অয়নে’র বুকের সাথে মাথা ঠেকিয়ে সে আবার বলে,
"আমাদের সাথে যা হয়েছে, আমি সব ভুলে গেছি সত্যি। কিন্তু তুমি আমাকে কথা দাও বাবাই, আমাদের মতো আর কাউকে যেন এমন যন্ত্রণা সহ্য করতে না হয়। কেউ যেন আর আমার বোনদের মতো হারিয়ে না যায়।
অয়নে’র বুকটা হঠাৎ করেই কেঁপে ওঠে। যাদের সে নিজের প্রাণ দিয়ে আগলে রেখেছে। সামান্য একটা ঝড়েই যেন সেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। এত বছরের ভালোবাসা, যত্ন, নিরাপত্তা—সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সে শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বুকের ভেতরটা হু হু করে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
কিছু দূরে আদিল নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে। চোখে মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু মাথার ভেতর চিন্তার ঝড়। তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার যদি কিছু হয়ে যায়, অয়ন কি সেটা সহ্য করতে পারবে?
কথা গুলো ভাবতেই মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। না… সে এখনই হারিয়ে যেতে চায় না।।সে বাঁচতে চায়। সে সবার সঙ্গে, একসাথে থাকতে চায়।তারও তো স্বপ্ন ছিল, একদিন নিজের একটা ছোট্ট সংসার হবে। তার বউ'কে সে অনেক ভালোবাসবে, তারপর একটা বেবি আসবে। সেই ছোট্ট বেবিটা সারাদিন তাকে “বাবা বাবা” বলে ডাকবে। ভাই–বোনদের সঙ্গে হেসে খেলবে, বাড়িটা কোলাহলে ভরে উঠবে। কিন্তু এই সব স্বপ্নগুলো যেন তার জন্যই লেখা হয়নি। মনে হয়, নিয়তি তার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে নিষ্ঠুর খেলাটা খেলেছে।
এইসব ভাবনার মাঝেই অয়নে’র কণ্ঠে বাস্তবতা ফিরে আসে।
“মা, আমার বড় আম্মা কই? আমি এসেছি জেনেও এক পলক দেখতে আসলো না কেন?
কথাটার ভেতরে হাললা অভিমান আর চাপা কষ্ট। মেয়েটি কিছু না বলে অয়নে’র হাতটা শক্ত করে ধরে। ছোট্ট হাতের টানেই যেন অনেক না বলা কথা লুকিয়ে আছে।
সে তাকে টেনে নিয়ে যায় ভেতরের একটি রুমের দিকে। অয়ন রুমে পা রাখতেই থমকে যায়। দৃশ্যটা তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে যায়। নিতু এলোমেলো ভাবে মেঝেতে বসে আছে। গায়ে জড়ানো ওড়নাটা অনেক দূরে পড়ে আছে। চুলগুলো উস্কোখুস্কো, চোখদুটো লাল হয়ে ফুলে গেছে। পুরো শরীরজুড়ে এমন একটা অসহায়তা, যেন জীবন থেকে সব আলো নিভে গেছে।
অয়ন ধীরে ধীরে তার পেছনে গিয়ে পড়ে থাকা ওড়নাটা তুলে নেয়। নিজের হাতে যত্ন করে সেটা নিতু’র গলায় জড়িয়ে দেয়।তারপর মেয়েটার সামনে বসে পড়ে, একদম চোখের সমতলে। নিতু অয়ন’কে দেখামাত্রই মাথা নিচু করে ফেলে। চোখাচোখি করার শক্তিটুকুও যেন তার নেই। অয়ন নরম গলায় কথা বলার চেষ্টা করে।
একবার, দুইবার, বারবার।
কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না নিতু’র মুখ থেকে। রুমটা নিঃশব্দ হয়ে যায়। অয়ন কণ্ঠ শক্ত করে, তবুও ভেতরের কাঁপুনিটা চাপা দিয়ে বলে—
“আম্মা, বার্থ বাবার সঙ্গে কথা বলবে না?
এই একটা বাক্যই যথেষ্ট ছিল। নিতু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে হঠাৎ করেই অয়নে’র বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দু’হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, যেন ছেড়ে দিলেই সব হারিয়ে যাবে। তার কান্না হাওমাও করে বেরিয়ে আসে—
"বাবাই ও বাবাই ওরা আমাদের ভালোভাবে বাঁচতে দিল না কেন? আমরা তো অনাথ…তুমি ছাড়া তো আমাদের কেউ নেই। তবুও ওরা আমাদের ছাড় দিলো না।
অয়নে’র বুকের ভেতরটা ফেটে যেতে চায়। সে নিতু’কে শক্ত করে আগলে ধরে। এই কান্না তার বুক চিরে যাচ্ছে, তবুও সে কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না। এই মুহূর্তে সে শক্ত না থাকলে ভেঙে পড়বে সবাই।
অয়ন নিতুর মুখমণ্ডল দু’হাত দিয়ে আলতো করে ধরে। আঙুলের স্পর্শে অদ্ভুত এক স্নেহ, এক অদম্য দৃঢ়তা। সে মাথা একটু নিচু করে নিতুর কপালের কাছে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে,
“আম্মা…কাঁদিস না। তোর বাবাই আছে তো। যারা তোদের কষ্ট দিয়েছে, যারা তোদের চোখের পানি ঝরিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে তার প্রাপ্য শাস্তি পাবে। এটা তোর বাবাই'য়ের ওয়াদা।
কথাগুলো খুব ধীরে, খুব স্থির স্বরে বলা হলেও তার ভেতরে লুকানো ছিল আগুনের মতো প্রতিজ্ঞা। এই মানুষটা হাসলে যেমন আশ্রয়, রেগে গেলে তেমনি ধ্বংস। নিতু অয়নে’র বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। কিছুক্ষণ পর তার কান্নার শব্দ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। শরীরের শক্তিটুকু ছেড়ে দিয়ে সে অয়নে'র বুকেই ভর দেয়। যেন এই বুকটাই তার শেষ নিরাপদ আশ্রয়।
অয়ন বুঝতে পারে এই মুহূর্তে শক্ত হওয়াটাই সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। সে ধীরে ধীরে নিতু’কে আলাদা করে। তারপর নিজের হাতে ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে দু’টিকে খাইয়ে দেয়। অয়ন হয়তো তাদের আসল বাবা নয় তবে একজন বাবার কাছে যেমন যত্ন, স্নেহ, ভালোবাসা পায়। অয়ন তাই তাই দেয়।
তারপর তাদের ঘুম পাড়িয়ে দেয় এবং কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। ওদের নিঃশ্বাসের ওঠানামা দেখে অয়ন সস্তির নিঃশ্বাস নেয়। তারপর অয়ন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। একবার পেছনে ফিরে তাকায়— বাচ্চাগুলো ঘুমিয়ে আছে। এই দৃশ্যটা তার বুকের ভেতর শীতল করে দেয়।
তারপর সেই দিনের কথা মনে হতেই চোখ দুটো লাল হয়ে উঠে, চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। এরপর সে আর এক মুহূর্ত দেরি করে না। নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায় অয়ন যেখানে অপেক্ষা করছে হিসাব, অপেক্ষা করছে শাস্তি, অপেক্ষা করছে এমন এক ঝড় যার পর কেউ আর এই মেয়েগুলোর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না।
অয়ন আর আদিল বেলকনিতে পাশাপাশি বসে আছে। সামনের টেবিলে খোলা ল্যাপটপ, স্ক্রিনে দ্রুত বদলাতে থাকা কিছু ফাইল। অয়নে’র কানে হেডফোন গোঁজা। সে কারো সঙ্গে নিচু গলায় নয় বরং হুংকার তুলে কথা বলছে। কণ্ঠে চাপা আগুন, চোখের কোণে রাগের ঝিলিক স্পষ্ট। আদিল কিন্তু ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে নেই। তার দৃষ্টি বারবার ঘুরে যাচ্ছে রুমের দিকে। সে খেয়াল রাখছে, কেউ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে কি না।
হঠাৎ করেই তার চোখে পড়ে আহি’কে। আহি ধীরে ধীরে রুমের দিকে আসছে। আদিল এক মুহূর্তও দেরি না করে অয়ন’কে ইশারায় থামতে বলে। অয়ন সঙ্গে সঙ্গে কলটা কেটে দেয়। আহি এসে রুমের ভেতর ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আবার বেলকনির দিকে নরম পায়ে এগিয়ে আসে মাহি। হাতে দু’টো কফির মগ। মাহি প্রথমে অয়নে’র দিকে মগটা বাড়িয়ে দেয়। অয়ন কফির মগ হাতে নিয়ে এক চুমুক দেয়।
তারপর ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বলে—
“থ্যাংকস বনু! এই সময় কফিটা যে কতটা প্রয়োজন ছিল, তোকে বলে বোঝাতে পারবো না। যদিও…আরেকটা জিনিস এখন খুব দরকার ছিল, কিন্তু তার ধারে-কাছেও যাওয়া সম্ভব না মনে হয়।
মাহি কিছু না বলেই মুচকি হাসে। তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে আরেকটা মগ আদিলে’র দিকে বাড়িয়ে দেয়। এক পলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নেয়। সে ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই,
"মাহি!
আদিলে’র কণ্ঠে নাম ধরে ডাক। মাহি সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়। একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ঠিক তখনই আহি দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসে পড়ে। চোখ বড় বড় করে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে— কি বলবে সেটা শুনতে ভীষণ উদগ্রীব।
আদিল একবার বোনের দিকে তাকায়। তারপর মাহি’র দিকে চোখ তুলে গম্ভীর স্বরে বলে,
"রাতে আমার রুমে দেখা করিস।
কথাটা শুনেই আহি খিলখিল করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে দুষ্টুমি ভরা গলায় বলে,
"ভাইয়া! তুমি কি রাতে মাহু’র সাথে প্রেম করবে?
অয়ন হুট করে আহি’কে এক ঝটকায় নিজের কোলে বসিয়ে নেয়। তার ফিসফিসে কথার ভেতরে স্পষ্ট দুষ্টুমি,
“রাতের প্রেম বুঝিস পাখি?
কথাটা কানে যেতেই আহি মুহূর্তে থমথম মেরে যায়। এই সামান্য কথার এমন পরিণতি হবে, সে কল্পনাও করেনি। এক সেকেন্ডের ভেতর একবার ভাই আদিলে’র দিকে, একবার মাহি’র দিকে, তো আরেকবার অয়নে’র চোখের দিকে তাকায়। অয়ন ঠোঁট চেপে ধরে হাসছে। এবং আবারও ফিসফিস করে বলে,
“রাতের প্রেম বুঝেও আমাকে অভুক্ত রাখিস কেন? তোর কি আমার জন্য একটুও মায়া হয় না পাখি?
আহি’র বুক ধক করে ওঠে। ভাইয়ের সামনে কেউ এমন কথা বলে? তার তো জানা ছিল না, অয়ন এভাবে একদম প্রকাশ্যে দুষ্টুমি শুরু করে দেবে। সে লজ্জায় ধীরে ধীরে নুয়ে যাচ্ছে। মুখ লাল হয়ে উঠেছে। একদিকে মাহি মুখ টিপে হাসছে। চোখে এখন একদম অন্যরকম আলো, যেন বিশ্ব জয় করে এসেছে।
এই মেয়েটাই তো কিছুক্ষণ আগেও বিষণ্নতায় ডুবে ছিল। আর এখন, এতটা খুশি!
ভালোবাসা বোধহয় এমনই— হাজারটা আঘাত সহ্য করালেও, একটা কথায় হৃদয়টা শীতল করে দেয়। মনের ভেতরে অজানা সুখ ঢেউ খেলিয়ে যায়।
আহি কাচুমাচু হয়ে মাথা নিচু করে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলে,
"অয়ন ভাই, এখানে ভাইয়া আর মাহু আছে।
অয়ন একটুও পাত্তা না দিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
“সো হোয়াট? ওরা আছে তাতে আমার কী? আমি তো আমার বউ’টার সাথেই প্রেমের কথা বলছি। শোন না, আজ তো বিয়ের দ্বিতীয় দিন। আজ প্রেম-ট্রেম হবে বল?
এই কথায় আহি’র ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সে ঝট করে উঠে বসে। চোখে ধাও ধাও করে আগুনের ফুলকি জ্বলছে। কোমড়ে দুই হাত গুঁজে রাগান্বিত কণ্ঠে বলে,
"অয়ন ভাই! এবার কিন্তু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে!
অয়ন ভ্রু তুলে অসহায় মুখ করে তাকায়। এবং নিরীহ ভঙ্গিতে বলে,
“কিছু তো করলামই না। তাহলে বেশি বেশি কিভাবে হলো, তুই বল?
আহি দাঁত চেপে হঠাৎই গর্জে ওঠে,
"আয়রনের বাচ্চা…
“আরে পাখি, আস্তে চিৎকার কর। আমি কানে শুনতে পাই।
এই নির্লজ্জ উত্তরেই আহি’র মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলে ওঠে। সে ঠোঁট উল্টো করে রাগ চেপে রেখে আদিলে’র দিকে ঘুরে দাঁড়ায়
"ভাইয়া, তুমি কিছু বলছো না কেন? তোমার সামনে এই লোকটা পঁচা পঁচা কথা বলছে!
আহির কণ্ঠে অভিযোগ আর অভিমান। আদিল মুখ খুলতে যাবে ঠিক তখনই অয়ন নির্বিকার ভঙ্গিতে কথা কেটে দেয়—
“সত্যি কথা সবার কাছেই পঁচা লাগে। আর তোকে যদি পঁচা কথা না বলি, তাহলে কি মন্ত্রীর মেয়েকে বলবো?
"বলেন গিয়ে! আপনাকে কে মানা করেছে?
এই বলে আহি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পেছন থেকে অয়ন বলে উঠলো,
“কোথায় যাচ্ছিস দোয়েল পাখি?
আহি বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে নেয়,
"মরতে, যাবেন আপনি?
অয়ন দাঁত কেলিয়ে হেসে উঠলো,
“না তুই একাই যা, এখন মরার মুড নেই। বা'স'র করে বাচ্চা কাচ্চা প*য়দা করে মরার কথা ভাববো। আর যেখানেই মরতে যাস না কেন? অবশ্যই রাত হওয়ার আগেই রুমে ফিরবি!
"বা*ল ফিরবো? আজ রাত আমি আমার শাশুড়ীর সাথে ঘুমাবো দেখবো কিভাবে তুলে আনেন হু!
আর এক মূহুর্তও না দাঁড়িয়ে আহি বড় বড় পা ফেলে চলে যায়।