“আব্বা, আমি বিয়ে করবো!
অয়ন কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই রুম জুড়ে নেমে এলো অদ্ভুত এক নীরবতা। যেন হঠাৎ করে কেউ সময় থামিয়ে দিয়েছে। উপস্থিত সবাই বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ এমন ঘোষণার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সদ্য আহি মুখে এক লোকমা ভাত তুলেছে, ঠিক তখনই অয়নে'র কথা কানে যেতেই সে হকচকিয়ে যায়। ভাত গলায় আটকে কাঁশতে শুরু করে। পরিস্থিতি মুহূর্তেই বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। অয়ন আর এক সেকেন্ড দেরি না করে তড়িঘড়ি করে আহি'র সামনে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়।
“পানিটা খেয়ে নে পাখি!
আহি ঢকঢক করে পুরো গ্লাস পানি শেষ করে। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, শ্বাস এখনো ঠিকমতো স্বাভাবিক হয়নি। সে ধীরে ধীরে অয়নে'র দিকে তাকায়। কিন্তু অয়ন তখন অন্য কিছু দেখছে, আহি'র দিকেই তার সমস্ত মনোযোগ, সমস্ত দৃষ্টি আটকে আছে। হঠাৎ জাহিদ শেখ গম্ভীর স্বরে বললেন,
- কি বললে তুমি?
অয়ন এবার নিজের বাবার দিকে তাকায়। চোখে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। গলায় আত্মবিশ্বাসের স্পষ্ট ছাপ।
“বললাম আমি বিয়ে করবো। বয়স তো আর কম হলো না আব্বা। অলরেডি থার্টি প্লাস। অথচ এত বড় ছেলেকে বিয়ে না করিয়ে আপনি দিব্যি হাত গুটিয়ে বসে আছেন!
জাহিদ শেখ ভ্রু কুঁচকে তাকান। ঠোঁটের কোণে হালকা বিরক্তির রেখা।
- তো আমি কি করবো?
অয়ন চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে, একরকম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“বউ চাই আমার! সেটাও আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে!
মূহুর্তেই সবাই স্তদ্ধ হয়ে যায়, জাহিদ শেখ চোখ পাকিয়ে তাকান ছেলের দিকে। তারপর ধীর এবং চাপা রাগে ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন,
- এতো তারাতাড়ি বউ লাগার কারণ?
অয়ন ভ্রু কুঁচকে বাবার দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু, কিন্তু নির্ভীক এক হাসি।
“এই শীতে যে কারণে আপনার আম্মাকে, শ্বশুর আব্বার শাশুড়ী আম্মাকে, ছোট চাচ্চুর ছোট আম্মাকে প্রয়োজন হয়। ঠিক সেই কারনে আমারও বউ প্রয়োজন!
কথা শেষ করতেই পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। হঠাৎ করেই অয়নের দিকে উড়ে আসে এক জোড়া উরন্ত জুতা। ঠিক নিশানায় না লাগলেও উদ্দেশ্য পরিষ্কার, এটা সতর্কবার্তা।
জুতা ছুড়েছেন শান্তা শেখ। তার চোখ-মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। রাগে তাঁর নাসারন্ধ্র ফুলে আছে। তিনি এক পা এগিয়ে আসতেই অয়ন মুহূর্তের মধ্যে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
“আম্মা! আপনি এত বড় ছেলের গায়ে জুতা ছুড়ে দিলেন কেন? আমি কি কোনো অপরাধ করেছি? শুধু বিয়ে করতে চাইছি বলে এভাবে নির্যাতন করবেন? আমি কিন্তু পুলিশের কাছে আপনার নামে মামলা করবো!
শান্তা শেখ এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করেন না। দাঁতে দাঁত চেপে তীক্ষ্ণ স্বরে বলেন,
- গোলামের পুত, কাছে এসে বল।
অয়নে'র মুখের রঙ সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টে যায়। সে দুই কদম পেছনে সরে গিয়ে দ্রুত মাথা নাড়ায়।
“আমাকে কি গাধা পেয়েছেন নাকি? ছোটবেলায় ভালো করে কাছে ডেকে কী যে মাইর দিতেন! ও খোদা, সেই কথা ভাবতেই এখনো গা শিউরে ওঠে। আম্মাজাত এত ডেঞ্জারাস কেন হয় কে জানে!
শান্তা শেখ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। চোখে আগুন জ্বলে।
- গোলামের পুত, দূরে যাচ্ছিস কেন? সাহস থাকলে কাছে এসে বল!
তিনি কয়েক কদম অয়নে'র দিকে এগিয়ে যেতেই অয়ন আর দেরি করে না। এক দৌড়ে সিঁড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরত্বটা এমনভাবে রাখে যেন প্রয়োজনে এক লাফে পালানো যায়।
“আম্মা, আমি কিন্তু একদমই আপনাকে ভয় পাই না। আর শুনেন আমি যত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবো, আপনারা তত তাড়াতাড়ি দাদা-দাদি হবেন। ছোট্ট ছোট্ট নাতি নাতনিদের কোলে নিয়ে হাঁটবেন, আর তা না করে ছেলেকে বিয়ে করাতে চায় না৷ আর আব্বা, শুনে রাখেন। আমি কিন্তু আপনার মেঝ ভাইয়ের মেয়েকেই বিয়ে করবো। সেটাও খুব তাড়াতাড়ি!
এই কথা বলেই আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সে নিজের রুমের দিকে হাঁটা দেয়। পেছনে আর একবারও তাকায় না। রুমে তখন থমথমে পরিবেশ। আহি চুপচাপ নিজের খাবার কোনোমতে শেষ করে উঠে পড়ে। বুকের ভেতর অজানা ভয় জমে আছে। পরিস্থিতি যে কোন দিকে মোড় নেবে, সে নিজেও বুঝতে পারছে না। অয়ন বরাবরই নিজের মনের কথাই শোনে। সে যখন কিছু একটা ঠিক করে ফেলে, তখন তাকে থামানো কারও পক্ষেই খুব একটা সহজ নয়।
_
_
আদিল রুমে ঢুকেই মুহূর্তের মধ্যে থমকে যায়। চোখের সামনে যে দৃশ্যটা ধরা পড়ে, তাতে সে একেবারে হতবিহ্বল হয়ে যায়। পুরো রুমটা নিখুঁতভাবে গোছানো। তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জামাকাপড়, বই, কাগজপত্র—সবকিছুই যেন অদৃশ্য কোনো নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা। এই রুম কি সত্যিই তার? কয়েক সেকেন্ড সে বিশ্বাসই করতে পারে না।
কারণ আদিল বরাবরই অগোছালো মানুষ। তার জীবনে কোনো কিছুই নিয়ম মেনে চলে না, রুম তো দূরের কথা। নিজের রুমের কোনো জিনিসেরই স্থায়ী ঠিকানা নেই। যা যেখানে পড়ে থাকে, সেখানেই পড়ে থাকে। মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কাপড়, টেবিলের উপর এলোমেলো কাগজ, বিছানার পাশে পড়ে থাকা বই, এই বিশৃঙ্খলাই ছিল তার স্বাভাবিকতা। এমনকি তার মা যখনই রুম গোছাতে চাইতেন, আদিল স্পষ্ট আপত্তি জানাত। সে বলত, এই এলোমেলো জীবনটাই তার ভালো লাগে।গোছানো-ছকবাঁধা জীবন তার ধাতে নেই। সে নিজেই নিজের যত্ন নেয় না, সেখানে রুম গোছানোর কথা ভাবাও তার কাছে হাস্যকর ছিল।
তবে সত্যি বলতে কি, আদিল সব সময় এমন ছিল না। মাস কয়েক আগে পর্যন্তও সে এতটা বেখেয়ালি ছিল না। ধীরে ধীরে যেন তার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে পড়েছে। অজান্তেই সে নিজের প্রতি উদাসীন হয়ে গেছে, চারপাশের সবকিছু এলোমেলো করে ফেলেছে।
কেন এমন করছে? এর উত্তরটা শুধু আদিল'ই জানে। অয়ন আর রাকিব তার বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়া সত্ত্বেও সে কাউকে কিছু বলেনি। অয়ন বহুবার তার এই পরিবর্তনের কারণ জানতে চেয়েছে। চিন্তিত কণ্ঠে প্রশ্ন করেছে, বারবার বোঝার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই আদিল বিষয়টা এড়িয়ে গেছে। কিছু কথা এমনই থাকে, যেগুলো শব্দে প্রকাশ করা যায় না। হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা। বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা নিয়ে সে দ্রুত ড্রয়ারের দিকে এগিয়ে যায়। তাড়াহুড়ো করে খুঁজতে থাকে। একটার পর একটা কাগজ সরিয়ে অবশেষে সে পেয়ে যায় সেই ইম্পোর্ট্যান্ট কাগজগুলো। কাগজগুলো হাতে নিয়ে আদিল দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে।
বুকের ভেতরের চাপটা যেন একটু হালকা হয়। সে নিজেকে সামলে নিয়ে রুমের চারপাশে একবার তাকায়—নিশ্চিত হতে চায় কেউ কিছু দেখেনি। তারপর খুব যত্ন করে কাগজগুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে তালা বদ্ধ করে দেয়। এই কাগজগুলোতে লুকিয়ে আছে তার জীবনের এমন এক সত্য, যা সে ছাড়া আর কেউ জানে না। হয়তো কোনোদিন কাউকে জানানো হবে না। কিছু সত্য শুধু নিজের ভেতরেই বন্দি থাকাই ভালো।
আদিল বারবার ভাবছে, তার রুমটা আসলে কে গুছিয়ে দিল? যতই মাথা খাটায়, ততই উত্তরহীন হয়ে পড়ে। পরিচিত কারও কাজ বলেও মনে হয় না, আবার অচেনা কারও পক্ষে এমন নিখুঁতভাবে সবকিছু গুছিয়ে দেওয়াও অসম্ভব। ভাবনার ভেতরেই সে অস্থির হয়ে ওঠে। মাথাটা তার ভীষণ ঝিমঝিম করছে। যেন কেউ মাথার ভেতরে ধারালো কিছু দিয়ে একের পর এক আঘাত করছে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, কপালের শিরাগুলো টনটন করে ওঠে। এই মুহূর্তে আর কিছু ভাবার শক্তি নেই তার অগত্যা আদিল সব চিন্তা আপাতত দূরে ঠেলে দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। শরীরটা ভেঙে পড়ার মতো ক্লান্ত। কোনো কিছু না ভেবেই সে বিছানায় উঠে পড়ে। অভ্যাসবশত কোলবালিশটা শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে, এই অভ্যাসটা তার বহুদিনের।
রুমটা নিস্তব্ধ। শুধু ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ। ঠিক তখনই হঠাৎ করে তার কানে এসে লাগে এক অদ্ভুত আওয়াজ। নরম, চাপা, কিন্তু স্পষ্টভাবে মেয়েলি কণ্ঠ,
- ওম…ওম…ওম…
আদিল চমকে উঠে। চোখ দুটো বড় বড় করে সে চারপাশে তাকায়। রুমে কেউ নেই। দরজা বন্ধ, জানালা বন্ধ। তবু সেই শব্দ যেন ঠিক তার কাছ থেকেই আসছে। বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি খেলে যায়। কে এমন অদ্ভুতভাবে শব্দ করছে? কেনই বা করছে? কিছুই বুঝতে পারে না সে।
ভয় আর বিভ্রান্তির মাঝেই আদিল আবার কোলবালিশটাকে নিজের বুকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে।
ঠিক তখনই সে টের পায়,
কোলবালিশটা যেন অস্বাভাবিকভাবে শক্ত। যেন শুধু তুলোর নয়, ভেতরে কোনো শক্ত কাঠামো আছে। আদিলে'র ভ্রু কুঁচকে যায়। গলায় অবাক আর অস্বস্তির মিশ্র সুর নিয়ে নিজেই আনমনে বলে ওঠে,
"এই কোলবালিশটা এমন কেন? যাহ্ বাবা…কোলবালিশের হাতও আছে নাকি?
কোলবালিশের উপর থেকে চাদরটা সরাতেই আদিল এক ঝটকায় সরে যায়। ভয় আর বিস্ময়ের মিশ্রণে সে চিৎকার করে ওঠে—
"মা মা মাহি'র বাচ্চা তুই এখানে? তাহলে আমার বউ কই?
হঠাৎ এই চিৎকারে মাহি তড়িঘড়ি করে বসে। চোখে ঘুমের ছাপ, মুখে বিস্ময়। থমথমে গলায় সে জিজ্ঞেস করে,
- বউ মানে?
আদিল রীতিমতো হতভম্ব। চারপাশে তাকিয়ে আবার বিছানার দিকে নজর দেয়। বিরক্তি আর বিস্ময় মিশিয়ে সে চিৎকার করে,
"আরে, আমার কোলবালিশটা কই? যে আমার বউ'টার মতো আমার খেয়াল রাখে! শালি, তুই এই রাতের বেলায় আমার রুমে কী করিস?
মাহি কিছুটা লজ্জা মিশ্রিত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
- আদিল ভাইয়া, মানে আপনি আমাকে আপনার বউ ভাবছেন? আমি তো আপনাকে সব সময় খেয়াল রাখি, তাই না?
আদিল চোখ কচটানিয়ে, বিরক্ত কণ্ঠে গর্জন করে…
"চুপ কর, বেডি! তোর লজ্জা করে না তো? এতো বকাঝকা করার পরেও তুই আমার রুমে পা রেখেছিস? এমন বেহায়া কেন তুই?
মাহি একটু উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে, নির্ভীক কণ্ঠে ফিসফিস করে,
- শুনেন, ভালোবাসার জন্য বেহায়া হওয়া কোনো পাপ নয়। তাছাড়া আমি তো আপনাকে অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি। আপনার জন্য একটু বেহায়া হলে ক্ষতি কি? বিয়ের আগে আমি বেহায়া, আর বিয়ের পর আপনি বেহায়া হবেন সেম সেম, বাট ডিফারেন্ট।
আদিল মাথা চেপে ধরে,
"ওহ্ শীট, এই মেয়েটা আমাকে পাগল করে দেবে।
মাহি সাবলীল কণ্ঠে বলল,
- আদিল ভাইয়া, আপনার মাথা ব্যথা করছে? আপনি এখানে শুয়ে পড়ুন, আমি টিপে দিচ্ছি।
আদিল রাগান্বিত কণ্ঠে আওরায়,
"আমার মাথা না টিপে একদম গলা টিপে দে! তোর এসব কাজ-কর্ম আমাকে পাগল করে দিচ্ছে।
মাহি একটুও দম না নিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে ওঠে,
- এক আমিতেই যদি আপনি পাগল হয়ে যান, তাহলে আমাদের বাচ্চাদের কে সামলাবে শুনি?
আদিল চোখ বড় করে তাকায়। গলা চড়িয়ে বলতে যাবে,
"মাহি…
কিন্তু মাহি সঙ্গে সঙ্গেই তার কথা কেটে দেয়। বিরক্তির সাথে বালিশটা ঠিক করতে করতে বলে,
"এই, চিৎকার করবেন না একদম। কত শান্তিতে একটু ঘুমাচ্ছিলাম, আর আপনি সব নষ্ট করে দিলেন। একটা রাত তো আমাকে শান্তিতে ঘুমাতে দিতে পারতেন, না কি?
আদিল দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সামলে বলে,
"নিজের রুম রেখে আমার রুমে এসে শান্তিতে ঘুমাতে এসেছিস?
মাহি চোখ কুঁচকে তাকায়, তারপর নিরীহ ভঙ্গিতে বলে…
- এই দেখুন, ওইভাবে তাকাবেন না। আমি কি ইচ্ছে করে ঘুমিয়ে পড়েছি নাকি? রুমটা তো গরুর ঘরের মতো করে রেখেছিলেন। সেই গরুর ঘরকে মানুষের ঘর বানাতে বানাতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, নিজেই বুঝিনি।
আদিলের কপালের শিরা ফুলে ওঠে।
"তোকে বলেছি এসব করতে?
"আমাকে বলতে হবে কেন? বউ হিসেবে আমার তো একটা দায়িত্ব আছে, তাই না?
"ইডিয়েট!
মাহি একচুলও দমে না। বরং একটু কাছে এগিয়ে এসে বলে,
- একটা কথা বলি?
আদিল খোঁচা দিয়ে উঠলো,
"কত কথা তো বলছিস! এখন আবার অনুমতি চাচ্ছিস কেন?
মাহি গম্ভীর হয়ে যায়। কণ্ঠটা একটু নরম করে বলল,
- না মানে…আপনি ওইদিন বলেছিলেন না, আপনি জুঁই আপুকে বিয়ে করবেন। তো আমি জেনে ফেলেছি, আপনার জীবনে কোনো জুঁই-টুঁই নেই। আপনি আমাকে মিথ্যা বলেছিলেন।
"হোয়াটটট?
মাহি ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে নেয়।
- আরেকটা কথা আছে, যেটা আপনি জানেন না।
আদিল সন্দেহভরা চোখে তাকায়—
"কী?
মাহি শান্ত গলায় বলে,
- জুঁই আপু কনসিভ করেছে।
"তুই…
মাহি তাকে থামিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে বলে,
- আমি সব জানি, বাচ্চাদের পাপ্পা। আপনি যদি ডালে ডালে চলেন, আমিও তাহলে পাতায় পাতায় চলি হুম। যান আজকের রাতের জন্য আপনাকে মুক্তি দিলাম। আগামীকাল বিরক্ত করবো, আর শুনেন মেহেরুন শেখ মাহি'র ভালোবাসা এতোটাও ঠুনকো নয়৷ তাকে আপনি যা বলবেন তাই বিশ্বাস করবে, মাঝে মাঝে একটু রাগ হয় তবে সময়ের সাথে আবারও আপনার কাছে চলে আসবো হু! গুড নাইট বাচ্চাদের পাপ্প।
মাহি ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আদিল তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে উঠে,
"এমন পাগলামো করিস না মাহি! অনেক কষ্ট হয় আমার, কেন বুঝিস না। একটু তো ভালো থাকতে দে আমায়।
দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা দিন কেটে যায়। আহি, মাহি আর মুন—তিনজনেরই এইচএসসি পরীক্ষার বাকি আর মাএ কয়েক মাস। অথচ তাদের পড়াশোনার কোনো চিন্তা নেই। মুন অবশ্য একটু সিরিয়াস, কিছুটা চেষ্টা করে পড়াশোনায় মন দিতে। কিন্তু আহি আর মাহি? পড়াশোনার কথাই শোনার সঙ্গে সঙ্গে যেন তাদের শরীরে জ্বর উঠে আসে।
সোফায় বসে আহি মিষ্টি খাচ্ছে, একে একে মুখে পুড়ে দিচ্ছে। চমচম গুলো মুখে দিতেই কেমন যেন মিলিয়ে যায়, সে তৃপ্তির সঙ্গে খাচ্ছে। তার চারপাশে কী হচ্ছে সেসব তার মাথায় ঢুকছে না। ঢুকছে না বললে ভুল হবে, কারণ খাওয়ার সময় আহি কোনো কথা বলা পছন্দ করে না। অন্যদিকে মাহি কোনো এক কাজের মধ্যে মন দিল। শান্তা শেখ কৌতূহলী চোখে এগিয়ে আসে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করে বোঝার চেষ্টা করছে, মাহি আসলে কী করছে।
ধীরে ধীরে তার চোখে স্পষ্ট হয়, মাহি এক সুন্দর রোমাল তৈরি করছে। শান্তা শেখ কখনোই নিজের মেয়ের হাতের কাজ করতে দেখেননি। পড়াশোনায় ডাব্বা হলেও, হাতে কাজের দক্ষতা মোটেই খারাপ নয়। হঠাৎ তিনি চোখ রাঙিয়ে বললেন,
- এটা কার জন্য তৈরি করছিস শুনি?
মাহি লজ্জা মিশ্রিত কণ্ঠে হেসে বলল,
"তোমার মেয়ের জামাইয়ের জন্য!
কথাটা বলেই জিব্বাহে হালকা কামড় দেয় সে। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে মুখে লজ্জা, গলায় থমথম ভাব নিয়ে ফিসফিস করে—
"আ…আ…আসলে, আম্মা, আমি বলতে চাচ্ছি কি…
- থাক, আর কিছু বলার দরকার নেই। পড়াশোনা তো ঘোড়ার ডিমও পারিস না। এই টুকটাক হাতের কাজ করতে পরলে যদি কপালে একটা জামাই জোটে৷
"জামাই জুটবে নয়, আম্মা। তোমার মেয়ে তো অলরেডি কিউট একটা জামাই নিজের জন্য সিলেক্ট করে ফেলেছে। এখন শুধু তাকে পটিয়ে বিয়ে করে নেওয়ার পালা।
অয়ন দোতলা থেকে আহি'কে খুব মনোযোগ দিয়ে পরখ করছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি হাসি, এমনকি তার বাচ্চামো সবই অয়নে'র মনকে বেসামাল করে তুলছে। খুব করে ইচ্ছে হচ্ছে মেয়েটাকে নিজের সাথে আলিঙ্গন করতেন কিন্তু বাবা শাসিয়েছেন, সুতরাং যেতে পারছে না।
আহি’র প্রতিটি দিক, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি অয়ন'কে যেন ঝড়ের মতো ঝাঁকিয়ে দেয়। হঠাৎ সে টের পায়, দু জোড়া চোখ তার দিকে নজর রাখছে। তার বাবা জাহিদ শেখ ও চাচা মহিবুল শেখ। যদিও চোখ রাখার পেছনে একটি বিশেষ কারণ আছে। এতোদিন মহিবুল শেখ নিশ্চিন্ত ছিলেন— মেয়ের আঠারো বছর হতে আর অনেক দিন বাকি। কিন্তু আর মাএ দু'টো দিন পর মেয়ের আঠারো বছর পূর্ণ হবে, এটাই তার জন্য ভয়।
দীর্ঘ ছয় বছর বিদেশে থেকে, কোনো যোগাযোগ বা কথাবার্তা না করে সেই ছেলে তার মেয়েকে ভুলতে পারেনি। অন্তত এই ছেলে তার মেয়েটাকে নিজের বউ না করে ছাড়বে না। ধীরে ধীরে মহিবুল শেখ অয়নে'র কাছে এগিয়ে আসে। কাঁধে হাত রাখে, গম্ভীর স্বরে বলে…
- ওদিকে তাকিয়ে কি দেখো?
অয়ন এক পলক তার দিকে তাকিয়ে আবারও দৃষ্টি আহি'র দিকে রাখে। ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি ঝুলিয়ে সে ফিসফিস করে—
“দেখার মতো তো আপনার ওই একটা মেয়েই আছে। এখন আপনি যদি আরেকটা ডাউনলোড করেন, তাহলে সেটাও দেখবো। আফটার অল, একটা মাত্র শালি হবে কিনা।
তিনি দাঁত খিঁচিয়ে উঠে,
- বেয়াদব ছেলে ভালো হবে না। এই নোংরা ছেলের সঙ্গে আমার মেয়েকে কোনোদিন বিয়ে দেবো না।
“তাতে কি হয়েছে? আপনার মেয়েকে তুলে নিয়ে বিয়ে কর ফেলবো। ওই পায়ে টায়ে আমি ধরতে পারবো না, মেনে নিলে নেবেন নয়তো বছর বছর হালি হালি নাতি নাতনি উপহার দেবো আপনাকে। আমার মধ্যে ভালোবাসার অভাব আছে নাকি!
হঠাৎ বড় বড় পা ফেলে মহিবুল শেখ সেখান থেকে সরে যান। যতবারই তিনি শান্তভাবে ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে আসেন, ততবারই অয়ন এমন কিছু বলে বসে, যাতে তার রাগ চেপে রাখা অসম্ভব হয়ে যায়। মহিবুল শেখ মনে মনে বিরক্ত হলেও আর কিছু না বলে নিজেকে সরিয়ে নেন।
অয়ন এসবের তোয়াক্কা না করে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে। তার চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও আহি থেকে সরে না। নিচে নেমে সে ঠিক আহি'র পাশেই গিয়ে বসে পড়ে। আহি তখন একমনে মিষ্টি খাচ্ছে। চামচে করে ঝোলসহ মিষ্টি তুলে মুখে দিচ্ছে, যেন এই দুনিয়ায় এখন মিষ্টি ছাড়া আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। অয়ন চুপচাপ বসে সেই দৃশ্যটাই দেখতে থাকে।
আহি'র মিষ্টি খাওয়ার ভঙ্গি, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সামান্য ঝোল এতে অয়ন যেন নিজের অজান্তেই মুগ্ধ হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর আহি টের পায়, কেউ একজন ড্যাব ড্যাব করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সে বিরক্ত হয়ে মুখ তুলে কর্কশ কণ্ঠে বলে ওঠে—
"অয়ন ভাই, আপনার যদি মিষ্টি খেতে ইচ্ছে হয়, তাহলে গিয়ে কিনে খান। আমার মিষ্টির দিকে একদম নজর দেবেন না। আমি একটা মিষ্টিও কাউকে দেবো না। আর আপনাকে তো নয়ই! আপনি হলেন ইবলিশ শয়তানের বাপ,হু!
অয়ন কোনো উত্তর দেয় না। নিঃশব্দে হেসে ওঠে। ঠোঁটের কোণে একচিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে ধীরে বলে—
“তোর মিষ্টি অনেক ফেভারিট, তাই না ডিয়ার?
আহি চামচে করে মিষ্টির শেষ ঝোলটুকু মুখে পুরে নেয়। তারপর মাথা নাড়িয়ে স্বীকার করে,
"অনেক!
অয়ন সুযোগটা হাতছাড়া করে না। একটু সামনে ঝুঁকে নরম গলায় বলে উঠলো,
“তোর জন্য আমার কাছে একটা অফার আছে।
"কী অফার?
“তুই যদি আমার ছোট্ট একটা কাজ করে দিস, তাহলে আগামী এক মাস তোর যত মিষ্টি, চমচম, রসগোল্লা খেতে ইচ্ছে করবে সব আমি নিজে খাওয়াবো। তাছাড়া তোকে নিজে আমি শপিং করিয়ে দেবো।
মুহূর্তের মধ্যেই আহি'র চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। সে খুশিতে গদগদ কণ্ঠে বলে,
"সত্যি?
অয়ন গম্ভীর মুখে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
“তোর অয়ন ভাই কখনো মিথ্যা বলে না।
আহি তড়িঘড়ি হয়ে জিজ্ঞেস করে,
"তাহলে তাড়াতাড়ি বলুন, আমাকে কী করতে হবে?
“আমার রুমে চল আগে!
আহি একটু থমকে যায়।
"রুমে গিয়ে কী করবো?
অয়ন কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলে,
“তোর ইচ্ছে হলে আয়, নইলে অন্য কাউকে খুঁজে নেবো।
"আরে না না! আমি যাবো না কখন বললাম? আপনি উপরে যান, আমি আসছি।
আহি গুটি গুটি পায়ে অয়নে'র রুমের দিকে হাঁটা দেয়। বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা ভয় কাজ করছে, কিন্তু সেই ভয়টাকে ছাপিয়ে গেছে মিষ্টির লোভ। এক মাসের মিষ্টি!, এই চিন্তাটাই তাকে সামনে এগোতে বাধ্য করছে। মাঝপথেই আচমকা আদিলে'র সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আহি'র মুখের ভীতু ভাবটা এক ঝলকেই চোখে পড়ে তার।
আদিল কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
"বনু, কোথায় যাচ্ছিস? আর এভাবে ভয়ে ভয়ে যাচ্ছিস কেন?
আহি একটু থমকে যায়। চোখ নামিয়ে ভিতু কণ্ঠে বলে,
- না মানে ভাইয়া…অয়ন ভাই তার রুমে যেতে বলেছে।
আদিলে'র ভ্রু যোগল কুঁচকে যায়। গলায় স্পষ্ট সন্দেহ,
"কেন?
- অয়ন ভাই বলেছে, তার ছোট্ট একটা কাজ করে দিলে আগামী এক মাস আমাকে অনেক অনেক অনেক মিষ্টি খাওয়াবে আর শপিং ও করে দেবে।
এই কথা শুনে আদিলে'র চোখের চাহনি এক মুহূর্তেই বদলে যায়। গলা কঠিন হয়ে ওঠে।
"ওর রুমে যাওয়ার দরকার নেই। তোর মিষ্টি খেতে ইচ্ছে হলে আমাকে বললেই পারিস। তোর যা যা লাগে অর্ডার করে দে, আমি পেমেন্ট করে দেবো। কিন্তু একা একা অয়নে'র রুমের ধারে-কাছেও যাবি না। বুঝতে পেরেছিস?
আহি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর এদিক-ওদিক মাথা নেড়ে কোনো কথা না বলেই সেখান থেকে সরে যায়। আহি চলে যেতেই আদিলে'র মুখে গম্ভীর ভাব জমে ওঠে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সে সোজা অয়নে'র রুমের দিকে পা বাড়ায়।
অয়ন তখন বিছানায় উল্টো হয়ে বসে ছিল। হঠাৎ কারো পায়ের শব্দ পেয়ে সে চট করে উঠে দাঁড়ায়। মূহুর্তেই ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি খেলে যায়। সে দরজার দিকে তাকিয়ে এক ঝটকায় এগিয়ে আসে। কিন্তু সামনে যাকে দেখে, তাকেই দেখে সে থমকে যায়। ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত কণ্ঠে বলে—
“শাউ*য়ার নাতি তুই? ভাঙিস দেখে ফেলেছি। নয়তো তোর উপর দিয়ে কী বয়ে যেত কে জানে! বাই দ্য ওয়ে, আমার দোয়েল পাখি'র জায়গায় তুই কেন?
আদিল বুকের উপর দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠান্ডা গলায় বলে উঠলো,
"তোর দোয়েল পাখি নিজের রুমে।
অয়ন যেন বিশ্বাসই করতে পারে না। চোখ বড় করে বলে,
“হোয়াটটট? ওর তো আমার রুমে আসার কথা ছিল! শালা সত্যি করে বল, তুই ওকে চলে যেতে বলেছিস, তাই না?
আদিল ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে অয়নে'র বেডে বসে পড়ে। ঠোঁটের কোণে এক গাল হাসি টেনে নিয়ে বলে,
"হুম!
অয়নে'র চোখে রাগের ঝিলিক।
“কেন?
আদিল এবার হাসিটা একটু চওড়া করে বলে,
"তোর কী মনে হয়, আমি সজ্ঞানে মুরগিকে শেয়ালের কাছে পাঠাবো? আবুলের নাতি, তোর লজ্জা করে না? সামান্য মিষ্টির লোভ দেখিয়ে আমার বোনটার সঙ্গে আকাম করতে চাচ্ছিলি?
অয়ন ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলে ওঠে,
“লজ্জা আর আমি? নো ওয়ে! নিজের বউকে একটু ভালোবাসা দেবো তাতে লজ্জা কিসের? ভুলে যাচ্ছিস নাকি, আমি তোর দুলাভাই লাগি। সো সম্মান দিয়ে কথা বল।
আদিল শান্ত, দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দেয়…
"দেখ ভাই, এমনিতেই বাসার কাউকে না জানিয়ে একটা আকাম করে বসে আছিস। শুধু বাসার লোকই নয়, আমার বোনটাও জানে না যে তার বিয়ে হয়ে গেছে। আর এখন যদি তুই ভুলভাল কিছু করে বসিস, তাহলে হিতে বিপরীত হবে। এই সহজ কথাটা কেন বুঝতে পারছিস না?
অয়ন হেসে কাঁধ ঝাঁকায়।
“হেই ইয়ার, ভয় পাচ্ছিস কেন? এমনিতেও আর কটা দিন পর তোর বোনকে পবিত্র কালেমা পড়ে নিজের করে নেবো। সো প্যারা না নিয়ে চিল কর। আর তোর কি সত্যিই মনে হয় আমি ভুলভাল কিছু করবো?”
এই বলে অয়ন ধীরে ধীরে আদিলে'র পাশে এসে বসে। এক হাত তুলে তার কাঁধে রাখে। গলার স্বর এবার খানিকটা নরম,
“শোন, দোয়েল পাখি আমার বউ এটা ঠিক। কিন্তু পুরোপুরি পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি তেমন কিছু করবো না। আমি ওকে ভালোবাসি, বুঝলি? নিজের চাহিদা মেটানোর জন্য ওই বাচ্চা মেয়েটার মনে আঘাত দেওয়ার মানুষ আমি নয়। ধীরে ধীরে ওকে বুঝাবো, ধীরে ধীরে আমাকে ভালোবাসতে শেখাবো। তারপর তোকে মামা বানানোর প্ল্যানিং করবো। তাই এত টেনশন নিস না।
কথাগুলো শুনে আদিলে'র ভেতরের জমে থাকা টানটা একটু আলগা হয়। সে একবার গভীরভাবে অয়নে'র দিকে তাকায়, তারপর ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে—
"তুই বিয়ে করার প্ল্যানিং করেছিস?
অয়ন মাথা নেড়ে দৃঢ় স্বরে বলে,
“হুম! শুধু প্ল্যানিং নয়, কখন, কিভাবে, কেমনে কেমনে করবো সব ঠিকঠাক করে রেখেছি।
আদিল এবার কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেও গলায় সতর্কতার ধার বজায় রাখে,
"দেখ ভাই, তুই যা চাচ্ছিস তাই হচ্ছে। কিন্তু আহি'র এইচএসসি এক্সাম দেওয়ার আগে বিয়ের কথা মাথাতেও আনবি না। নয়তো মাথা ফাটিয়ে ফেলবো। আর এই কয়েক মাস ওর থেকে একটু দূরে দূরে থাকার চেষ্টা কর। ওকে পড়াশোনায় মন বসাতে হবে। এক্সাম শেষ হলে তোদের বিয়ের ব্যাপারে আমি নিজেই আব্বা'র সঙ্গে কথা বলবো। কিন্তু পালিয়ে-টালিয়ে বিয়ে করার কোনো চিন্তা মাথায় আনলে, এখনই সেটা বাদ দে।
অয়ন সামান্য হাসে! তার হাসির আড়ালে কি রহস্য আছে আদিল বুঝলো না। শুধু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“ওকে!
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে কাঙ্ক্ষিত নাম দেখে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি চওড়া হয়। আদিল তার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
"ভাই এসব ছেড়ে দিলে হয় না? তুই তো জানিস, আমার বোনটা এসব ভয় পায়।
“ভয়'কে সাহসে রুপান্তর করতে জানে অয়ন! আর এসব করা যদি আমি ছেড়ে দেয় তাহলে ওদের বিরুদ্ধে কে দাঁড়াবে হুম? ওই নরপৈশাচদের বুঝতে হবে, টাকার কাছে আইন বিক্রি হলেও এই অয়নে'র কাছে তারা মাফ পাবে না। তাদের করার প্রতিটি অন্যায়ের শাস্তি দেবো আমি, সেটাও রাস্তার কুকুরদের মতো। যাতে কোনো মায়ের বুক খালি করতে না পারে।
এই বলে অয়ন চলে যায়। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আদিল দীর্ঘ শ্বাস নেয়। সে চায় প্রতিটি পাপিষ্ঠ শাস্তি পাবে, তাদের করা অন্যায়ের শাস্তি তারা পাবেই পাবে। হোক না অয়নে'র হাত দিয়ে, তাতে ক্ষতি কিসের। তবে সব সত্য যখন আহি জানতে পারবে তখন মেনে নিতে পারবে তো?