে ঢুকেও বেশ কিছু ডাকাডাকি করে সবাই, কিন্তু কোনো নড়াচড়া টের পাওয়া যায়নি মেয়েটার। মেয়েটার নাম মনে না পড়ায়, ইতিমধ্যেই ফর্মের মধ্যে মেয়েটার নাম দেখে আসে জারা। মেয়েটার নাম নাবিহা জান্নাত।
কোনো নাড়াচাড়া না পেয়ে প্রথমে নাকের সামনে হাত দেয় জারা। “শ্বাস চলছে, বেঁচে আছে।” বলে উঠলো জারা।
এই কথা শুনে তুমুল চিন্তার মধ্যেও একটু স্বস্তি পেল সবাই। তারপর মেয়েটার মাথা জারা তার কোলে নিয়ে হাতের নাড়িতে হাত দিল। রক্ত চলাচল ও স্বাভাবিক লাগছে তার কাছে। পাশের টেবিলের উপরে থাকা পানির বোতল থেকে পানি নিয়ে নাবিহার মুখে ছিটিয়ে দেয় তানিশা। পানি পেয়ে হালকা নড়ে ওঠে সে। তাও চোখ মেলেনি।
পাশ থেকে শান্ত বলল, “হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার মেয়েটাকে।”
“হাসপাতালে নিলেই তো সব তথ্য বের হয়ে আসবে, কোথায় ছিল, সাথে কে ছিল।” রবি বলল।
এরমধ্যেই আবার পানি ছিটিয়ে দেয় তানিশা। এইবার মেয়েটি হালকা চোখ খুলে। চোখ খোলার পর জারা ও তানিশা তাকে তুলে বসিয়ে দুই দিক থেকে ধরে রাখে দুইজন। প্রথমে চোখ খুললেও পড়ে উঠে বসতে বসতেই আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে নাবিহা। আবারও কিছু পানি ছিটিয়ে দিলে মেয়েটি বলে উঠে, “শান্ত, এ কী বুদ্ধি দিলে তুমি?”
এটা বলার সাথে সাথেই মেয়েটার হাত ছেড়ে দেয় জারা ও তানিশা। খাটের উপর পড়ে যায় মেয়েটা। এইকথা শুনে সবাই শান্তর দিকে তাকায় একযোগে।
“সবাই আমার দিকে এইভাবে তাকিয়ে আছো কেন? আমি কিছু করিনি, আমিতো তোমাদের সাথেই ছিলাম।” বেশ থতোমতো খেয়ে কথাটা বলল শান্ত। সে নিজেও বুঝতে পারছে না নাবিহা কেন এই কথা বলল।
জারা আর তানিশা ছাড়া বাকি সবাই রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। সবার মনে একই প্রশ্ন, “শান্ত কী বুদ্ধি দিয়েছিল?”
শান্ত বেরিয়ে ছাদে আসলো। মাহিরও আসলো শান্তর পেছন পেছন। এসেই প্রশ্ন করল, “তুই কি বুদ্ধি দিয়েছিলি নাবিহাকে?”
“আরে আমি কি বুদ্ধি দেব। আমিতো নিজেই ওর মুখ থেকে শুনে আকাশ থেকে পড়লাম। আমি সাত পাঁচ কিছুতে নেই, আর আমি নাকি কী বুদ্ধি দিয়েছি?” জবাবে শান্ত বলল।
“দেখ, তুই যদি কিছু না বলিস তাহলে তোর নাম কেন বলবে মেয়েটা? অন্য কারো কথা তো বলেনি। আর তোর নাম জানবেই বা কী করে যদি তোকে না চিনে?” মাহির বলল।
“আমাকে এতদিনে এই চিনলি তুই? আমি কি বুদ্ধি দিবো? ও তো রুম থেকেই বের হয় না। দেখাই বা হবে কি করে? আর আমি কি করে বলব আমার নাম কীভাবে জানে?” শান্ত আবারও একই সুরে বলল।
“আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। তুই মেয়েটাকে কিছু বললে, বলে দে প্লিজ। ওর যা অবস্থা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কিছু না জানলে হাসপাতালে নিয়ে কী বলবো?” মাহির জিজ্ঞেস করল।
বার বার একই কথা বলায় ছাদ থেকে চলে গেল শান্ত। নিচে যেতেই রবির সাথে দেখা। রবির ও সেই একই প্রশ্ন, “কী বুদ্ধি দিয়েছিলি তুই?”