নেশাময় আসক্তি

পর্ব - ২১

🟢

অয়ন ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিসিয়ে আওরাল,

“চিকন রাখা আর্ট নাকি ভা'তা'রের DNA এর অভাব!

"অয়ন ভাই এবার কিন্তু মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো?

অয়ন মুখ বাকিয়ে আওরায়,

“আগে তো আমার ভর সামলে নে। তারপর যা ইচ্ছে করিস।

সঙ্গে সঙ্গে আহি থমথমে খেয়ে যায়। অয়ন'কে দেখে ঠিক লাগছে না, আজ সে কিছু একটা হবে তা ভালো করেই বুঝতে পারছে। এই ভাবনার মাঝেই অয়ন রুমে ঢুকে পড়ে। কিছু বলার আগেই সে এগিয়ে এসে আহি’কে বিছানার ওপর বসিয়ে দেয়। তারপর ভেতর থেকে দরজাটা লক করে দেয়। লকের শব্দটা আহি’র কানে অস্বস্তিকরভাবে বাজে। অয়ন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে—একেকটা পা ফেলার সাথে সাথে আহি’র বুকের ভেতর ধুকপুকুনি বেড়ে যায়। আহি পরপর কয়েকটা শুকনো ঢোক গিলে নেয়।

গলা শুকিয়ে এসেছে। মিনমিনে কণ্ঠে সে বলে ওঠে,

"অ অ অয়ন ভাই, আপনি একদম আমার কাছে আসবেন না কিন্তু?

অয়ন থামে। তার মুখে হালকা কৌতূহলের ছাপ ফুটে ওঠে। শান্ত স্বরে প্রশ্ন করে,

“হোয়াই?

আহি চোখ নামিয়ে কাচুমাচু হয়ে বলে,

"আপনাকে ভয় লাগে। সব সময় কেমন নেশামাখা চোখে তাকিয়ে থাকেন।

তার কথায় অয়ন হেসে ওঠে। হাসিটা হালকা, কিন্তু ভেতরে অন্যরকম অর্থ লুকানো। সে হঠাৎ এক লাফে এসে আহি’র গা ঘেঁষে বসে পড়ে। খুব কাছ থেকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলে,

“আমার তীব্র নেশায় তো তুই-ই পাখি!

আহি থমকে যায়। এই কথার কোনো জবাব সে খুঁজে পায় না। শুধু চুপ করে বসে থাকে, নিজের হৃদস্পন্দন নিজেই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। মাথার ভেতর যেন হঠাৎ করে সব শব্দ হারিয়ে গেছে। বুকের ভেতর কেবল অস্থিরতার ঢেউ ওঠানামা করছে। সে চুপচাপ বসে থাকে, চোখ নামানো, নিঃশ্বাসটা পর্যন্ত ঠিকঠাক নিতে পারছে না।

ঠিক তখনই আচমকা অয়ন তার মাথার খোঁপাটা খুলে দেয়।

এক মুহূর্তের মধ্যেই বাঁধা চুলগুলো খুলে গিয়ে ঝরঝর করে নিচে নেমে আসে। লম্বা কেশ ছড়িয়ে পড়ে তার কাঁধ, পিঠের ওপর। হঠাৎ এমন ঘটনায় আহি চমকে ওঠে। সে কিছু বলার আগেই অয়ন ধীরে ধীরে তার মুখের সামনে উড়ে আসা উড়ন্ত চুলগুলো লক্ষ্য করে। অয়ন খুব আলতোভাবে ফু দেয়। চুলগুলো সরে গিয়ে আহির মুখটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অয়ন একটুখানি ঝুঁকে আসে। খুব কাছে, এত কাছে যে আহি তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করতে পারে। হঠাৎই অয়ন তার কানের কাছে ঠোঁট লাগিয়ে খুব ফিসফিস করে বলে ওঠে,

“আমার পাখি এতো কিউট কেন? একদম রসগোল্লার মতো।

শব্দগুলো কানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আহি’র শরীর কেঁপে ওঠে। সে মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়। লজ্জায়, অস্বস্তিতে আর অজানা অনুভূতিতে তার বুকের ভেতরটা ভরে ওঠে, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। সে শুধু চুপ করে বসে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

অয়ন আরেকটু এগিয়ে আসতেই আহি কিছুটা পিছিয়ে যায়। অয়ন ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে আওরাল,

“এভাবে পিছিয়ে গেলেই কি আমার হাত থেকে পালাতে পারবি পাখি?

আহি আরো ভয় পেয়ে যায়। সে পেছাতে পেছাতে বেডের সাথে পিঠ ঠেকে যায়। সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,

"অয়ন ভাই বউ'য়ের অনুমতি ছাড়া তাকে টাচ করা কিন্তু অন্যায়!

অয়ন সঙ্গে সঙ্গে ক্ষীপ্ত স্বরে আওরায়,

“তোর স্যা*টার অন্যায়ের মাইরে বাপ! আমার যৌবন চাঙ্গে যাচ্ছে আর এই স্যা*টা ভাঙায় বলছে অনুমতি ছাড়া টাচ করা অন্যায়!

আহি সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাল ফ্যাল করে কাঁদতে থাকে। অয়ন বিচলিত হয়ে পড়ে, সে তো কিছুই করেনি তাহলে মেয়েটা কাঁদছে কেন? অয়ন আরো কিছুটা এগিয়ে আহি'র গাল দুটো হালকা স্পর্শ করে ফিসফিস করে,

“পাখি কাঁদছিস কেন? আমি তো এখনো কিছুই শুরু করিনি?

আহি তবুও থামে না। অয়ন আচমকা তাকে নিজের বুকে জরিয়ে নেয়।

“রিলাক্স পাখি! হবে না কিছু গড প্রমিজ, তবুও কাঁদিস না। তোর যেদিন ইচ্ছে হবে সেই দিন তোকে আমি আমার করে নেবো সত্যি।

আহি তবুও থামে না। কান্নাটা যেন আর নিয়ন্ত্রণে নেই শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার, বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছে। অয়ন সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে যায়। এই মুহূর্তে সে কী করবে, কী বলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। সে একটু দূরে সরে গিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে ওঠে,

“এই পাখি, বল না কাঁদছিস কেন? আমি তো বললাম, তুই না বললে কিছুই হবে না। তবুও এমন করছিস?

কথা বলতে বলতে অয়ন অনিচ্ছাকৃতভাবে আহি’র হাত দুটো নিজের হাতের ভাঁজে ধরে ফেলে। ঠিক সেই মুহূর্তেই আহি চিৎকার দিয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

"উফফফফ

অয়ন মুহূর্তেই থমকে যায়। তার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। সে দ্রুত আহি’র হাত ছাড়ে এবং তাকাতেই চোখে পড়ে হাতের এক পাশে স্পষ্ট নিলচে দাগ। অয়ন আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কণ্ঠে উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞেস করে,

“পাখি হাতে আঘাত পেলি কিভাবে?

আহি ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে উত্তর দেয়,

"ওয়াশরুমের ফ্লোরে পড়ে গিয়েছিলাম।

অয়ন হঠাৎ করেই রেগে যায়।

“একটু দেখে শুনে হাঁটতে পারিস না? সব সময় এমন তাড়াহুড়া করিস কেন বল তো? তুই কি আমাকে একটুও ভালো থাকতে দিবি না? তোর এই যন্ত্রণায় একদিন আমি মরেই যাবো দেখিস।

এই কথাটা যেন আহি’র বুকে ছুরি হয়ে বিঁধে যায়। সে হঠাৎ অয়নে’র মুখের দিকে তাকায়। চোখ দুটো ভিজে টলমল করছে, অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে থুতনিতে। কণ্ঠে ভয় আর অপরাধবোধ,

"আমি কি আপনাকে অনেক জ্বালাতন করি, অয়ন ভাই? আমি কি তাহলে খুব খারাপ? আমার জন্য আপনি মরে যাবেন?

“পাখি…আমি ওভাবে বলতে চাইনি!

হুট করে আহি কাঁতর মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠে,

"আমি জানি, আমি সবাইকে অনেক জ্বালাতন করি। আমার জন্য সবাই কষ্ট পায়। আমি আর আপনাকে একটুও জ্বালাতন করবো না, অয়ন ভাই। সত্যি বলছি, তবুও আমাকে একা করে যাইয়েন না। আপনি চলে গেলে আপনার মতো করে কেউ আমাকে ভালোবাসবে না। কেউ আমাকে আগলে রাখবে না।

অয়ন শক্ত করে আহি’কে বুকের ভেতর চেপে ধরে। যেন নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়েই তাকে আগলে রাখতে চায়। এমন নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে আহি’র ভেতরের বাঁধ ভেঙে যায়। সে ডুকরে কেঁদে ওঠে এই কান্না ভয় নয়, এই কান্না স্বস্তির, ভরসার। অয়ন নিজেও কাঁপছে। গলার স্বর ভারী হয়ে আসে, তবুও নিজের অনুভূতি চেপে রাখতে পারে না।

কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে,

“তুই যদি আমাকে জ্বালাতন না করিস তাহলে কে করবে শুনি? তুই আমার জান, আমার প্রাণ, আমার সবকিছু। তোর যখন ইচ্ছে আমাকে বিরক্ত করবি। আমি তোকে ছাড়া এতো তারাতাড়ি কোথাও যাবো না। যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন তোকে আমার পাঁজরের ভেতর গেঁথে রাখবো!

আহি থমকে যায়। এই কথা গুলো যেন সরাসরি তার হৃদয়ে গিয়ে লাগে। সে এক দৃষ্টিতে অয়নে’র দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মানুষটাকে সে বিশ্বাস করে, নির্ভর করে। খুব ভালোবাসে, যেভাবে কাউকে ভালোবাসলে নিজের সব ভয় হারিয়ে যায়। হঠাৎ করেই অয়ন তাকে কোলে তুলে নেয়। আচমকা হওয়ায় আহি কিছুটা চমকে ওঠে, কিন্তু প্রতিরোধ করে না। অয়ন ধুপধাপ পা ফেলে বেলকনির দিকে এগিয়ে যায়।

রাতের নরম বাতাস, নীরব আকাশ সবকিছু যেন এই মুহূর্তটাকে আরও গভীর করে তুলেছে। সে আহি’কে কোলে নিয়ে রকিং চেয়ারে বসে পড়ে। চেয়ারটা ধীরে ধীরে দুলতে থাকে। অয়ন আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,

“বল তো পাখি, ওই আকাশে চাঁদ বেশি সুন্দর, না আমার কোলে বসা চাঁদ?

আহি অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। ভ্রু কুঁচকে একটু অভিমান মাখা কণ্ঠে বলে,

"আপনি আমাকে সবার পছন্দের সঙ্গে তুলনা করছেন?

অয়ন কোনো শব্দ করে না। শুধু নিঃশব্দে হেসে ওঠে। সেই হাসিতে কোনো দুষ্টুমি নেই, আছে নিখাদ ভালোবাসা। সে একটু ঝুঁকে আহি’র কপালে ছোট্ট একটা চুম্বন আঁকে। তারপর নরম স্বরে বলে,

“ওহু, একটুও না। আকাশের চাঁদ আর আমার পার্সোনাল চাঁদ দুটো এক না।

সে আহি’কে আরও কাছে টেনে নেয়,

“আকাশের চাঁদ সবার পছন্দ হতে পারে, কিন্তু আমার পছন্দ নয়। যে চাঁদ নিজের সৌন্দর্য সবাইকে দেখিয়ে সবার প্রিয় হয়, সেই চাঁদ আমার দরকার নেই।

অয়ন আহি’র কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে,

“আমার চাঁদ শুধু আমার! যাকে দেখার অধিকার শুধু আমারই থাকবে। আমি ব্যতীত কেউ ভুলেও তার দিকে তাকাবে না।

রাতের আকাশে চাঁদ তখনো জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু অয়নে’র কাছে, তার কোলে বসে থাকা চাঁদটাই পুরো আকাশ। আহি মুগ্ধ দৃষ্টিতে অয়নে’র কথাগুলো শুনছে। মানুষটা কতটা নিখুঁতভাবে কথা বলতে জানে—ভালোবাসাকে যুক্তি দিয়ে, অধিকারকে দায়িত্ব দিয়ে, আর যত্নকে আশ্বাসে রূপ দিতে জানে। তার বলা প্রতিটি কথার ভেতর এমন এক দৃঢ়তা আছে, যেখানে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না। আহি চেষ্টা করেও কোনো ত্রুটি খুঁজে পায় না।

হঠাৎ অয়ন তার দিকে তাকিয়েই বলে ওঠে,

“ওভাবে তাকিয়ে থাকিস না পাখি…আমি নিজেকে সামলাতে পারি না!

আহি যেন বজ্রাহত হয়। মুহূর্তেই তার মুখে লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়ে। সে আর এক সেকেন্ডও চোখ তুলে তাকিয়ে থাকতে পারে না। দ্রুত মাথা নিচু করে অয়নে’র বুকে মাথা এলিয়ে দেয়। শক্ত বুকের মাঝে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে নেয়। এই বুকটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, যেখানে কোনো ভয় নেই, কোনো অনিশ্চয়তা নেই, শুধু নিঃশর্ত আশ্রয়। কিছুক্ষণ কেটে যায়। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। রকিং চেয়ারটা ধীরে ধীরে দুলছে।

অয়ন আলতো করে আহি’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সেই স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো অধৈর্যতা নেই, আছে শুধু শান্ত করা ভালোবাসা। ধীরে ধীরে আহি’র শ্বাস-প্রশ্বাস সমান হয়ে আসে। চোখ বন্ধ হয়ে যায়। সে ঘুমে বিভোর হয়ে পড়ে, ঠিক যেমন শিশুরা নিরাপদ কোলে ঘুমায়। অয়ন নিচু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আহি’র ঘুমন্ত মুখের দিকে। এই মুখটার জন্যই সে সবকিছু করতে পারে ভালো কিংবা খারাপ, আলো কিংবা অন্ধকার।

ঠিক তখনই হঠাৎ ফোনের ভাইব্রেশনে মুহূর্তটা ভেঙে যায়। অয়ন ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফোনের দিকে তাকায়। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি নাম—সাদিকা। নামটা দেখামাত্রই তার চোখের দৃষ্টি বদলে যায়। যে চোখে এতক্ষণ কোমলতা ছিল, সেখানে এখন ঝিলিক দিয়ে ওঠে শীতল আগুন।

ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত হাসি খেলে যায়, যে হাসির মানে শুধু সে নিজেই জানে। সে ফোনটা চেপে ধরে মনে মনে বলে ওঠে,

“কাঙ্ক্ষিত দিন আর দূরে নয়। যারা যা করেছে, সবাই তার প্রাপ্য শাস্তি পাবে।

বিজ্ঞাপন
নেশাময় আসক্তি গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় স্পেশাল রোমান্টিক গল্প