মাহি ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে আদিলে’র রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা পায়ের ধাপে বুকের ভেতর দুটো অনুভূতি একসাথে ধাক্কা খাচ্ছে— একটা অজানা ভয়, আরেকটা চাপা খুশি। দরজার সামনে এসে থেমে যায় সে। হাত বাড়িয়েও আবার নামিয়ে নেয়। দুই–তিনবার এমন করেই দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়, আবার নিজেই সরে যায়। মনের ভেতর প্রশ্ন ঢুকবে, নাকি ফিরে যাবে?
কিছুক্ষণ পর যেন নিজেকেই সাহস জুগিয়ে আবার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই, দরজাটা হুট করে খুলে যায়। আদিল এক টানেই মাহি’কে রুমের ভেতরে টেনে নেয়। আচমকা সব কিছু ঘটে যাওয়ায় মাহি ভয় পেয়ে গুটিশুটি হয়ে যায়।
চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে থাকে। তার সামনে আদিল, হাস্যোজ্জ্বল মুখ, শান্ত চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে।
সেই এক ঝলক দেখাতেই মাহি’র বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা হালকা হয়ে আসে। এক অদ্ভুত শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে শরীর জুড়ে। আদিল এক হাতেই মাহি’কে আলতো করে তুলে নিজের বিছানায় বসিয়ে দেয়। তারপর নিজে গিয়ে ঠিক মুখোমুখি বসে পড়ে। মাহি তখনো ঘোরের ভেতর। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কিছুই ঠিকঠাক ধরতে পারছে না।
হঠাৎ আদিল তার কোলে শুয়ে পড়ে। এই উপস্থিতিটুকু টের পেয়েই মাহি স্থির হয়ে যায়। শ্বাস নিতে ভুলে যায় যেন। তারপর আদিলে’র কণ্ঠ ভেসে আসে,
“আমার রুমে আসতেও এতো ভয় পাচ্ছিলি? আমি বাঘ না ভাল্লুক, যে তোকে খেয়ে ফেলবো?
মাহি স্তব্ধ হয়ে যায়। কিছু বলার আগেই আদিল হঠাৎ তার হাতের ভাঁজে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। মুহূর্তেই মাহি বরফের মতো জমে যায়। মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় এটা সত্যি? নাকি কেবল কল্পনা?
আদিল আবার বলে ওঠে,
“ভাবিস না, বউ ভেবে চুমু দিয়েছি। তোকে বোনের নজরে দেখি, তাই বোনের নজরে চুমু দিলাম। বাই দ্য ওয়ে, বললি না তো আমার রুমে আসতে এতো ভয় পাচ্ছিলি কেন?
মাহি চোখ নামিয়ে নেয়।
নিচু, প্রায় ফিসফিসে কণ্ঠে উত্তর দেয়,
"অনেক দিন হলো আসিনি তো তাই।
আদিল ভ্রু তুলে তাকায়,
“তোকে আসতে বারণ করেছি?
মাহি মাথা নাড়ে।
"ওহু!
“তাহলে কেন আসিস না?
একটু তো দেখা করতে পারিস। সারাদিন রুমের ভেতর বসে থাকতেই ভালো লাগে তোর?
মাহি আবারও মাথা নেড়ে অস্বীকার করে।
আদিল ধীরে ধীরে তার কোল থেকে উঠে বসে। তারপর বুক পকেট থেকে ছোট্ট একটা বক্স বের করে। বক্স খুলতেই আলো ছড়িয়ে পড়ে— একটা ডায়মন্ড রিং। আদিল কোনো কথা না বাড়িয়ে খুব যত্ন করে রিংটা মাহি’র আঙুলে পরিয়ে দেয়। ডায়মন্ডটা আলোয় চকচক করে ওঠে। কিন্তু মাহি’র চোখ আটকে থাকে অন্যখানে রিংয়ের ঝলকে নয়, আদিলে’র হাতে। সে তখনো যেন কল্পনার জগতে ভেসে আছে। হৃদয় ভরে উঠেছে এক অদ্ভুত আনন্দে। ডায়মন্ড পাওয়ার জন্য নয় বরং ভালোবাসার মানুষটা নিজ হাতে তাকে গিফটটা পরিয়ে দিয়েছে বলেই।
মাহি হঠাৎ তোঁতলাতে তোঁতলাতে বলে ওঠে,
"আ আ আদিল ভাইয়া। আপনি আমাকে এটা কেন পড়িয়ে দিলেন?
আদিল স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই হালকা হেসে নেয়।তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সংকোচও না।সে অনায়াসে বলে,
“আর বলিস না। তোর ভাবি কয়েকদিন ধরে মুড অফ করে রেখেছে।কারণ দুদিন আগে তার বার্থডে ছিল, অথচ আমি তাকে উইশ করিনি, ইভেন কোনো গিফটও দিইনি।
তো ওর জন্য গিফট কিনতে গিয়ে এই রিংটা চোখে পড়ে। পছন্দ হয়ে যায়। আর যেহেতু তোর বার্থডেতেও তোকে কোনো গিফট দেওয়া হয়নি, তাই আজ নিয়ে আসলাম। বল তো, কেমন হয়েছে?
এই কথাগুলো মাহি’র কানে পৌঁছাতেই বুকের ভেতরে যেন বিস্ফোরণ ঘটায়। তার চোখ মুহূর্তেই ছলছল করে ওঠে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু লুকাতে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে ভেবেছিল, হয়তো আদিল তাকে আপন করে নিতে চেয়েছে। হয়তো এই রিংটার মানে অন্য কিছু।
কিন্তু না, সবই ভুল, ভীষণ ভাবে ভুল। বুকের ভেতর হঠাৎ তীব্র একটা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। যেন কেউ অদৃশ্য হাতে হৃদয়টা শক্ত করে চেপে ধরেছে। এই মুহূর্তে তার কী করা উচিত কিছু বুঝে উঠতে পারে না। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে সে আবার জিজ্ঞেস করে,
"আদিল ভাইয়া আপনি কি শুধু এইটার জন্যই আমাকে আসতে বলেছিলেন?
আদিল এক মুহূর্তও না ভেবে উত্তর দেয়,
“হুম! কেন তোর পছন্দ হয়নি?
মাহি বুকের ভেতরের তীব্র কষ্টটা শক্ত করে চেপে ধরে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু নামতে দেয় না। বরং ঠোঁটের কোণে জোর করে একটা হাসি টেনে আনে— যে হাসিটা হাসি নয়, অভ্যাসে শেখা একরকম বেঁচে থাকার অভিনয়। সে এক গাল হেসে শান্ত স্বরে বলে ওঠে,
"হুম…অনেক পছন্দ হয়েছে। আচ্ছা আদিল ভাইয়া, আপনার আর কোনো কিছু বলার ছিল? না মানে, আমার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে।
আদিল একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“এখনই ঘুম পাচ্ছে?
মাহি মাথা নেড়ে দেয়। আর কিছু ব্যাখ্যা দেয় না।
"হুম!
আদিল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
“আচ্ছা, তাহলে যা। কালকে কথা হবে।
এই কথাটুকুই মাহি’র জন্য যথেষ্ট। আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি তার নেই। সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়, যেন এক সেকেন্ড দেরি হলেই সে ভেঙে পড়বে। দরজাটা বন্ধ হতেই মাহি’র পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায় করিডোরে।
রুমের ভেতরে একা দাঁড়িয়ে থাকে আদিল।
তার দৃষ্টি স্থির থাকে সেই বন্ধ দরজার দিকে। একটা তপ্ত শ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুকের ভেতর থেকে। নিজের সাথেই নিচু স্বরে বলে ওঠে,
“তোকে গার্ড করতে আমারও ভালো লাগছে না, কুইন! কিন্তু এছাড়া আমার আর কোনো ওয়ে নেই। ইদানীং দেখছি, তোর চোখজোড়া অন্য কথা বলছে। এই চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকিস না, কুইন। আমি নিজেকে সামলাতে পারবো না। তোকে আমার থেকে আরো দূরে সরাতে হবে। এতটাই দূরে, যাতে আমার কথা ভাবতে গেলেও তোর ঘৃণা হয়।
রাত অনেকটা গভীর! ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোলেও অয়নে’র সময় যেন এক জায়গায় আটকে আছে। নিজের রুমের ভেতর সে বারবার পায়চারি করছে। একবার জানালার কাছে যাচ্ছে, একবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে, তো আবার বিছানার পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে।
কিন্তু আহি এতো রাত হয়ে গেল, তবুও মেয়েটা এখনো ফেরেনি। এই ভাবনাটাই অয়নে’র মাথা গরম করে দিচ্ছে। সে বিরক্ত হয়ে দাঁত চেপে ধরে। এভাবে একা রুমে বসে থাকা যায় নাকি? নতুন বিয়ে, অথচ বউ নেই পাশে ভাবতেই মাথার ভেতর অস্থিরতা বেড়ে যায়। শেষমেশ আর ধৈর্য থাকে না। হন্তদন্ত হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে।
এক এক করে খোঁজ শুরু করে মাহি’র রুম, মুনে’র রুম, এমনকি মহিবুল শেখের রুম পর্যন্ত। তার এমন পাগলামিতে সবাই বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। কিন্তু অয়ন সেসব দৃষ্টি একেবারেই উপেক্ষা করে। তার চোখে তখন একটাই নাম, আহি! হঠাৎ করেই আহি’র বলা একটা কথা তার মনে পড়ে যায়। আর এক সেকেন্ড দেরি না করে সে দৌড়ে নিজের মায়ের রুমের দিকে ছুটে যায়। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই অয়ন থমকে যায়।
চোখের সামনে যে দৃশ্যটা দেখে সে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
আহি তার মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। মুখে শান্তির ছাপ, ঘুমে বিভোর। আর ফ্লোরে তার বাবা। এদিক-ওদিক পাশ ফিরছে, ঘুম আসছে না, চোখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। জাহিদ শেখ কোনোদিন মেঝেতে ঘুমাননি। কিন্তু আজ এই মেয়ের জন্যনসেই অপছন্দের কাজটাও করতে হয়েছে।
হঠাৎ অয়ন’কে দেখেই তিনি হেসে ওঠেন। খুব ভালো করেই বুঝে গেছেন, অয়ন এসেছে মানেই সে তার বউকে নিয়ে এক পা-ও যাবে না। অয়ন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। শান্তা শেখ আহি’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আজ অনেক বছর পর মেয়েটা তাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। এই দৃশ্যটা শান্তা শেখের চোখ ভিজিয়ে দেয়।
অয়ন আর কোনো কিছু ভেবেই সরাসরি আহি’র পাশে গা এলিয়ে দেয়। আর ঠিক তখনই তার ঠান্ডা হাতটা গিয়ে আহি’র গলায় চেপে ধরে। আহি নড়ে ওঠে। এই কাণ্ডে শান্তা শেখ রাগী দৃষ্টিতে তাকান। গলা চড়িয়ে বলেন,
- এই বদ ছেলে! এতো রাতে এখানে কেন এসেছিস?
অয়ন কোনো ভণিতা না করে সোজাসাপটা উত্তর দেয়,
“বউ’টাকে নিতে!
শান্তা শেখ ভ্রু কুঁচকে বলেন,
- আহি আজ আমার সাথেই ঘুমাবে। তুই তোর বাপকে নিয়ে যা।
সঙ্গে সঙ্গে অয়ন ভ্রু তুলে নিজের বাবার দিকে তাকায়। তারপর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলে—
“আমার বউয়ের কাজ তোমার জামাই করতে পারবে না, আম্মা। তার কাজ তাকেই করতে হবে। So, আমার বউ’কে আমার হাতে তুলে দাও।
শান্তা শেখের চোখে বিরক্তির ছাপ আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়েই তিনি কড়া স্বরে বলেন,
- দেখ বাপ, মুখে একটু লাগাম দে। দিন দিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস। তোর বাপ-দাদাও তো কোনো কালেই এমন বেসরম ছিল না।
অয়ন একটুও বিচলিত হয় না। বরং হালকা হাসি ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে—
“হইছে আম্মা, আর বলতে হবে না। রাতে বউয়ের কাছে সব বাপ-দাদা’ই বেসরম হয়। শুধু আমারটাই দেখা যায় হু! দাও, আমার বউ’কে দাও।
এই বলে অয়ন ধীরে ধীরে হাত বাড়ায় আহির দিকে, তাকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আহি লাফিয়ে উঠে বসে। চোখে আতঙ্ক, সে শান্তা শেখের দিকে সরে গিয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে বলে ওঠে,
"বড় আম্মা, আমি যাবো না তোমার নির্লজ্জ বেহায়া ছেলের সাথে। এই লোক কেমন যেন পঁচা পঁচা করে তাকিয়ে থাকে আর পঁচা কথা বলে।
অয়ন দাঁত চেপে, ঠোঁট বাঁকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা বলে,
“চুপ কর শ্বশুরের মেয়ে। আমি পঁচা কথা বললেই তো আম্মা ডাক শুনতে পাবি। যদিও শুধু ডাকলে হবে না, এটার কিছু প্রসেসিং আছে। আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি চল।
আহি জেদ করে মাথা নাড়িয়ে দেয়,
"যাবো না আমি!
অয়ন ভ্রু তুলে, কণ্ঠে কঠোরতা এনে বলে—
“নো এক্সকিউজ। ফাস্ট চল!
"বললাম তো যাবো না। আজ আমি বড় আম্মার সাথেই…
বাকি কথাটা শেষ করার সুযোগই পায় না আহি। মুহূর্তের মধ্যে অয়ন ঝাঁপিয়ে পড়ে, এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে নেয়। আহি ছটফট করে ওঠে, নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, ঠিক তখনই— অয়নে’র ঠোঁট গিয়ে তার ঠোঁটে ছুঁয়ে যায়। আহি মুহূর্তেই বরফের মতো স্থির হয়ে যায়। শ্বাস আটকে আসে, চোখ বড় বড় হয়ে যায়। এমন আকস্মিক ঘটনায় সে সম্পূর্ণ স্তব্ধ। অয়ন আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করে না। ধুপধাপ করে দ্রুত পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
আহি আবারও নিজেকে ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে অয়ন দৃঢ় স্বরে আওরায়,
“এই চিকনা শরীর নিয়ে আমার সাথে লাগতে আসিস? তোর মনে হয়, এভাবে ছোটাছুটি করলেই তোকে আমি ছেড়ে দেবো?
"হোয়াট? আমি চিকনা?
“শুধু চিকনা নয়, শুকনো খঁড়ির মতো চিকনা হুম!
আহি অয়নে'র দিকে তাকিয়ে ভেঁংচি কেঁটে বলে উঠে,
"নিজেকে চিকন রাখাও একটা আর্ট, যা হাতি গন্ডারের মতো হওয়ার উগান্ডারা বুঝবে না হু!
অয়ন ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিসিয়ে আওরাল,
“চিকন রাখা আর্ট নাকি ভা'তা'রের DNA এর অভাব!
"অয়ন ভাই…