অয়ন উল্টো হয়ে হাঁটতে থাকে আর বিরবির করে,
“আদিল আমি কিন্তু এমনি এমনি চলে যাচ্ছি। আবার কেউ যেন এটা না ভাবে তাকে দেখে আমি ভয় পেয়ে চলে যাচ্ছি। আর এই লেডি রুমে দেখা করিস তোর জন্য চমচম এনেছি!
"এই যে, আমাকে কি আপনার ছাগল মনে হয় নাকি? চমচমের লোভ দেখালেই দৌড়ে চলে আসবো? আপনার মতো জাওড়ার রুমে আমি জীবনে পা রাখবো না। রাক্ষস একটা!
অয়ন আড়চোখে আহি’কে মেপে নেয়। তার সেই একটিমাত্র শীতল দৃষ্টিতেই আহি মুহূর্তেই গুটিয়ে যায়, বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। অয়ন দাঁতে দাঁত পিষে কটমট করে আওরায়,
“ওই মাতারি, আমি কি তোকে খেয়ে ফেলেছি যে রাক্ষস বলছিস? বেশি বারাবাড়ি করলে এখনই কিন্তু সত্যি সত্যিই খেয়ে ফেলবো।
আহি আঁতকে উঠে পেছনে সরে যায়। কাঁপা গলায় চিৎকার করে ওঠে,
"আব্বাজান! এই জাওড়া'টাকে কিছু বলেন না?
মহিবুল শেখ এক কদম এগিয়ে আসে গম্ভীর স্বরে বললেন,
- প্রব্লেম কি তোমার হ্যাঁ?
অয়ন নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
“দেখেন শ্বশুর আব্বা, আমার মধ্যে কোনো প্রব্লেম-টব্লেম নেই।
তবুও যদি ডাউট থাকে তাহলে আপনার মেয়েকে…
- অয়ন!
মহিবুল শেখ চিৎকার দিয়ে বললেন।
অয়ন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে হেসে ফেলে,
“আরে আরে আমি তো কফি নিয়ে যাওয়ার কথাই বলছিলাম! আপনি শুধু শুধু নেগেটিভ মাইন্ড ভাবেন। বুঝি না বাপু, শ্বশুর যদি এমন হয় তাহলে মেয়ের জামাই কিভাবে ভালো হবে? আশ্চর্য!
মহিবুল শেখ গর্জে উঠলেন,
"বেয়াদব ছেলে, এতো বছর বিদেশ থেকে কি শিখে আসছো?
অয়ন ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে নির্বিকার গলায় উত্তর দিল,
“এই যে আপনার মেয়েকে কিভাবে কিভাবে ভালোবাসতে হয়। কত তারাতাড়ি তাকে আমার বেড পার্টনার বানানো যায়, আর কত তাড়াতাড়ি আপনাকে নানা ভাই বনানো যায়, সেই সব প্রোসেসিং!
কথাটা বলেই অয়ন আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে পড়ে। মহিবুল শেখ বিস্মিত চোখে তার যাওয়া দিকে একবার তাকায় আরেকবার নিজের ছেলের দিকে তাকায় তার তাকানো দেখে আদিল মেকি হাসি আওরায়,
“আব্বা, আপনি আমার দিকে তাকিয়ে কী দেখেন? আপনাদের মাঝে আমি নেই।
এই কথাটুকু বলেই সে ও সামনে এগিয়ে যায়। মহিবুল শেখ কিছু বলার আগেই সে পিছু পিছু সরে পড়ে। অয়ন সোজা নিজের রুমে ঢুকে পড়ে। দরজা বন্ধ করেই এসে বিছানার উপর ধপাস করে শুয়ে পড়ে। গায়ে জড়ানো শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে সে আনমনে বিড়বিড় করে বলে ওঠে—
“মাই ডিয়ার দোয়েল পাখি! তোকে না দেখেই আমি বেসামাল ছিলাম, আর এখন ওই কিউট টেডিবিয়ারকে সামনে দেখে নিজেকে কীভাবে কন্ট্রোল করবো? এভাবে চলতে থাকলে মনে হয় সেকেন্ড বিয়ের কথাও ভাবতে হবে। নয়তো ড্যাম শিওর কোনো অঘটন ঘটে যাবে!
_
_
শেখ মঞ্জিলের সবচেয়ে গোপন আর কোলাহলপূর্ণ জায়গাটা এখন সাজ্জাদের রুম। চার পান্ডব—আহি, মাহি, মুন আর সাজ্জাদ গোল হয়ে বসে আছে। কিন্তু গোল মিটিং বললেও আসলে কেন্দ্রবিন্দুতে একজনই, বেচারা সাজ্জাদ। তিন ছোট বোনের চাপ সামলাতে সামলাতে সে এমনভাবে বসে আছে, যেন পরীক্ষার হলে ভুল সাবজেক্টের প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েছে। চোখ দুটো ফাঁকা, মুখে অসহায় ভাব, পুরোপুরি হ্যাবলার মতো অবস্থা। আহি আর আদিল আপন ভাই–বোন। অয়ন, মাহি আর মুন—তারা জমজ ভাই–বোন। আর সাজ্জাদ? সে একাই।
তার কাছে এই তিন ছোট বোনই দুনিয়ার সব।
সাজ্জাদ অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আর আহি, মাহি, মুন তিনজনই ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। বয়সে ছোট হলেও বুদ্ধিতে আর দুষ্টুমিতে একটুও কম নয়।
হঠাৎ সাজ্জাদ দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ে। ঠিক তখনই আহি সেটা চোখ এড়ায় না। সঙ্গে সঙ্গে উঠে এসে সাজ্জাদে'র পিঠে একটা কিল বসিয়ে দেয়। এবং কর্কশ কন্ঠে আওরায়,
"এই ভাইয়া! তুমি এমন ঝিমাচ্ছো কেন? মনে রেখো, আমাদের কাজ যদি ঠিকঠাক মতো না হয় তাহলে তোমার পিটিতের কথা ছোট চাচ্চুকে বলে দেবো!
কথাটা শোনামাত্রই সাজ্জাদে'র মুখের রং বদলে যায়। সে প্রায় লাফিয়ে উঠে দু’হাত জোড় করে মিনতি করে,
- এই না না বোন আমার, এমন করিস না। প্লিজ! আব্বা যদি জানতে পারে, আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবে!
তার অসহায় চেহারা দেখে মাহি আর মুন মুখ চেপে হাসে। আর আহি? সে ভ্রু কুঁচকে, বিজয়ীর হাসি হেসে বলে—
"এই না হলে আমার ভাই!
সাজ্জাদ মুখ গোমড়া করে তাকিয়ে বলল,
- বল, কী করতে হবে?
আহি দাঁতে দাঁত চেপে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠল,
"ওই অয়রনের বাচ্চা আমার ঠোঁটে চুমু দিয়েছে। তাই ওর ঠোঁট আমি কেঁচি দিয়ে কেটে ফেলবো!
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ঘরে থাকা সবাই একসাথে চিৎকার দিয়ে উঠল। মুহূর্তেই পরিবেশটা থমকে গেল। সাজ্জাদ হাঁ করে আহি'র দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাসের সুরে বলল,
- হোয়াট…! অয়ন ভাইয়া তোকে চুমু দিয়েছে? কখন?
একই সাথে মাহি তড়িঘড়ি করে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
–অয়ন চুমু দিয়েছে মানে কী? ভাইয়া দেশে আসলো কখন? এই মুন, তুই কিছু জানিস?
মুন বিরক্ত হয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–আমি কীভাবে জানবো? আমিও তো তোর সঙ্গেই শপিং মলে ছিলাম। এইমাত্র তো বাসায় এলাম। এই আহি, সত্যি করে বল…ভাইয়া কি এসেছে?
এই কথাটা শুনেই মাহি'র চোখ দুটো ঝলমল করে উঠল। খুশিতে সে প্রায় আত্মহারা।
–তার মানে আদিল ভাইয়াও এসেছে! ও মাই গড! আমার ক্রাশ!
মাহি দৌড় দিতে উদ্যত হতেই আহি খপ করে তার হাত ধরে ফেলল। চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"খাচ্চর ছেমড়ি, থাম! আগে আমাকে হেল্প করবি, তারপর আমার ভাইয়ের কাছে যাবি। নয়তো এমন মাইর দিমু, তক্তা বানিয়ে ফেলবো!
মাহি কাঁদোকাঁদো মুখ করে মিনতি করল,
–আমার মিষ্টি বনু, প্লিজ তোর ভাইকে এক পলক দেখতে দে। গড প্রমিজ, এক পলক দেখেই চলে আসবো।
আহি'র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাহি সঙ্গে সঙ্গে চুপ মেরে গেল। আর কোনো কথা না বলে মন খারাপ করে আহি'র প্ল্যান শুনতে লাগল। শুরুতে সাজ্জাদ একদমই রাজি হয়নি। কিন্তু বোনদের একটানা চাপের কাছে শেষমেশ হার মানতে হলো।
অবশেষে সবাই পা টিপে টিপে অয়নে'র রুমের দিকে রওনা হলো। সাজ্জাদ সবার পেছনে, সে শুধু সঙ্গ দিয়েছে, সাহস তার একফোঁটাও নেই। সবার আগে এগিয়ে যাচ্ছে আহি, হাতে ছুড়ি।
ঠোঁট কাঁটতে পারুক আর না পারুক, আজ অন্তত হাত কাটবে, এই পণ নিয়েই সে হাঁটছে। গুটি গুটি পায়ে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় আহি। দেখে, অয়ন বিছানায় শুয়ে আছে, কপালে হাত ঠেকানো। দৃশ্যটা দেখে আহি'র ঠোঁটের কোণে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে ওঠে। সে ফিসফিস করে বলে,
"সাজ্জাদ ভাইয়া, তুমি অয়রনের হাত চেপে ধরবা। মুন আর মাহি পা দুটো চেপে ধরবি। আমি ঠিক তখন ওনার ঠোঁট কেঁটে দেবো।
মাহি নাক কুঁচকে ফিসফিস করে বলে,
–দোস্ত, ওটা আয়রন না…অয়ন হবে।
আহি চোখ পাকিয়ে তাকায়,
"চুপ কর বেডি। আমি যা বলবো, সেটাই ঠিক।
সাজ্জাদ ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করে বলে,
- বনু, এতো বড় রিস্ক নেওয়ার কোনো দরকার নেই। চল, চলে যাই। অয়ন ভাইয়ের ঠোঁট কেটে ফেললে সে তার বউ'কে চুমু দেবে কিভাবে বল? বউয়ের সাথে রোমাঞ্চ করবে কিভাবে?
আহি বিরক্ত হয়ে ফিস করে ওঠে,
"ভাইয়া চুপ কর। আমি যা বলেছি, তাই হবে। পুরো ঠোঁট কাঁটতে না পারলেও এক টুকরা কেটে নিয়ে চলে আসবো।
সেই ভাবা, সেই কাজ। সবার আগে আহি রুমে ঢুকে পড়ে। তারপর এক এক করে বাকিরাও ঢোকে। অয়নে'র পেছনে দাঁড়িয়ে আচমকা আহি চিৎকার করে ওঠে,
"পান্ডবের দল অ্যাটাক…
চেনা কণ্ঠস্বর পেয়ে অয়ন হঠাৎ ঘুরে তাকায়। চোখে পড়তেই যে চার-পাঁচটা পরিচিত মুখ—ঠিক সেই মুহূর্তে সবাই ভোঁ দৌড়! মুহূর্তের মধ্যে রুম ফাঁকা। আহি দৌড় দিতে যাবে ঠিক তখনই অয়ন ঝাঁপিয়ে উঠে তার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। আহি মুহূর্তেই বরফ হয়ে যায়। হাত ছুটাতে মরিয়া হয়ে মোচড়ামোচড়ি করে কিন্তু কোনোভাবেই ছাড়া পায় না। সে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
"ওই মীরজাফরের বংশধর এটা কথা ছিল না, আমাকে তো সাথে নিয়ে যাবি। আয়রনের বাচ্চা আমাকে ছাইড়া দেন, আমি কিছু করতে আসিনি। এমনকি আমি এই ছুড়ি দিয়ে আপনার ঠোঁট ও কাঁটতে আসিনি, সত্যি।
আহি'র কথা শুনে অয়ন যেন আকাশ থেকে পড়ল। এই বিচ্ছু মেয়ে নাকি তার ঠোঁট কাঁটতে এসেছে! ভাবতেই গা শিউরে উঠল তার। মুখ খিঁচিয়ে বিরক্ত বলে উঠল,
“লাইক সিরিয়াসলি, ডিয়ার? তুই আমার ঠোঁট কাঁটতে এসেছিস?
আহি চোখ বড় বড় করে আতঙ্কে কেঁপে উঠল। সে বিড়বিড় করে,
"ও আল্লাহ গো! এই মুখটা সব সময় সত্যি কথা কেন বলে দেয়! এই আপনি আমার হাত ছাড়ুন! আব্বাজান, আপনার মাইয়ারে এই জাওড়া মাইরা ফেললো!
আহি'র চিৎকারে অয়ন একেবারে গর্জে উঠল,
“জাস্ট শাট আপ, ডিয়ার! এই সন্ধ্যাবেলা তুই আমার রুমে ঢুকে আমাকেই মার্ডার করতে এসেছিস, আর আমি তোর হাত ধরেছি বলে চিৎকার করছিস? চল, তোর আব্বার কাছে গিয়ে বলি, তুই শুধু আমাকে মারতে না, আমাকে ইজ্জত হরণ করতেও এসেছিস!
আহি আতঙ্কে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
"ও আল্লাহ গো! এই বজ্জাত এতো মিথ্যা কথা কেমনে কয়! এই, আমি আপনার ইজ্জত হরণ করতে আসছি? মাথা খারাপ নাকি?
অয়ন ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে ঠাণ্ডা গলায় বলে,
“সেটা তুই আর আমি জানি। আর তো কেউ জানে না, এখন তোকে আমি যে পানিশমেন্ট দেবো, সেটা যদি মানতে পারিস, তবেই তোকে ছেড়ে দেবো। নয়তো…
"নয়তো কী, হ্যাঁ? আমি কোনো দোষ করিনি। আপনি তখন আমার ঠোঁটে চুমু দিলেন কেন? তাই এখন আমি আপনার ঠোঁট কাঁটতে এসেছি!
সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো।
অয়ন মুহূর্তেই এক টানে আহি'কে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। কণ্ঠটা ধীর আর ভারী করে বলল,
“ওহ্, রিয়েলি? শুধু চুমু দেওয়ার জন্য তুই যদি আমার কিউট কিউট ঠোঁট কাঁটতে আসতে পারিস, তাহলে তার জন্য আমি কোনো পানিশমেন্টও দিতে পারবো না? ওহু…তা তো হচ্ছে না ডিয়ার!
অয়নে'র ভারী নিশ্বাস আহি'র মুখে এসে লাগছে। আহি ঘন ঘন শ্বাস নিতে থাকে। ভেতরটা হঠাৎ করেই এলোমেলো হয়ে যায়। বুকের ভেতর এক অজানা অস্বস্তি জমে ওঠে। নিজেকে ছাড়াতে সে মরিয়া হয়ে ওঠে, কিন্তু অয়ন বিন্দুমাত্র ছাড় দেয় না।
বরং সে আরও কাছে টেনে নেয় আহি'কে। তাদের মধ্যকার দূরত্ব আরও কমে আসে। অয়ন যখন আহি'র ঘাড়ে তার নরম ঠোঁট ছোঁয়ায় সাথে সাথে আহি শিউরে ওঠে। শরীরটা কেঁপে যায় অনিচ্ছাকৃতভাবে। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে—সে বুঝে যায়, পরিস্থিতিটা ভয়ংকর দিকেই এগোচ্ছে। ঠিক তখনই অয়নে'র মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয়। সে হঠাৎ বুঝে যায়, সে কী করতে যাচ্ছিল! সঙ্গে সঙ্গে এক ধাক্কায় সরে যায়।
এই সুযোগে আহি নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না দৌড়ে পালিয়ে যায়।
রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অয়ন অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। নিজের চুলে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
“ওহ শিট…শিট! এটা আমি কী করতে যাচ্ছিলাম? দোয়েল পাখি কী মনে করলো আমাকে? ডোন্ট কিস লাইক দ্যাট, প্লিজ কন্ট্রোল ইয়োরসেলফ কন্টোল!