“শালির ঘরে শালি, আমি কি তোকে রেখে পালিয়ে যাচ্ছি? তোর ওই বা*লের মুখ অফ কর নয়তো বোম মেরে উড়িয়ে দেবো।
অতঃপর অয়ন ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। সে দ্বিধা দ্বন্দ ছাড়ায় যেই দরজা খুলে ঠিক তখনই দেখতে পায় আদিল তার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে।
সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা ধাক্কা মেরে হুরমুরিয়ে রুমে ঢুকে পড়ে আদিল। হঠাৎ এমন আগমনে রুমের ভেতরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে যায়। ঠিক তখনই আহি আদিল’কে সামনে দেখে আঁতকে ওঠে। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে তার। আদিল একবার নিজের বোনের দিকে তাকায় তো আরেকবার ভ্রু কুঁচকে অয়নে’র দিকে তাকায়—কিন্তু অয়ন সম্পূর্ণ ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিতে, নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে। যেন এসব কিছুতেই তার কিছু যায় আসে না। আহি আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। লজ্জা, ভয় আর অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে সে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে।
যাওয়ার ঠিক আগে ক্ষীণ স্বরে, প্রায় কাঁপা কণ্ঠে বলে যায়—
"ভাইয়া, সত্যি আমি আসতে চাইনি…এই অয়ন ভাই আমাকে জোর করে কোলে তুলে নিয়ে এসেছে।
এই কথাটা বলেই সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে চলে যায়। আহি বেরিয়ে যেতেই আদিলে’র রাগ যেন বিস্ফোরণ ঘটায়। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে অয়নে’র পিঠে ঠাস ঠাস করে কয়েকটা কিল বসিয়ে দেয়। তার চোখে মুখে আগুন জ্বলছে।
সে দাঁত চেপে হুংকার দিয়ে বলে ওঠে,
"লুচ্চার ঘরে লুচ্চা! তোর এতো কুরকুরানি কই থেকে আসে হ্যাঁ? সারাদিন শুধু আমার বোনের দিকেই নজর! তুই যে আকাম করতে যাচ্ছিলি বাসার কেউ দেখলে কী হতো ভেবেছিস একবার?
অয়ন কিল খেয়েও একচুল নড়ে না। বরং ঠোঁটের কোণে ঠাণ্ডা হাসি টেনে নিয়ে চরম বেপরোয়া গলায় বলে—
“তোর আবা*ল মার্কা কথা তুই রাখ। বিয়ে করা বউ আমার, ওকে শুধু কোলে নয়, দরকার হলে কাঁধে তুলে নাচবো! তারপর দেখবো কোন বা*ল পাকনায় কি বলে, আর তুই বা এই সুসময় ডিস্টার্ব করতে এসেছিস কেন? যেই পিরিতটা একটু জমে ছিল, আর তুই কাবাব মে হাড্ডি হয়ে ঢুকে পড়লি।
আদিল রাগে দাঁতে দাঁত পিষে উঠে। চোখ লাল হয়ে যায় তার। গলা ভারী করে চেঁচিয়ে বলে,
"তোর রুমে বা*ল ফালাইতে আইছি।
অয়ন বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে জবাব দেয়,
“নিজের এতো বড় রুম থাকতে আমার রুমে কোন সুখে বা*ল ফালাইতে আইসোস?
"অয়নে’র বাচ্চা…
কথা শেষ করার আগেই অয়ন ধমকে ওঠে,
“চুপ কর শাউ*য়্যার নাতি! কিসের জন্য এসেছিস সেটা বল।
আদিল এবার একদম সামনে এগিয়ে এসে চোখে চোখ রেখে বলে,
"তুই বুঝতে পারছিস না কেন এসেছি? তোকে এতোবার বারণ করার পরেও মন্ত্রীর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে মার্ডার করলি কেন?
অয়ন ঠান্ডা, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আদিলে’র দিকে তাকিয়ে থাকল। যেন এই কথাগুলো তার কাছে নতুন কিছু নয়। ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি খেলিয়ে সে ধীরে ধীরে জবাব দিল—
“কেন আবার মার্ডার করবো? মন্ত্রী কোথায় আছে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে বলেনি, তাই মেরে ফেলেছি।
কথাটা শুনে আদিল যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বিশ্বাস করতে পারছিল না, এতটা সহজভাবে, এতটা স্বাভাবিক সুরে কেউ মানুষের জীবন নেওয়ার কথা বলতে পারে!
সে এক ধাপ এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"লাইল সিরিয়াসলি অয়ন? শুধু জিজ্ঞেস করার পরেও বলেনি বলে তাকেই মেরে ফেলবি? এই নিয়ে পাঁচজনকে মেরে ফেলেছিস, পাঁচজন! তোর কি মনে হয় এভাবে তুই ওই নরপৈশাচকে খুঁজে পাবি? কেউ জানে না সে কোথায় আছে। আর তার ভুলের জন্য তুই একের পর এক নিরীহ মানুষকে খুন করে যাচ্ছিস।
কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই অয়নে’র ভেতরের আগুন যেন বিস্ফোরণ ঘটাল। সে হঠাৎ ঘুরে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এক সজোরে পাঞ্চ মারল। ঝনঝন শব্দে আয়নাটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।রুমের বাতাসও হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। অয়নে’র চোখ মুহূর্তেই বদলে গেল নরম নয়, বরং ভয়ংকর কঠিন। সে হঠাৎ গর্জন তুলে বলল,
“নিরীহ? তুই ওদের নিরীহ বলছিস?
সে ধীরে ধীরে ঘুরে আদিলে’র দিকে তাকাল। চোখ দুটো লালচে, ভেতরে জমে থাকা ঘৃণা আর যন্ত্রণার আগুন স্পষ্ট।
“তুই জানিস না ওই কু*ত্তার বাচ্চা মন্ত্রী আর ওর ছেলে আমার কলিজায় হাত দিয়েছিল! আমার ছোট্ট ছোট্ট পাখি গুলোকে নরক যন্ত্রণায় ফেলে দিয়েছিল, শুধু আমার পাখি গুলো নয় আরো কতশত পাখি ছিল কেউ জানে না। শিশু ছিল ওরা, নিষ্পাপ ফুলের মতো! যাদের হাত ধরে একদিন এই দেশ দাঁড়াতো!
যাদের আমি মেরেছি, তারা সবাই ওই মন্ত্রীর সঙ্গ দিতো। সব জানতো, কেন? ওরা কি চাইলে এই পাপ থেকে সরে আসতে পারতো না ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ছিল ওরা! সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ছিল ওদের চোখে!
রুমের ভেতর এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
আদিল গভীর নিঃশ্বাস নিল। সে বুঝতে পারছে অয়নে’র যন্ত্রণা, তার ক্ষোভ সবকিছু। কিন্তু তবুও সে মাথা নেড়ে বলল—
"আমি বুঝতে পারছি অয়ন। কিন্তু তাই বলে আসল দোষীকে না ধরে অন্যদের সাথে এমন করা ঠিক নয়। হ্যাঁ ওরা টাকার লোভে এমন করতো, ইভেন ওরা না করলেও অন্য কাউকে দিয়ে এমন পাপ কাজ করাতো। কারণ মন্ত্রীর মুখোশের আড়ালে এসব নোংরা কাজেই করে, তার এসব কাজ আরো অনেকেই জানে কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। কারন তাদের পকেটেও আলাদা ডোনেশন দেওয়া হয়।
আদিল কিছু সময় চুপ থেকে আবার বলল,
"আচ্ছা শোন, তোকে একটা ইনফরমেশন দিতে এসেছিলাম। মন্ত্রীর মেয়ে, সাদিকা ইমরোজ। একমাত্র সে-ই জানে তার বাবা আর ভাই কোথায় আছে। মন্ত্রীকে খুঁজে বের করতে হলে ওর কাছ থেকেই সব বের করতে হবে।
এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই অয়নে’র ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। হাসিটা এতটাই ঠান্ডা আর ভয়ংকর যে আদিল নিজেও বুঝতে পারল না—এই হাসির আড়ালে কী লুকিয়ে আছে। অয়নে’র চোখে মুহূর্তেই অন্য রং খেলে গেল। কিছু না বলেই সে ঘুরে দাঁড়াল। কোনো তোয়াক্কা না করে, কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে, সে ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আদিল সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। সে নিজেও বুঝতে পারছে না অয়ন আসলে কি করতে চাচ্ছে।
অয়ন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। প্রতিটা ধাপে তার পা পড়ছিল নিঃশব্দে, কিন্তু চোখের ভেতরে ছিল অদ্ভুত এক স্থিরতা। নেমে এসে সে নিঃশব্দে গিয়ে মহিবুল শেখে'র পাশে বসে পড়ে। ঠিক তাদের সামনেই চেয়ারে বসে চা খাচ্ছিল তার বাবা, জাহিদ শেখ।
অয়ন বসতেই মহিবুল শেখ ভ্রু জোড়া কুঁচকে তাকালেন। কারণ অয়ন পাশে বসেও তার মনোযোগ মোটেও তাদের দিকে নয়—তার দৃষ্টি আটকে আছে আহি’র ওপর। আহি তখন চেয়ারে বসে নিশ্চিন্তে কলা খাচ্ছে। শুধু খাচ্ছেই না, নিজের চারপাশে এমনভাবে কলাগুলো সাজিয়ে রেখেছে যেন সেগুলো তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। মুন অনেকক্ষণ ধরেই একটা কলা চাইছে, কিন্তু আহি কিছুতেই দিচ্ছে না। বেচারা মুন মুখ ভার করে চুপচাপ বসে আছে।
অয়নে’র সেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা চোখ মহিবুল শেখে’র নজর এড়ায় না। তিনি গলা খানিকটা ভারী করে গম্ভীর স্বরে বলে ওঠেন,
- চোখ নিচে নামাও অয়ন। তুমি যেভাবে আমার মেয়েটার খাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছো, তাতে আমার মেয়ের পেটে ব্যথা হবে। খেতে ইচ্ছে হলে বলো, কিন্তু এভাবে বদ নজরে তাকিয়ে থেকো না।
অয়ন সঙ্গে সঙ্গে আহি’র দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মহিবুল শেখে’র দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে সে নির্লজ্জ স্বরে বলে—
“ডিয়ার শ্বশুর আব্বা, আপনার মেয়ে হচ্ছে যত নষ্টের মূল। সে এমনভাবে আমার সামনে আসে যে আমার চোখ আপনা-আপনি ওর দিকেই চলে যায়। ও আমাকে নজর ঠিক রাখতে দেয় না।
- চুপ কর বেয়াদব ছেলে!— মহিবুল শেখ চোখ রাঙিয়ে ওঠেন।
“আচ্ছা, চুপ করলাম। কিন্তু এবার তো আপনার মেয়েটাকে আমার হাতে তুলে দিন। রাতে বউ ছাড়া ঘুম আসে না। এই শীতে দেহ সরি সরি মনটা শুধু বউ বউ করে।
মহিবুল শেখ এবার রীতিমতো রেগে যান। গলা চড়া করে বলেন,
- মুখের ভাষা সংযত করো, নইলে হাত ভেঙে ফেলবো।
অয়ন একটুও ভয় না পেয়ে উল্টো ঠান্ডা কন্ঠে জবাব দেয়,
“হাত ভাঙবেন, ভাঙতেই পারেন। কিন্তু আসল জিনিসটা তো ভাঙতে পারবেন না। আসল কাজ তো আর হাত দিয়ে হবে না, ওটা থাকলেই হলো!
- অয়ন! — মহিবুল শেখ চেঁচিয়ে ওঠেন।
কিন্তু অয়নে’র মুখে তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সামনে তাকিয়ে থাকে। ঠিক তখনই চশমার ফাঁক দিয়ে জাহিদ শেখ খুব গভীর মনোযোগে নিজের ছেলে আর ভাইকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার চোখে সন্দেহের ছায়া স্পষ্ট। তিনি অয়নে’র চোখে এমন কিছু দেখতে পাচ্ছেন, যা সহজে উপেক্ষা করার মতো নয়। বয়সের সাথে সাথে মাথার চুল যেমন এমনি এমনি পাকে না, তেমনি এই অভিজ্ঞ দৃষ্টি এমনি এমনি ভুল হয় না।
জাহিদ শেখে’র সেই তীক্ষ্ণ চাহনি টের পেয়ে অয়ন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে—
“আব্বা, আপনি ওভাবে তাকিয়ে কী দেখছেন?
জাহিদ শেখ ধীর কিন্তু গভীর কণ্ঠে বলেন,
"তোমাকে দেখে আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে। সত্যি করে বলো তো, তোমার মাথায় কোনো অপকর্মের বুদ্ধি ঘোরাঘুরি করছে? তুমি কি কোনো বড় কিছু করার জন্য বসে আছো?
অয়ন আনমনে বলে উঠলো,
“আপনি শুধু শুধু সন্দেহের চোখে তাকাবেন না আব্বা! আমার কি মান ইজ্জত নেই আপনাদের মেয়েকে তুলে নিয়ে বিয়ে করবো…!
"আমি কখন বললাম তুমি আমাদের আম্মাকে তুলে নিয়ে বিয়ে করবে?
কথাটা বলেই জাহিদ শেখ ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকান। তার কণ্ঠে বিরক্তি, চোখে সন্দেহ। কিন্তু অয়ন যেন এসবের তোয়াক্কাই করছে না। সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে যায়, ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসি লেগে আছে।
ঠিক তখনই মহিবুল শেখ আর নিজেকে সামলাতে পারেন না। হঠাৎ গলা চড়িয়ে চিৎকার করে ওঠেন,
- ভাই, আপনার ছেলে মনে মনে কী ভয়ংকর শয়তানি বুদ্ধি এঁটে বসে আছে! এই বাড়িতে আমার মেয়েটা একদমই সেফ নয়। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি, এই ছেলের চোখে ভালো কিছু নেই। আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করবো না। এক সপ্তাহের মধ্যে আমার মেয়েকে এই বাড়ি থেকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেবো। যত দূরে রাখা যায়, ততই ভালো।
“তার আগেই তো আমি আপনার মেয়েকে নিয়ে ভেগে যাবো!
অয়ন বিরবির করতে করতে সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়। মহিবুল শেখ আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে আছে, সামনে কি হতে যাচ্ছে সেটাই ভাবছে।