নেশাময় আসক্তি

পর্ব - ৩

🟢

“ওহ শীট শীট! এটা আমি কি করতে যাচ্ছিলাম, দোয়েল পাখি কি মনে করলো? ডোন্ট কিস লাইক দ্যাট, প্লিজ কন্ট্রোল ইয়োরসেলফ কন্টোল!

অয়ন আহি'র পিছু নেয়! এতো তারাতাড়ি এসেও অয়ন আহি'কে খুজে পায় না। কোথায় গেল বুঝতে পারছে না। সে আহি'র রুমে উঁকি দেয়, সেখানেও কেউ নেই। সে আনমনে বলে উঠে,

"ও মাই গড, আয়ন, ওয়াই ডিড ইউ ডু দিস ডিজগাস্টিং অ্যাক্ট?

নিজের উপর প্রচন্ড বিরক্ত অয়ন। এমন কিছু করবে নিজেই ভাবতে পারেনি, নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে ভিষন। অয়ন মন খারাপ করে নিজের রুমে ঢুকে পড়ে।

অন্য দিকে,

আদিল তারাহুরো করে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসছে ঠিক তখনই মাহি'র সঙ্গে ধাক্কা খায়। দু'জনেই তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায়। মাহি পড়ে গিয়েও এক দৃষ্টিতে আদিলে'র দিকে তাকিয়ে আছে। আদিল বিরক্তিকর কন্ঠে গর্জে উঠে,

"এই ইডিয়েট, চোখ কি কপালে নিয়ে হাটিস? এতো বড় মানুষকে তোর চোখে পড়ে না?

আদিল হাত পা ঝেড়ে কোনো রকম উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু মাহি বসে গাল হাত দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখে আদিল আরো বিরক্ত হয়। সে কয়েকবার ডাক দেয় কিন্তু কোনো উওর পায় না। তাই চিৎকার দিয়ে উঠে,

"মাহি'র বাচ্চা …

তীব্র শব্দে মাহি নিজের সজ্ঞানে ফিরে।

- কি কি কিছু বলছেন আদিল ভাইয়া?

"ইডিয়েট তোকে কখন থেকে ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না? ওভাবে তাঁকিয়ে আছিস কেন?

সে লাজুক হাসি দিয়ে বলে,

- আদিল ভাইয়া আপনি সত্যি জানেন না আমি কেন তাকিয়ে আছি? জানেন আপনি না ফোনের থেকে বাস্তবে বেশি সুন্দর। সুন্দর তো হতেই হবে, আফটার অল মাহি'র ফাস্ট ক্রাশ বলে কথা।

আদিল চোখ বন্ধ করে বড় বড় শ্বাস নেয়। আজ যে প্রথম মাহি'র মুখ থেকে এসব শুনছি তা নয়। মাহি রোজ পাঁচ থেকে দশবার তাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করে। তাকে এভয়েড করে কিন্তু মেয়েটা বুঝতে চায় না, তার নম্বর ব্লক লিস্টে রেখেছিল। সেই জন্য দুদিন বাসার কারো সঙ্গে কথা তো দূর রুম থেকে বের হয়নি। তার পাগলামো আর ছোট্ট বোনের আবদারে তাকে ব্লক লিস্ট থেকে অন ব্লক করেছিল। মাহি ফোন দিলে শুধু রিসিভ করে রাখতো কোনো কথা বলতো না। যদিও এতে মাহি'র কোনো আক্ষেপ নেই, সে নিজের মতো আদিলে'র সঙ্গে কথা বলতো।

হঠাৎ মাহি আদিলে'র দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

- আদিল ভাইয়া আমাকে টেনে তুলো।

আদিল তাকে তোয়াক্কা না করে নিজের গন্তব্যের দিকে হাটতে থাকে। মাহি তড়িঘড়ি হয়ে উঠে আদিলে'র পথ আটকে ধরে।

- আদিল ভাইয়া, আপনি সব সময় আমার সাথে এমন করেন কেন?

মাহি’র প্রশ্নে আদিলে'র মুখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে ওঠে। দাঁত খিঁচিয়ে সে ধীরে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে,

"তুই জানিস না কেন এমন করি? আমাকে আবারও বলতে হবে?

এই কথার সঙ্গে সঙ্গেই মাহি’র মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কিছুক্ষণ আগেও যে ঠোঁটের কোণে লুকানো এক চিলতে হাসি ছিল, তা যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টকে শক্ত করে চেপে ধরে সে আদিলে'র চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে,

- আদিল ভাইয়া, ভালোবাসা কি পাপ?

প্রশ্নটা যেন আদিলে'র বুকে এসে আছড়ে পড়ে। সে সরু চোখে মাহির দিকে তাকিয়ে থাকে। এই প্রশ্নের অর্থ সে খুব ভালো করেই বোঝে। ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এসে মাহি’র সামনে দাঁড়ায়। দু’হাত তুলে আলতো করে তার গাল দুটো ছুঁয়ে দেয়। স্পর্শে মায়া আছে, কিন্তু কণ্ঠ বরফের মতো শীতলতা—

"ভালোবাসা পাপ নয়, মাহি। কিন্তু যাকে তাকে ভালোবাসা পাপ। তুই কেন এটা বুঝিস না বল তো? আহি আর মুন’কে আমি যে দৃষ্টিতে দেখি, ঠিক সেই দৃষ্টিতেই তোকেও দেখি। তবুও তুই কেন এমন পাগলামি করিস? আমরা শুধু ভাই–বোন। এর বাইরে কিছু না। তোর জীবনে যা চাওয়ার আছে, আমাকে বল। ভাই হিসেবে তোর সব আবদার আমি পূরণ করবো। কিন্তু এই চিন্তাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। যেটা কোনোদিন সম্ভব নয়, সেটা চাওয়া ঠিক নয়।

মাহি এক মুহূর্তের জন্যও চোখ নামায় না। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু সে শক্ত করে আটকে রাখে। কণ্ঠ এবার কাঁপে না বরং অদ্ভুত এক দৃঢ়তা নিয়ে সে বলে ওঠে,

- কেন ঠিক নয়? তুমি যদি একজন ভাই হয়ে নিজের বোনকে তার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে পারো, তাহলে আমার বেলায় সেটা অসম্ভব কেন? হয়তো অয়ন ভাইয়া আহি’কে যে পরিমাণ ভালোবাসে, আমি তোমাকে ততটা ভালোবাসি না। কিন্তু আমার ভালোবাসাও ঠুনকো নয়। আমি তোমাকে ঠিক ততটাই চাই, যতটা মানুষ চাঁদকে নিজের করে চায়।

আদিল হালকা হাসির আড়ালে দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখে বলে,

"তোকে বুঝতে হবে মাহি, মানুষ চাইলেই চাঁদকে পায় না!

মাহি এবার একচুলও দমে না। চোখে অদম্য জেদ, কণ্ঠে গভীর বিশ্বাস,

- সেটা ঠিক। কিন্তু মানুষ চাইলে চাঁদে যেতে পারে।

আদিল বিরক্ততে মুখ চাওড়া হয়। এই মেয়েটাকে কোনো ভাবেই বুঝিয়ে পারে না, ভাই বোনের জেদ বরাবরই এক। একদিকে অয়ন'কে সামলাতে হিমশিম খেতে হয় এখন আবার তার বোন যুক্ত হয়েছে। এই জন্য সে দে-শে আসতে চাইনি৷ এক পলক মাহি'র দিকে তাকিয়ে গটগট করে চলে যায়। মাহি ঠোঁট উল্টো করে চলে যায়। সে নিজের কষ্ট কাউকে বলতে পারছে না। ভালোবাসা এমন অদ্ভুত কেন? এতো বেহায়াপনা করে তবুও সে ভালোবাসার কাঙ্গাল!

আহি সাজ্জাদে'র রুমে গিয়ে সবাইকে সেখানেই পায়। আহি'কে দেখেই সবাই পালাতে শুরু করে। কিন্তু কেউ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় না, সে বিদুৎ গতিতে গিয়ে সাজ্জাদে'র চুলের মুঠি আঁকড়ে ধরে। রাগে গজগজ করতে করতে বলে,

"তুমি আমার ভাইয়া হয়ে মীরজাফরের মতো ব্যবহার করলে? আর এই ঘুষিটি বেগমেদের কথা তো বাদই দিলাম। শয়তান গুলো সব জায়গায় আমাকে ফাঁসিয়ে দেয়।

সাজ্জাদ আকুতি স্বরে বলল,

বিজ্ঞাপন

- লক্ষ্মী বোন আমার চুল গুলো ছেড়ে দে। দেখ এমনিতেই তোদের ভাবি পালায় পালায় করে, এখন যদি সব চুল ছিড়ে ফেলে দিস তাহলে তো টাক মাথা হয়ে যাবে। তখন শুধু তোদের ভাবি নয়, কোনে লেডি পাত্তা দেবে না।

আহি তবুও নাছড় বান্দা সে বিছানায় ওঠে ইচ্ছে মতো মাইর দিচ্ছে। একটু জন্য রাক্ষসরুপী মানুষটা তাকে গিলে খায়নি। ভাঙ্গিস তখন ছেড়ে দিয়েছিল নয়তো কি থেকে কি হতো কে জানে। এবার মনে মনে পণ করে ফেলেছে নাকের ডোগায় লজ্জা থাকলে ভুলেও ওই লোকটার রুমে যাবে না। দরজার সামনে অয়ন'কে আসতে দেখে সাজ্জাদ, মাহি, মুন ঘাবড়ে যায়। আহি উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকায় দেখতে পায়নি। সে নিজের মনে গজগজ করতে করতে বলে,

"মুনে'র বাচ্চা তোর ভাইকে কাল সকালেই পাবনা রেখে আসবি। শালার শরীরের শিরায় শিরায় উওেজনা, পারলে ওই আয়রনকে বিয়ে করিয়ে দে কোনো পাগলীর সঙ্গে।

মুন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে,

- ব ব বনু একটু চুপ কর।

"চুপ আর আমি নো নো। জানিস আমার একটা কথা মনে হচ্ছে, ওই শালা বিদেশে নিজের রুমে না হলেও পাঁচ ছয়টা মেয়ে রাখতো নয়তো ওই গন্ডারের মতো শরীরে এতো উওেজনা কেন?

আহি কথা বলতে বলতে বেডের কর্নারে চলে আসে। সাজ্জাদ তার হাত আঁকড়ে ধরার আগেই আহি পড়ে যেতে নেয়, ঠিক তখনই বিদুৎ গতিতে এসে তাকে নিজের বাহুতে জরিয়ে ধরে অয়ন। আহি চোখ বন্ধ করেই চিৎকার দেয়,

"খোদা আমার কোমড় বুঝি আজ ভেঙেই যাবে। শাশুড়ীর পুত আসার আগেই আমি শেষ।

আহি হঠাৎ নিজেকে শূন্যে ভাসছে অনুভব হতেই চোখ পিটপিট করে তাকায়। উপস্থিত সবাই তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। আহি সবার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

"সামান্য বিছানায় থেকে পড়ে গিয়ে আমি মরে গেলাম? আল্লাহ গো আমি তো শাশুড়ীর পুতকে বিয়ে করতে পারলাম না, এমনকি বা'স'র ও করতে পারলাম না। ওই মীরজাফরের বংশধর আমাকে হসপিটালে তো নিয়ে চল, এতো তারাতাড়ি মইরা গেলে তোদের মামা,খালা বানাবে কে শুনি?

আহি নিজের মতো বকবক করছে। হঠাৎ মুখ ঘুরে তাকাতেই আত্মা কেঁপে ওঠে। অয়ন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। অয়ন ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে আওরাল,

“তোর শাশুড়ীর পুত কামিং ডিয়ার! আমি থাকতে তুই কিভাবে মরতে চাস হুম? আমার দেওয়া সুইট সুইট কষ্ট তো এখনো তোর উপর এপ্লাই করিনি।

এই বলে অয়ন আহি'র ওষ্ঠ জোরায় পরপর কয়েকবার চুম্বন কাঁটে! আহি আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে, কি বলবে ভেবে পায় না। সে কোলে থেকেই হাওমাও করে কাঁদতে থাকে।

"এই মাহি'র বাচ্চা তোর বজ্জাত ভাই এটা কি করলো? ও শাশুড়ীর পুত, তুমি কই? তোমার বউ'কে এই আয়রনের বাচ্চা নির্যাতন করছে।

অয়ন আহি'র চিৎকারের শব্দে ততক্ষণে কোল থেকে নামিয়ে বিছানায় বসিয়ে দেয়। আহি বিছানায় বসে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে, আর এক এক করে সব বালিশ অয়নে'র দিকে ছুড়ে দিচ্ছে। অয়ন চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটা এমন করে কেন সেটাই বুঝতে পারে না। এতো বাচ্চামো সে কিভাবে সহ্য করবে?

হঠাৎ অয়ন আহি'কে ধমকে স্বরে বলল,

“শাউ*য়্যার নাতি কাঁদিস কেন? তোরে কামড় দিছি নাকি খাঁমচি দিছি। বিছানা থেকে পড়ে যাচ্ছিলি তাই জাস্ট কোলে নিয়ে একটা পাপ্পি দিছি, চুমু তো আর দেয়নি!

কথাটা শোনা মাএ সবাই খিলখিল করে হেসে দেয়। আহি বেকুব বনে তাকিয়ে থাকে। পাপ্পি আর চুমু'র মধ্যে যে ডিফারেন্ট আছে এটা জানা ছিল না। সে কোমড়ে হাত গুঁজে কর্কশ কণ্ঠে কথাগুলো প্রতিধ্বনিত করে তোলে—

"আপনি কি আমাকে পাগল পেয়েছেন? পাপ্পি আর চুমু তো একই জিনিস!

অয়ন ব্যঙ্গভরা হাসি ছুড়ে দিয়ে আবার বলে,

“তোকে পাওয়ার কী আছে? তুই তো আমরাই!

"আমি অন্য পাওয়ার কথা বলছি।

অয়ন নাক সিটকিয়ে বলে ওঠে,

“ছিঃ ছিঃ! তুই আমাকে বিছানায় পাওয়ার কথা বলছিস? আমি ভাবছিলাম, আর কেউ ভালো হোক বা না হোক, আমার দোয়েল পাখি অন্তত ভালো হবে। কিন্তু এই মাতারী কবুল বলার আগেই বিছানায় যেতে চায়! ওহ খোদা, এই পঁচা মেয়েটাকে আমার নজরে ফেললে কেন!

কথাগুলো শুনে আহি ফ্যালফ্যাল করে কাঁদতে শুরু করে। কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলে,

"আমি এখনই বড় বাবা’র কাছে বিচার দেবো। আপনি এইটুকু সময়ে আমার সাথে কী কী করেছেন, তার হিসাব দেবেন। আর আমাকে এমন নোংরা কথা বলছেন!

আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সে গটগট করে বেরিয়ে যায়। আহি'র চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে অয়ন দাঁত কেলিয়ে হেসে ওঠে,

“যা গিয়ে বল। তোর শ্বশুর আমার বা*ল ও ছিঁড়তে পারবে না।

আহি চলে যেতেই অয়ন ঘুরে দাঁড়িয়ে ভাই-বোনদের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায়। সেই দৃষ্টির তাপে সাজ্জাদ কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে,

"ভাইয়া, আমি কিছু করিনি, গড প্রমিজ। তোমার বউ'ই আমাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গেছে। বিশ্বাস না হলে ওদের জিজ্ঞেস করো।

কথাটা বলেই সাজ্জাদ গুটি গুটি পায়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আপাতত সে চায় অয়নে'র চোখের আড়ালে থাকতে। অয়ন এবার নিজের বোনদের দিকে তাকায়। মাহি'র মনখারাপ মুখটা দেখে সে দু’বোনকে একসাথে বুকে জড়িয়ে নেয়। মাহি'র কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,

“আদনান শেখ অয়নে'র বোন হয়ে মন খারাপ করে বসে আছিস? মনে রাখিস, চাইলেই কাউকে পাওয়া যায় না। নিজের ভালোবাসা নিজেকেই ছিনিয়ে নিতে হয়। যে আমার, তাকে যেভাবেই হোক আমার করতেই হবে। একটু কষ্ট হোক, তবু সেই পাওয়াটা হাতছাড়া করা যাবে না। এবার কিছু বুঝতে পেরেছিস?

মাহি এক গাল হেসে জবাব দেয়,

- হুম ভাইয়া, আমি বুঝে গেছি আমাকে কী কী করতে হবে। মি. আরিয়ান শেখ আদিল, মাহি'র পাগলামো দেখার জন্য রেডি হন!

বিজ্ঞাপন
নেশাময় আসক্তি গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় স্পেশাল রোমান্টিক গল্প