চোখে–মুখে ঠাণ্ডা পানি আঁচড়ে পড়তেই অয়ন ধরফরিয়ে উঠে বসে। হঠাৎ ঘুম ভাঙায় সে যেন দিশেহারা হয়ে যায়। চোখ কচলাতে কচলাতে চিৎকার দিয়ে ওঠে—
“কোন শাউ*য়্যার নাতিরে আমার দুঃখের ঘুম ভেঙে দিলি?
চোখ খুলেই সামনে যাকে দেখে, তার মেজাজ মুহূর্তেই আরও দ্বিগুণ চওড়া হয়ে যায়। রাকিব দাঁড়িয়ে আছে নির্লজ্জ মুখে। অয়ন রাগে দাঁত চেপে তাকিয়ে থাকে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে আহি, মাহি আর মুন—তিনজনই নীরবে পুরো দৃশ্যটা দেখছে।
অয়ন তাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে গর্জে ওঠে,
“এই সব বা*ল পাকনা গুলা আমার রুমে কি করিস?
রাকিব অবশ্য অয়নে’র ধমকে ভয় পাওয়ার মানুষ না। সে হাত ভাঁজ করে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তারপর উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
"আমাদের কথা বাদ দে, আগে বল তোর দুঃখের ঘুম মানে কী? তোর তো খুশিতে নাচার কথা ছিল আজ সকালে। বাই দ্য ওয়ে, ভাবি আমার ঠিকঠাক মতো হাঁটছে কিভাবে?
অয়ন রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। রাকিব তার দৃষ্টি পাত্তা না দিয়ে দুষ্টু হেসে আওরায়,
"দোস্ত বা'স'র রাত কেমন কাটলো?
অয়ন মূহুর্তেই দাঁতে দাঁত পিষে গর্জন তুলে,
“শাউ*য়্যার বা'স'র করছি। স্যা*টা ভাঙা বউ জুটেছে কপালে, সামান্য চুম্মা দেওয়ার আগেই লেটকাইয়া পইড়া গেছে। না জানি কিছু করতে গেলে মইরা টইরা যাইবো নাকি?
অয়নে’র কথা শেষ হতেই সবার মধ্যে প্রথমে মাহি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে হঠাৎ খিলখিল করে হেসে ওঠে। তার সেই হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ে পুরো রুমে। মাহি’র হাসি দেখে উপস্থিত বাকিরাও পিক করে হেসে দেয়। এই পুরো দৃশ্যটা দরজার আড়াল থেকে নীরবে দেখছিল আদিল। কারো দিকে তার চোখ নেই, শুধু মাহি’র দিকেই তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। আজ অনেক দিন পর মেয়েটার ঠোঁটের কোণে এমন হাসি ফুটেছে। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে তার। সে তো এই হাসিটাই দেখতে চেয়েছিল এই প্রাণখোলা, নিষ্পাপ হাসি।
কতদিন এই পরিচিত মুখটা দেখতে পারবে, জানা নেই তার। ভাগ্য কতদিন তাকে এই সৌভাগ্য দেবে, সেটাও অজানা। কিন্তু যতদিন পারবে, সে এক মুহূর্তও চোখ সরাবে না। প্রাণ ভরে দেখবে। এই হাসিটাই তার সবচেয়ে বড় পাওনা হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে, সেই হাসিই অয়নে’র মাথার ভেতর আগুন ঢেলে দেয়। সবার হাসি দেখে তার রাগ আরও বেড়ে যায়। চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। সে আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারে না। বিছানায় পড়ে থাকা ফোনটা ঝট করে তুলে নেয় অয়ন। কোনো চিন্তা না করেই সজোরে ছুড়ে মারে রাকিবের দিকে। পরিস্থিতি বুঝে রাকিব মুহূর্তের মধ্যেই সরে যায়। আর সোজা গিয়ে আঘাত করে আদিলের কপাল বরাবর।
আঘাত লাগতেই আদিল ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে। সে এক হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যায়, আঘাতটা মোটেও হালকা ছিল না। এই দেখে মাহি আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সে দৌড়ে গিয়ে আদিলে'র পাশে দাঁড়ায়। কণ্ঠে উৎকণ্ঠা আর ভয় মিশে যায়,
- আদিল ভাইয়া, আপনি ঠিক আছেন? অনেক ব্যথা লেগেছে তাই না?
এরপর মাহি ধীরে ধীরে ঘুরে অয়নে’র সামনে এসে দাঁড়ায়। মুখে স্পষ্ট বিরক্তি,
- ভাইয়া, ফোনটা একটু আস্তে ছুড়লে কি হতো? দেখো তো, কতটা ব্যথা পেল আদিল ভাইয়া!
তার কথার সঙ্গে সঙ্গেই অয়নে’র ভেতরের বিরক্তি যেন উপচে পড়ে। সে ঠোঁট বাঁকিয়ে কটাক্ষের সুরে বলে,
“আমার কী দোষ? তোর ভা’তা’র কোন সুখে ওই দরজার আড়াল থেকে আমাদের কথা শুনছিল? এতই যখন কথা শোনার ইচ্ছে ছিল, তাহলে রুমে আসতে সমস্যা কী ছিল?
অয়নে’র কথায় মাহি এক মুহূর্ত থেমে যায়। সে আবার উল্টো হয়ে আদিলে’র দিকে তাকায়। আদিল তখন শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে ব্যথার ছাপ স্পষ্ট। মাহি দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে গড়গড় করে বলতে শুরু করে,
"আমার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই। আমি তো রুমেই ঢুকতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু রাকিবে’র জন্যই শুধু শুধু এই ব্যথাটা পেলেন।
কথা শেষ হতে না হতেই মাহি’র রাগ যেন বাঁধ ভেঙে যায়। সে দৌড়ে গিয়ে রাকিবে’র চুলের মুঠি শক্ত করে টেনে ধরে। আচমকা এমন ঘটনায় রাকিব চিৎকার দিয়ে ওঠে,
"এই শালীকা! এমন দজ্জালের মতো বিহেভ করছো কেন? ভুলে যেও না, আমি তোমার হবু দুলাভাই। চুল ছেড়ে দাও, তাহলে চকলেট কিনে খাওয়াবো।
মাহি চোখ রাঙিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দেয়,
- আমি বাচ্চা নই যে আপনার দেওয়া চকলেট খাবো। আপনি কেন ওখান থেকে সরে গেলেন? শুধু মাত্র আপনার জন্যই আমার আদিল ভাইয়া ব্যথা পেল।
এই অবস্থা দেখে আদিল আর চুপ থাকতে পারে না। সে দ্রুত এগিয়ে এসে মাহি আর রাকিব’কে আলাদা করে দেয়।
"মাহি, এমন করছিস কেন রাকিবে’র সঙ্গে? হ্যাঁ, একটু ব্যথা পেয়েছি। তাই বলে ওর চুল টেনে ধরবি?
মাহি ছলছল চোখে আদিলের’ দিকে তাকায়। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বলে,
- আমি তো আপনাকে…
কথাটা শেষ করার আগেই আদিল থামিয়ে দেয়। সে চোখ নামিয়ে সংক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
"আমাকে নিয়ে তোর ভাবতে হবে না। তুই নিজের কথা ভাব।
এই কথায় মাহি’র বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। সে নিঃশব্দ হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর ধীরে ধীরে বলে,
- সরি, আদিল ভাইয়া। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আপনার জন্য ভাবার লোক আছে। আমার এতটা অধিকার বোধ দেখানো উচিত হয়নি।
হঠাৎ করেই অয়নে’র ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সে গর্জে উঠে পুরো রুম কাঁপিয়ে তোলে,
“শাউ*য়্যার নাতিরা, থামবি তোরা? তোদের এই স্যা*টা ভাঙা ঝগড়া আমার রুম থেকে বের হয়ে কর। সকাল সকাল সবগুলো আমার মাথা খেয়ে নিচ্ছে!
অয়নে’র চিৎকারে রুমের ভেতরের পরিবেশ মুহূর্তেই থমকে যায়। শব্দটা এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে মুন আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। সে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়, কারন সে তার ভাইয়ের রাগকে প্রচন্ড ভয় পায়। মুন’কে এভাবে চলে যেতে দেখে রাকিব এক পলক তার দিকে তাকায়। তারপর বিরক্ত আর কটাক্ষ মেশানো গলায় বলে ওঠে,
"এই শালার তোর মুখ দিয়ে কখনো মিষ্টি কথা বের হবে না। জন্ম থেকেই শালা তেঁতো তেঁতো কথা বলে। দেখলি তো, নিজের বোনটাও ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল।
রাকিবে’র কথা শেষ হতেই অয়ন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুই গিয়ে সেই ভয় ভাঙিয়ে দিয়ে আয়।
"সেই সুযোগ দিলে তো! আমাকে দেখলেই তো তোর বোন দশ হাত দূরে থাকে।
সে বিরবির করে বলল।
অয়ন এক এক করে সবার দিকে তাকায় রাকিব, আদিল, মাহি তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামে আহি’র উপর। অয়ন ইশারা করে আহি’কে নিজের কাছে আসতে বলে। আহি একটু থমকে যায়। সে অবচেতনে নিজের ভাইয়ের দিকে তাকায়। ঠিক তখনই অয়নে’র গলা আবারও চড়ে ওঠে,
“শাউ*য়্যার নাতি! তোর ভাইয়ের দিকে না তাকিয়ে ভা’তা’রের দিকে তাকা। আর তুই নিজে আসবি নাকি আমি আসবো?
আহি শুকনো ঢোক গিলে ধীরে ধীরে অয়নে’র পাশে গিয়ে বসে। বুকের ভেতরটা ধুকধুক করছে, যেন প্রতিটা নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। ঠিক তখনই অয়ন এক মুহূর্তও দেরি না করে আহি’র কোমড় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। আহি চমকে উঠে ছটফট করতে থাকে। পরিস্থিতির হঠাৎ বদলে যাওয়া তাকে আরও অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। এক পলক সে তাকায় অয়নে’র দিকে, আরেক পলক আদিল, মাহি আর রাকিবে’র দিকে। সে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
"অয়ন ভাই, ছাড়ুন সবাই এখানে আছে।
অয়ন ভ্রু কুঁচকে তাকায়, কণ্ঠে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই।
“সো হোয়াট? আমি কি ওদের ভয় পায় নাকি? বিয়ে করা বউ তুই আমার। অন্য কারো গার্লফ্রেন্ড নয়।
এই কথায় আহি আরও কাচুমাচু হয়ে যায়। সে চোখ নামিয়ে চুপচাপ বসে থাকে, মন চাচ্ছে মাটির নিচে ঢুকে যেতে। হঠাৎ করেই অয়ন গলা তুলে বলে ওঠে,
“হেই গাইস, তোমরা এখন আসতে পারো।
অয়নের কথায় রাকিব ভ্রু নাচিয়ে কটাক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করে,
"কেন? এক্সট্রা ক্লাস করবি নাকি?
অয়নে’র ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসি খেলে যায়। রাকিব সবাইকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে দুষ্টু হেসে বলে,
"এক্সটা ক্লাস কর ইট’স ওকে। বাট এক্সট্রা ক্লাস করতে গিয়ে এক্সট্রা ডোজ দিয়ে দিস না আবার, নয়তো তুই থাকবি গাঙ্গে আর তোর বউ থাকবে চান্দে।
এই বলে হাসতে হাসতে রাকিব চলে যায়। আদিল নিঃশব্দে হাসে কারণ তার পাশে মাহি রয়েছে। তারা চলে যেতেই আহি ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে,
"অয়ন ভাই এক্সট্রা ক্লাস মানে কি?
অয়ন ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে আওরাল,
“বদ্ধ রুমে চুম্মা চুম্মি করাকে এক্সট্রা ক্লাস বলে! যেই ক্লাস একটু পর আমি করবো!
মুহূর্তের মধ্যেই আহি ভরকে যায়। বুকের ভেতর ধকধক শব্দটা যেন কানে কানে বাজতে থাকে। মাথার ভেতর একটাই চিন্তা, এখান থেকে পালাতে হবে। সে যেই দৌড় দেওয়ার জন্য পা বাড়ায়, ঠিক তখনই অয়ন খপ করে তার হাত ধরে ফেলে। আচমকা এই স্পর্শে আহি পুরোপুরি বরফ হয়ে যায়।
অয়ন তার বাহু জোরা শক্ত করে চেপে ধরতেই আহি কাঁদতে কাঁদতে বলে,
"অয়ন ভাই ছেড়ে দেন আমায়। আমি এক্সট্রা ক্লাস করবো না। শুধু এক্সট্রা ক্লাস নয়, আমি কোনো ক্লাসই করবো না। আব্বা, আপনার ভাইয়ের ছেলে আমার সাথে পঁচা কাজ করতে চায়।
আহি’র কান্না আর কথায় অয়ন মুহূর্তেই কড়া হয়ে যায়। সে ভ্রু কুঁচকে ধমকে ওঠে,
“চুপ কর মাতারী। কিছু করার আগেই এমন কান্নাকাটি শুরু করে দিলি। কিছু করতে গেলে কি হবে, কে জানে?
আহি দুই হাতে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,
"ছেড়ে দেন না অয়ন ভাই। আমি একটা অবুঝ বাচ্চা মেয়ে। আপনি দামড়া বেডা হয়ে বাচ্চা মেয়েকে টর্চার করবেন?
“বুঝিস না কেন বউ? বাচ্চা মেয়েকে বড় করার জন্য একটু টর্চার করতেই হবে।
"মাবুদ, তুমি আমারে উঠাইয়া নাও। আমি বড় হতে চাই না। আমি তো....