“বুঝিস না কেন বউ? বাচ্চা মেয়েকে বড় করার জন্য একটু টর্চার করতেই হবে।
"মাবুদ, তুমি আমারে উঠাইয়া নাও। আমি বড় হতে চাই না। আমি তো....
অয়ন হুট করেই আহি’র খুব কাছে চলে আসে। কোনো প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই সে ঝুঁকে পড়ে এবং আহি'র গোলাপি অধর জোরা নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। আচমকা এমন ঘনিষ্ঠতা পেয়ে আহি ভয়ে কেঁপে ওঠে। সে ছটফট করে ওঠে, দু’হাত দিয়ে অয়’নের টি-শার্ট শক্ত করে চেপে ধরে নিজেকে সরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু অয়নে’র শক্ত মুঠির সামনে সে মুহূর্তে নিজেকে অসহায় মনে হয়। ঠিক তখনই দরজার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে আহি’র বুকের ভেতর হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা—রাগান্বিত ও কঠিন দৃষ্টিতে সবকিছু দেখছে। ভয় আর আতঙ্কে আহি হঠাৎ করেই অয়নে’র পেটে শক্ত করে চিমটি দেয়। অপ্রত্যাশিত ব্যথায় অয়ন সঙ্গে সঙ্গে সরে আসে। তার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট,
“শালির মাইয়া বা'স'র তো করতে দিলি না আর এখন চুমু দিচ্ছি তাতেও চিৎকার করছিস? হাত পা বেঁধে নেবো কিন্তু, বড্ড জ্বালাতন করে তোর এই হা হা হা …
কথা বলতেই সে থমকে যায়। চোখের সামনে মহিবুল শেখ'কে দেখে পর পর কয়েকটা শুকনো ঢুক গিলে। ততক্ষণাক বিদ্যুৎগতিতে আহি'র কাছ থেকে সরে আসে। মুহূর্তের মধ্যে তার ভঙ্গি পাল্টে যায়। সে জোর পূর্বক ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে রাখে। অন্যদিকে আহি সম্পূর্ণ গুটিয়ে গেছে। লজ্জা, ভয়ে তার মনে হচ্ছে মাটির নিচে ঢুকে যেতে পারলে বাঁচে। মাথা নিচু করে সে এক কোণে বসে থাকে, চোখ তুলে তাকানোর সাহসও পায় না।
অয়ন শান্ত থাকলেও চোখ মুখে বিরক্তির ছাপ। সে নিঃশব্দে নিজের মনে বিড়বিড় করে—
“বা*লের শ্বশুর ডিস্টার্ব করার আর টাইম পেল না। এমনিতেই তার স্যা*টা ভাঙা মেয়েকে চুম্মা দিতে গেলে চিৎকার করে উঠে আর এখন এই খাম্বা এসে হাজির। দূর জীবনটাই স্যা*টা মার্কা হয়ে গেল!
হঠাৎ মহিবুল শেখ গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠেন,
"বেয়াদব ছেলে। লাজ–লজ্জা সব ধুয়ে খেয়েছো?
কথাটা ছুড়ে দিয়ে তিনি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ান। ঠিক তখনই পেছন থেকে অয়নে’র কণ্ঠ ভেসে আসে—
“এই শ্বশুর আব্বা, শুনেন তো?
মহিবুল শেখ থমকে দাঁড়ান। ধীরে ঘুরে তাকাতেই অয়ন সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখ পাকিয়ে কঠিন দৃষ্টিতে তাকান তিনি। কিন্তু অয়ন সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করেই ভ্রু তুলে নির্লিপ্ত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
“আপনি আমাকে বেয়াদব বললেন কেন? আমি কি কোনো বেয়াদবি করেছি?
মহিবুল শেখের মুখ আরও শক্ত হয়ে যায়।
"নির্লজ্জ, বেহায়া ছেলে! এখন আবার প্রশ্ন করছো বেয়াদবি করেছিস কি না!
অয়ন ঠোঁট চেপে একরকম হাসে। সেই হাসিতে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। বরং কণ্ঠে শীতল ব্যঙ্গ—
“আপনি যদি এত লজ্জাশীল হতেন, তাহলে আমার বউ জন্ম নিল কীভাবে? লজ্জায় তো আপনার ছোট আম্মার ধারে কাছেও যাওয়ার কথা ছিল না। তাহলে বাচ্চা পয়দা হলো কী করে?
মহিবুল শেখের চোখ-মুখ মুহূর্তেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। বুকের ভেতর লজ্জা আর রাগ একসঙ্গে আছড়ে পড়ে। শেখ মঞ্জিলে এমন নির্লজ্জ ছেলের জন্ম হবে এটা তিনি কল্পনাও করেননি। মানুষ সম্পর্ক, বয়স দেখে কথা বলে; কিন্তু এই ছেলের কাছে সেসবের কোনো মূল্য নেই।
অয়ন থামে না। ঠোঁট বাঁকিয়ে আবার বলে,
“আর শুনেন, বউকে চুমু দেওয়াকে বেয়াদবি বলে না। ওটাকে ভালোবাসা বলে। কিন্তু আপনার মেয়ে যদি এসব বুঝতো! ওকে একটু শিখিয়ে দেবেন তো, প্রাণের স্বামীর যা করবে সরি সরি যা বলবে তাই যেন অক্ষরে অক্ষরে শুনে।
মহিবুল শেখের কান যেন গরম হয়ে ওঠে। রাগে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। আর একটি কথাও না বলে তিনি তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে দ্রুত সরে যান।
এই সুযোগেই আহি দৌড়ে পালিয়ে যায়। লজ্জা আর ভয় মিশে তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে।
অয়ন একা দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশে নীরবতা। সে হাবলার মতো তাকিয়ে থেকে নিজের মনে বিড়বিড় করে—
“স্যা*টার কপাল! বউকে কাছে পেয়েও ঠিক করে ভালোবাসাটুকু দেখাতে পারলাম না, ছ্যাহ!
সিঁড়ি বেয়ে হন্তদন্ত হয়ে নেমে যাচ্ছে অয়ন। প্রতিটি ধাপে তার পায়ের শব্দ ভারী, যেন মনের ভেতরের আগুনই মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। চোখ-মুখ লাল আভায় ঢেকে গেছে, কপালের শিরাগুলো স্পষ্ট। বুকের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
তাকে দেখেই শান্তা শেখ দৌড়ে এগিয়ে আসে এবং মৃদু স্বরে বলেন,
"বাবা, তুই এখন…
কথাটা শেষ করার সুযোগই দেন না অয়ন। একবারও পেছনে তাকায় না। মায়ের কণ্ঠ, মমতা, কিছুই আজ তার কানে ঢুকছে না। সে সোজা দরজার দিকে এগিয়ে যায়, চোখে মুখে রাগের ভয়ংকর ঝিলিক। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে পুরো দৃশ্যটা লক্ষ্য করছিল আদিল। অয়ন'কে সে খুব ভালো করে চেনে। এত বছরের সম্পর্ক, এই রাগ সাধারণ নয়। নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছে, যা অয়নে’র ভেতরটা তছনছ করে দিয়েছে। আদিল আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। উঠে পড়ে, দ্রুত অয়নে’র পিছু নেয়। কারণ এই মুহূর্তে অয়ন’কে সামলাতে পারবে,একমাত্র সে-ই।
অয়ন গাড়িতে ওঠেই ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে গাড়িটা। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ গতিতে আদিল পাশের দরজা খুলে বসে পড়ে।
কোনো কথা নেই৷ কোনো প্রশ্ন নেই। অয়ন গিয়ার টেনে নেয়। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ি ছুটে চলে যায় অস্বাভাবিক গতিতে।
রাস্তায় আলো-আঁধারি পেছনে পড়ে যেতে থাকে, শহরের চেনা চিত্রগুলো ঝাপসা হয়ে যায়। প্রায় এক ঘণ্টার পথ মাত্র বিশ মিনিটেই শেষ করে ফেলে অয়ন। আদিল কিছু বলে না। হঠাৎ ব্রেক কষতেই গাড়িটা থেমে যায়। সামনে তাকিয়ে আদিল দেখে— তাদের চির চেনা অনাথ আশ্রম।
হুট করে অয়ন কিছু না বলেই দরজা খুলে নেমে যায়। সে বড় বড় পা ফেলে গেটের ভেতরে প্রবের করে। আর এক মুহূর্তের মধ্যেই বেশ কয়েকজন শিশু ছুটে আসে তার দিকে।
অয়নে’র রাগী চোখ-মুখে প্রথমবারের মতো ফাটল ধরে। সে কিছু বলার আগেই হুট করে তেরো বছরের একটি মেয়ে দৌড়ে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটার ছোট শরীরটা কাঁপছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।
"বাবাই…
কথাটা আর বেরোয় না। গলায় আটকে যায়। অয়ন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার শক্ত বুকের ওপর মেয়েটার অশ্রু ভিজে যায়। ধীরে ধীরে সে দুই হাত দিয়ে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে। তার চোখে জমে থাকা আগুন যেন একটু একটু করে নিভে আসে। আদিল দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখে বুকের ভেতর শীতল অনুভব করে। অয়ন বাচ্চাদের ভিষণ ভালোবাসে আর তার জন্যই অনাথ শিশুদের সে লালন পালন করে।
অয়ন ধীরে ধীরে মেয়েটার মুখের দিকে ঝুঁকে আসে। তার দুই গালে আলতো করে হাত রাখে। শক্ত হাতে নয়—একেবারে বাবার মতো, ভয় পাওয়া সন্তানের গাল ছুঁয়ে যেমন শান্ত করতে হয় ঠিক তেমন করে। চোখে মুখে তখন আর রাগ নেই, আছে শুধু উৎকণ্ঠা আর অদ্ভুত এক ভয়।
মৃদু স্বরে সে জিজ্ঞেস করে,
“মা তুই ঠিক আছিস তো?
মেয়েটা কথা বলার আগেই আরও জোরে তাকে আঁকড়ে ধরে। ছোট শরীরটা কাঁপছে, নিঃশ্বাসগুলো এলোমেলো। তারপর ভাঙা কণ্ঠে এক নিঃশ্বাসে বলে যায়,
"বাবাই ওই লোকগুলো আবারও আমাকে আর আপুকে তুলে নিতে এসেছিল। ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চায়। তুমি জানো, আমাদের বাঁচাতে গিয়ে দাদাজানকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। দাদাজান খুব ব্যথা পেয়েছে বাবাই। তখন যদি তোমার লোকগুলো না আসতো…তাহলে হয়তো আমরা আজ তোমার থেকে অনেক, অনেক দূরে চলে যেতাম।”
কথাগুলো শেষ হতেই মেয়েটা আবার কাঁদতে শুরু করে। মূহুর্তেই অয়নে’র বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। যেন কেউ ভেতর থেকে বুক চিরে দিয়েছে। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসে সব। সে শক্ত করে দাঁত চেপে ধরে, না হলে এই মুহূর্তেই চিৎকার বেরিয়ে আসতো।
সে ধীরে ধীরে মাথা তোলে। তার চোখ এবার গার্ডদের দিকে।
সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কারো চোখে চোখ রাখার সাহস নেই। অয়নে’র নিঃশ্বাস ভারী হতে থাকে। শরীরের প্রতিটা শিরা যেন ফুলে উঠছে। এই রাগ আর সংযত করার জায়গা নেই। পরক্ষণেই অয়ন হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক এক করে সে লোক গুলোর শরীরে অজস্র লাঠির আঘাত করে ।
পুরো আশ্রম চত্বরে তার গর্জন প্রতিধ্বনিত হয়—
“শু*য়োরের বাচ্চা! তোরা থাকতে আমার মেয়েগুলোকে ওই নর পৈশাচগুলো কিভাবে কিডন্যাপ করতে আসে? তোদের কোন বা*ল ফালাইতে রেখেছি হ্যাঁ?
লোকগুলোর দৃষ্টি এখনো নিচু। কারো ঠোঁট নড়ে না, কেউ কোনো শব্দ করে না। নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন নিজেরাই জানে, আজ তাদের শাস্তি পাওয়ার কথা ছিল। অয়নে’র হাতে ধরা লাঠিটা আবারও শক্ত হয়ে ওঠে। চোখে জমে থাকা আগুন আর থামানো যাচ্ছে না। সে আবার আঘাত করতে উদ্যত হয়।
ঠিক তখনই আদিল সামনে এসে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা বাচ্চা দৌড়ে এসে অয়নে’র হাত চেপে ধরে। কেউ তার পা জড়িয়ে ধরে, কেউ হাত ধরে টানে। হঠাৎ সেই মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে সামনে এগিয়ে আসে। চোখ দুটো লাল, কণ্ঠ ভাঙা, তবু সাহস করে অয়নে’র দিকে তাকিয়ে বলে—
"বাবাই, তুমি ওনাদের মেরো না। ওনারা সবাই অনেক ভালো। সবাই আমাদের খুব ভালোবাসে। আমাদের আগলে রাখে, পাহারা দেয়। ওনাদের ছোট্ট ভুলের জন্য এভাবে মেরো না বাবাই, প্লিজ।
কথাগুলো শোনামাত্র অয়নে’র বুকের ভেতর ভেঙে যায়। লাঠিটা তার হাত থেকে খসে পড়ে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, ঝুঁকে পড়ে। এক ঝটকায় মেয়েটাকে বুকের মাঝে টেনে নেয়, এমন শক্ত করে জড়িয়ে ধরে যেন ছেড়ে দিলে সে আবার হারিয়ে যাবে।
তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।
“মারে…তোরা আমাকে ক্ষমা করে দে। তোদের আমি রক্ষা করতে পারিনি। বাবা হিসেবে আমি ব্যর্থ। বাবা মানেই তো ভালোবেসে আগলে রাখা, আগলে রাখা মানেই নিরাপদ রাখা। অথচ আমি তোদের আগলে রাখতে পারিনি। ওই নৈর পৈশাচগুলো আমার ক’লি’জা দের কষ্ট দিয়েছে মা। তোরা নরকের যন্ত্রণা সহ্য করেছিস। আমি জানতাম না…আমি তোদের একটুও রক্ষা করতে পারলাম না।
মেয়েটা ধীরে ধীরে অয়নে’র গালে আলতো করে হাত রাখে। তারপর ছোট্ট হাতটা তার মাথার উপর বুলিয়ে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে হেসে উঠে,
"না বাবাই! তুমি বাবা হিসেবে বেষ্ট। তোমার মতো কেউ আমাদের এতো ভালোবাসে না। কেউ এতো আগলে রাখে না, এতো যত্ন করে না।
অয়নে’র বুকের সাথে মাথা ঠেকিয়ে সে আবার বলে,
"আমাদের সাথে যা হয়েছে, আমি সব ভুলে গেছি সত্যি। কিন্তু তুমি আমাকে কথা দাও বাবাই, আমাদের মতো আর কাউকে যেন এমন যন্ত্রণা সহ্য…