রাত প্রায় দু'টো! আহি বেডের মধ্যে খানে চুপিসারে বসে আছে। অয়ন এখনো বাসায় আসেনি, ইদানীং অয়ন অনেক রাত করে বাসায় ফিরে এবং ভোর হওয়ার আগেই চলে যায়। আহি'র সাথে দেখা হয় না বললেই চলে, অয়ন যখন হসপিটালে ফ্রি থাকে তখন শুধু ভিডিও কলে কথা হয়। কিন্তু এতে আহি একদমই সন্তুষ্ট নয়, তার অয়ন ভাইকে চাই। সেই আগের অয়ন ভাই, যে সব সময় তাকে বুকে জরিয়ে রাখতো। তার সাথে ঝগড়া করতো, আবার নিজেই কান ধরে ওঠবস করতে করতে সরি বলতো।
কিন্তু সেই সব গুন এই অয়ন ভাইয়ের মধ্যে নেই, এই অয়ন অনেক শান্ত। আহি কিছু বললে চুপ করে শোনে, দাঁড়াতে বললে দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু কোনো তর্ক করে না। তাই তো আহি'র আগের অয়ন ভাইকে চাই। আজ সে জিজ্ঞেস করবে কেন তাকে আগের মতো ভালোবাসা হয় না। কেন তার সাথে দুষ্টুমি করা হয় না। কেন তাকে আগের মতো জ্বালাতন করা হয় না। তাই আজ আহি একটুও ঘুমাবে না।
হঠাৎ দরজা খুলার শব্দে সেদিকে তাকায়। অয়ন হেলেদুলে তার দিকে এগিয়ে আসছে, চোখ মুখে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। প্রথম দেখায় আহি তাকে ভয় পেয়ে যায়। অয়ন আহি'কে জেগে থাকতে দেখে একটুও অবাক হয় না। সে এমন কিছু আশা করেছিল। কিন্তু আজ সে প্রিয়তমা’র অভিমান ভাঙাতে পারবে না, উল্টো প্রিয়তমা’কে তাকে নিজের মতো সামলাতে হবে।
আহি তাকে দেখা মাএ দৌড়ে আসে। কাছে এসেই অয়নে’র শার্ট খাঁমচে চেপে ধরে,
"বদ লোক, আপনার লজ্জা করে না বউ'কে রুমে একা রেখে রাতে একা একা বাহিরে থাকেন? খুব তো বউ বউ করেন, কিন্তু বউ'কে যে একটু আলাদা সময় দিতে হয় সেটা জানেন না?
অয়ন নির্বাক ভাবে তাকিয়ে আছে। সে সোজা থাকার চেষ্টা করছে কিন্তু বারবার হেলে যাচ্ছে। আহি আবারও চিৎকার করে,
"কি হলো কথা বলছেন না কেন? আজ আমি আপনাকে কোনো ভাবেই ছাড় দেবো না। আপনি মানুষটা দিন দিন অনেক বেয়াদব হয়ে যাচ্ছেন। বউ'কে কিভাবে ভালোবাসতে হয় সেসব ভুলে যাচ্ছেন দেখছি।
আহি অয়ন'কে এক পলক দৃষ্টিরত ভাবে তাকিয়ে দেখেই বুঝে ফেলে সে আজ নিজের মধ্যে নেই। তার মনে অন্য কিছু চলছে, কেমন যেন দুলে উঠছে। হুট করে সে পড়ে যেতে নিলে আহি অয়ন'কে ধরে ফেলে।
“অয়ন ভাই!
অয়ন নেশামাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আহি আবারও কাঁপা কাঁপা কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,
"আপনার কি হয়েছে অয়ন ভাইয়া? এভাবে হেলেদুলে পড়ছেন কেন, কিছু হয়েছে আপনার?
অয়ন দুলতে দুলতে আহি'র কাছে হুমকি খেয়ে পড়ে। তারপর আচমকা তার কোমড় জরিয়ে ধরে নিজের শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে ফিসফিসিয়ে আওরাল,
“তোকে চাই দোয়েল পাখি! খুব করে চাই, এতোটাই চাই যেখানে বৃন্দ মাএ দূরত্ব থাকবে না। মরে যাচ্ছি আমি, প্লিজ বাঁচিয়ে নে আমায়?
আহি নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অয়ন কি বুঝাতে চাচ্ছে সেটাই বোধগম্য হচ্ছে না। আহি'কে বেখেয়ালি দেখে অয়ন আবারও বলে,
“আমার হবি না দোয়েল পাখি?
আহি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এতোটা নেশা মাখা কন্ঠে কেউ যে ভালোবাসার আবদার করতে পারে জানা ছিল না তার। হুট করে সে নিচু স্বরে জবাব দেয়,
"আপনি এমন করে বলছেন কেন অয়ন ভাই? আমি তো আপনারই, পুরোটাই আপনার। আমি আপনার বউ, আমার উপর আপনার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।
অয়ন তার চিবুকে আলতো করে চুমু দিয়ে ফিসফিস করে,
“দোয়েল পাখি আজ তুই নিজে এসে ধড়া দিলি। আজ হাজার কাঁদলেও ছাড় দেবো না, তোর অয়ন ভাই এতোটাও ভালো নয়। সে আজ নিজের মধ্যে নেই, তুই'তে উম্মাদ হয়েছে, একটু বেশি পাগলামি করলে সামলে নিস প্লিজ!
অয়ন ধীরে ধীরে আহি’র দিকে ঝুঁকে পড়ে। তার ভারী শরীরের চাপ সামলাতে গিয়ে আহি প্রায় টাল খেয়ে যায়। ছোট্ট এই মেয়েটার পক্ষে এত বড় একজন মানুষকে ধরে রাখা সত্যিই কঠিন হয়ে উঠছে।
"অয়ন ভাই…আপনি ঠিক নেই। নিজেকেই তো ঠিকমতো সামলাতে পারছেন না। প্লিজ, আগে শাওয়ার নিয়ে আসুন। আমি আপনার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।
সে কোনোরকমে অয়ন’কে বিছানায় বসিয়ে দু’কদম এগোতেই হঠাৎ পেছন থেকে শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে অয়ন।
“আমি কিছু খাবো না বউ! তুই আমার কাছে আয় প্লিজ।
তার গলায় একধরনের আকুলতা। আহি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। দু’হাত তুলে অয়নে’র মুখ ছুঁয়ে দেয় আলতো করে। তার আঙুলের স্পর্শে অয়নে’র চোখ এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে আসে।
"এমন পাগলামি করবেন না, আমি তো আছি আপনার কাছে। আপনি যা বলবেন, তাই শুনবো।
অয়ন মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলে,
“ওহু…তোর যদি আবার মুড সুইং হয়? তখন আমার কি হবে? আজ আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছি না, দোয়েল পাখি!
আহি’র চোখে হালকা অভিমান ফুটে ওঠে।
"আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করেন না?
অয়ন বিন্দুমাত্র দেরি না করে উত্তর দেয়,
“নিজের থেকেও বেশি।
"তাহলে শাওয়ার নিয়ে আসুন। দেখবেন, তখন…
কথা শেষ করতে দেয় না অয়ন। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিস করে,
“আমাকে শাওয়ার নিতে হবে না বউ। শাওয়ার ছাড়ায় আমি খাটে,মাঠে সব জায়গায় অলরাউন্ডার!
মুহূর্তেই আহি’র চোখে রাগের ঝিলিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই লোকটার সঙ্গে দু’দণ্ড স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যায় না, সব কথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যায়।
সে কোমরে হাত গুঁজে কর্কশ গলায় বলে ওঠে—
"অয়ন ভাই, এবার কিন্তু আমি সত্যি সত্যি রেগে যাচ্ছি!
কথা শেষ হতেই অয়ন আচমকা এক টানে তাকে নিজের বুকের ওপর টেনে নেয়। আহি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভারসাম্য হারিয়ে বিছানায় পড়ে যায়। পরমুহূর্তে অয়ন ঝুঁকে পড়ে তার ওপর, মাথা নামিয়ে গলায় মুখ ঘষতে ঘষতে ধীরে, টেনে টেনে বলে—
“তোর যত রাগ আছে, সব কালকের জন্য তুলে রাখ। আজ একটু ভালো বউ হয়ে যা,অয়নে’র লক্ষী বউ!
তার স্লো মশনের গলায় বলা প্রতিটা শব্দে আহি’র বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে। মানুষটার কণ্ঠে আজ অন্যরকম ভার। অয়ন মুখ তুলে তার চোখে তাকায়।
“এই যে ভালো বউ, কথা বল না? আজ আমাকে নিজের করে নিতে পারবি না? পারবি না এই উম্মাদকে তোর ভালোবাসা দিয়ে শান্ত করতে? ট্রাস্ট মি, তোকে এতোটাই ভালোবাসবো, যে অভিযোগ করার সুযোগই পাবি না।
আহি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কোনো কথা বলছে না, তার এই নীরবতা অয়ন’কে কেমন অসহায় করে তোলে। সে দু’হাত দিয়ে আহি’র বাহু আলতো ঝাঁকায়,
“আমার হবি না তাহলে?
কোনো উত্তর নেই। অয়ন ঠোঁট উল্টায়, দম নিয়ে নিচু স্বরে বলে,
“ওকে, ফাইন, আজ না হয় নিজেই নিজেকে শান্ত করি।
সে সরে আসতে উদ্যত হয়। ঠিক তখনই আহি তার শার্ট খামচে ধরে। অয়ন থেমে যায়। আহি একটু উঁচু হয়ে কাঁপা ঠোঁটে আলতো করে তার গলায় স্পর্শ রেখে ফিসফিস করে,
"আপনার ভালো বউ থাকতে আপনি নিজেই নিজেকে শান্ত করবেন কেন? আপনার বউ কি অবুঝ?
অয়নে’র চোখে এক ঝলক আলো জ্বলে ওঠে।
“আমার বউ তো আমার কষ্ট বুঝতেছে না।
"সে তো আপনার কষ্ট বোঝে কিন্তু…
অয়ন অধীর হয়ে ঝুঁকে আসে,
“কিন্তু কি পাখি?
আহি চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে,
"আপনাকে ভয় পায় অনেক।
সঙ্গে সঙ্গে অয়ন তার কোমড় জরিয়ে ধরে। তার ঠোঁটের কোণে গভীর চুম্বন এঁকে দিয়ে ফিসফিসিয়ে আওরাল,
“তোর ভয়কে আজ ভালোবাসায় রুপান্তর দেবো বউ! তখন তুই চাইলেও আর দূরে সরে থাকতে পারবি না, সব সময় আমার আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চাইবি। আমার হয়ে, পুরোপুরি আমার!
কথাগুলো বলার পর আর কোনো দূরত্ব রইলো না তাদের মাঝে। অয়ন ধীরে ধীরে আহি’র মুখ দু’হাতে তুলে ধরে। পরমুহূর্তেই সে আহি’র ওষ্ঠে গভীর, দীর্ঘ এক চুম্বন এঁকে দেয়।
সে চুম্বনে তাড়াহুড়া নেই, হিংস্রতা নেই, আছে ডুবে যাওয়ার মতো এক আকুলতা। যেন বহুদিনের জমে থাকা দূরত্ব, না বলা কথা সব একসাথে গলে যাচ্ছে। আহি’র আঙুলগুলো অয়নে’র শার্ট আঁকড়ে ধরে। প্রথমে কেঁপে ওঠে, তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে ছেড়ে দেয় সেই অনুভূতির ভেতর।
রাত নিঃশব্দে তাদের সাক্ষী হয়ে থাকে। দু’জন মানুষ, যারা একে অপরকে হারানোর ভয় পায়। আজ আরও দৃঢ়ভাবে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে। অয়ন তার অর্ধাঙ্গিনী’কে নিজের ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে রাখবে। এমন এক নিরাপদ আশ্রয়ে, যেখান থেকে কেউ চাইলেও তাকে কেড়ে নিতে পারবে না।
আহি চোখ বুজে তার বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলে। লজ্জা আর ভয়ে আরো গুটিয়ে যায়। তাদের এই ভালোবাসার গভীরতা কতটুকু, তা মাপার কোনো মাপদণ্ড নেই। শুধু জানা যায়, তারা দু’জনই ডুবে যাচ্ছে, অতল এক সাগরে, যেখানে একে অপর ছাড়া আর কিছুই নেই। বাইরে রাত নীরব। ভেতরে দুটি হৃদয়ের ধ্বনি—এক ছন্দে, এক তালে!