আহি আঁতকে উঠে। বুকের ভেতর ধক করে ওঠে হৃদয়। মুহূর্তেই সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, আর ঠিক তখনই অয়ন’কে দেখে লাফিয়ে একপাশে সরে যায়। চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। মুখ ফ্যাকাশে। হাত-পা কাঁপতে থাকে।
কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শব্দগুলো কোনোরকমে বের হয়,
"অ অ অ অয়ন ভাই আপনি?
অয়ন কোনো দ্বিধা ছাড়াই আহি’র বেডে বসে পড়ে। রুমের নরম আলোতে তার প্রতিটি রেখা, প্রতিটি ছন্দ সব কিছু স্পষ্ট হয়ে দেখা যায়। এক হাত ধীরে ধীরে আহি’র দিকে বাড়িয়ে সে তাকে নিজের বুকের কাছাকাছি টেনে নেয়। মুহূর্তের জন্য আহি স্থির হয়ে যায়, যেন বরফের মতো জমে গেছে। সে বুঝতেই পারে না, পেছনে যে অতি কাঙ্ক্ষিত মানুষটা দাঁড়িয়ে ছিল। আহি চোখ বুজে রাখে, লজ্জার ছাঁপ তার গালে জ্বলজ্বল করছে। গলার ভেতর কণ্ঠস্বর, শরীরের অস্থিরতার স্রোত সৃষ্টি করছে।
কিছুক্ষণের নীরবতার মধ্যে আহি’র লজ্জা মিশ্রিত দু’গালে অয়ন চুম্বন কাঁটে। প্রতিটি চুম্বন যেন একেকটি আবেগের বিস্ফোরণ। আহি মুহূর্তেই চুপচাপ হয়ে যায়, চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকে, এবং ধীরে ধীরে দৃষ্টি থেমে যায়।
আজ অয়ন'কে তার কাছে আরও নিখুঁত মনে হচ্ছে। হয়তো রোজ'ই সে সুন্দর কিন্তু আজ তার উপস্থিতি যেন আরও উজ্জ্বল, আরও আকর্ষণীয়। আহি নিজেও লক্ষ্য করে, কতোটা অনির্দেশ্যভাবে তার হৃদয় প্রতিটি নিঃশ্বাসে অয়নে'র প্রতিচ্ছবি বিরাজ করে।
তার দৃষ্টিরত দেখে অয়ন নিঃশব্দে হাসে। সেই হাসি নরম, শান্ত। মেয়েটার চোখে থাকা নির্দিষ্ট কিছু একটা সরলতা, এক নির্ভেজাল অনুভূতি—এমনই যা তাকে বারবার আকৃষ্ট করে। নয়তো পৃথিবীতে কোটি কোটি মেয়ে থাকতে এইটুকু মেয়ের প্রেমে পড়বে কেন?
অয়ন হঠাৎ তীব্র নেশাক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
“একটু বুকে জরিয়ে ধরে ভালোবাসি বলবি পাখি!
আহি থমকে যায়। হুটহাট লোকটা কেমন বদলে যায়, এই এইরকম হলে আরেকটু পর অন্য রকম। তবুও সে এই মানুষটাকে ভিষণ ভালোবাসে। ভালোবাসা গভীরতা মাপা যায় না। নয়তো পরিমাপ করে দেখতো, এই মানুষরাকে সে কতটা ভালোবাসে।
আহি কোনো কথা বলছে না দেখে অয়ন নিজেই আহি'কে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে। বুকের ভেতর এক অন্য রকম শান্তি বিরাজ করছে। সে আবারও গভীর দৃষ্টিতে আহি'র দিকে তাকায়, চোখে মুখে স্পষ্ট তার অভিযোগ গুলো। তবুও সে আগে বুঝতে পারেনি প্রেয়সি'র ব্যাকুল হৃদয়!
হুট করে অয়ন আহি'কে নিজের কোলে বসিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে আহি লজ্জায় তার বুকে মুখ লুকিয়ে নেয়। অয়ন মুচকি হেসে তার গাল দুটো আলতো ভাবে স্পর্শ করে। তার মুখো নিজের মুখোমুখি রেখে বলল,
“আমার প্রতি এতো অভিযোগ তোর? মুখে না হয় বলতে পারিস নি, তাই বলে কি ছোট্ট চিঠির মধ্যেও অভিযোগ গুলোকে লিখতে পারিসনি?
আহি মোচড়ামুচড়ি শুরু করে দেয়। তা দেখে অয়ন বেশ বিরক্ত হয়, সে যখনই সিরিয়াস মুডে কথা বলবে তখনই মেয়েটা বাচ্চামো শুরু করে দেয়। অয়ন ধমকে স্বরে আওরায়,
“ছটফট করছিস কেন? পৃথিবীর আলো দেখার পর থেকে তো আমার কোলে উঠেই বসে থাকতি। বারন করলেও শুনতি না আর এখন নামতে চাচ্ছিস? চুপচাপ আমার প্রশ্নের উত্তর দিবি নয়তো একটা মাইরও মাটিতে পড়বে না।
আহি ঠোঁট উল্টে নরম স্বরে বলল,
"আপনি আমাকে মাইর দেবেন, অয়ন ভাই?
অয়নে'র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে। সে হালকা ভ্রু তুলে জবাব দেয়,
“কথা না শুনলে কী করবো? মাইরের বদলে চুমু দেবো?
আহি মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে চোখ নামিয়ে নেয়। কণ্ঠে স্পষ্ট দুষ্টুমি,
"আপনি তো সেটাই দেন!
অয়ন আর নিজেকে সামলাতে পারে না। সো দাঁত খিঁচিয়ে উঠে,
“কি বজ্জাত মেয়েরে বাবা! এক সময় আমাকে দেখলে পালিয়ে যেতি, আর এখন আমার কোলে বসে আমারই চোখে চোখ রেখে কথা বলছিস!
আহি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে ওঠে!
"আমি কি ইচ্ছে করে এসে বসেছি নাকি? আপনি নিজেই তো কোলে নিলেন, এখন আবার নিজেই কথা শোনাচ্ছেন। ভারি পাঁজি আপনি। আর আপনি এত রাতে আমার রুমে কী করছেন? লুকিয়ে লুকিয়ে আমার কথা শুনছিলেন?
এই প্রশ্নে অয়ন এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। তারপর ভ্রু নাচিয়ে, আগের সেই চেনা দুষ্টু ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“কথা শুনতে আসিনি। এসেছিলাম দোয়েল পাখির ঠোঁট টেস্ট করতে। আজ সারাদিনে একটুও মিষ্টি খাইনি।
মূহুর্তেই আহি লজ্জায় গাল লাল করে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। অয়ন আবার হাসি চেপে বলে,
“তারপর রুমে এসে দেখি আমার কুইন কারো সঙ্গে কথা বলছে। ভাবলাম, কে সেই ভাগ্যবান, যার জন্য আমার কুইন এত রাতে না ঘুমিয়ে জেগে আছে! কিন্তু এখন দেখছি, সেই ভাগ্যবান লোকটা তো আমি নিজেই!
অয়ন আলতো করে আহি’কে আরেকটু উঁচু করে নিজের মুখোমুখি করে নেয়। তার দুই হাতের ভেতর ছোট্ট মেয়েটা একেবারে হারিয়ে যায়। ঠিক তখনই আহি বড় একটা হাই তুলে চোখ দুটো আধা বন্ধ করে বলে ওঠে,
"আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে অয়ন ভাই। আপনি প্লিজ এবার আপনার রুমে যান।
অয়ন অবাক হয়ে তাকায়। ঠোঁটের কোণে হালকা বিরক্তির ছাপ নিয়ে বলে,
“এই তো এলাম, এখনো কথা শুরুই করতে পারলাম না আর তোর চোখে ঘুম চলে এলো?
আহি শিশুর মতো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
"আমি এসব জানি না। আমার ঘুম পাচ্ছে। যা কথা আছে, কাল শুনবো।
অয়ন একটু চুপ করে থাকে। তারপর চোখ দুটো সরু করে মুচকি হেসে বলে,
“ওকে ফাইন! কিন্তু যাওয়ার আগে একটা কাজ করবি।
আহি সন্দেহভরা চোখে তাকায়,
"কি কাজ?
“আমাকে জরিয়ে ধরে ‘ভালোবাসি’ বলবি!
কথাটা শুনে আহি থমকে যায়। সে মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট উল্টো করে ফেলে বলে,
"পারবো না।
অয়নের ভ্রু কুঁচকে যায়,
“হোয়াই? পারবি না কেন? ভালোবাসিস না আমাকে?
আহি চোখে চোখ রেখে একদম নির্ভীকভাবে বলে,
"না, একটুও ভালোবাসি না।
এই উত্তরে অয়নে'র চোখে হঠাৎ অদ্ভুত এক ঝিলিক খেলে যায়। এতেও আহি'র কোনো ভয় নেই। ঠিক তখনই অয়ন নিজের গায়ে জড়ানো সাদা শার্টের বোতাম এক এক করে খুলতে শুরু করে।
এই দৃশ্য দেখেই আহি আঁতকে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে সে অয়ন'কে ঝাপটে ধরে তার বুকের সাথে লেপ্টে যায়। তড়িঘড়ি করে বলে ওঠে,
"ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি! সত্যি সত্যি ভালোবাসি আপনাকে অয়ন ভাই। গড প্রমিজ, আর একটু ত্যাড়ামি করবো না। প্লিজ আপনি এখন রুমে যান। আর এখানে শার্ট খোলার কোনো দরকার নেই। আমি তো ভালোবাসি বলে দিয়েছি, তাই না?
অয়ন কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। তারপর নিচু হয়ে হালকা হাসি নিয়ে মৃদু স্বরে বলে,
“হেই ডিয়ার! আমি শার্ট খুলছিলাম রুমে যাওয়ার জন্যই। সারাদিনে এতো দৌড়াদৌড়ি, গরমে অবস্থা খারাপ। শাওয়ার নেবো বলে। আর তুই কি থেকে কি ভাবলি!
সে হেসে আবারও মাথা নেড়ে বলে,
“ছিহ্ পাখি ছিহ্! এই তোর মাথা, সব সময় পঁচা পঁচা কথা ঘুরে বেড়ায়।
আহি আহাম্মকের মতো তার দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের ভুল বোঝাবুঝিতে সে এতটাই লজ্জা পায় যে কিছু বলার ভাষা খুঁজে পায় না। অয়ন আলতো করে আহি’কে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তার কপালে ধীরে, খুব যত্ন করে ভালোবাসার একটুখানি পরশ এঁকে দেয়। তারপর নিজে উঠে দাঁড়িয়ে রুমের লাইট অফ করে বলে,
“ঘুমিয়ে পর পাখি। কাল কথা হবে।
দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে একবার পিছন ফিরে তাকায়। আহি চোখ বন্ধ করে শান্তভাবে ঘুমানোর চেষ্টা করছে।ঠিক যেমনটা সে চায়, নিরাপদ, নিশ্চিন্ত, তার ভালোবাসার ভেতর, ঠিক তেমনটা অয়ন তাকে ভালোবাসে। এইটুকু পেলে কি চায় সে।
শরীরের উপর হালকা ওজন অনুভব হতেই অয়ন চোখ পিটপিট করে তাকায়। আধঘুমের ঘোর কাটতে না কাটতেই হঠাৎ দৃশ্যটা স্পষ্ট হয়, আহি তার উপর শুয়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্য সে হতভম্ব হয়ে যায়। পরের সেকেন্ডেই হকচকিয়ে উঠে বসে অয়ন। অয়নে'র হঠাৎ উঠে বসার ধাক্কায় আহি ভারসাম্য হারিয়ে ধপাস করে বেড থেকে নিচে পড়ে যায়।
মেঝেতে বসেই আহি কাঁদু কাঁদু মুখ করে তাকিয়ে বলে,
"অয়ন ভাই…আপনি আমাকে ফেলে দিলেন?
অয়ন মুহূর্তেই বিছানা থেকে নেমে আসে। কোনো কথা না বলে তাকে তুলে আবার বিছানায় বসায়। তারপর দুশ্চিন্তায় ভরা চোখে তার হাত-পা ভালো করে দেখে নেয় কোথাও লেগেছে কি না, ব্যথা পেয়েছে কি না। তারপর নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
“পাখি, ব্যথা পেয়েছিস?
আহি মুখ ফিরিয়ে নেয়। ঠোঁট উল্টো করে বলে,
"এখন আর ঢং দেখাতে হবে না। আগে ব্যথা দিলেন, এখন দরদ দেখাচ্ছেন! আমার আপনার রুমে আসা টাই ভুল হয়েছে। আর আসবো না আপনার কাছে, হু।
এই বলে সে বিছানা থেকে নামতে যায়। রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই, হঠাৎ অয়ন তার হাত ধরে হেঁচকা টান দেয়। মুহূর্তের মধ্যে আহি তার বাহুর ভেতর বন্দী হয়ে যায়। আহি ছটফট করতে থাকে, নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে।
ঠিক তখনই অয়ন ধমকে ওঠে,
“হুসসস! এতো ছটফট করিস কেন? তোকে ব্যথা আমি দেবো না তো কে দেবে শুনি? ভালোবাসবো আমি, আবার ব্যথাও দেবো আমি। কারণ তুই সম্পূর্ণ আমায়। আমি আমার প্রপার্টি সাথে কি কি করবো, তার জন্য কি তোর থেকে পারমিশন নিতে হবে?
আহি হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। বড় বড় চোখে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে কটমট করে বলে,
"মানে…আপনি আমাকে ব্যথা দেবেন, অথচ আমাকে জিজ্ঞেসও করবেন না?
অয়ন হেসে ফেলে। সেই হাসিতে দুষ্টুমি স্পষ্ট। সে আবারও ভ্রু নাচিয়ে বলে,
“ওহু! বাই দ্য ওয়ে, এতো সকাল সকাল আমার রুমে কেন এসেছিস? এক্সট্রা এনার্জি পেতে?
আহি এক মুহূর্তের জন্য কথা হারিয়ে ফেলে। এই লোকটা সব সময়ই একটু বেশি বুঝে। আহি কোমড়ে দুই হাত গুঁজে, চোখ বড় বড় করে কর্কশ কণ্ঠে বলে ওঠে—
"আপনি কি এবার থামবে? আমার কলেজে যেতে হবে। কিন্তু পৌঁছে দেওয়ার মতো কেউ বাসায় নেই। মুন আর মাহি তো আগেই চলে গেছে। এমনকি ভাইয়াও বাসায় নেই। তাই আপনি আপনার কাছে এসেছিলাম, যাতে আপনি আমাকে কলেজে পৌঁছে দিন।
অয়ন ভ্রু উঁচিয়ে তাকায়। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি খেলিয়ে ধীরে ধীরে বলে,
“সে না হয় পৌঁছে দিলাম। কিন্তু আমাকে না ডেকে আমার ওপর শুয়ে থাকার কারণটা কী?
আহির চোখ কপালে ওঠে। অয়ন আবারও নির্বিকার গলায় বলে,
“এই মেয়ে, বিয়ে আগেই ইটিসপিটিস শুরু করে দিচ্ছিস নাকি?
আহি সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে আতঙ্কিত ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
"আস্তাগফিরুল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ! আপনি এসব কী বলছেন অয়ন ভাই? কলেজে নিয়ে যাবেন না, সেটা সোজা করে বললেই হয়। শুধু শুধু পঁচা কথা বলার দরকার কী?
“হোয়াটটটট? আমি পঁচা কথা বলি?
"হ্যাঁ, আপনিই তো বললেন।
এক মুহূর্ত চুপ থেকে অয়ন দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“দাঁড়া…তোকে আজ মজা দেখাচ্ছি।
এই বলেই সে আচমকা আহি'র পেছনে ছুটে যায়।
কিন্তু আহি কি আর ধরা দেওয়ার মেয়ে? বিচ্ছু মেয়েটা এক ঝটকায় সরে গিয়ে দৌড় দেয়। অয়ন যতই ধরতে চায়, ততই সে ফসকে যায়। হেসে হেসে আহি সোজা ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়ে এবং গিয়ে নিজের বাবার ঠিক পাশে বসে পড়ে। অয়ন সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহি'র দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলতে পারে না। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বিরবির করে—
“শাউ*য়ার নাতি! আর কোথাও বসার জায়গা পেল না?
চোখ ঘুরিয়ে মহিবুল শেখে'র দিকে তাকিয়ে আবার বলে,
“যেয়ে কিনা এই রাক্ষসটার পাশেই গিয়ে বসতে হলো!
আহি বাবার কাঁধে হেলান দিয়ে বসে মুচকি হাসে।সে জানে, এই জায়গা থেকে অয়ন তাকে ধরা তো দূর ছুঁতেও পারবে না।