আহি আনমনে বলে উঠলো,
"সেই হিসেবে আপনি নিজেই তো আমার স্যা*টা ভাঙা জামাই হোন অয়ন ভাই?
অয়ন বিরক্তি মাখা কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,
“শাউ*য়্যার ঘরে শাউ*য়্যা আমার স্যা*টা ভাঙা নয়। বিশ্বাস না হলে চেক করে দেখ!
আহি কিছু সময় তার দিকে তাকিয়ে থেকে খিলখিল করে হাসতে থাকে। হাসি থামিয়ে বলে উঠলো,
"দেখান, আমি তো সেটা দেখার জন্যই তো বসে আছি।
অয়ন তাজ্জব বনে যায়। চোখ বড় বড় করে আহি'র দিকে তাকিয়ে থাকে, এ সে কোন আহি'কে দেখছে। সে তো আহি'কে ভয় দেখানোর জন্য পাগলামি করেছিল কিন্তু এই মেয়ে ভয় পাওয়ার বদলে দেখতে চাচ্ছে। সে ততক্ষণাক আহি'র কপাল, গলা চেক করে না সব ঠিকঠাক আছে। তার শরীর জ্বর নেই, তাহলে মেয়েটার হঠাৎ আচরণ বদলে গেল কেন?
এসব ভাবতে ভাবতে আহি কপাল ভাঁজ করে বলল,
"অয়ন ভাই আপনি এমন করছেন কেন? আমি একদম পারফেক্ট আছি, সত্যি।
অয়ন তপ্ত শ্বাস ছাড়ে। কথাটুকু শুনে বুকের ভেতর শীতল অনুভব হলো। সে ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ঝুলিয়ে আচমকা সে আহি'র কোলে মাথা রাখে এবং আহি'র হাত আলতো ভাবে নিজের মাথায় রেখে ফিসফিস করে,
“পাখি মাথাটা একটু টিপে দে তো?
"শুধু মাথা…
“কেন, গলা টিপে দেওয়ার ইচ্ছে আছে নাকি?
অয়ন সন্দেহ ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো।
আহি মাথা হেলেদুলে অস্বীকার করে। আহি পরম যত্নে অয়নে'র চুলের ভেতর আগুল ঢুকিয়ে টানতে থাকে। অয়ন নিশ্চুপ হয়ে থাকে। কিছু সময় পর আহি নিচু স্বরে আবারও বলল,
"অয়ন ভাই আমাদের বিয়ের জন্য আব্বা অনেক রাগ করেছে তাই না?
অয়ন চোখ বন্ধ করেই উওর দেয়,
“ওহু!
আহি মুখ নামিয়ে নেয়। কন্ঠ অনেকটা শীতল,
"মিথ্যা বলছেন কেন অয়ন ভাই? আমি জানি আব্বা অনেক রাগ করেছে আমার উপর।
অয়ন ধীরে ধীরে আহি’র মুঠিবদ্ধ আঙুলের ভেতর নিজের আঙুল ঢুকিয়ে ধরে। তারপর খুব যত্ন করে সেই ছোট্ট মুঠির ওপর পরপর কয়েকবার আলতো চুমু এঁকে দেয়। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসি ফুটে ওঠে।
নরম কণ্ঠে অয়ন বলে,
“তোর অয়ন ভাই দুনিয়ার সবার সাথে মিথ্যা কথা বলতে পারলেও, তোর সাথে কোনোদিনই পারবে না পাখি। তুই এমন একজন, যার সামনে এসে এই অয়ন নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। তখন সে আর অয়ন থাকে না, শুধু তুইতে মত্ত হয়ে যায়!
আহি কোনো কথা বলে না। নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে। তার চোখ নামানো, কিন্তু বুকের ভেতর অজানা একটা ভার জমে আছে। অয়নে’র কথাগুলো যেন একটার পর একটা তার হৃদয়কে শীতল করছে। অয়ন আবারও মুচকি হেসে বলে,
“আর শ্বশুর আব্বা আমাদের বিয়ের ব্যাপারে দ্বিমত করেননি পাখি। তিনি শুধু একটু অভিমান করেছেন।
আহি ধীরে ধীরে চোখ তোলে। অয়ন খুব দৃঢ় স্বরে বলল,
রাগ আর অভিমান এক জিনিস নয় পাখি। রাগ তো মানুষ যাকে তাকে করতে পারে। কিন্তু অভিমান? অভিমান শুধু কাছের মানুষদের সাথেই হয়। যাকে নিজের মনে করে, তাকেই তো অভিমান দেখানো যায়।
শুধু আমার শ্বশুর আব্বা নয়। তার জায়গায় যে বাবা থাকতো, সেও অভিমান করতো। কারণ প্রত্যেক বাবার ইচ্ছে থাকে, তার রাজকন্যাকে রাজকন্যার মতো সাজিয়ে, তার পছন্দের পাত্রের হাতে তুলে দেবে। কিন্তু আমি, কাউকে কিছু না বলেই তোকে বিয়ে করে ফেলেছি।
আহি কাঁপা কন্ঠে আওরায় ,
"আব্বা কি শুধু এই অভিমানের জন্য, আমার সাথে আর কথা বলবে না, অয়ন ভাই?
অয়ন সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে। এক মুহূর্তও দেরি না করে আহি’র চোখের কোণে জমে থাকা টলমল অশ্রু নিজের বৃদ্ধ আঙুল দিয়ে মুছে দেয়। তারপর আলতো করে তার দু’গাল ছুঁয়ে দেয়—একটা স্পর্শে ভরসা, নিরাপত্তা আর আশ্বাস মিশে থাকে। অয়ন নরম স্বরে বলে,
“কাঁদিস না পাখি, শ্বশুর আব্বা কখনোই এমনটা করবেন না। কারণ সে তার একমাত্র রাজকন্যাকে প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসে।
আহি অনিশ্চিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
"আপনি যা বলছেন, সত্যিই কি তাই হবে?
অয়ন দৃঢ় কণ্ঠে হেসে বলে,
“একদম পাক্কা! আচ্ছা, এবার একটু বাকিদের কথা বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে ভাব। তোর এই “আমি”টা কেমন শুকিয়ে গেছি দেখতে পাচ্ছিস না?
আহি কপাল কুঁচকে অয়নে’র দিকে তাকায়। চোখে সামান্য দুষ্টুমি, ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসি।
"কোথায়? আপনাকে যেমন জলহস্তির মতো দেখা যেত, এখনো ঠিক তেমনই দেখা যাচ্ছে।
কথাটা শেষ হতেই অয়ন এক মুহূর্ত থমকে যায়। যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, এই মেয়ে সত্যিই তাকে টিচ করছে, নাকি ইচ্ছে করেই খোঁচা দিচ্ছে। সে কাঁদু কাঁদু ফেস করে বলল,
“এভাবে টিচ করতে পারলি তুই?
কথাটা বলেই অয়ন আর কিছু না বলে নিঃশব্দে মুখ ভার করে নেয়। তারপর বেডে হেলান দিয়ে আধা শোয়া, আধা বসা অবস্থায় থাকে। আহি এক পলক তাকিয়ে থাকে। তারপর সে মুচকি হাসে এবং কিছু না বলে ধীরে ধীরে অয়নে’র আরো কাছে সরে আসে। তারপর খুব ধীরে ধীরে অয়নে’র বুকে মাথা রাখে।
মুহূর্তের মধ্যেই অয়ন যেন প্রাণ ফিরে পায়। সে আর অপেক্ষা করে না। সঙ্গে সঙ্গে আহি’কে আরো শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। এক হাতে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে, আরেক হাত আলতো করে পিঠে রেখে দেয়। যেন এই স্পর্শ হারিয়ে গেলে সে আবার শূন্য হয়ে যাবে। আহি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। অয়নে’র বুকের ওঠানামা হৃদস্পন্দন শুনতে শুনতে হঠাৎ নিচু স্বরে বলে,
"অয়ন ভাই…আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
অয়ন চোখ না খুলেই উত্তর দেয়,
"হুম, বল!
"সত্যি জিজ্ঞেস করবো?
অয়ন হালকা হাসে।
“সত্যি বলতে ইচ্ছে না হলে মিথ্যে মিথ্যে বল। তবুও বল।
আহি নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে। বুকের ভেতর জমে থাকা প্রশ্নটা শেষমেশ বেরিয়ে আসে,
"আমি আপনার বউ তাই না?
এই প্রশ্ন শুনে অয়ন চোখ খুলে ফেলে। সে নিচের দিকে তাকায়, দেখে আহি ঠিক তার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে, তার নিশ্বাসে মিশে আছে, তার হাতের বাঁধনে বাঁধা। অয়ন হালকা ভ্রু তুলে বলে,
“আমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছিস, এরপরও ডাউট হচ্ছে?
কণ্ঠে একফোঁটা বিরক্তি নেই, বরং একরাস ভালোই লুকিয়ে আছে। আহি আর কোনো কথা বলে না, সে নিঃশব্দে হাসে। সেই হাসিতে ভয় নেই, সংশয় নেই, শুধু প্রশান্তি। যেন এই বুকটাই এখন তার পৃথিবী। অয়ন চোখ বন্ধ করে আবারও আহি’কে নিজের ভেতরে টেনে নেয়। যেন মনে মনে বলছে,
“হ্যাঁ, তুই আমারই। একান্তই আমার, তোর প্রতি আমি ব্যাতিত আর কারো অধিকার নেই!
আহি ভ্রু জোগল তুলে ফিসফিস করে,
"অয়ন ভাই বলেন তো বউ কাকে বলে?
মূহুর্তেই অয়ন ঠোঁট বাকিয়ে হাসে৷ তারপর বাঁকা হেসে আওরায়,
“ছেলেকে প্যান্ট পড়া শিখাতে মা'য়ের লাগে পাঁচ বছর! অথচ সেই প্যান্ট খুলতে বউ'য়ের লাগে পাঁচ সেকেন্ড, একেই বলে বউ!
কথাটা বলেই অয়ন দাঁত কেলিয়ে হাসতে থাকে। সেই হাসিটা দেখে আহি প্রথমে কিছুই বলে না। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থাকে, যেন কথাটার মানে মাথার ভেতর গুছিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু যেই মুহূর্তে কথার আসল ইঙ্গিতটা বুঝে ফেলে, ঠিক তখনই তার বুকের ভেতর আগুন ধরে যায়। আহি ঝাঁপিয়ে পড়ে অয়নে’র বুকে ধুম ধুম করে কয়েকটা কিল বসিয়ে দেয়। চোখে-মুখে বাজ খাওয়া রাগ, কণ্ঠে ঝাঁঝ—
"বেহায়া, নষ্ট পুরুষ! আপনার মুখে কি ভালো কথা বের হয় না? আপনার মুখে আল্লাহ গজব ফালায় না কেন?
অয়ন একটুও বিচলিত হয় না। বরং সেই আগের মতোই নির্লজ্জ হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখে বলে,
“গজব হিসেবেই আল্লাহ্ তোকে পাঠিয়ে দিয়েছে। যাতে তুই আমার জীবনটা তামা তামা করে দিতে পারিস। আর আজ কি ভালো কথা বের হওয়ার রাত? আজ তো শুধু…
বাকি কথাটা শেষ করার আগেই আহি চিৎকার দিয়ে উঠে,
"ওই মুখ দিয়ে যদি আর একটাও নির্লজ্জ কথা বের হয়, তাহলে আমি আপনাকে খুন করে ফেলবো বলে দিলাম!
“ওকে, ফাইন! তাহলে তুই তোর ভালোবাসার আগুন দিয়েই খুন করে ফেল। আমি সেই আগুনে জ্বলে পুড়ে মরতে চাই, পাখি।
এই কথা বলেই অয়ন আচমকা আহি’র কোমড় জড়িয়ে ধরে। মুহূর্তেই আহি ছটফট করে ওঠে, শরীর শক্ত হয়ে যায় তার।
অয়ন ভ্রু তুলে তাকায়,
“প্রব্লেম কি? এমন ছোটাছুটি করছিস কেন?
"আমাকে ছেড়ে দিন অয়ন ভাই, আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।
অয়ন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
“কিন্তু আমার তো অন্য কিছু পাচ্ছে।
এই কথায় আহি শুকনো ঢোক গিলে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যায়। অয়ন ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে আহি’র গলায় ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়, গভীরভাবে চুম্বন কাটে। তারপর নিজের অবাধ্য ঠোঁট জোড়া উপরের দিকে তুলতেই— হঠাৎ করেই আহি তার ওপর ঢলে পড়ে।
অয়ন মুহূর্তেই বিচলিত হয়ে যায়। সে দ্রুত আহি’কে শুইয়ে দেয়। কাঁধে, গালে, হাত ধরে কয়েকবার ঝাঁকুনি দেয়,
“পাখি, এই পাখি শোন না। কি হলো তোর?
কিন্তু কোনো সাড়া নেই। যতই ডাকুক, আহি সজাগ হয় না। তখন অয়ন বুঝতে পারে, ভয়ের চোটেই আহি অজ্ঞান হয়ে গেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্তির স্বরে বলে,
“ধূর, বা*লের বা’স’র করবো আমি। টাচ করার আগেই চান্দের দেশে চলে গেল। এমন করলে আমার বিড়াল মারার কি হবে?
বিরক্তি আর অসহায়ত্ব মিশে থাকে তার কণ্ঠে। কিন্তু রাগ দেখানোরও উপায় নেই। শেষমেশ অয়ন নিজেও কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে আহি’কে বুকের মাঝখানে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আহি নিঃশ্বাস নিচ্ছে ঠিকই, শান্ত ঘুমে ডুবে আছে। আর অয়ন তাকে আগলে রেখেই ধীরে ধীরে তার গলায় মুখ গুঁজে ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়!