অয়ন রুমের ভেতর এদিক-ওদিক অস্থিরভাবে হাঁটাহাঁটি করছে। পেটের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠছে, খিদের যন্ত্রণায় মাথায় কিছুই ঢুকছে না। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, আবার বিরক্তিতে চুলে হাত বুলাচ্ছে। ঠিক তখনই হঠাৎ দরজায় কারো টোকা পড়তেই তার বিরক্তি চরমে পৌঁছে যায়।
কর্কশ কণ্ঠে বিড়বিড় করতে করতে সে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজার লক খুলতে খুলতেই রাগ ঝরে পড়ে তার কথায়—
“শাউয়ার নাতি, কোন বা*ল ফালাইবার জন্য এখন আবার আমার রুমে এসেছিস!
কথাটা শেষও হয়নি, তার চোখের সামনে দৃশ্যটা বদলে যায়। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে আহি, হাতে খাবারের প্লেট। মুহূর্তের মধ্যেই অয়নে'র সমস্ত বিরক্তি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। বহুক্ষণ ধরে যে মানুষটাকে দেখতে মনটা অস্থির হয়ে ছিল, সে হঠাৎ করেই চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে তার। এক সেকেন্ডের জন্য সে নিশ্চুপ হয়ে যায়। তারপর নিজেকে সামলে হালকা হাসি টেনে বলে, “হাও দিস পসিবল? কুইন নিজে আমার জন্য খাবার নিয়ে হাজির, কেমনে কী?
আহি দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্ত গলায় জবাব দেয়,
"আয়রনের বাচ্চা, আপনি আমাকে রুমে ঢুকতে দেবেন নাকি এখান থেকেই চলে যাবো?
অয়ন তড়িঘড়ি করে হাত নেড়ে বলে ওঠে,
“এই না না, ভেতরে আয়! দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
আহি গুটি গুটি পায়ে রুমে ঢুকে পড়ে। চারপাশে একবার তাকিয়ে নেয়, তারপর নির্দিষ্ট জায়গায় খাবারের প্লেটটা রেখে দেয়। মুখে অনিচ্ছার ছাপ স্পষ্ট।
"শুনেন, ভাইয়া বললো তাই খাবারটা দিয়ে গেলাম। না হলে একটা জাওড়ায়র রুমে আসার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। খাবারটা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন, আমি যাচ্ছি।
সে ঘুরে দাঁড়াতে যাবে ঠিক তখনই অয়ন আচমকা তার হাতটা আঁকড়ে ধরে। স্পর্শটা হালকা হলেও কণ্ঠ স্বরটা নরম করে ফিসফিসিয়ে বলে—
“খাবারটা যেহেতু এনে দিয়েছিস, একটু খাইয়ে দে না। প্লিজ কুইন, মানা করিস না। এই শীতে এমনিতেই প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তার উপর তোর ঠান্ডা পানি চক্করে আবার শওয়ার নিতে হয়েছে।
আহি চোখ বড় করে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,
"পারবো না।
কিন্তু অয়ন থামে না। সে ধীরে ধীরে কয়েক কদম এগিয়ে আসে। তার দৃষ্টি, তার উপস্থিতিতে মূহুর্তেই আহি অস্থির হয়ে পড়ে। তাড়াহুড়ো করে বলে ওঠে…
"দিচ্ছি দিচ্ছি! এমন করে কাছে আসবেন না আয়রন!
অয়ন হঠাৎ থেমে যায়। নিঃশব্দে বিছানার দিকে চলে গিয়ে বসে পড়ে, চোখে তখনও বিশাল এক শান্তির মিশ্রণ। আহি, তার হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে, নরম ধাপ দিয়ে এগিয়ে আসে। অয়নে' র দৃষ্টি এখনোও শুধুই আহি'র দিকে স্থির। আহি ছোট্ট একটি লোকমা তুলে ধরে, অয়ন'র মুখে পুড়ে দেয়। কয়েক লোকমা ভাত অয়নে’র মুখে দিতেই, আহি’র আঙুলে কামড় বসিয়ে দেয় সে! ব্যথায় আহি কুঁকড়ে উঠে। মুখের ভঙ্গি মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়—
"উফফফ!
তার ব্যথা অয়নে'র বুককে যেন অদ্ভুতভাবে শান্ত করে। অয়ন কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলে,
“কুইন, তোর মুখ থেকে স্পেশালভাবে এমন শব্দ শোনার সৌভাগ্য আমার কবে হবে?
আহি তৎক্ষণাৎ তেড়ে আসে, চোখে আগুনের ঝলক…
"নষ্টামি করার জায়গা তো পান না? একটু ভালো করে কথা বলছি আর ওমনি আসল রূপে ফিরে এসেছেন আয়রনের বাচ্চা! দিলাম না খাইয়ে, কি করবেন আপনি?
রাগে আহি গজগজ করে উঠে দাঁড়ায়। আর অয়ন থমথমে গলায় তাড়া দেয়,
“পাখি, সরি…সরি…সরি! আমার মস্ত বড় ভুল হয়েছে। প্লিজ ক্ষমা কর। সত্যি বলছি, এমন কথা আর কোনোদিন বলবো না। দে না খাইয়ে খুব খিদে লেগেছে। এই দেখ, শরীর থেকে পাঁচ কেজি ওজনও কমে গেছে।
আহি দাঁতে দাঁত পিষে কটমট করে বিরবির করে,
"পাঁচ কেজি কেন? বিশ কেজি কমলেও ওই শরীর গন্ডারের মতো লাগবে।
অয়ন ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কিছু বললি?
"না কিছু বলিনি। এবার খেয়ে আমাকে উদ্ধার করেন।
“খেতেই তো চায় কিন্তু তুই চান্স দিলে তো খাবো। না মানে, খাইয়ে দে শুধু শুধু তো বকবক করছিস।
আহি অয়ন'কে খাইয়ে দেওয়া শেষ হলে উঠে দাঁড়ায়। সে দরজার কাছাকাছি যেতেই কারো শক্ত পোক্ত বুকের সাথে ধাক্কা খায়। উপরে তাকিয়ে অয়ন'কে দেখে মেজাজ বিগড়ে যায়। মাএ বিছানায় বসে থাকতে দেখে আসলো, এখন আবার তার সামনে।
"কি সমস্যা আপনার? খাবার খেয়েও পেট ভরেনি আপনার?
হুট করে অয়ন আহি'র ঠোঁটে আলতো ভাবে স্পর্শ করে! আহি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। অয়ন বুকের পাশে হাত দিয়ে ধীর কন্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“ওভাবে তাকিয়ে থাকিস না কুইন… এখানে লাগে!
আহি'র হৃদয় কেমন যেন অচেনা রকম কেঁপে ওঠে।
হঠাৎ করেই আহি মুখ ঝিমিয়ে বলল,
"বদ লোক, আপনার কপালে বউ থাকবে না দেখে নিয়েন।
আহি কোনো কথা না বাড়িয়ে, সে ধুপধাপ পা ফেলে রুমের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়।
•
•
মুখের ওপর ঠান্ডা পানির ঝর্ণা পড়তেই ধরফরিয়ে উঠে বসে আদিল। হঠাৎ ধাক্কায় বুক ধড়াস করে ওঠে। চোখ-মুখ কুঁচকে সে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে চারপাশে তাকায়। ঠিক তখনই চোখের সামনে মাহি'কে দেখতে পেতেই মুহূর্তের মধ্যে মাথায় রাগ চওড়া হয়ে ওঠে।
দাঁত কিড়মিড় করে সে গর্জে ওঠে,
"মাহির বাচ্চা, তুই এখানে?
মাহি একটুও বিচলিত না হয়ে ভেংচি কেটে হাসে। কণ্ঠে নির্লজ্জতার ছাপ,
- এই মাহি'র বাচ্চা এটা কেমন কথা? তার থেকে নিজের বাচ্চার মা বললেও তো ভালো হতো!
আদিলে'র চোখ রাগে লাল হয়ে ওঠে। সে বিছানায় বসেই ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,
"তুই আমার রুমে কী করছিস এত সকাল সকাল?
মাহি নির্বিকার ভঙ্গিতে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং গলায় দুষ্টু সুরে বলল,
- হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল, তাই ভাবলাম আমার বাচ্চা কাচ্চার বাবার সঙ্গে ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু আলাপ করি। কিন্তু আপনি তো এসব বোঝেন না। বুঝেন শুধু আমার ওপর চিৎকার-চেঁচামেচি করতে!
কথাগুলো শুনে আদিল মাথা চেপে ধরে। বিরক্তি আর রাগে মুখ খিঁচিয়ে ওঠে তার। দাঁত কামড়ে বলে,
"তুই তাড়াতাড়ি এই রুম থেকে বের হ। নইলে একদম খুন করে ফেলবো!
কিন্তু আদিলে'র হুমকিতে একটুও ভয় পায় না মাহি। উল্টো সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আদিলে'র গা ঘেঁষে বসে পড়ে। চোখে দুষ্টুমি, ঠোঁটে হাসু টেনে ফিসফিস করে বলে,
- আমি কিন্তু রাজি, হ্যান্ডসাম!
আদিল হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বিছানা থেকে সরে যায়। মাথায় চুল খাঁমচে রীতিমতো চিৎকার করে ওঠে,
"ওহ শীট! তুই বের হবি নাকি? সত্যি সত্যি এবার খুন করে ফেলবো!
আদিলে'র চিৎকারের শব্দে মুহূর্তের জন্য মাহি থমকে যায়। তবে সেটা ভয় পেয়ে নয়, বরং আদিলে'র মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে সে। সেই হাসিতে ভয় কম, দুষ্টুমি বেশি। মাহি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তারপর এক পা এগিয়ে এসে আদিলে'র সামনে দাঁড়িয়ে হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে বলে,
- খুন করবেন? এই সকাল সকাল? আরে বাবা, খুন করলে তো আপনার বাচ্চাকাচ্চারা এতিম হয়ে যাবে!
আদিলে'র মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলে ওঠে। সে বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে ওদিক ওদিক তাকায়,
"তুই একটা মহা বিপদ! সকাল সকাল আমার মাথা নষ্ট করার লাইসেন্স নিয়ে আসছিস নাকি?
মাহি আয়নার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজের চুল ঠিক করতে করতে অনায়াস ভঙ্গিতে বলে,
- লাইসেন্স লাগে না। আপনার মাথা এমনিতেই নষ্ট, একটু নাড়াচাড়া করলেই হলো।
"জাস্ট শাট আপ!
আদিল হঠাৎ গর্জে ওঠে।
"আমার রুমে এসে এসব নাটক করবি না। বল, কী চাই তোর?
মাহি আয়না থেকে চোখ সরিয়ে ধীরে আদিলে'র দিকে তাকায়। এবার তার চোখে আর আগের দুষ্টুমি নেই, বরং একরাশ ভালোবাসা আর মুগ্ধতা। সে ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, ব্যথাভেজা হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,
- আপনাকে চাই! ঠিক ততটাই চাই, যতটা ক্যান্সারের রোগী বেঁচে থাকার আশায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে। আপনি আমার হয়ে যান না…সত্যি বলছি, এরপর আর কিছু চাইবো না আমি।
কথাগুলো শুনে আদিলে'র বুক কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে যায়, কিন্তু নিজের দুর্বলতা লুকাতে মুখে বিরক্তির ছাপ টেনে আনে। কর্কশ গলায় বলে ওঠে,
"তুই রুম থেকে বের হবি, নাকি লাথি দিয়ে বের করে দেবো?
মাহি অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। সে একচুলও নড়ল না। বরং মুচকি হেসে বলল,
- তার আগে অয়ন ভাইয়ার মতো ছোট্ট করে একটা চুমু দিন!
"মাহি…!
আদিলে'র গলা হঠাৎ চড়া হয়ে ওঠে।
মাহি ভ্রু কুঁচকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে,
- এত চিৎকার করেন কেন? আপনার গলা ব্যথা করে না? এসব বাদ দেন। আমার একটা প্রশ্ন আছে, তার উত্তর দিন।
"তাড়াতাড়ি বল, তারপর রুম থেকে বেরিয়ে যা।
মাহি এবার গম্ভীর হয়ে যায়। চোখে জমে ওঠে অভিমান আর অভিযোগের মিশ্র রঙ। ধীর তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে,
- আপনার ফেসবুক আইডিতে তো আমাকে ঝুলিয়ে রেখেছেন। অথচ মুনে'র ফোন থেকে দেখলাম, আপনি একটা মেয়ের সঙ্গে লুতুপুতু করে ছবি তুলেছেন। বলেন তো, ওই মেয়েটি কে? এমনকি ওই ডাইনির সাথে গতকাল কফি শপে দেখা করলেন। আমি বললে তো এক গ্লাস পানিও খান না অথচ ওই ডাইনির সঙ্গে কত কিছু খেলেন।
হঠাৎ আদিলে'র ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। কণ্ঠে রাগ আর বিরক্তি চেপে ধরে সে চেঁচিয়ে ওঠে,
"থামবি তুই? ডাইনি মানে কি? ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, আমি ওকেই বিয়ে করবো। সো সম্মান দিয়ে কথা বলবি। নেক্সট টাইম ওর নামে কোনো বাজে কথা শুনলে একদম খারাপ হয়ে যাবে মাইন্ড ইড। আর এক্ষুনি বের হয়ে যা, জাস্ট গেট আউট।
কথাগুলো মাহি'র বুকে যেন ধারালো ছুরির মতো গেঁথে যায়। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর ধরে রাখতে পারে না, টলমল করে ওঠে। একটা মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে সে কখনো কল্পনাও করেনি। তার মনে কি একটুও মায়া নেই? ভালোবাসা কি সত্যিই এত বড় অপরাধ? সে তো কিছু চাইছিল না—শুধু একটু ভালোবাসা, একটু যত্ন। তবুও কেন এত ঘৃণা? যে মানুষটা তাকে সহ্যই করতে পারে না, সেটা কেন সে বুঝতে পারছে না মাহি? সামান্য ভালোবাসা দিলে কি খুব বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেত? অথচ সে স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করে যাচ্ছে, বারবার আঘাত দিচ্ছে। মাহি আর কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
তার চলে যাওয়ার কিছু সময় পর দরজায় নরম শব্দ হয়। মুন ভেতরে ঢোকে। মুন'কে দেখেই আদিলে'র মুখে অজান্তেই একটা মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। সে হাত ইশারায় মুন'কে কাছে ডাকলে মুন নিঃশব্দে এসে আদিলের পাশে বসে। আদিল তখন খেয়াল করে, মুনে'র চোখের কোণে জমে আছে অশ্রু। সে আনমনে বলে ওঠে,
"বোন, কী হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন?
মুন অভিমানী গলায় উত্তর দেয়,
- ভাইয়া, তুমি আমার সঙ্গে কত সুন্দরভাবে বিহেভ করো। অথচ মাহি'র সঙ্গে এমন করো কেন? ও তো সত্যি সত্যি তোমাকে অনেক ভালোবাসে। তুমি আমার চোখের অশ্রু দেখেই বুঝতে পারো আমি কষ্টে আছি। অথচ মাহি'র চোখের অশ্রু দেখেও তুমি ওকে কষ্ট দিয়ে কথা বলো। ওকে একটু ভালোবাসা দিলে কী এমন ক্ষতি হতো? হয়তো আমি কাউকে ভালোবাসি না, কিন্তু মাহি'কে দেখে বুঝেছি ভালোবাসার ব্যথা কতটা তীব্র হতে পারে।
আদিল চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলে,
"তুই কি মাহি'র হয়ে সাফাই গাইতে এসেছিস?
মুন মাথা নাড়িয়ে শান্ত স্বরে বলে,
- না ভাইয়া! তবে জানো কি, একটা মেয়ে যেমন নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে, ঠিক তেমনি জেদ হলে সেই ভালোবাসাকে পায়ের নিচেও ফেলতে পারে। আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই, সময় নাও। কিন্তু নিজের মনের কথা না জেনে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিও না। নয়তো পরে পস্তাতে হবে।
কথা শেষ করে মুনও ধীরে ধীরে চলে যায়। বোনের কষ্ট সহ্য হচ্ছে না তার। আর কিভাবেই বা সহ্য হবে, যার সঙ্গে দশ মাস দশ দিন একই মায়ের গর্ভে লালিত হয়েছে। প্রায় একই সঙ্গে পৃথিবীর আলো দেখতে পেয়েছে, তার সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হাটতে শিখেছে। তার কষ্ট সে সহ্য করবে কিভাবে।
🌸🖤
কনসালট্যান্ট সার্জন ড. আদনান শেখ অয়ন— ইউএস থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে অবশেষে দেশে ফিরেছে! আজ তার জন্য বিশেষ দিন। হসপিটালের প্রতিটি করিডোর যেন ব্যস্ততায় থমথম করছে। সহকর্মী ডাক্তার, নার্স, স্টাফ সবাই নতুন করে তাকে বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষায়। অথচ সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটাই এখনো বাসায়, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দিব্যি রেডি হচ্ছে। অয়ন গুনগুন করতে করতে নিজের টাই ঠিক করে নেয়। আয়নায় একবার নিজেকে দেখে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে ওঠে ঠোঁটে। চোখে কালো সানগ্লাস পড়ে ধীরে ধীরে পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। কিছু পথ গিয়ে তার পা থেমে যায় আহি’র রুমের সামনে।
ভেতরে আহি কলেজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। গায়ে পরিপাটি কলেজ ড্রেস, চুল পেছনে গুছানো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে ঠোঁটে হালকা গোলাপি রঙের লিপস্টিক লাগাচ্ছে। অয়ন উঁকি দিতে গিয়ে রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ে। আশ্চর্যের বিষয়, তার উপস্থিতি আহি একদমই টের পায় না। লিপস্টিক দেওয়া শেষ করে আহি পেছনে ঘুরতেই আচমকা অয়নে'র সঙ্গে ধাক্কা লাগে। ভয় পেয়ে সে এক পা পিছিয়ে যায়। চোখ বড় বড় করে কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে—
"অ অ অ…অয়ন ভাইয়া আপনি?
‘ভাইয়া’ শব্দটা কানে যেতেই অয়নে'র মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। চোখের দৃষ্টিতে মুহূর্তেই রাগের ছাপ। সে ধীরে ধীরে আহি’র খুব কাছে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে,
“কী বললি?
আহি আরও নার্ভাস হয়ে পড়ে। গলা শুকিয়ে আসে, তবু সাহস করে আবার বলে…
"অয়ন ভাইয়া…
অয়ন ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
“সো হোয়াট ভাইয়া? আমি তোর কোন জন্মের ভাইয়া লাগি?
আহি হতভম্ব! কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না।
"তা…তা হলে কী বলবো?
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। যেন ভেতরে ভেতরে কিছু হিসাব করছে। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“আই’ম ড্যাম শিওর, তুই আমাকে জান, কলিজা, সোনা, লোহা এইসব কিছুই বলবি না। তবে আজ থেকে আমাকে অয়ন ভাই বলবি।
সঙ্গে সঙ্গে আহি মুখ বেঁকিয়ে প্রতিবাদ করে বসে,
"ভাই আর ভাইয়া তো একই জিনিস! তাহলে এত ঢং করছেন কেন?
অয়ন চোখ রাঙিয়ে বলে,
“চুপ কর মাতারী! ভাইয়া ডাকটা অন্তর থেকে আসে, আর ভাই ওটা বলার আগেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তাই তুই আজ থেকে আমাকে অয়ন ভাই বলবি, ব্যস।
"বললেই হলো? মাহি, মুন, সাজ্জাদ ভাইয়া সবাই আপনাকে ভাইয়া বলবে আর আমি ভাই বলবো?
অয়ন একচিলতে হাসি হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়—
“তো কী হয়েছে? সবাইকে কি আমি বিয়ে করবো নাকি? বউ তো তুই-ই হবি আমার, তাই তুই শুধু ভাই বলবি। বাকিরা সবাই আমার আপন বোন। আর তুই…তুই আমার আপন কেন, কোনো বোন হোস না।
আহি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে! আচমকা অয়ন তার অধর জোরা নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। আহি কি বলবে ভেবে পায় না, হুটহাট লোকটা কেন তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে বোঝা মুশকিল। মানুষ কোনো কাজ করার আগেই ওয়ার্নিং বলতে কিছু একটা দেয় কিন্তু এই লোকটার সেসব কিছু তার ধাতেই নেই। এই ভালো আবার এই উম্মাদ প্রেমিক!
আবারও হুট করেই আহি'কে ছেড়ে দিয়ে অয়ন বড় বড় পা ফেলে চলে যায়। আহি শ্বাস নিতে নিতে অয়ন'কে খুঁজে পায় না। সে রাগে গজগজ করতে করতে বলে,
"জাওড়ার ঘরে জাওড়া তোকে একবার বাগে পায় তারপর খবর আছে।
অয়ন মুচকি হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। হঠাৎ মুন তার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেঁসে দেয়। হাসির শব্দে সবাই মুনে'র দিকে তাকায়। মুন এখনো হাসছে, তা দেখে অয়ন ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তবুও তার হাসি থামে না বরং শব্দ করে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে,
- ভাইয়া তুমি লিপস্টিক দিতে শুরু করলে কবে থেকে?
সঙ্গে সঙ্গে মহিবুল শেখ নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকায়, অয়নে'র ঠোঁটের লিপস্টিকের ছাঁপ স্পষ্ট। সে চোখ রাঙিয়ে বলে,
- বেয়াদব ছেলে লিপস্টিক দেওয়া শুরু করেছে। এ তো আমাদের শেখ বাড়ি নাম ঢুবিয়ে ছাড়বে দেখছি।
অয়ন ঠোঁটের কোণে বাঁকা হেসে টেনে আওড়াল,
“শ্বশুর আব্বা আমি তো আপনার মেয়েকে নিয়ে ডুবতে চাই কিন্তু আপনার মেয়ে তো বুঝে না। আর আমি ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়নি, মাএ আপনার কন্যার ঠোঁট টেস্ট করে আসলাম! ইসসস, কি যে ইয়াম্মি লাগলো। মন তো বারবার চাচ্ছে!
অয়নে'র এইটুকু কথায় মহিবুল শেখে'র মাথায় আগুন জ্বালে উঠে। ঘাড় বাকিয়ে তাকান জাহিদ শেখে'র দিকে,
- ভাইজান আপনি আজও চুপ করে থাকবেন? এই ছেলে দিন দিন নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ আরমান শেখ (সাজ্জাদে'র বাবা+অয়ন,আদিলে'র ছোট্ট চাচ্চু) অয়নে'র দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর তার কাঁধে হাত রেখে নরম কন্ঠে বললেন,
–মেঝ ভাইজান! আমাদের অয়ন কিন্তু মেয়ের জামাই হিসেবে খারাপ নয়। আমাদের আম্মাজানের সঙ্গে বেশ মানাবে। তাছাড়া মেয়েও বাসায় থাকবে।
- তুই চুপ কর। তোর আশকারায় এমন বাঁদর হয়েছে। এবার যদি তুমি বেশি বারাবাড়ি করো তাহলে আমার মেয়েকে অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখবো।
অয়নে'র দিকে তাকিয়ে শেষ কথাটুকু বলল।
সঙ্গে সঙ্গে অয়নও বলে উঠে,
“যে শহরেই লুকিয়ে রাখুন না কেন? আপনার ওই পুঁচকে মেয়েকে খুঁজে বের করার জন্য আমার এক টিম'ই যথেষ্ট!
- কি বললে তুমি…?
অয়ন আমতা আমতা করে বলল,
“আমি…? কই আমি তো কিছু বলিনি। আদিল চল শালা, তোকে অফিসে পিক করে আমি হসপিটালে যাবো। অনেক লেট হয়ে যাচ্ছে।
দুজনেই তারাহুরো করে বেরিয়ে পড়ে। তাদের যাওয়ার দিকে সবাই সন্দেহ ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
হসপিটালের প্রধান প্রবেশদ্বারে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবেশটা যেন নতুন এক উদ্দীপনায় ভরে ওঠে। কয়েকজন খ্যাতনামা স্পেশালিস্ট ডক্টর, দায়িত্বশীল নার্স ও অন্যান্য স্টাফ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অয়ন'কে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। দেশের বাইরে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে ফিরে আসা একজন কনসালট্যান্ট সার্জন'কে নতুনভাবে বরণ করার উত্তেজনা সবার চোখেমুখেই স্পষ্ট। সম্মানসূচকভাবে একজন সিনিয়র ডক্টর এগিয়ে এসে তার হাতে রজনীগন্ধা ফুলের সুগন্ধি তোড়া তুলে দেন। সাদা ফুলগুলোর মিষ্টি ঘ্রাণ মুহূর্তেই চারপাশের পরিবেশটাকে আরও সৌম্য করে তোলে।
অয়ন ঠোঁটে আত্মবিশ্বাসী হাসি ঝুলিয়ে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে। কারো সঙ্গে করমর্দন, কারো সঙ্গে দু–একটি সৌজন্যমূলক কথা বলে। দীর্ঘদিন পর নিজের দেশের কর্মক্ষেত্রে ফিরে এসে এই সম্মান আর ভালোবাসা তাকে ভেতরে ভেতরে গভীর এক তৃপ্তি দেয়।
পরিচয় পর্ব শেষ হতেই ড. জাফর তালুকদার নিজ দায়িত্বে অয়ন'কে তার পার্সোনাল কনসালট্যান্ট রুমে নিয়ে যান। করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি রুম সংক্রান্ত কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য জানাচ্ছিলেন। অয়ন মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিল, চোখ বুলাচ্ছিল হাসপাতালের পরিচ্ছন্ন পরিবেশের দিকে। কনসালট্যান্ট রুমে প্রবেশ করেই অয়ন থমকে দাঁড়ায়। অয়ন ধীরে ধীরে পুরো কনসালট্যান্ট রুমটা পরখ করে দেখে। ডেস্কে হাত বুলিয়ে নেয়, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে একবার তাকায়। রুমটার প্রতিটা কোণেই যেন দায়িত্ব আর সম্মানের ছাপ লেগে আছে।
তবে সবচেয়ে বেশি তার নজর কাড়ে কনসালট্যান্ট রুমের সঙ্গে সংযুক্ত একটি এডজাস্ট করা বিশ্রাম কক্ষ। ভেতরে একটি পরিপাটি বেড রাখা এবং প্রয়োজনীয় জিনিস পএ। মূহুর্তেই অয়নে'র ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, রহস্যময় হাসি খেলে যায়। এই হাসির কারণ কেউ বুঝতে পারলো না।
ড. জাফর তালুকদার কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই তুলি হুড়মুড় করে রুমের ভেতর ঢুকে পড়ে। যেন এতক্ষণ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। দৌড়ে এসে সে অয়ন'কে জড়িয়ে ধরতে গেলে মুহূর্তের মধ্যেই অয়ন তাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়।
“ওই মাতারী, দূরে থাক! বউ'য়ের জায়গায় তুই দৌড়ে আসিস কেন? এই জায়গাটা আমার দোয়েল পাখির জন্য বরাদ্দ!
তুলি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে।
"হোয়াট?
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আচমকা অয়ন তুলি’র গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। শব্দটা যেন রুমের ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। তুলি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অয়নে'র দিকে। চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু অশ্রু জমে ওঠে। কাঁপা কণ্ঠে সে বলে,
"তুই আমাকে থাপ্পড় দিতে পারলি, অয়ন?
অয়নে'র চোখে তখন কোনো নরম ভাব নেই। কঠিন স্বরে বলে ওঠে,
“নিজের পাখি'রে এত ভালোবাসি, তাকেই কষ্ট দেয় আর তুই কোন দেশের বা*ল শুনি?
অয়ন আর তুলি’র সম্পর্কটা ছিল বন্ধুসুলভ। তারা একসঙ্গে কলেজ-ভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছে। কত স্মৃতি, কত আড্ডা, কত নির্ভার সময় ছিল তাদের। অয়ন দেশে ফিরেছে এই খবর সে শুনেছিল, কিন্তু দেখা করা হয়ে ওঠেনি। আজ নিজের হসপিটালেই যখন অয়ন'কে দেখল, তখন প্রথমে অবাক হয়েছিল। তারপর আনন্দে বুক ভরে উঠেছিল তার। আজ থেকে প্রতিদিন এই মানুষটার সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে—এই ভাবনাটাই তাকে আলাদা করে খুশি করেছিল। যাকে এতদিন দূর থেকে কল্পনা করত, সে আজ চোখের সামনে রক্তমাংসের মানুষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ তুলি ভ্রু নাচিয়ে, কৌতুকের আড়ালে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
"ভালোবাসা মানে? তুই এখনো সেই পিচ্চি মেয়েটাকে ভুলতে পারিস নি?
অয়ন কোনো উত্তর দেয় না। ধীরে পকেট থেকে ফোনটা বের করে হাতে নেয়। স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই ভেসে ওঠে আহি'র হাস্যোজ্জ্বল মুখ। সেই ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর পরম মমতায় ফোনের স্ক্রিনে ছোট্ট করে একটা চুম্বন ছুঁইয়ে দেয়।
আনমনে, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে—
“সেই পিচ্চিটাই আমার দোয়েল পাখি। যাকে আমার মনের গৃহিণী করে যত্ন করে ভালোবেসেছি। যার জন্য আমার জীবনে আর কোনো নারীর প্রবেশ ঘটেনি। এই মনটা শুধু তার জন্য বরাদ্দ। আমার ভালোবাসার চাদরে তাকে মুড়িয়ে রেখেছি। তাকে ভুলে যাওয়া তো দূর, সে হীনা এই আদনান শেখ অয়ন এক সেকেন্ডও অন্য নারীতে দৃষ্টিরত হয়নি!
কথাটুকু শুনে তুলি একটুও সন্তুষ্ট হয়নি। ভিষণ রাগ হচ্ছে তার কিন্তু কেন এমন হচ্ছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না। তবে সেই দোয়েল পাখি'কে অনেক হিংসে হচ্ছে। কি আছে তার মধ্যে যে অয়ন অন্য নারীর দিকে ভুলেও তাকায় না, সে কি তুলি'র থেকেও ভিষণ সুন্দরী।
তার ভাবনার মাঝে ছেঁদ ঘটিয়ে অয়ন অনুনয় স্বরে বলল,
“সরি তুলি, তোকে থাপ্পড় দিয়েছি বলে মাইন্ড করিস না। আসলে আমি চাই না আমার দোয়েল পাখি ব্যতিত পর নারী আমাকে স্পর্শ করুক। সে আমার প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা হয়ে চিরকাল থাকবে!
হঠাৎ ফোন বাজতেই অয়ন তড়িঘড়ি হয়ে বেরিয়ে যায়। তুলি তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে, হয়তো নিজের মনকে বৃথা শান্ত করার চেষ্টা করছে।
______________________
তপ্ত রোদের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছিল রাকিব। তার চোখ-মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। হঠাৎ, দূর থেকে একটি কোমল, মেয়েলি কণ্ঠে ভেসে এলো…
–রাকিব ভাইয়া, দাঁড়ান প্লিজ!
রাকিব লক্ষ্য করলো, দূরের একজন মেয়েটিকে। যখন মেয়েটির মুখ পরিষ্কারভাবে দেখা গেল, তখন অপ্রতিরোধ্য এক হাসি তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো। রাকিব ধীরে ধীরে মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটি আর কেউ নয়, সে মুন। সে তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে শুরু করলো। বড় বড় শ্বাস নিয়ে বলল,
–আপনাকে কতক্ষন ধরে ডাকছিলাম, কিন্তু আপনি শুনতে পারছিলেন না।
"সরি মুন, আসলে একটু অন্য মনস্ক ছিলাম। তোমার কোনো দরকার ছিল? আচ্ছা তুমি এখানে একটু দাঁড়াও, আমি আসছি।
রাকিব এই বলে দ্রুত কোথাও চলে গেল। পাঁচ মিনিট পর, সে এক বোতল পানি নিয়ে ফিরে এসে মুনে'র হাতে ধরালো।
"পানিটা খেয়ে শান্ত হয়ে বলো, কী প্রব্লেম। চিন্তা করার কিছু নেই, আমি পালিয়ে যাচ্ছি না।
মুন ধীরে ধীরে পানি শেষ করল। রাকিব অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। মুহূর্ত পর, মুন ধীর কণ্ঠে বলল,
–আসলে ভাইয়া, আমি জানতে চাচ্ছিলাম আদিল ভাইয়ার ব্যাপারে।
"হুম, বলো!
–আপনি হয়তো জানেন, মাহি আদিল ভাইয়াকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু ভাইয়া কিছুই বুঝে না। সে শুধু মাহি'র উপর চিৎকার চেঁচামেচি করে। আপনি কি বলতে পারবেন, আদিল ভাইয়া সত্যি সত্যিই কাউকে ভালোবাসে কি না? সেই আপুটির নাম মনে হয় জুঁই।
রাকিব মুচকি হেসে বলল,
"সব খবর পেলে আমি কি পাবো?
–আপনি যা চাইবেন।
রাকিব অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"যদি তোমাকে চাই!
–কিছু বলছেন ভাইয়া?
"ক ক কই কিছু না তো। আচ্ছা, আমি তোমাকে একটা সিক্রেট বলি, আদিল কাউকে ভালোবাসে না। আর যে জুঁই'য়ের কথা বলেছিল, সে আমার কাজিন। ওর বিয়ে হয়েছে দু’ বছর আগে, আর গতকাল হঠাৎ আদিলে'র সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাই দু'জন মিট করেছিল। তুমি মাহি'কে বলো, চেষ্টা যেন চালিয়ে যায়। আর শোনে এটা যেন আদিল না জানতে পারে নয়তো আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো।
–থ্যাকস্ ভাইয়া। আমি কাউকে কিছু বলবো না, প্রমিজ।
এই বলেই মুন দৌড় দেয় পেছন থেকে রাকিব ডাক দেয়। সঙ্গে সঙ্গে মুন থেমে গিয়ে পেছন ফিরে তাকায়,
"রাকিব এহসান নামে তোমার কাছে একটা রিকুয়েষ্ট গিয়েছে প্লিজ একসেপ্ট কইরো।
মুন মাথা হেলেদুলে স্বীকার করে। তারপর আবার দৌড়ে গন্তব্যের দিকে ছুটতে থাকে। রাকিব তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে,
"পাগলি মেয়ে! এই বাচ্চা মেয়েটাকে বিয়ের পর সামলাবো কিভাবে?
🌸🖤
মাহি মুড অফ করে রুমের ভেতর চুপচাপ বসে আছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু আসলে সে কিছুই দেখছে না। চোখ দুটো ফাঁকা, ভেতরে জমে থাকা কষ্টগুলো যেন নিঃশব্দে চিৎকার করছে। আহি অনেকক্ষণ ধরেই তার পাশে বসে আছে, কখনো গল্প বলছে, কখনো ইচ্ছে করে হাস্যকর কথা বলছে, আবার কখনো জোর করে বিষয় বদলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই মাহি'র মন ভালো হচ্ছে না। হঠাৎ মাহি আর নিজেকে সামলাতে পারে না। আচমকা সে আহি'কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। সেই কান্না এতটাই অসহায় যে মুহূর্তেই আহি'র বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আহি দু’হাতে মাহি'কে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে। সে নিজেও কষ্ট পাচ্ছে—ভীষণ কষ্ট। কিন্তু সেই কষ্টটা সে বলতে পারছে না, শুধু চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে রাগ আর দুঃখে।
আজ সে নিজের ভাইকে খুব করে বকবে, ভীষণ করে। কেন এই মেয়েটাকে এমন কষ্ট দেয়? মাহি তো তাকে সত্যি সত্যিই ভালোবাসে। নিঃস্বার্থ, নিখাদ ভালোবাসা, তবুও এমন অবহেলা! আহি'র মাথায় কিছুই ঢুকছে না।
আহি ধীরে ধীরে মাহি'র চোখের অশ্রু মুছে দেয়। আঙুলের স্পর্শটা ভীষণ যত্নের, যেন সে কান্নাটুকুও ব্যথা না পায়। নরম, শান্ত গলায় আহি বলে ওঠে—
"মাহু, কাঁদিস না প্লিজ। তোর কান্না আমি সহ্য করতে পারি না। আমি ভাইয়ার সাথে কথা বলবো, আমি জিজ্ঞেস করবো কেন ভাইয়া এমন করছে। আমার মাহু কি দেখতে কম সুন্দর? আমার মাহু তো আমার ভাবি হওয়ার জন্য একদম পারফেক্ট। তুই একদম টেনশন নিস না, তোকেই আমি আমার ভাইয়ার বউ বানাবো।
আহি'র কথায় মাহি একটু থেমে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে,
- কিন্তু আদিল ভাইয়া তো জুঁই আপুকে বিয়ে করতে চায়…
কথাটা শুনে আহি'র মুখ মুহূর্তেই বদলে যায়। চোখে রাগের ঝিলিক,
"এ্যাহ্! বললেই হলো? আমি কোনো জুঁই-টুঁইকে ভাইয়ার বউ বানাতে দেবো না। তুই আমার ভাবি হবি, এটাই ফাইনাল। ওই জুঁইয়ের ব্যবস্থা আমি করছি। শাঁকচুন্নি দেশে আর ছেলে পেল না, আমার মাহু'র জিনিসে নজর দিয়েছে! ওই শাঁকচুন্নির চোখ আমি তুলে ফেলবো।
মাহি আহি'র বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে রেখেই ছোট গলায় প্রশ্ন করে,
- তুই সত্যি আমাকে তোর ভাইয়াকে দিবি, পাখি?
আহি কোনো দ্বিধা না রেখেই বলে ওঠে,
"দেবো না কেন? আমার ভাইয়া মানে তোর জামাই, আর তোর ভাইয়া মানে আমার জামাই!
কথাটা মুখ থেকে বেরিয়েই আহি'র মাথায় বাজ পড়ে। সে হঠাৎ জিব্বায় কামড় দেয়, সে কী বলতে কী বলে ফেললো! মুহূর্তেই চুপ করে যায়। মাহি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে আহি'র দিকে। চোখে প্রশ্ন, মুখে বিস্ময়। পরিস্থিতি সামলাতে আহি মেকি একটা হাসি ঝুলিয়ে তাড়াতাড়ি বলে—
"দোস্ত, আমি ওটা বলতে চাইনি। আমি তো এমনি এমনি বলছিলাম, বুঝছিস তো!
কথাটা বললেও আহি'র বুকের ভেতরটা কেমন জানি ধক করে ওঠে। আর মাহি, সে শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকে, যেন নতুন করে ভাবার মতো কিছু একটা পেয়ে গেছে।
“আজকাল দেখছি মানুষ এমনি এমনি আমাকে জামাই ভাবছে! বলি, সে কি সত্যিই এই নিষ্পাপ অয়ন’কে বিয়ে করতে চাচ্ছে নাকি?
কথাটা শেষ হতেই দুজনের দৃষ্টি একসাথে দরজার দিকে চলে যায়। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন। চোখেমুখে স্পষ্ট দুষ্টুমির ছাপ, ঠোঁটের কোণে চেনা বাঁকা হাসি। যেন সব কথা সে শুনেই ফেলেছে, আর এতে তার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই।
আহি হঠাৎ করেই ঘাবড়ে যায়। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে,
"অ…অ…অয়ন ভাই! আপনি?
অয়ন কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। প্রতিটা পা ফেলার সাথে সাথে আহি'র বুকের ধুকপুকানিও যেন বেড়ে যাচ্ছে। মাহি তার ভাইয়ের চোখের ভাষা বুঝে ফেলে। সে লাজুক ভঙ্গিতে তাড়াতাড়ি ওড়না টেনে মুখ ঢেকে নেয়। তবুও কৌতূহল সামলাতে না পেরে ওড়নার ফাঁক দিয়েই সবকিছু দেখতে থাকে। হঠাৎ করেই অয়ন ঝুঁকে আহি'র কপালে পরম যত্নে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়।
আহি কেঁপে ওঠে! ঠিক তার কান ঘেঁষে অয়ন ফিসফিস করে বলে—
“ওহু! মতলব তো ভালো ঠেকছে না। মনে হচ্ছে কেউ আমিতে ডুবতে চাইছে। যদিও এসব পঁচা কাজ অয়ন করতে চায় না…তবে তার দোয়েল পাখি চাইলে এর থেকেও বেশি কিছু হতে পারে!
কথাগুলো যেন আগুন হয়ে আহি'র কানে ঢোকে। তার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়ার জোগাড়। সে নিজের রাগ সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে, কিন্তু বিপরীত পাশের মানুষটার নির্লজ্জ মার্কা কথায় আর দমে থাকতে পারে না। হঠাৎ করেই সে অয়ন'কে ধাক্কা দিয়ে সরাতে যায়। কিন্তু পরিস্থিতি উল্টো হয়ে যায়। ধাক্কা খেয়ে পেছনে না সরে অয়ন ভারসাম্য হারিয়ে সরাসরি আহি'র ওপরই পড়ে যায়, যদিও এটা অয়ন ইচ্ছেকৃত করেছে। মুহূর্তেই আহি'র চিৎকারে রুম কেঁপে ওঠে—
"আল্লাহ গো! এই জলহস্তি আমার ওপর কেন পড়লো? মাহু, তোর ভাইকে সরতে বল! আমি তার ভরেই মরেই যাবো মনে হয়!
মাহি ওড়নার আড়াল থেকে মুখ চেপে হাসছে, কিন্তু কোনো সাহায্য করছে না। অয়ন আহি'র ওপর ঝুঁকে থেকেই ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“তোকে মারতেই তো চাই! কবে আমার হবি পাখি, আর আমি নিজেকে সামলাতে পারছি না। এই বেপরোয়া মানুষটাকে একমাত্র তুইই সামলাতে পারবি।
কথাগুলো শুনে আহির মুখ লাল হয়ে যায় রাগে, লজ্জায় আর অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে। হঠাৎ করেই আহি চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে। তার শরীরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এই অপ্রত্যাশিত দৃশ্যে অয়ন মুহূর্তেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসে। বুকের ভেতরটা কেমন জানি ধক করে ওঠে তার। সে দ্রুত আহি'র গালে হাত রাখে, আলতো করে স্পর্শ করে, তারপর একটু জোরে ঝাঁকাতে থাকে। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আহি নিশ্চুপ। না কোনো নড়াচড়া, না কোনো শব্দ।
অয়নে'র বুকটা মুহূর্তেই হিম হয়ে যায়। গলা শুকিয়ে আসে। ভয়ার্ত কণ্ঠে সে বলতে থাকে,
“পাখি…এই পাখি, কী হলো তোর? আরে কথা বল না বউ! মাহি, তোর ভাবি কথা বলছে না কেন? পাখি প্লিজ কথা বল না, তোকে নিয়ে আমি বড্ড ভয় পাই। এমন করিস না পাখি, প্লিজ…
তার কণ্ঠে তখন আর দুষ্টুমি নেই, নেই কোনো ঠাট্টা, শুধু নিখাদ ভয় আর অসহায়তা। তবুও আহি চুপ। অয়ন কাঁপা হাতে তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। হঠাৎ করেই সে জোরে চিৎকার করে ওঠে,
“আম্মা, আপনি কই? আমার পাখি কথা বলছে না! এই মাহি, তুই কিছু বল না বোন। আমার পাখি'র হঠাৎ কি হলো?
ঠিক তখনই রুমের ভেতর হালকা একটা হাসির শব্দ ভেসে আসে। অয়ন থমকে যায়। ধীরে ধীরে আহি'র দিকে তাকায়। আহি তখন চোখ খুলে খিলখিল করে হাসছে। সেই হাসিতে কোনো অসুস্থতা নেই, কোনো দুর্বলতা নেই, শুধু দুষ্টুমি। এক মুহূর্তেই অয়ন সব বুঝে ফেলে। তার পাখি মজা করছিল। কিন্তু এই উপলব্ধির সাথে সাথে তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা রাগে পরিণত হয়। চোখ দুটো বড় হয়ে যায়, কপালে ভাঁজ পড়ে। মুহূর্তেই তার হাত উঠে যায়।
ঠাসস, ঠাসস! আহি'র গালে পরপর থাপ্পড় বসে।গর্জন তুলে অয়ন চেঁচিয়ে ওঠে,
“ফাজলামো করিস আমার সাথে? একটুর জন্য আমার প্রাণটা বেরিয়ে যায় নি, বুঝিস তুই? আমার ভেতরটা কেমন করছিল বুঝতে পারছিস? নেক্সট টাইম এমন ফাজলামো করলে দাঁত ভেঙে দেবো, মাইন্ড ইট!
কথা শেষ করেই সে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতে যেতে রুমে হঠাৎ অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে আসে। আহি আর মাহি দুজনেই তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। আহি ধীরে ধীরে নিজের গালে হাত বুলিয়ে ঠোঁট উল্টে বিরক্ত স্বরে বলে,
",ইসস! কতো জোড়ে থাপ্পড় দিল তোর ভাই। এতো নির্দয় কেন? আচ্ছা তুই বল তো, কারো ভারে কি সত্যিই কেউ মরে যায় নাকি? যতসব!
মাহি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর মাথা নিচু করে মুচকি হেসে বলে,
- তুই আর তোর ভাই কোনোদিন বুঝতে পারবি না ভালোবাসা কতটা ভয়ংকর। ভালোবাসার মানুষটার সামান্য ব্যথা পেলেও আমাদের বুকটা ফেটে যায়। অথচ আমাদের কষ্টের ভাগ থেকে চুল পরিমাণ কষ্ট যদি তোদের দেওয়া হয়, তোরাই সেটা সহ্য করতে পারবি না। এটাই হচ্ছে ওয়ান সাইড লাভ।
কথাগুলো শুনে আহি চুপ করে যায়। হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় তার মুখ থেকে। রুমের ভেতর আবার নীরবতা নামে কিন্তু এবার সেই নীরবতায় লুকিয়ে থাকে একরাশ অনুভূতি, যেগুলো আর সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
কথাটা বলেই মাহি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে দ্রুত ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দেয়, যেন বাইরে থেকে কেউ তার ভেতরের ভাঙনটা দেখতে না পায়। তারপর শাওয়ারটা চালু করে দেয়। ঠাণ্ডা, গরম মিলেমিশে পড়া পানির ধারায় সে নিজের মাথা, বুক, চোখ, সবকিছু ভিজিয়ে নিতে চায়। আপাতত এই লম্বা শাওয়ারটাই তার একমাত্র আশ্রয়, যেখানে দাঁড়িয়ে নিজের অস্থির মনটা একটু শান্ত করা যায়।
এক তরফা ভালোবাসা যে কতটা বেদনাদায়ক, সেটা না কাউকে বোঝানো যায়, না নিজের ভালোবাসার গভীরতাটা ঠিকভাবে কাউকে বুঝিয়ে বলা যায়। চুপচাপ সহ্য করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। মাহিও সেটাই করছে। চোখ বেয়ে নামা পানি আর অশ্রুর পার্থক্য তখন আর বোঝা যায় না। অন্যদিকে দরজার আড়াল থেকে কেউ একজন তাকে লক্ষ্য করছিল। চোখে ছিল চিন্তা, মুখে ছিল চাপা দ্বিধা। কিন্তু সে কিছু বললো না। হয়তো সে নিজেই কোনো এক অদৃশ্য গণ্ডির ভেতর আটকে আছে, যেখানে চাইলেও সামনে এগোনো যায় না, আবার পেছনেও ফেরা যায় না।