"হয়তো আমি তার কাছে কোনোদিন নিজের মানুষ হয়ে উঠতে পারবো না। কিন্তু আমার হৃদয়ে সে চিরকাল নিজের জায়গা করে নিয়েছে। তাকে ভালোবাসার এই অনুভূতিটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। আর সেই সৌভাগ্য নিয়েই আমি বাঁচবো…আজীবন!
মুন খুব মনোযোগ দিয়ে মাহি’র প্রতিটা কথা শুনছিল। মাহি’র চোখের অশ্রু, কাঁপা কণ্ঠ, বুক ভেঙে আসা দীর্ঘশ্বাস সবকিছু যেন তার হৃদয়ে গিয়ে বিঁধছিল। সে নিজে কখনো ভালোবাসার গভীর মানে বুঝে উঠতে পারেনি। তবে যখনই রাকিবে’র সাথে কথা হয়, অকারণেই তার বুকের ভেতরটা নরম হয়ে আসে। অদ্ভুত এক শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে শরীরজুড়ে। মনটা শান্ত হয়ে যায়, ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছাকৃত হাসি ফুটে ওঠে। তাহলে কি সেটাই ভালোবাসা?
এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল তার ভেতরে। অবশেষে কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
- মাহি, ভালোবাসা কাকে বলে?
মাহি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার দৃষ্টি তখনো দূরে রাস্তার দিকে। বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছিল, তবু সে খেয়াল করছিল না। একসময় গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলল—
"ভালোবাসা কাকে বলে সেটা ঠিক সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না, মুন। তবে যাকে ভালোবাসি, তার সবকিছুই ভালো লাগে। তার হাসি, তার রাগ, এমনকি তার দেওয়া আঘাত আর কষ্টটুকুও অদ্ভুতভাবে নিজের বলে মনে হয়। সে কষ্ট দিলে কাঁদি, তবুও সেই কষ্টটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে ইচ্ছে করে।
মুন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। মাহি আবার বলে,
"ভালোবাসা মানে হলো কাউকে হারানোর ভয়। মনে হয়, সে যদি এক মুহূর্তের জন্যও দূরে সরে যায়, তাহলে দম বন্ধ হয়ে যাবে। তাকে অন্য কারো সাথে দেখলে বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে। অকারণে হিংসা হয়। মনে হয় তাকে নিজের করে লুকিয়ে রাখি, যেন পৃথিবীর কেউ তাকে ছুঁতেও না পারে। কখনো কখনো রাগে, অভিমানে মনে হয় তাকে শেষ করে ফেলি…যেন সে আর কারো না হতে পারে। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝি, ভালোবাসা কাউকে ধ্বংস করার নাম না। ভালোবাসা মানে, তাকে ভালো থাকা দেখতে চাওয়া, সে আমার হোক বা না হোক।
ভালোবাসা মানে হলো, কাউকে নিজের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া। নিজের সুখ-দুঃখ ভুলে তার ভালো থাকাকে প্রাধান্য দেওয়া। আর সবচেয়ে বড় কথা, ভালোবাসা কখনো জোর করে পাওয়া যায় না। এটা আসে অজান্তে…ঠিক যেমন হঠাৎ বৃষ্টি নামে, কেউ প্রস্তুত থাকুক বা না থাকুক। ভালোবাসা মানে হলো কাউকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারা। সে আমার না হলেও, আমার হৃদয়ে তার জায়গাটা চিরকাল নিজের মতো করেই থাকবে!
মুন আনমনে বলে উঠলো,
- জানিস, আমি যখন কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলি তাহলে রাকিব ভাইয়া আমাকে অনেক বকা দেয়। আমাকে অন্য ছেলের সাথে কথা বলতে বারণ করে, এরপরেও যদি না শুনি তাহলে কাঁদবে। তাহলে তুই এটাকে কি বলবি?
মাহি ধীরে ধীরে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল। সকালের মৃদু ম্লান আলোয় দুই বোনের চোখ একসাথে আটকে গেল। মাহি আলতো করে মুনের গাল ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল—
"একেই বলে ভাগ্য! আমি একজন মানুষকে পাওয়ার জন্য নিজের অহংকার, নিজের সম্মান সব ভুলে পায়ে পর্যন্ত ধরেছি, তবুও সে একবারও পেছনে ফিরে তাকায়নি। অথচ এমন একজন ছেলে আছে, যে তোকে হারানোর ভয়ে কাঁদে।
মুন নিঃশ্বাস আটকে শুনছে। মাহি আবার বলল,
"তুই ভাবতে পারছিস তুই কতটা লাকি? সে তোকে অন্য ছেলেদের সাথে কথা বলতে দেখলে অস্থির হয়ে যায়। তোকে বকা দেয় মানে সে তোকে ভালোবাসে। সে ভয় পায়, কেউ যেন তোকে তার কাছ থেকে কেঁড়ে না নেয়। ভালোবাসা না থাকলে কেউ এতটা অধিকার দেখায় না।
মুন নিচের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
- কিন্তু ছেলে মানুষ কেন কাঁদবে? ভালোবাসলেি কি কাঁদতে হবে?
মাহি তপ্ত শ্বাস ফেলল। এই মেয়েটা অবুঝের মতো কথা বলে। মেয়েটা তার জমজ বোন অথচ নিজের কোনো গুন দেখতে পায় না। সে ধীরে ধীরে বলে,
"ছেলে মানুষ সহজে কাঁদে না, বোন। তারা কাঁদে তখনই, যখন ভেতরটা সত্যিই ভেঙে যায়। যখন বুঝতে পারে, তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটাকে হয়তো হারাতে বসেছে। তখন তাদের অহংকার, জেদ, সব গলে যায়। কান্না চলে আসে নিজের অজান্তেই। এই আমাকেই দেখ না, আমি ভালোবাসি তাই তো আমাকেই কাঁদতে হয় রোজ। তাই রাকিব ভাইয়া তোকে ভালোবাসে, সেই জন্য সে কাঁদে।
মুন অবিশ্বাসী চোখে তাকাল,
- সত্যি?
"হুম, একদম সত্যি। কান্না দুর্বলতা নয়। কারো জন্য কাঁদতে পারা মানে তাকে সত্যি মন থেকে চাওয়া। তাকে নিজের করে চাওয়া।
মূহুর্তেই মুন মন খারাপ করে বলল,
- কিন্তু আমি তো দুদিন ধরে রাকিব ভাইয়ার সাথে কোনো কথা বলিনি। সে অনেকবার কল করেছে, ম্যাসেজ দিয়েছে আমি ইচ্ছা করে ধরিনি। বরং আরো বিরক্ত হয়ে ফোনের কাছেই যাইনি। এখন কি হবে?
মাহি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল,
"আমি তোকে বলবো না যে তুই তাকে ভালোবাস। ভালোবাসা নিজে থেকেই বুঝে আসবে। তবে একটা কথা ভাব, কোন ছেলে তোর জন্য কতটা করতে পারে। হাজার জন তোকে ‘ভালোবাসি’ বলবে। কিন্তু সেখান থেকে একজনই থাকবে, যে তোর অভিমান ভাঙাতে বারবার কল করবে। তুই কথা না বললেও অপেক্ষা করবে। তোকে অন্য কারো হতে দেখলে কাঁদবে।
যে মানুষটা তোকে হারানোর ভয় পায়, সে তোকে গুরুত্ব দেয়। সে চায় না তুই অন্য কারো সাথে জড়িয়ে পড়িস, কারণ তার চোখে তুই শুধু একটা মেয়ে না, তুই তার নিজের মানুষ। ভালোবাসা মানে শুধু মিষ্টি কথা বলা নয়৷ ভালোবাসা মানে, দায়িত্ব, ভয়, অধিকার আর অপেক্ষা।
মুন ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
- তাহলে, রাকিব ভাইয়া কি সত্যি সত্যিই আমাকে ভালোবাসে?
মাহি মৃদু হেসে উত্তর দিল,
"এই প্রশ্নের উত্তর তোকে নিজের হৃদয়েই খুঁজে নিতে হবে। তবে একটা কথা মনে রাখিস, যে মানুষটা তোকে হারানোর ভয় পায়, তাকে অকারণে কষ্ট দিবি না। কারণ সবাই কাঁদতে পারে না, আর সবাই কারো জন্য কাঁদেও না।
মুনের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। চোখে ভয়, দ্বিধা আর অজানা আশঙ্কা,
- কিন্তু আমি যদি রাকিব ভাইয়ার সাথে কথা বলতে বলতে দুর্বল হয়ে পড়ি, তখন কি হবে? তখন ভাইয়া, আব্বা, আম্মা, ছোট বাবাই তারা কি মেনে নেবে?
মুনে’র ভেতরে তখন অস্থির ঝড় উঠে গেছে । মাহি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। চোখে এক ধরনের পরিণত শান্তি। সে এগিয়ে এসে মুনে’র কাঁধে হাত রাখল।
"তোকে কারো কথা ভাবতে হবে না। তুই তোর মনকে প্রশ্ন কর, তোর মন কি চায়? কার সাথে কথা বললে তোর মুখে অজান্তে হাসি আসে? কে তোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়? কে তোর না বলা কষ্টটুকুও বুঝতে পারে? কার সাথে কথা বললে তুই নিজেকে হালকা, সুখী আর নিরাপদ মনে করিস?
মুন চুপ হয়ে গেল। প্রশ্নগুলো যেন তার বুকের ভেতর ঢেউ তুলল। সে নিজের হৃদয়ের শব্দ শুনতে চেষ্টা করল। রাকিবে’র কণ্ঠ, তার অভিমান, তার কান্না সব একসাথে ভেসে উঠল মনে। মাহি আবার বলল,
"ভালোবাসা মানে শুধু সাহস নয়, দায়িত্বও। কিন্তু ভয় পেয়ে নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করিস না। যদি তুই সত্যিই তাকে গুরুত্ব দিস, তাহলে একদিন না একদিন পরিবারকেও বোঝাতে পারবি। তবে আগে নিজেকে বুঝতে শিখ।
এক মুহূর্তও আর দাঁড়িয়ে থাকল না মুন। তার বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত তাড়না কাজ করল। সে দৌড়ে ছাদ থেকে নেমে গেল। তার ওড়না পেছনে উড়তে লাগল, পায়ের শব্দ সিঁড়িতে প্রতিধ্বনিত হলো। মাহি সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে প্রার্থনাই বেশি। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে রোদ মেশানো আকাশের দিকে তাকাল। সূর্য অনেকটাই ক্ষীণ, আলো যেন ধীরে ধীরে ঊদিত হচ্ছে।
মাহি বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। বুকের ভেতর পুরোনো ক্ষত আবার টনটন করে উঠছে। সে নিজের ভালোবাসাকে পায়নি—তবুও চায় না, তার মতো করে আর কেউ দহন পোহাক। ভালোবাসার আগুন বড় অদ্ভুত। বাইরে থেকে উষ্ণ মনে হয়, ভেতরে ভেতরে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে আদিলে’র কথা ভাবতে ভাবতে সে ফিসফিস করে বলল—
"ভালোবাসা বুঝেন? আমি আপনার জন্য মরে গেলেও, আপনাকে আমি নির্দোষ প্রমাণ করে দিয়ে যাবো। ভালোবেসে পাপ আমি করেছি, আপনি নন। তাই কলঙ্ক তো আমারই প্রাপ্য!
তার চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু সে কাঁদল না। এখন আর কান্নার বিলাসিতা নেই। মাহি জানে, তার সামনে ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে। এমন এক সিদ্ধান্ত, যার পরিণাম খুব একটা ভালো হবে না। তবু সে পিছিয়ে যাবে না। কারণ সে ভালোবেসেছে। আর ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে সবচেয়ে সাহসী, আবার সবচেয়ে অসহায়ও করে তোলে।
এক পা, দুই পা…বড় বড় পা ফেলে সে ছাদ ছেড়ে নিচে নেমে গেল। পেছনে পড়ে রইল রক্তিম আকাশ, নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে একটি মেয়ের নিঃশব্দ আত্মত্যাগের।
_
_
অয়ন নিজের কেবিনে চুপচাপ বসে আছে। মাথা দু’হাতের মাঝে গুঁজে রেখেছে, চোখ দুটো অন্যমনস্ক। টেবিলের উপর ফোনটা উল্টো করে রাখা—কিন্তু মনটা বারবার সেদিকেই ছুটে যাচ্ছে। কয়েকবার ফোন দিয়েছিল আহি’কে। একবারও রিসিভ করেনি। সদ্য বিয়ে করেছে বেচারা অথচ বউ’টার সঙ্গে একটু প্রেমও করতে পারছে না।
ঠিক তখনই দরজা হঠাৎ করে খুলে গেল। জুঁই তড়িঘড়ি করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তার চোখেমুখে তীব্র উৎকণ্ঠা।
"স্যার, এবার অন্তত অপারেশনটা করে আসেন! একটা মানুষের জীবন-মরণ অবস্থা, আর আপনি এখানে বসে বউ’কে নিয়ে ভাবছেন?
অয়ন মুখ তুলে তাকাল। চোখে বিরক্তি, সে মেজাজ বিগড়ে গেল।
“পেত্নী, তুই একটু চুপ করবি? বুড়ি বেডি হয়ে গেলি, তবুও বিয়ের কথা মাথায় আনিস না। আর এদিকে আমি বউ’টাকে একটু বেশি ভালোবাসি বলেই তোর হিংসা হচ্ছে?
জুঁই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তার মুখের রঙ পাল্টে গেল। সে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
"সত্যি হিংসে হচ্ছে, কিন্তু কোনো লাভ হবে না। কারণ তুই অনেক আগেই অন্য কারো হয়ে গিয়েছিস। তোকে আমার মনের কথাটাও বলতে পারলাম না…আফসোস।
কথাগুলো খুব আস্তে বলার জন্য অয়নে’র কানে পৌঁছাল না। সে হুট করে কপাল কুঁচকে তাকাল,
“কিরে শালী? তুই আবার কোন ভাতারের কথা ভাবছিস?
জুঁই সজ্ঞানে ফিরতেই হকচকিয়ে উঠল। পরক্ষনেই সে অয়নে'র কথা পাত্তা না দিয়ে তার হাত টেনে ধরে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।
“এই মাতারী, ছাড় আমাকে! আমি বউ’য়ের সাথে একটু রোমাঞ্চ না করে অপারেশন করবো না!
সে প্রায় চেঁচিয়েই বলল। জুঁই থমকে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
"চুপ কর, নির্লজ্জ! সারারাত বউ’য়ের কাছে থেকে কোন বা*ল ফালাইছিস। যে এখন আবার রোমাঞ্চ করা লাগবে?
“আরে শালী, ছাড় প্লিজ! বউ’টার কাছে না গেলে মনে হয় মরেই যাবো!
তার কথায় করিডোরের দু’একজন নার্স হেসে ফেলল। কিন্তু জুঁইয়ের মুখে হাসি নেই। তার চোখে চাপা কষ্টের ছায়া। তবু তার মুখে পেশাদারিত্বের মুখোশ।
"মরার আগে পেশেন্টকে বাঁচিয়ে দিয়ে যা!
জুঁই দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলেই অয়নে’র হাত শক্ত করে টেনে ধরল। এখন টেনে হেঁচড়ে হেঁচড়ে অপারেশন থিয়েটারের সামনে এসে দাঁড়াল করালো।
সামনে উদ্বিগ্ন মুখগুলোর ভিড়। পেশেন্টের বাড়ির লোকজন কেউ চুপচাপ দেয়ালের সাথে হেলে দাঁড়িয়ে, কেউবা হাত জোড় করে দোয়া পড়ছে। এক কোণে দুইজন মহিলা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। অয়ন এক পলক সবার দিকে তাকাল। তারপর জুঁই প্রায় ঠেলে তাকে অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অয়ন আবার বের হয়ে এলো।
সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। সে পেশেন্টের বড় ভাইয়ের সামনে গিয়ে নাক কুঁচকে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“ভাই, আপনাদের রোগীকে আর কিছু সময় ওয়েট করতে বলেন। আমি একটু বউ’য়ের সাথে রোমাঞ্চ করেই চলে আসবো। আজ সারাদিনে বউয়ের কাছ থেকে একটা চুমুও পাইনি!
মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ। কেউ যেন বুঝতেই পারছে না এটা মজা, না সত্যি! পেশেন্টের বড় ভাই হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল, ঠোঁট কাঁপছে। তিনি আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,
- এ এ এ এসব কী বলছেন ডক্টর? আপনি এখন অপারেশন করতে পারবেন না?
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝে জুঁই দৌড়ে সামনে এলো।
"সরি ভাইয়া,অয়ন আপনাদের সাথে একটু ফান করছে। টেনশন করবেন না। ও এমনই… সিরিয়াস মুহূর্তে আজেবাজে কথা বলে ফেলে।
তারপর দাঁতে দাঁত চেপে অয়নে’র দিকে ঘুরে ফিসফিস করল,
"এই শালা, লুচ্চামি রেখে ভেতরে চল।
অয়ন ঠোঁট টিপে হাসল, কিন্তু জুঁই’য়ের চোখের কঠোরতা দেখে আর কিছু বলল না। দু’জন একসাথে অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে ঢুকে গেল। বাইরে থাকা মানুষগুলো আরও অস্থির হয়ে উঠল। যে ডক্টর অপারেশন করার আগে বউ’য়ের কথা ভাবে, সে কি তার ভাইকে বাঁচাতে পারবে?
মহিলারা আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ল। অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা জ্বলে উঠতেই সবার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
কিন্তু তারা জানে না—অয়ন যতই বাইরে হালকা, বেহায়া, বউ পাগল ভঙ্গিতে কথা বলুক, অপারেশন টেবিলের সামনে দাঁড়ালে সে একদম অন্য মানুষ। ভেতরে ঢুকেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। চোখে স্থিরতা, কণ্ঠে দৃঢ়তা।
“ফোকাস বি,
সে নিজেকেই বলল। জুঁই একপাশে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। এই রূপটাই সে সবচেয়ে বেশি চেনে। দায়িত্বের সময় অয়ন আর কারো না, শুধু তার পেশার। কয়েক ঘণ্টা পর, অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলল। সবাই ছুটে এগিয়ে এলো।
পেসেন্টের বড় ভাই উদগ্রীব কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন,
- ভাই আমাদের রোগী কি বেঁচে আছে?
অয়ন বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
“আপনাদের রোগী বেঁচে আছে নাকি মইরা গেছে ওইটা আমি কিভাবে বলবো? আপনাদের স্যা*টা ভাঙা রোগীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন। বা*লডার জন্য বউ'টার কাছে যেতে পারলাম না!