নেশাময় আসক্তি

পর্ব - ২৬

🟢

অয়ন বিরক্তি কন্ঠে বলে উঠলো,

“আপমাদের রোগী বেঁচে আছে নাকি মইরা গেছে ওইটা আমি কিভাবে বলবো? আপনাদের স্যা*টা ভাঙা রোগীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন। বা*লডার জন্য বউ'টার কাছে যেতে পারলাম না!

তার কথা শুনে লোকটা অপ্রস্তুত হয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। অয়ন আর একবারও কারও দিকে তাকাল না। সোজা হসপিটালের করিডোর পেরিয়ে দ্রুত পায়ে বাইরে বেরিয়ে এল। অনেক হয়েছে, আর এক মূহুর্তও সে বউ'হীন থাকতে পারবে না। গাড়িতে উঠে সে আর দেরি করল না। ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই গাড়ি ছুটল বাসার দিকে।

প্রায় বিশ মিনিট পর গাড়ি এসে থামল শেখ মঞ্জিলের সামনে। ব্রেক কষার সাথে সাথেই সে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল। গাড়ির দরজা বন্ধ করারও সময় নেই—দ্রুত পায়ে দৌড়াতে লাগল সিঁড়ির দিকে। তার চোখে-মুখে একরাশ উম্মাদনা। সে দৌড়ে যেতেই মাঝপথে হঠাৎ করেই কারও সাথে সজোরে ধাক্কা খেল।

দু’জনই তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। অয়ন রাগে দাঁত খিচিয়ে উঠল। নিচে পড়ে থাকা আদিল’কে দেখে মেজাজ আরো বিগড়ে যায়। সে আদিলে'র দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল—

“শাউ*য়্যার নাতি! আসার আর টাইম পেলি না? শুভ কাজে সব সময় বেগড়া দিতে খাম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে যাস। সর এখান থেকে।

মেঝেতে বসে থাকা আদিল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। কী হলো, কেন হলো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তার চোখে বিস্ময়, অয়ন সেসব তোয়াক্কা না করে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়াল। এবং এক মুহূর্তও নষ্ট না করে নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিল। আদিল এখনও মেঝেতে বসে, স্তব্ধ।

অয়ন রুমের সামনে এসে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। একবার এদিক-ওদিক তাকাল। বিছানা, সোফা, বারান্দা সব জায়গা ফাঁকা। কোথাও আহি নেই। তার মুখের উজ্জ্বলতা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল।

সে বিরক্ত স্বরে বলল, “ওহ্ নো, এখন এই মাতারীকে কোন বনে খুঁজে বেড়াবো? বউ কই তুই? আমার যে অক্সিজেন শেষ হয়ে আসছে!

সে তাড়াহুড়া করে গা থেকে ব্লেজার খুলে ছুড়ে ফেলল। চুলে হাত চালাল। বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি বাড়ছে। ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে মৃদু পায়ের শব্দ ভেসে এলো।

অয়ন ঘুরে তাকাল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে আহি। চোখে একটু লাজুক চাহনি নিয়ে।

এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল। পরের মুহূর্তেই অয়ন যেন ঝড়ের মতো তার দিকে ছুটে গেল। এক হাত দিয়ে আহি’র কোমর জড়িয়ে তাকে আলতো করে তুলে নিল।

"এ এ এই অয়ন ভাই কি করছেন? আমি তো…

বাকি কথা শেষ করার আগেই সে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। অয়ন দু’হাত বিছানার দু’পাশে রেখে ঝুঁকে পড়ল তার উপর। তার চোখে তখন তীব্র আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু সেই তীব্রতার ভেতরেই গভীর ভালোবাসা লুকানো।

আহি কিছু বলার আগেই হুট করে অয়ন তার অধর স্পর্শ করল। তীব্র, অধিকারী এক চুম্বন যেন সারাদিনের জমে থাকা আকুলতা ঢেলে দিচ্ছে। আহি বিস্ময়ে কেঁপে উঠল, তার দু’হাত অয়নে’র কাঁধে উঠে এলো।

অয়নে’র হঠাৎ ঝড়ের মতো আগ্রাসী আলিঙ্গনে আহি প্রথমে কিছু বুঝতেই পারেনি। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। বুকটা চেপে আসছে, যেন বাতাস ঢুকছে না ঠিকমতো। সে ছটফট করে উঠল। কিন্তু অয়ন তখনও নিজের উন্মত্ত আবেগে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।

আহি’র চোখে পানি এসে গেল। সে দু’হাতে অয়নে’র কাঁধে ধাক্কা দিল, বুকের কাছে আঘাত করল। কিন্তু অয়ন যেন বুঝতেই পারছে না কতটা শক্ত করে চেপে ধরেছে।

অবশেষে আহি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে জোরে ধাক্কা মারতেই অয়ন হুঁশে ফিরে এল। হুট করে তাকে ছেড়ে দিল।

আহি সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে জোরে জোরে কেশে উঠল।

"ও ও ওয়াক থু

সে মুখ বাঁকিয়ে পাশে সরে গেল। শ্বাস ঠিক করার চেষ্টা করছে। চোখ-মুখ কুঁচকে বিরক্তিতে সে আবারও বলল,

"ছিঃ ছিঃ ছিঃ, অয়ন ভাই! আপনি থুথু খাওয়ার জন্য এভাবে ছুটে আসলেন? আমি তো ভাবছিলাম আমার জন্য মিষ্টি-টিষ্টি এনেছেন!

অয়নে’র চোখে আবার সেই দুষ্টু ঝিলিক ফিরে এল। কয়েক সেকেন্ড আগে যে মানুষটা অস্থিরতায় কাঁপছিল, সে এখন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসছে। সে আবার ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। আহি ঠোঁট ফুলিয়ে বসে আছে।

অয়ন হালকা ঝুঁকে তার ফুলিয়ে রাখা ওষ্ঠে পরপর কয়েকটা ছোট ছোট চুমু দিল, এবার আগের মতো হিংস্র নয়, বরং দুষ্টুমি মেশানো কোমলতায়। তারপর খুব কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল—

“তোর মতো স্যা*টা ভাঙাদের মাথায় এমন চিন্তাই আসবে। লিপ কিস করাকে কেউ থুথু খাওয়া বলে না, পাগলী। ওটাকে বলে এক্সট্রা ভালোবাসা এক্সট্রা!

আহি দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল।

"এক্সট্রা ভালোবাসা নাকি ছাঁই। আমাকে মেরে ফেলার ধান্দায় আছেন আপনি।

মুহূর্তের মধ্যেই অয়ন দুষ্টু হাসি হেসে আহি’র কোমর আঁকড়ে ধরল। তার চোখে সেই চেনা দুষ্টুমি ঝিলিক।

“চল, মেরেই ফেলি তাহলে।

সে ফিসফিস করে বলতেই আহি বুঝে উঠার সাথে সাথেই আঁতকে উঠে চিৎকার দিয়ে সরে গেল। তার সেই হঠাৎ চিৎকারে পুরো বাসা যেন কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই দরজা ধাক্কা দিয়ে রুমে ঢুকে পড়ল আদিল আর সাজ্জাদ। দু’জনের মুখেই আতঙ্কের ছাপ।

সাজ্জাদ ঢুকেই চারদিকে তাকিয়ে অয়নকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে উঠল

- এই ভাইয়া! পিরিত করছো তো পিরিত করো, কিন্তু তোমার বউ এভাবে চিৎকার করছে কেন? তোমার প্রব্লেম নাই হতে পারে, কিন্তু আমার অনেক প্রব্লেম হয়! বিয়ের বয়স হয়ে গেছে, অথচ আমার বিয়েটা করিয়ে দাও না। আর তোমাদের এই যন্ত্রণা দেখে তো মনে হয় এ বাসায় থাকতেই পারব না!

আহি তখন লজ্জায় কুঁকড়ে অয়নে’র পেছনে গিয়ে লুকিয়েছে। তার গাল টকটকে লাল। মনে হচ্ছে মাটি ফাঁক হয়ে গেলে এখনই ঢুকে পড়বে। এমন দিনে-দুপুরে এমন পরিস্থিতিতে পড়বে, স্বপ্নেও ভাবেনি। সাজ্জাদ এবার কস্টিব অয়নে’র দিকে ছুড়ে দিয়ে মুখ বাঁকালো,

বিজ্ঞাপন

- এরপর থেকে যা-ই করো, তোমার বউয়ের মুখে এটা লাগিয়ে দিয়ে করবে। যাতে গলার জোড় রুমের বাইরে না যায়!

অয়ন আর আদিল দু’জনেই হতভম্ব। সাজ্জাদে’র মুখ দিয়ে এমন কথা বেরোবে, কেউ ভাবেনি। তারপর সাজ্জাদ গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আদিলও পেছন পেছন বেরোতে গিয়ে দরজার কাছে থেমে পেছনে তাকিয়ে বলল,

"ভাই, বোনটা আমার অনেক ছোট। একটু বুঝে-শুনে টর্চার করিস।

অয়ন সাথে সাথে গর্জে উঠল—

“শালা, ভাগ এখান থেকে। ছোট না ছাঁই, তোরা শাউ*য়্যা গিরি দেখাতে না আসলে এতোক্ষণে ফরজ কাজ হয়ে যেতো আমার!

আদিল চলে যেতেই অয়ন পেছন ফিরতেই দেখল, আহি নেই! এক দৌড়ে বিছানা থেকে নেমে দরজা দিয়ে ছুটে পালিয়েছে সে। অয়ন কয়েক সেকেন্ড হ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মাথা চুলকে বিড়বিড় করল

“যাহ্ শালা! বউকে ধরার আগেই উধাও? যতই পালাই পালাই করিস বউ…রাত হলে কিন্তু আমার কথায় নাচতে হবে, হু!

_

_

মুন গুটি গুটি পায়ে রাকিবের রুমের সামনে এসে থেমে যায়। দরজাটা আধখোলা। ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। তবুও তার বুকের ভেতর ধকধক শব্দ হচ্ছে। পেছন থেকে রাকিবে’র বোন আর মাহি তাকে ভেতরে যেতে বলছে। কিন্তু মুনে’র পা যেন মেঝেতে আটকে গেছে।

অনিচ্ছা সত্যেও ধীরে ধীরে সে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। রাকিব রুমের এক কোণে রকিং চেয়ারে বসে আছে। কপালে হাত রেখে যেন গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। চোখদুটো লালচে, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। দুদিনে মানুষটা যেন অনেকটা বদলে গেছে।

মুন খুব আস্তে আস্তে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার গলা শুকিয়ে কাঠ। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। জীবনে এই প্রথম সে এতোটা ভয় পাচ্ছে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে খুব ধীরে বলে ওঠে,

"রাকিব ভাইয়া…

শব্দটা যেন রুমের ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে রাকিব তড়িঘড়ি করে পেছন ফিরে তাকায়। চোখের সামনে মুনকে দেখে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকে। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।

সে চোখ কচলে আবার তাকায়। না, ভুল দেখছে না। সত্যিই মুন!

মুহূর্তের মধ্যে সে চেয়ারের থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে এসে মুন’কে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে।

“মুন তুমি?

তার কণ্ঠ ভেঙে যায়। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট যেন একসাথে বেরিয়ে আসে। সে হু হু করে কাঁদতে শুরু করে।

“সরি মুন, আই’ম রিয়েলি সরি। তোমার যার সাথে ইচ্ছে কথা বলো, তবুও আমার সাথে কথা বলা বাদ দিও না। তুমি জানো, এই দুদিন ধরে আমার বুকটা কতটা ব্যথা করছে? ফোন দিলে রিসিভ করো না, ম্যাসেজ দিলে সিন করো না, এমনকি তোমাদের বাসায় গেলাম, তবুও এক পলকের জন্য আমাকে দেখা দিলে না।

এতো নিষ্ঠুর তুমি কিভাবে হলে? ভালোবাসা কি পাপ? হ্যাঁ, তুমি আমাকে পছন্দ না-ও করতে পারো তাই বলে কি আমাকে একটা সুযোগও দেবে না?

রাকিব এক দমে বলে থামে। তার কণ্ঠে ভালোবাসার আকুতি মিশে আছে। মুন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। মানুষটার চোখে আজ কেবল অসহায়তা। মাহি যেভাবে আদিল’কে পাওয়ার জন্য আকুতি করত, ঠিক তেমন করেই আজ রাকিব তার কাছে আকুতি করছে।

রাকিব আবার বলে ওঠে,

“ট্রাস্ট মি, মুন তুমি একটাবার আমার হয়ে দেখো। দেখবে, আমার প্রতি কোনো অভিযোগ করার সুযোগটাই পাবে না তুমি।

মুন তার শক্ত আলিঙ্গনে হাঁসফাঁস করতে করতে কষ্ট করে বলে,

"একটু ছাড়ুন আমাকে…

সঙ্গে সঙ্গে রাকিব যেন হুঁশে ফিরে আসে। দ্রুত তাকে ছেড়ে দেয়। কয়েক কদম দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ায়। মাথা নিচু করে ফেলে।

মুন একটু উঁচু হয়ে দাঁড়ায়। রাকিব তার থেকে লম্বা, তাই কষ্ট করে হাত বাড়িয়ে নিজের আঁচল দিয়ে তার অশ্রুসিক্ত চোখ মুছে দেয়। স্পর্শটা খুব কোমল, সে নরম গলায় ফিসফিস করে বলে—

"আমার আপনাকে পছন্দ নয়, এটা ঠিক। তবে আমি আপনাকে ঘৃণাও করি না।

আমার জীবনে প্রেম-ভালোবাসা বলতে কিছু নেই। ইভেন এসব আমার ভালোও লাগে না। আমি কখনো স্বপ্নও দেখিনি কাউকে নিয়ে। তবে, আপনাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি।

রাকিবে’র চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়।

“সত্যি?

মুন সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে যায়।

"এতে খুশি হওয়ার কোনো দরকার নেই। ভালোবাসার মানুষকে না পেলে কতটা কষ্ট হয়, সেটা আমি জানি না। কিন্তু নিজের চোখের সামনে মাহি’কে ভেঙে গুড়িয়ে যেতে দেখেছি। মেয়েটা এখন হাসতেও ভাবে। আমি কখনো চাই না, আপনার জীবনও ওর মতো হোক। কারও জন্য নিজেকে শেষ করে দেওয়াটা আমি সমর্থন করি না।

রাকিব অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার কথা শুনছে।

মুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলে,

"আপনি আমার বাসায় কথা বলে দেখুন। যদি সবাই আপনার সঙ্গে আমাকে বিয়ে দিতে রাজি হয়, তাহলে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি রাজি। আর যদি কেউ রাজি না হয়, তাহলে আপনি আপনার রাস্তায় আর আমি আমার রাস্তায়।

রাকিব এদিক-ওদিক মাথা কাত করে হালকা হেসে সম্মতি জানায়। তার ঠোঁটে প্রাণ উজ্জ্বল হাসি।

কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল মাহি। তাদের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর হালকা একটা শূন্যতা দোলা দিয়ে উঠল। সে ভাবল— তার জীবনটাও যদি এমন হতো? একটু পূর্নতা পেলে কি এমন ক্ষতি হতো।

বিজ্ঞাপন
নেশাময় আসক্তি গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় স্পেশাল রোমান্টিক গল্প