ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে রুম ভরিয়ে তুলছে। পর্দার ফাঁক গলে সূর্যের নরম রশ্মি এসে পড়েছে বিছানার উপর। ঘুম ভাঙতেই আহি আবিষ্কার করে, সে অয়নে’র বুকে শুয়ে আছে। শক্ত, উষ্ণ, নিরাপদ এক আশ্রয়ে। কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে থাকে, তারপর ঘুমজড়ানো চোখে একবার তাকায় অয়নে’র দিকে। আবার চোখ বুজে ফেলে।
আরও একটু কাছে সরে আসে। ছোট্ট পাখির মতো নিজেকে গুটিয়ে নেয় অয়নে’র বুকের ভেতর। অয়ন অনেকক্ষণ ধরেই জেগে ছিল। সে চুপচাপ তাকিয়ে ছিল তার দোয়েল পাখি’টার দিকে। আহি’র এই নির্ভরতা, এই নিশ্চিন্ত ঘুম তার বুক ভরে দেয় অদ্ভুত এক শান্তিতে। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে।
সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে আহি’র কানের কাছে ফিসফিস করে—
“বউ! গতকালকে ডক্টর হাসবেন্ড আপনার কেমন সেবা করেছিল? তার সেবায় মন ভরেছে তো?
কথা শেষ হতেই আহি’র চোখ হালকা কুঁচকে যায়। পরের মুহূর্তেই সে ঝট করে অয়নে’র বুকে কামড় বসায়। কিন্তু অয়নে’র মুখে ব্যথার ছাপ নেই। বরং ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক বাঁকা হাসি। আহি এবার আরও শক্ত করে দু’হাত দিয়ে চিমটি কাটে। আবার হালকা কামড়।
অয়ন হাসতে হাসতেই বলে,
“আর কয়েকটা দিন যেতে দে বউ, তারপর তো শরীরে জোর আসবে। এইটুকু শক্তি নিয়ে আমার সাথে পারবি না।
আহি এবার থেমে যায়। ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকায় তার দিকে। অয়নে’র মুখে তখন সেই খোলা, প্রাণবন্ত হাসি। আহি কয়েক সেকেন্ড অপলক তাকিয়ে থাকে। যেন প্রথমবার নতুন করে দেখছে মানুষটাকে। নিজের অজান্তেই বলে ফেলে,
"অয়ন ভাই, আপনি এতো সুন্দর করে হাসেন কিভাবে?
অয়ন ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
“কি বললি?
সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। পরের মুহূর্তেই হাত বাড়িয়ে আহি’র কপালে হাত রাখে।
“পাখি তুই ঠিক আছিস তো? জ্বরটর কিছু নাই তো? না মানে…তুই আমার প্রশংসা করছিস? লাইক সিরিয়াসলি?
আহি থমকে যায়। তার গাল দুটো লাল আভায় ঢেকে ওঠে।
"আ আ আমি মানে…
সে আর কিছু না বলে তাড়াতাড়ি মুখ লুকিয়ে ফেলে অয়নে’র বুকে। অয়ন হেসে ওঠে।
হঠাৎ রুমের বাইরে থেকে বজ্রপাতের মতো গলা ভেসে আসে—
"ওই শালা, বউ রেখে এবার বাইরে বের হ! একজন মরে যাওয়ার অবস্থা আর এ বউ’য়ের সাথে পিরিত করছে! তোর যে সাড়ে এগারোটায় অপারেশন আছে সব কি গুলিয়ে খেয়ে ফেলেছিস?
আদিলে’র চিৎকারে পুরো রুম কেঁপে ওঠে। অয়ন যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে আসে। তড়িঘড়ি করে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। ১১:২০, সে চোখ বড় বড় করে আহি’র দিকে তাকায়। এতক্ষণ সে তার দোয়েল পাখি’র মাঝে এতোটাই ডুবে ছিল যে সময় কখন সকাল পেরিয়ে দুপুরের দিকে চলে গেছে বুঝতেই পারেনি।
তারপর হঠাৎই ঝুঁকে পড়ে আহি’র কপালে একের পর এক চুমু এঁকে দেয়।
“লাভ ইউ বউ! তোকে আরো অনেক অনেক অনেক ভালোবাসতে ইচ্ছে হচ্ছে…কিন্তু আরেকজনকে বাঁচাতে হবে। তাই নিজেই মরতে মরতে চলে যাচ্ছি। রাতে রেডি থাকিস, কোনো বাহানা চলবে না। তোকে চাই মানে চাই!
এই বলে সে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।
আহি কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে থাকে। তারপর হেসে গড়িয়ে পড়ে। এর পাঁচ মিনিট পর দরজা খুলে অয়ন বের হয়—পরনে শুধু টাওয়াল। চুল ভেজা, সে ক্যাবিনেট খুলে একের পর এক শার্ট বের করতে থাকে।
“কোনটা পরবো রে বউ? হোয়াইট? ব্ল্যাক? রেড? ব্লু…
বাকিটা শেষ হওয়ার আগেই আহি হাত তুলে থামিয়ে দেয়,
“হয়েছে এবার থামুন। আপনি হসপিটালে যাচ্ছেন, কোনো ডেটিং-এ নয়। এত শার্ট দেখানোর দরকার নেই। ব্লু শার্ট পরুন।
অয়ন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
“ভালো দেখা যাবে তো?
আহি চোখ ঘুরিয়ে বলে,
“ইচ্ছে হলে পরুন, না হলে বসে থাকুন। এহ্, মানুষ বিয়ে করতে গেলেও এত ভাবে না, হু!
অয়ন হেসে ফেলে। আর কথা না বাড়িয়ে ব্লু শার্ট পরে নেয়। তার ওপর ব্ল্যাক ব্লেজার। দ্রুত ঘড়ি পরে নেয়, চুলে হাত বুলিয়ে নেয়। তারপর হঠাৎই আহি’র দিকে এগিয়ে আসে। আহি কিছু বুঝে ওঠার আগেই অয়ন তার পা ধরে এক টানে নিজের কাছে টেনে নেয়।
"এই…
কথা শেষ হওয়ার আগেই অয়ন তার অধর নিজের দখলে নিয়ে নেয়। কয়েক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে যায়। তারপর ছেড়ে দিয়ে তার সারা মুখমণ্ডল জুড়ে একের পর এক চুমু ছড়িয়ে দেয়।
“তোকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না একদম বউ! তুইও আমার সাথে হাসপাতালে চল। তুই তোর বর-এর ট্রিটমেন্ট করবি, আর আমি রোগীদের। সেম সেম, বাট ডিফারেন্ট!
আহি কপাল কুঁচকে তাকায়।
"অয়ন ভাই, আপনি না বলেছিলেন আমি না বললে কিছুই করবেন না? তাহলে এখন চুমু দিলেন কেন?
অয়ন একটু ঝুঁকে তার কানের কাছে ফিসফিস করে,
“ওটা ফার্স্ট পিরিতের জন্য বলেছিলাম। যেহেতু ফার্স্ট পিরিত শেষ…এখন আমার যত ইচ্ছে বউকে ভালোবাসবো।
আহি অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল। তার চোখে বিস্ময় মিশে আছে।
"এটা কিন্তু কথা ছিল না, অয়ন ভাই…
অয়ন শার্টের বোতাম ঠিক করতে করতে নির্বিকার গলায় বলল—
“নির্বাচন শুরুর আগে কি বলেছি সেটা ভুলে যা পাখি। এখন আমি জয়ী হয়েছি, সব আমার রুলসে চলবে!
আহি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে।
"বললেই হলো?
অয়ন সেই দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আবার ঝুঁকে পড়ে। এক ঝটকায় আহি’র ঠোঁটে চুমু এঁকে দেয়। তারপর দরজার দিকে হাঁটা দেয়। আহি তাড়াতাড়ি পেছন থেকে ডাকে,
"অয়ন ভাই, শুনেন তো!
অয়ন দরজার হাতলে হাত রেখে পেছন ফিরে তাকায় না। শুধু হাসতে হাসতে বলে,
“এখন ডাকিস না বউ। রাতে এসে সব পুষিয়ে দেবো, পাক্কা প্রমিজ!
এই বলে গটগট করে বেরিয়ে যায়। আহি কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাইরে তখনও আদিল দাঁড়িয়ে। অয়ন বের হতেই সে মুচকি মুচকি হাসছে।
অয়ন ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
“শালা, দাঁত বের করে হাসছিস কেন?
আদিল কাঁধে হাত তুলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
"দেখে মনে হচ্ছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ করেছিস। তোর বউ’টাকে বলে দিস লিপস্টিক একটু কম দিতে। না হলে তোর মান-ইজ্জত বলে কিছু থাকবে না।
অয়ন প্রথমে কিছু বুঝতে পারে না। তারপর আদিলে’র চোখের ইশারা অনুসরণ করে ফোনের স্ক্রিনে গিয়ে নিজের ঠোঁট দেখে। এক কোণে হালকা লালচে দাগ। সে এক গালে হাসে।
“রাখ তো লিপস্টিক। বউ’কে কতটা ভালোবাসি সেটা সবাইকে দেখাতে হবে না। বাই দ্য ওয়ে…ভাবছি সাদিকার সাথে একটু মিট করবো। কি বলিস?
আদিল থমকে যায়।
"তুই কি পাগল?
“কেন?
আদিল কপাল ভাঁজ করে বলল,
"সাদিকা কিন্তু মন্ত্রীর মেয়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমার বোন যদি জানে তুই মন্ত্রীর মেয়ের সাথে প্রেম করতে যাচ্ছিস, তখন তোকে একদম খুন করে ফেলবে!
“পরের টা পরে দেখা যাবে, এবার চল।
দু'জনেই কথা বলতে বলতে চলে যায়।
_
_
মাহি ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে তার চুল উড়ছে, কিন্তু সে কিছুই টের পাচ্ছে না। তার দৃষ্টি শুধু একদিকে—আদিলে’র চলে যাওয়ার পথের দিকে। আদিল যত দূরে সরে যাচ্ছে, মাহি’র বুকের ভেতরটা ততটাই ছ্যাঁত করে উঠছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন ভেতর থেকে মুঠো করে ধরে টানছে।
যতক্ষণ চোখে দেখা যায়, ততক্ষণ সে ঝুঁকে ঝুঁকে তাকিয়ে থাকে। যেন দৃষ্টির সীমানা শেষ হয়ে গেলেও হৃদয়ের সীমানা শেষ হবে না। হঠাৎ কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে ওঠে মাহি। পেছনে ফিরে দেখে, মুন দাঁড়িয়ে আছে। মুন আলতো করে এগিয়ে এসে তার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছে দেয়।
- মাহি, আমি কি ভাইয়ার সাথে তোদের ব্যাপারে কথা বলবো?
মাহি ধীরে মাথা নাড়ে। সে গলায় ভাঙা সুরে বলে,
"দরকার নেই। সে অন্য কাউকে ভালোবাসে। আর আমি কারো ভালোবাসা ছিনিয়ে নিতে চাই না।
মুন হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
- তাহলে কাঁদিস কেন? কাঁদলেই কি ভাইয়াকে পেয়ে যাবি?
মাহি তপ্ত শ্বাস ছাড়ে। ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে,
"ভাগ্যে না থাকলে হাজার কাঁদলেও পাওয়া যায় না!
এই কথাটা বলার সময় তার চোখ দিয়ে আবারও টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
"তাকে ভালোবাসার ভাগ্য হলো,কিন্তু তাকে পাওয়ার ভাগ্য হলো না। সে বুঝালো সে সত্যি সত্যি আমার, অথচ দিন শেষে সে পুরোটাই অন্য কারো!
মুন আর সহ্য করতে পারে না। হঠাৎ করে মাহি’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজেও ডুকরে কেঁদে ওঠে।
- মাহি, প্লিজ থাম বোন। তোর কষ্ট আমার সহ্য হচ্ছে না। তুই যখন কাঁদিস, আমার বুকটা কেঁপে ওঠে।
মাহি চোখ বন্ধ করে নেয়।
"অথচ আমার এই করুণ অবস্থা দেখে ওই মানুষটার মন পর্যন্ত গলেনি। তাকে পাওয়ার জন্য পায়ে ধরেছিলাম তবুও সে বুঝিয়ে দিল, চাইলেই সব পাওয়া যায় না।
আজ বুঝলাম, ভাগ্য মানুষকে কতটা নিষ্ঠুর খেলায় ফেলে দিতে পারে। আমি সবসময় ভেবেছিলাম সে আমার হবে। তাকে আমি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আঁকড়ে ধরে রাখবো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সে ছিল শুধু আমার স্বপ্নের মানুষ। আমার হাসির আসল কারণ। আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উপহার। অথচ সেই উপহারটা আমি কোনোদিন নিজের হাতে পাইনি।
ভালোবাসার মতো অমূল্য একটা অনুভূতি আমি পেয়েছি। কিন্তু সেই ভালোবাসার শেষ পরিণতি আর পাইনি। হয়তো আল্লাহর ইচ্ছাই এমন ছিল, সে আমার হবে না। কিন্তু তাকে ভালোবাসার সৌভাগ্যটা যেন শুধু আমার ভাগ্যেই লিখে দিলেন। সে আমার পাশে থাকুক বা দূরে থাকুক, আমার জীবনে সে সবসময় থাকবে। কারণ ভালোবাসা শুধু পাওয়ার নাম না। ভালোবাসা মানে কাউকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারা, চিরদিনের জন্য।
মুন চোখ ভেজা অবস্থায় তাকিয়ে থাকে তার বোনের দিকে। মাহি মৃদু হেসে বলে,
"হয়তো আমি তার কাছে কোনোদিন নিজের মানুষ হয়ে উঠতে পারবো না। কিন্তু আমার হৃদয়ে সে চিরকাল নিজের জায়গা করে নিয়েছে। তাকে ভালোবাসার এই অনুভূতিটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। আর সেই সৌভাগ্য নিয়েই আমি বাঁচবো…আজীবন!