নেশাময় আসক্তি

পর্ব - ১২

🟢

আদিল যখন মাহি’র হাত টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন মাহি আর চারপাশের কিছুই দেখছিল না। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে ছিল শুধু আদিলে’র মুখের দিকে। চোখে ছিল জমে থাকা প্রশ্ন, অবিশ্বাস আর ভাঙা স্বপ্নের চাপা আর্তনাদ। সে এখনো মেনে নিতে পারছিল না, আদিল সত্যিই অন্য কাউকে ভালোবাসে। যে মানুষটাকে সে প্রতিদিন নিঃশব্দে নিজের মনে জায়গা করে দিয়েছিল, যে মানুষটাকে নিয়ে তার অজস্র স্বপ্ন ছিল, সে মানুষটা কি সত্যিই তার নয়?

হঠাৎ করেই মাহি থেমে যায়। আচমকা আদিলে’র হাতটা শক্ত করে টেনে ধরে। মাহি’র এমন আচরণে আদিলও বিস্মিত হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। সে ভ্রু কুঁচকে পেছনে ফিরে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করে—

'কি প্রব্লেম?

মাহি আদিলে’র চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার গলা কাঁপছিল, তবুও সে সাহস করে প্রশ্নটা করে ফেলে,

- আদিল ভাইয়া আপনি কি সত্যি সত্যি অন্য কাউকে ভালোবাসেন?

প্রশ্নটা শোনার পর আদিল কোনো উত্তর দেয় না। সে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই নীরবতাই মাহি’র বুকের ভেতর সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। আদিলে’র মুখে কোনো অস্বীকার নেই।

মাহি তখনও তার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ইদানীং আদিল’কে তার কাছে খুব বদলে যাওয়া মানুষ মনে হয়। আগের সেই হাসিখুশি মানুষটা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। এখন সে সব সময় উদাস থাকে, নিজের ভেতর নিজেই ডুবে থাকে। কারো সঙ্গে ঠিক করে কথা বলে না, কারো সঙ্গে হাসে না। যেন বুকের ভেতরে লুকিয়ে আছে অজানা কোনো যন্ত্রণা, যেটা কাউকে বলতে পারে না।

এই প্রশ্নগুলো বারবার মাহির মনে ঘুরপাক খায়।

কাকে সে ভালোবাসে? কেন সে এত একা হয়ে যাচ্ছে? কেন মাহি’কে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে?

হঠাৎ মাহি নিজের অজান্তেই বলে ওঠে,

- জানেন আদিল ভাইয়া, আমি স্বপ্ন দেখি আপনিও ঠিক অয়ন ভাইয়ার মতো আমার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মনের কথা বলবেন। আপনিও আমাকে গভীরভাবে ভালোবাসবেন। নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে রাখবেন। কখনোই অন্য কারো হতে দেবেন না। আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার হবেন। কিন্তু আপনি আমার হয়েও হলেন না। ভাগ্য কি আমাদের এক করতে চাইছে না? নাকি আপনি নিজেই আমার হতে চান না, আদিল ভাইয়া?

আদিল তখনো নিশ্চুপ। তার নীরবতা মাহি’র বুকের ভেতর হাজারটা প্রশ্নের জন্ম দেয়। মাহি আরও কাছে এগিয়ে এসে চোখে চোখ রেখে বলে

- আচ্ছা আদিল ভাইয়া, আপনি কি আমার বাচ্চামোতে বিরক্ত হন? আমি কি আপনাকে খুব বিরক্ত করি? আপনি যদি আমার হয়ে যান, তাহলে সত্যি সত্যি আমি আপনাকে আর বিরক্ত করবো না। আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। আপনি যা বলবেন তাই করবো। শুধু একবার বলুন, আপনি আমার হবেন, আদিল ভাইয়া?

আদিল অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। তার বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। হাজারটা কথা জমে আছে গলায়, কিন্তু একটি শব্দও বের করতে পারছে না। খুব ইচ্ছে করছে মাহি’কে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে

“তোর এই বাচ্চামো গুলোই আমার সবচেয়ে প্রিয়, মাহি কুইন। তুই যখন আমাকে বিরক্ত করিস, তখনই আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি নেমে আসে। তোকেও নিজের করে নিতে ইচ্ছে করে। তোকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে”

মাহি আবারও বলল,

- কি হলো আদিল ভাইয়া? বলুন না…

মাহির কণ্ঠে ছিল অপেক্ষা, ভাঙা আশা আর শেষ চেষ্টা। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই আদিল হঠাৎ করে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে নেয়। কোনো উত্তর না দিয়েই সে ফোনটা কানে চেপে ধরে কয়েক কদম এগিয়ে যায়। মাহি’র দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েই এমনভাবে কথা বলতে শুরু করে যেন মাহি সেখানে নেই—অথচ কথাগুলো ইচ্ছে করেই তার কানে পৌঁছে দেওয়ার মতো করে।

"হ্যাঁ, মৌরি বলো? আচ্ছা, তুমি যা বলছো তাই হবে। ওকে ওকে, সব জায়গায় তোমাকে নিয়েই ঘুরবো।

একেকটা শব্দ যেন মাহি’র বুকের ভেতরে গিয়ে ধারালো ছুরির মতো বিঁধে যায়। সেই নামটা, সে সহ্যই করতে পারে না। যার অস্তিত্বই মাহি’র ভেতরে অজানা ঈর্ষা আর ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আদিলে’র মুখে সেই নাম শুনে মাহি’র চোখ জ্বালা করে ওঠে। আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি তার থাকে না। কিছু না বলেই গটগট করে সেখান থেকে চলে যায় মাহি।

হাঁটতে হাঁটতে তার বুকের ভেতর রাগ আর কষ্ট একসাথে জমে ওঠে।

এই পৃথিবীতে এত এত মেয়ে থাকতে তাকেই কেন পছন্দ করতে হবে? মাহি চলে যেতেই আদিল সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার চোখ আপনা আপনিই মাহি’র চলে যাওয়ার দিকেই আটকে থাকে। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। কি অভিমানী মেয়েটা!

ঠিক তখনই হঠাৎ রাকিব এসে আদিলে’র কাঁধে হাত রেখে মুচকি মুচকি হাসে। রাকিবে’র সেই রহস্যময় হাসিটা দেখে আদিল ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

"কিরে শালা? এমন একা একা হাসছিস কেন?

রাকিব চোখ চকচক করে বলে— মনে প্রেম জেগেছে ভাই! আচ্ছা শোন, তোকে একটা অফার দিতে আসলাম।

"কি অফার? আদিল সন্দেহভরে তাকায়।

রাকিব একদম সিরিয়াস হয়ে বলল,

- তুই মুন’কে আমার সাথে সেটিং করিয়ে দিবি, আর তার বিনিময়ে আমি তোকে এক বক্স ট্রেজারার লাক্সারি ব্ল্যাক খাওয়াবো।

এক মুহূর্ত আদিল বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে রাগে তার চোখ লাল হয়ে ওঠে। রাকিব তখন ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে,

- ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?

আদিল দাঁতে দাঁত চেপে ফুঁসে ওঠে,

"শালা, তুই আমার বোনের সাথে সেটিং করানোর জন্য আমাকেই সিগারেট অফার করছিস? মা*ঙ্গের নাতি, বোম মারার আগেই এখান থেকে সর। নয়তো তোর পার্সোনাল বোম সোজা আকাশে উড়িয়ে দেবো!

রাকিব তবুও নির্বিকার। বরং হাসিটা আরও চওড়া করে বলে,

- আরে ভাই রেগে যাচ্ছিস কেন? আহি হচ্ছে তোর বোন, মাহি আর মুন তো নয়। মাহি হবে তোর বউ, আর মুন হবে আমার বউ, সেম সেম বাট ডিফারেন্ট!

এই কথা শোনামাত্র আদিলে’র মাথায় যেন রক্ত উঠে যায়।

"রাকিবে’র বাচ্চা…

বিজ্ঞাপন

বাকিটা শোনার আগেই রাকিব প্রাণপণে দৌড় দেয়। আর তার পিছু পিছু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আদিলও ছুটে যায়।

অয়ন প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে আহি’র পিছু পিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে যতবার কিছু জানতে চাইছে, অয়ন ততবারই শুধু ঠোঁট উল্টে তাকিয়ে থাকছে। সে ইশারায় কিছু বোঝাতে চাইছে, কিন্তু আহি কিছুই ধরতে পারছে না। এই রহস্যময় আচরণে আহি ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠছে। তার মনে হচ্ছে লোকটা ইচ্ছে করেই তাকে বিরক্ত করছে।

আহি সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ অয়ন তার হাত টেনে ধরে। আচমকা টানে আহি ভারসাম্য হারিয়ে অয়নে’র বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অয়নে’র স্পর্শে মুহূর্তেই আহি কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতরটা কেমন অজানা শিহরণে ভরে যায়, কিন্তু সে সেটা লুকিয়ে দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়।

পরক্ষণেই আহি চোখ রাঙিয়ে তাকায়—

"অয়ন ভাই, এবার কিন্তু আমি আব্বাকে ডাক দেবো! আপনি শুধু শুধু এভাবে পিছু পিছু ঘুরছেন, কিছুই বলছেন না। আর এখন আবার পঁচা ভাবে টাচ করছেন!

আহি’র কথা শুনে অয়ন হেসে ওঠে। এবং সে ভ্রু কুঁচকে, ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে প্রশ্ন করে—

“আমি তোকে পঁচা ভাবে টাচ করেছি?

আহি গম্ভীর মুখ করে জবাব দেয়,

"তা নয়তো কী? আপনি জানেন না, বিয়ের আগে এভাবে কাছে আসলে সেটাকে পঁচা টাচ বলে?

অয়ন এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“বাট আমাদের তো অলরেডি বিয়ে হয়ে গেছে পাখি। এখন তো আর সেটা পঁচা টাচ হবে না।

এই কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে আহি’র চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সে চোখ পাকিয়ে তাকায়, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না নিজের কানে শোনা কথাটা।

"আমাদের বিয়ে হয়েছে মানে?

“কোনো মানে নেই, ম্যাডাম। আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে আজ নয়, দুই বছর আগেই হয়ে গেছে। শুধু আপনি সেটা জানতেন না।

কথাটা কানে যেতেই আহি যেন আকাশ থেকে সোজা মাটিতে পড়ে গেল। এক মুহূর্তে তার মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। তাকে কিছু না জানিয়েই, তার অজান্তে—তাকেই বিয়ে করে ফেলেছে! আর আজ এত সহজ ভঙ্গিতে সেটা প্রকাশ করছে! মুহূর্তেই আহি’র চোখ লাল হয়ে ওঠে। ভেতরে জমে থাকা সব রাগ, ক্ষোভ আর বিস্ময় একসাথে বিস্ফোরিত হয়ে যায়।

সে ঠাসস ঠাসস করে অয়নে’র বুকে ঘুষি মারতে থাকে। কিন্তু অয়ন তাকে থামাতে যায় না। বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে আসে তার দিকে। হঠাৎ করেই অয়ন আহি’কে কোলে তুলে নেয়। কোনো সুযোগ না দিয়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটা দেয়। আহি ছটফট করতে থাকে, নিজেকে ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু শক্ত সেই বাঁধন ভাঙতে সে ব্যর্থ হয়।

অয়ন তাকে নিজের বেডে বসিয়ে দেয়। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দরজাটা লক করে ফেলে। পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখে, আহি তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।

চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু চিকচিক করছে। সে দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলতে চেষ্টা করে, কিন্তু লকের নাগাল পায় না। ঠিক তখনই অয়ন মুচকি হেসে এক হাত দিয়ে তাকে তুলে আবার বেডে বসিয়ে দেয়। আহি আচমকা অয়নে’র হাতে জোরে কামড় বসিয়ে দেয়। কিন্তু এতেও অয়নে’র মুখে কোনো যন্ত্রণা বা প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। বরং সে নির্বিকারই থাকে।

শেষমেশ আহি’ই বিরক্ত হয়ে কামড় ছেড়ে দেয়।

সে মাথা তুলে অয়নে’র দিকে সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে

"অয়ন ভাই, আমি আপনার হাতে কামড় দিয়েছি অথচ আপনি চিৎকার করছেন না কেন?

অয়ন ধীরে ঝুঁকে এসে আহি’র নাকের ডগায় নাক ছুঁইয়ে দেয়। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি খেলিয়ে ফিসফিস করে বলে

“তোর এইটুকু কামড়ে যদি আমি চিৎকার করি, তাহলে পুরুষ জাতিরই বদনাম হবে পাখি। আমরা পুরুষ মানুষ হলাম ভালোবাসার অস্ত্র। আর সেই ভালোবাসার গভীর যন্ত্রণাতেই নারীরা চিৎকার করে বুঝতে পেরেছিস?

কথাগুলো বলেই সে স্থির দৃষ্টিতে আহি’র দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়তেই দুজনেই চমকে তাকায় সেদিকে। আহি সঙ্গে সঙ্গে এক লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে যায়। কোনদিকে পালাবে সেটাই বুঝতে পারছে না, সে একবার এদিকে ছুটে যায় তো আরেকবার অন্য দিকে ছুটে যায়।

তার কান্ড দেখে অয়ন আরো থমকে যায়। হঠাৎ আহি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে,

"অয়ন ভাই এখন যদি আপনার জন্য কারো কাছে ধরা খাই তাহলে আপনার খবর আছে। কে বলেছিল আমাকে আপনার রুমে আনতে? দরজার ওপাশে যদি আব্বা থাকে তখন?

“চুপ কর বেডি, আগে দেখে তো নেই কে আছে।

অয়ন এক বাড়াতেই আহি তার হাত আকরে ধরে ফিসফিস করে,

"এই অয়ন ভাই ওখানে সত্যি সত্যি আব্বা নয়তো? আব্বা যদি দেখে আমি আর আপনি একই রুমে তাহলে আমি শেষ। ও আল্লাহ্ আজকের মতো বাঁচিয়ে দাও।

অয়ন কপাল ভাঁজ করে বলল,

“পাখি এবার কিন্তু সত্যি সত্যি মাইর খাবি, আগে দেখতে তো দে।

অয়ন আবারও এক পা বাড়াতেই আহি শক্ত করে হাত টেনে ধরে,

"অয়ন ভাই আমাকে একা ফেলে যাইয়েন না প্লিজ। আমি শিওর ওখানে আব্বায় আছে।

অয়ন বিরক্তির চরম পর্যায় পৌঁছে যায়। সে ততক্ষণাক চোখ মুখ কুঁচকে নেয়,

“শালির ঘরে শালি, আমি কি তোকে রেখে পালিয়ে যাচ্ছি? তোর ওই বা*লের মুখ অফ কর নয়তো বোম মেরে উড়িয়ে দেবো।

অতঃপর অয়ন ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। সে দ্বিধা দ্বন্দ ছাড়ায় যেই দরজা খুলে ঠিক তখনই…

বিজ্ঞাপন
নেশাময় আসক্তি গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় স্পেশাল রোমান্টিক গল্প