অফিস রুমের ডেস্কে মাথা কাত করে বসে ছিল আদিল। চারপাশে কাজের কোলাহল থাকলেও তার ভেতরটা ছিল অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ। বুকের ভেতরটা যেন কেউ ধারালো অস্ত্র দিয়ে বারবার ক্ষতবিক্ষত করছে। সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল—বারবার নিজেকে বোঝাচ্ছিল, সব ঠিক আছে, কিছু হয়নি। কিন্তু মন মানছিল না। যতই নিজেকে সামলাতে চাইছিল, ততই মনে হচ্ছিল সবকিছু তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ করেই তার কাশি শুরু হয়। প্রথমে হালকা মনে হলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কাশির দমকে দমকে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে।
বুক ভারী হয়ে আসে তার, গলা শুকিয়ে যায়। আদিল চেয়ার আঁকড়ে ধরেও নিজেকে সামলাতে পারলো না। কাশতে কাশতেই সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে, চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে। কাঁপা হাতে সে পকেট থেকে একটি রুমাল বের করে মুখে চেপে ধরে।
এই রুমালটা সকালে মাহি জোর করে তার পকেটে গুঁজে দিয়েছিল। তখন সে কতই না বিরক্ত হয়েছিল! কত বলেছিল দরকার নেই, কিছু হয়নি—তবুও মাহি শোনেনি। এখন সেই রুমালটাই যেন তার শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে জানতো, এমন বিপদের মুহূর্তে সেটাই কাজে লাগবে! ঠিক সেই সময় হঠাৎ করে কেবিনের দরজা খুলে যায়। ভেতরে ঢুকে পড়ে মৌরি। আদিলে’র ক্লাসমেট মৌরি এখন তাদের কোম্পানিতেই জব করে। বেশ কিছুদিন ধরেই আদিলে’র সঙ্গে তার দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছিল, আর সেই সূত্রে দুজনের মধ্যে একটা ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।
কেবিনে ঢুকেই আদিল’কে এই অবস্থায় দেখে মৌরি ভয় পেয়ে যায়। দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে তুলে বসায়। দ্রুত এক গ্লাস পানি এনে তার সামনে ধরে।
- আদিল, পানি’টা খেয়ে নে। আর কী হয়েছে তোর?
কিন্তু আদিল পানি খেতে পারছিল না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, বুক উঠানামা করছে অস্বাভাবিকভাবে। সে তখনও মুখে রুমাল চেপে ধরে ছিল। হঠাৎ করে রুমালটা সরাতেই তার মুখ দিয়ে গড়গড় করে রক্ত বের হয়ে আসে। মৌরি স্তব্ধ হয়ে যায়। এক মুহূর্তের জন্য তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। চোখের সামনে এমন দৃশ্য সে কল্পনাও করেনি।
আদিলে’র এই অবস্থা তাকে সম্পূর্ণ হতবিহ্বল করে তোলে। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে তার। কিছুক্ষণ পর আদিলে’র কাশি একটু কমে আসে, শ্বাস স্বাভাবিক হতে থাকে। মৌরি কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে,
- আ আ আ আদিল তোর কী হয়েছে? গলা দিয়ে রক্ত পড়ছে কেন? সত্যি করে বল তো, তোর কোনো বড় রোগ হয়নি তো?
আদিল অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নেয়। মুখে জোর করে একটা স্বাভাবিক ভাব আনার চেষ্টা করে সে।
"রোগ হবে কেন? আমার অতিরিক্ত কাশি উঠলে এমন হয়। তুই টেনশন নিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু মৌরির বিশ্বাস হয় না। সে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। - তুই কি আমাকে গাধা পেয়েছিস? যা বলবি আমি তাই বিশ্বাস করবো? এমনি এমনি কারো গলা দিয়ে রক্ত পড়ে না, আদিল। আমি শিওর তোর কিছু একটা হয়েছে।
আদিল শুকনো ঢোক গিলে নেয়। চোখ এড়িয়ে যায় তার।
- তুই কথা বাড়াচ্ছিস কেন? আমি তো বলছি এমনি এমনি, তবুও বারবার জিজ্ঞেস করছিস কেন?
মৌরি শক্ত গলায় বলে।
- আমাকে বলবি না তাহলে, ওকে আমি অয়নকে…
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আদিল আঁতকে ওঠে।
"এই না না, মৌরি প্লিজ! অয়ন’কে কিছু বলিস না। আমি সব সত্যি বলছি তোকে।
শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না আদিল। ধীরে ধীরে এক এক করে সব সত্যি খুলে বলে, যে সত্য এতদিন সে নিজের বুকের ভেতর চেপে রেখেছিল। মৌরি সব শুনে চুপ করে যায়। এত বড় বাস্তবতা শুনে সে কিছুই বলতে পারে না।
হঠাৎ করে আদিল মৌরির হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে।
"মৌরি প্লিজ, এখন যে সিক্রেট কথা গুলো তোকে বললাম কাউকে বলিস না। আমি চাই না কেউ এসব জানুক। যেদিন সবাই জানবে, সবাই অনেক কষ্ট পাবে। আমার মাহি কুইনটা…সে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে। আমি কিছুতেই ওকে কষ্ট দিতে চাই না।
মৌরি কিছু বলতে চেয়েও থেমে যায়।
- কিন্তু…
আদিল অনুনয়ের স্বরে বলে,
"প্লিজ মৌরি আমাকে একটু বুঝার চেষ্টা কর। পসিবল হলে আমি নিজেই অন্তত অয়ন'কে বলতাম, কিন্তু ওকেও এসব বলা যাবে না। আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন সবাই এই আমিটাকেই ভালোবাসুক, এর থেকে বেশি কিছু চাই না আমি!
হঠাৎ কেবিনের দরজায় হালকা টোকা পড়তেই আদিল চমকে উঠে। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে চেয়ারটায় সোজা হয়ে বসে পড়ে। তার বুকের ভেতরটা কেমন দুরুদুরু করতে থাকে—এই সময়ে কেউ আসার কথা ছিল না।
দরজা ঠেলে উঁকি দিতেই দেখা যায় মাহি। তাকে দেখামাত্র আদিলে’র মুখের রং পাল্টে যায়। যেন কেউ হঠাৎ করে তার গোপন জগতে ঢুকে পড়েছে। আদিল কিছু বলার আগেই মাহি নির্দ্বিধায় কেবিনের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
কেবিনে ঢুকেই মাহি প্রথমে আদিলে’র দিকে তাকায়, তারপর তার চোখ পড়ে রুমে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। অচেনা সেই মেয়েটাকে দেখে মাহি’র কপাল মুহূর্তেই ভাঁজ পড়ে যায়। চোখ দুটো কটমট করে ওঠে। অন্যদিকে মৌরি একেবারেই স্বাভাবিক। বরং বেশ হাস্যোজ্জ্বল মুখে মাহি’র দিকে এগিয়ে আসে। নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে বলে,
- হাই, আই’ম মৌরি। আচ্ছা…তোমার নাম কি মাহি?
মৌরি’র কথা শেষ হতে না হতেই মাহি মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কাটে। হাতটা একেবারেই না ধরেই তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে,
– আমার নাম মাহি না। আমি হলাম মিসেস আরিয়ান শেখ আদিল। বুঝেছেন? আমি তার একমাত্র বউ। বাই দ্য ওয়ে, আপনি কে? এই সময় নিজের কাজ ছেড়ে আমার জামাইয়ের কেবিনে দাঁড়িয়ে কী পিরিতের আলাপ করছেন?
মাহি’র কথার ভঙ্গিতে এমন অধিকার আর আত্মবিশ্বাস যে, আদিল চাইলেও মুখ সোজা রাখতে পারে না। সে মাথা নিচু করে ঠোঁট চেপে হাসে। এই মেয়েটা তাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, এতটাই ভালোবাসে যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। অথচ সেই ভালোবাসা তার জন্য নিষিদ্ধ, সে জানে, সে চাইলে কাউকে নিজের করে নিতে পারবে না। সে অদৃশ্য এক গণ্ডির ভেতর বন্দি।
মৌরি মাহি’র দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি রেখে বলে,
- সেটা সিক্রেট। তোমাকে বলা যাবে না। আর তুমি আদিল’কে কবে বিয়ে করলে? আদিল, তুই তো আমাকে কিছু বলিসনি!
আদিল কিছু বলার আগেই মাহি গরগর করে উঠল,
– আপনি কোন দেশের মহারানী যে আপনাকে জানিয়ে বিয়ে করতে হবে? বুইড়া বেডি, বুইড়া বেডির মতোই থাকেন।
- হোয়াট…?
– পেত্নীদের মতো চিৎকার করা বন্ধ করে তারাতাড়ি এই কেবিন থেকে বের হন। আমি আমার জামাইয়ের সঙ্গে পার্সোনাল কথা বলবো।
মৌরি অবাক হয়ে বড় বড় চোখে তাকায়। এত স্পর্ধা সে আশা করেনি। ঠান্ডা গলায় বলে,
- বের না হলে কি করবে শুনি?
মাহি এবার আদিলে’র দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। চোখে স্পষ্ট হুমকি, গলায় কর্তৃত্ব,
– জামাই, আপনি কি এই মহিলাকে যেতে বলবেন? নাকি আমি আমার স্টাইলে বের করবো?
এই পরিস্থিতি আর বাড়তে দিতে চায় না আদিল। সে দ্রুত বলে ওঠে,
"এই না না। মৌরি তুই এখন নিজের কাজ কর গিয়ে, পরে কথা বলবো তোর সাথে।
মৌরি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। বেরিয়ে যাওয়ার সময় মাহি তাকিয়ে ভেংচি কাটে, যেন যুদ্ধ জিতে এসেছে।
ধীরে ধীরে মাহি এসে আদিলে’র কোলে বসে পড়ে। হঠাৎ এমন আচরণে আদিল বিস্মিত নয়নে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কী বলবে ভেবে ওঠার আগেই মাহি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে হুমকির সুরে বলে ওঠে,
– এখন যদি কিছু বলেন, তাহলে সত্যি সত্যি আপনাকে তক্তা বানিয়ে ফেলবো। ওই শাঁকচুন্নিদের সঙ্গে বসে কত মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন, আর আমার বেলায় মুখ খুললেই তেঁতো তেঁতো কথা বের হয়!
আদিল আর কিছু না বলে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
"তুই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে এখানে কেন এসেছিস?
মাহি লজ্জায় চোখ নামিয়ে নরম কণ্ঠে উত্তর দেয়,
– আপনার সঙ্গে প্রেম করতে এসেছি।
আদিল ভ্রু কুঁচকে তাকায়, "মাইর দেবো?
মাহি খিলখিল করে হেসে বলে,
– দিতেই পারেন, তবে সঙ্গে ভালোবাসাটাও দিতে হবে।
এই বলে মাহি হঠাৎ নিজের ব্যাগ খুলে একটা ছোট টিফিন বক্স বের করে। ঢাকনা খুলতেই ভেতর থেকে ভেসে আসে নুডলসের সু ঘ্রাণ। কাঁটা-চামচে একটু নুডলস তুলে সে আলতো করে আদিলে’র মুখের সামনে ধরে। আদিল এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে, তারপর আর কোনো আপত্তি না করে মুখে তুলে নেয়। মাহি নিঃশব্দে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন বুঝতে চায়, রান্নাটা আদৌ ভালো হয়েছে কিনা।
একটু দ্বিধা নিয়ে সে জিজ্ঞেস করে,
– নুডলস কেমন হয়েছে আদিল ভাইয়া?
আদিল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। সেই নীরবতা মাহি’র বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। যে মেয়েটা জীবনে কখনো রান্নাঘরের ধারেকাছেও যায়নি, সে আজ কত যত্ন করে, কত কষ্ট করে রান্না করেছে। এই ভাবনাটাই তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই আদিল মুচকি হেসে বলে ওঠে—
"হুম…অনেক অনেক অনেক টেস্ট হয়েছে।
আচ্ছা বল তো, এটা কে রান্না করে দিয়েছে? আম্মা না বড় আম্মা?
মাহি সঙ্গে সঙ্গে অভিমানী মুখ করে বলে,
– এতো কষ্ট করে নিজে হাতে রান্না করলাম, হাত পুড়িয়ে ফেললাম আর আপনি বলছেন আম্মা'রা রান্না করেছে!
এই কথা শুনেই আদিলে’র চোখ বদলে যায়। সে দ্রুত মাহি’র হাত টেনে নিয়ে ভালো করে দেখতে থাকে। হাতের আঙুলে আর তালুতে হালকা পোড়া দাগ স্পষ্ট। সেই দাগ দেখে আদিলে’র বুকের ভেতর রাগ আর অস্থিরতা একসাথে চেপে বসে। কর্কশ কণ্ঠে সে বলে ওঠে…
"বেয়াদব! তোকে কে বলেছে এই শীতে হাত পুড়িয়ে রান্না করতে? আমি কি তোকে বলেছি আমার জন্য নুডলস বানিয়ে আনতে?
মাহি একটুও ভয় পায় না। বরং খিলখিল করে হেসে আদিলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আপনি না বলেন আমাকে ভালোবাসেন না? তাহলে আমার হাত পুড়ে গেছে দেখে আপনার এতো রাগ হচ্ছে কেন, হুম হুম হুম ?
সঙ্গে সঙ্গে আদিল চুপ হয়ে যায়। এই নীরবতা তার জন্য নিরাপদ নয়— সে জানে। কারণ সে যত বেশি চুপ থাকবে, মাহি’র চোখের দিকে তাকাবে, ততই নিজের সিদ্ধান্তে টলমল করবে। অথচ যেভাবেই হোক, তাকে মাহি’কে নিজের কাছ থেকে দূরে সরাতেই হবে। কয়েক দিনের সুখের বিনিময়ে সে সারাজীবনের কান্না উপহার দিতে পারবে না। যতটা কঠোর হওয়া দরকার, সে ততটাই কঠোর হবে, নিজের হৃদয় ভেঙে হলেও।
আদিল আলতো করে মাহি’র হাত নিজের হাতের ভাঁজে জড়িয়ে ধরে। কণ্ঠটা অস্বাভাবিক নরম, কিন্তু কথাগুলো নির্মম—
"মাহি কুইন, প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা কর। আমি তোকে একটুও ভালোবাসি না। এমনকি তোকে কখনোই আমার লাইফ পার্টনার বানাতে পারবো না।
মাহি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। চোখে তখনো বিশ্বাসের আলো,
– কেন পারবেন না? মানুষ চাইলে তো সব পারে। আপনি ধীরে ধীরে আমাকে ভালোবাসুন। আচ্ছা, ভালোবাসতেই হবে না…আপনি শুধু আমার হয়ে থেকে যান।
আদিল চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিশ্বাস নেয়। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
"মাহি, তুই কেন বুঝতে পারছিস না, এটা অসম্ভব। যদি সম্ভব হতো, আমি নিজেই চেষ্টা করতাম। কিন্তু বল তো, একটাই মন আমি কয়জনকে দেবো? আমি অলরেডি অন্য একজনকে ভালোবাসি। তাকে আমি কীভাবে আমার জীবন থেকে মুছে দিয়ে তোকে গ্রহণ করবো?
এই কথাগুলো মাহি’র বুকে বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করে। তার চোখ ছলছল করে ওঠে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা শুরু হয়। সে ধীরে ধীরে আদিলে’র কোল থেকে উঠে দাঁড়ায়।
– আদিল ভাইয়া…আপনি মিথ্যা বলছেন, তাই না? আপনার জীবনে সত্যি সত্যি আর কেউ নেই, তাই তো?
আদিল চোখ নামিয়ে নেয়। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে,
"না কুইন, আমি সত্যি সত্যি অন্য একজনকে ভালোবাসি। আচ্ছা বল, তোর কেমন ছেলে পছন্দ? আমি নিজ হাতে তার সঙ্গে তোর বিয়ে দিয়ে দেবো।
মাহির চোখ দিয়ে টুপটাপ করে পানি ঝরে পড়ে। কাঁপা কণ্ঠে সে বলে,
– আমার অন্য কাউকে লাগবে না। আমার আপনাকেই লাগবে। আপনি কেন বুঝতে পারছেন না আদিল ভাইয়া? এই মাহি’র জীবনে আপনি ছাড়া আর কোনো পুরুষ নিষিদ্ধ!
আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি তার থাকে না। কাঁপা হাতে কলেজ ব্যাগটা তুলে নিয়ে সে দৌড়ে বেরিয়ে আসে। পেছনে তাকায় না একবারও। আদিল সেই শূন্য জায়গার দিকে তাকিয়ে থাকে। বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে আসে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলে—
"তোকে কষ্ট দিতে চাই না কুইন,কিন্তু এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই আমার। সবার কপালে এমন পাগলী জোটে না। দেখ, তোকে এতো কাছে পেয়েও নিজের করে নিতে পারলাম না। তোকে কখনো মুখ ফুটে বলতে পারবো না…ভালোবাসি আমার মাহি কুইন’কে। অসম্ভব ভালোবাসি!
রাত তখন ঠিক এগারোটা! পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ, কিন্তু ছাদের উপর যেন এক অন্যরকম ব্যস্ততা। অয়ন, আদিল, রাকিব, সাজ্জাদ, মাহি আর মুন—সবাই একসাথে ছাদে দাঁড়িয়ে আহি’র জন্মদিনের সারপ্রাইজের আয়োজন করছে। অয়নে’র পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো ছাদটা সাজাতে হবে নিখুঁতভাবে। হাতে সময় মাত্র এক ঘণ্টা, তার মধ্যেই সব শেষ করতে হবে।
ছাদের এক পাশে বেলুন ফোলানো হচ্ছে, আরেক পাশে লাইট ঝুলছে। কোথাও ফুলের তোড়া সাজানো হচ্ছে, কোথাও কেকের জায়গা ঠিক করা হচ্ছে। সবার মুখে তাড়া, তবুও একটা চাপা উত্তেজনা। আহি’র রিঅ্যাকশন কেমন হবে, সেটা ভেবেই।
হঠাৎ অয়ন কাজের ফাঁকে রাকিবে’র দিকে তাকিয়ে খানিকটা গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
“ওই, মাদারবোর্ড কাঠ গোলাপের গুচ্ছ এনেছিস তো?
অয়নে’র কথা শুনে সবাই মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। ঠিক তখনই মুন কপাল কুঁচকে সরল গলায় প্রশ্ন করে বসে,
- ভাইয়া…মাদারবোর্ড অর্থ কি?
তার প্রশ্নটা শুনেই ছাদজুড়ে একরাশ হাসি ছড়িয়ে পড়ে। সাজ্জাদ হেসে দুই হাতে মুখ চেপে ধরে। অয়ন আর আদিল নিঃশব্দে হাসে, অথচ এই হাসির ভিড়ে শুধু দু’জন আলাদা মাহি আর মুন।
মাহি নীরবে নিজের কাজে ব্যস্ত, যেন এসবের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। আর মুন দাঁড়িয়ে আছে হ্যাবলার মতো, একদমই বুঝে উঠতে পারছে না সবাই কেন হঠাৎ এমন হাসছে। রাকিব কয়েক কদম এগিয়ে এসে মুনে’র সামনে দাঁড়ায়।
সে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
"তুমি সত্যিই জানো না মাদারবোর্ড অর্থ কী?
মুন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে নিঃশব্দে অস্বীকার করে। এই সরল স্বীকারোক্তিতে রাকিব আরও অবাক হয়ে যায়। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অয়ন দ্রুত এগিয়ে এসে রাকিবে’র কাঁধে হাত রাখে।
অয়ন ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে বলে—
“ভাইরে, ও আমার বোন হলেও ওর মধ্যে আমার এক ফোঁটা গুণও নেই। তাই এমন হ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকিস না, মুখটা বন্ধ কর নয়তো আস্ত মহিষ ঢুকে যাবে।
রাকিব যেন অষ্টম পর্যায় থেকে পড়লো। সে আরেকটু অয়নে'র কাছে মুখ লাগিয়ে ফিসফিস করে ,
"ভাই তাহলে তুই তোর বোন'টাকে আমার কাছে দিয়ে দে।
অয়ন বিষ্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে আওরায়,
“কেন? আমার বোন'কে তুই তোর কোন শাউ*য়্যার ভেতরে রাখবি?
"তুই তোর বউ'কে যে শাউ*য়্যার ভেতর রাখবি আমিও তেমন তোর বোন'কে সেই শাউ*য়্যার ভেতর রাখবো।
কথাটা বলেই রাকিব দু-হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে।
সঙ্গে সঙ্গে অয়ন রাকিবে’র পিঠে কিল বসিয়ে দেয়। রাকিব হকচকিয়ে পেছনে তাকায়। তারপর মুখে বিরক্তি ঝলমলিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
"এই শাউ*য়্যার জীবনে সত্য কথার ভাত নেইচ হু!
অয়ন ঠোঁটের কোণে কুণ্ঠাহীন হাসি ঝুলিয়ে ধমকে ওঠে,
“তোরে ভাত কে খাইতে বলেছে, তুই গিয়ে বিরিয়ানি খা!
রাকিব বিরবিরিয়ে গলায় জোর দিয়ে বলেন,
"তোর বোনের থেকে কোনো বিরিয়ানির এই মুখে রুচবে না!
“কি বলি, শালার পুত…
ততক্ষণে অয়ন ক্ষীপ্ত হয়ে রাকিবে’র পিছু ছুটতে থাকে। রাকিব এদিক-ওদিক দৌড়াতে থাকে, হেঁটে হেঁটে পিছু ফিরে তাকাচ্ছে। অয়ন তাকে ধরতে না পেরে অবশেষে তার দিকে জুতা ছুড়ে মারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, জুতাটা গিয়ে সোজা আদিলে'র কপাল বরাবর লাগে। আদিল হকচকিয়ে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই অয়ন দ্রুত দৌড়ে নিচে নেমে আসে।
আহি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল, গায়ে জড়িয়ে ধরে তার প্রিয় পুতুল। কিন্তু এই শান্ত ঘুমটি অয়নে’র একটুও সহ্য হলো না। ধীরে ধীরে সে আহি’র দিকে এগিয়ে আসে, নিজের ঠান্ডা হাত জোড়া করে আহি’র কোমল গালে রাখে। আহি অচেতনভাবে নড়ে উঠলো, তারপর অন্য পাশে ঘুরে শুয়ে পড়ে।
মূহুর্তেই অয়নে’র মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে যায়। সে ধীরে ধীরে আহি’র কাছে থাকা পুতুলটি সরিয়ে নিজে সেই জায়গায় শুয়ে পড়ে। অয়ন ধীরে ধীরে আহি’র পাশে শরীর মিশিয়ে নেয়, আর আহি’র চুলের মিষ্টি ঘ্রাণে সে যেন মাতাল হয়ে ওঠে। আচমকা অয়ন আহি’র ওষ্ঠ জোরে চুম্বন করে, একের পর এক। এক হাত দিয়ে আহি’র কোমর জরিয়ে নিজের দিকে টেনে আনে।
হঠাৎ আহি ঠান্ডা স্পর্শ পেয়ে কেঁপে ওঠে। সে অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। বারবার চেষ্টা করেও স্বাভাবিকভাবে নিজেকে ছাড়াতে পারে না। হুট করে সে বুঝতে পারে, তাকে কোনো পুরুষ শরীরে জড়িয়ে ধরে আছে, তখনই চিৎকার দেয়। কিন্তু গলার শব্দ বের হয় না, কারণ অয়ন তার মুখ চেপে ধরে আছে। আহি রীতিমতো নিজের সব শক্তি দিয়ে অয়নে’র শরীরে খাঁমচে দেয়। এমন জোরে যে সঙ্গে সঙ্গে অয়নে’র শরীরে দাগ স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
হঠাৎ অয়ন তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
“পাখি, তোকে ভালোবাসার আগে এমনভাবে খাঁমচে দিলি, এখন তো আমার ভিষণ প্রেম প্রেম পাচ্ছে!
আহি ভয়ে ভয়ে গুটিয়ে যায়। হঠাৎ সে কেঁদে ওঠে। অয়ন সাথে সাথে উঠে বসে এবং রুমের লাইট অন করে। আলোতে দেখা মাত্র আহি তাকে ঝাপটে ধরে, কান্নায় ভেসে যায়। অয়ন চেষ্টা করে আহি’কে শান্ত করার, কিন্তু পারছে না।
“এই দোয়েল পাখি, কি হলো? কেন কাঁদছিস? এমন করে কাঁদিস না প্লিজ।
আহি কিছু বলে না, কেবল নীরবে কাঁদতে থাকে। অয়ন আবারও ধীরে ধীরে বলল,
“প্লিজ, পাখি, কাঁদিস না। দেখ, আমি তো কিছুই করিনি। তুই কাঁদিস না পাখি, আমার একটুও ভালো লাগে না। অনেক কষ্ট হয়, তুই তোর অয়ন ভাই'কে কষ্ট দিবি।
"আপনি এমন করে আসলেন কেন, অয়ন ভাই? আপনি জানেন আমি কতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম? আমি ভেবেছিলাম…অন্য কেউ এসেছে।
অয়নে’র চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে ওঠে। গলায় চাপা রাগ নিয়ে বলল,
“আমি ছাড়া আমার প্রপার্টির দিকে হাত দেওয়া তো দূরের কথা, যে সামান্য নজর দেবে, তার কলিজা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।
কথাটা বলেই অয়ন হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকায়। সময়— ১১টা ৪৫ মিনিট।
আর সময় নেই। সে দ্রুত আহি’কে বিছানা থেকে নামিয়ে হাতে একটা শাড়ি তুলে দেয়,
“দোয়েল পাখি, ফাস্ট শাড়িটা পড়ে আয়।
আহি ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
"কেন, অয়ন ভাই?
“ইস্স্! তোর কথা শুনতে চাই না। তাড়াতাড়ি পড়ে আয়।
এই বলে আর কোনো সুযোগ না দিয়ে অয়ন আহি’কে ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। নিজে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। আহি কিছুই বুঝতে পারে না। তবুও শাড়িটা পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু শাড়ি পড়ায় সে একেবারেই অভ্যস্ত নয়। অনেক চেষ্টা করেও ঠিকভাবে প্যাঁচাতে পারে না। শেষমেশ শুধু ব্লাউজ আর পেটিকোটের উপর শাড়িটা কোনো রকম কোমরে জড়িয়ে নিয়ে বাইরে আসে।
দরজার শব্দে অয়ন ঘুরে তাকায়। এক ঝলকেই সে থমকে যায়। চোখ সরাতে পারে না। নিজের অবাধ্য দৃষ্টি সামলাতে ব্যর্থ হয়।
কয়েক সেকেন্ড পর নিজেকে সামলে নিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করে অয়ন,
“পাখি, এভাবে এসেছিস কেন?
আহি মাথা নিচু করে লাজুক গলায় বলল,
"আ আ আ আমি শাড়ি পড়তে পারি না।
অয়ন আর কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। কিছু সময় পর সে আবার ফিরে আসে, সঙ্গে মাহি। চাইলেই অয়ন নিজে আহিকে শাড়ি পড়িয়ে দিতে পারতো। কিন্তু সে চায় না কোনো ভুল বোঝাবুঝি হোক, কোনো সীমা অতিক্রম হোক। তাই নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেই মাহি'কে নিয়ে এসেছে।