আদিল চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে, ভাঙা কণ্ঠে বলে,
"আমি ইসোফ্যাজিয়াল ক্যান্সারে আক্রান্ত কুইন!
সঙ্গে সঙ্গে মাহি কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ তীব্র ব্যথা উঠল। অয়ন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথা কাজ করছিল না। তড়িঘড়ি করে সে ফাইলটা খুলে টেস্ট রিপোর্ট বের করল। কাগজের ওপর বড় অক্ষরে লেখা—
Esophageal Cancer
অয়নে’র চোখ বড় হয়ে গেল। হাত কাঁপতে শুরু করল। পরের মুহূর্তেই রিপোর্টটা তার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল। রুমটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কারও মুখে কোনো কথা নেই। সবাই অবিশ্বাস নিয়ে আদিলে’র দিকে তাকিয়ে আছে।
আদিল ধীরে একটা নিঃশ্বাস নিল। যেন এতদিন ধরে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা কথাগুলো বের করতে কষ্ট হচ্ছে। শান্ত গলায় সে বলল,
"অনেক বছর ধরেই আমি ইসোফ্যাজিয়াল ক্যান্সারে ভুগছি। প্রথমে শুধু গলা ব্যথা আর বুক ব্যথা করত। তখন ভেবেছিলাম সাধারণ কিছু, তাই গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম ব্যাপারটা এত সহজ না। প্রায় চার বছর ধরে এই রোগটা আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়, এতটাই যে দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন হয়ে যায়।
কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তবুও সে নিচু স্বরে বলতে থাকে,
"ডক্টর বলেছে চিকিৎসা খুব সীমিত। অপারেশন করা যায়, কিন্তু সেটাও খুব ঝুঁকিপূর্ণ। সবাই বাঁচে না সেখান থেকে ১০% পেসেন্ট মৃত্যুর দোয়াড় থেকে ফিরে আসে। আর বাকি ৯০% অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
হঠাৎ করেই আহি যেন নিজের শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। তার পা কেঁপে উঠলো, চোখ ঝাপসা হয়ে এলো, আর মুহূর্তের মধ্যেই সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো। তার পড়ে যাওয়ার শব্দে অয়ন ভয়ে চমকে উঠলো। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো তীব্র আতঙ্কে। সে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গিয়ে আহি’কে তুলে বুকে জড়িয়ে নিল।
আর বাড়ির সবাই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কারও মুখে কথা নেই। এতদিন ধরে তাদের ছেলেটা এমন ভয়ানক একটা রোগের সঙ্গে লড়াই করছে, আর তারা কেউ বুঝতেই পারেনি। কেউ খেয়াল করেনি তার চুপচাপ হয়ে যাওয়া, তার কষ্টের ভেতরের নীরবতা, তার জোর করে হাসার চেষ্টা। অয়নে’র বুকে মাথা রেখেই আহি হঠাৎ তার শার্ট খামচে ধরলো। তার শরীর কাঁপছে, শ্বাস ভেঙে যাচ্ছে কান্নায়।
"অয়ন ভাই, আমার ভাইয়া এসব কি বলছে? ভাইয়া সব মিথ্যা বলছে তাই না?
ঠিক তখনই আবার হিয়া হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখে আতঙ্ক, সে অয়নে’র হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ছুটে গিয়ে আদিলে’র বুকে হামলে পড়লো।
"ভাইয়া!
তার কণ্ঠ যেন বুক ফেটে বের হচ্ছে। ভাইকে না হারিয়েও তার তীব্র যন্ত্রনা সে তিলে তিলে বুঝতে পারছে। বুঝতে পারছে তার আবদারের মানুষটাকে তাকে একা করে দিয়ে দূর আকাশে চলে যাবে। সে বুক ফাটা চিৎকার দিয়ে উঠে,
"ভাইয়া ও ভাইয়া তুমি এসব কি বলছো? তুমি তোমার ছোট্ট বোনটাকে একা করে চলে যাবে? আমি কিভাবে তোমাকে ছাড়া থাকবো? তুমি হারিয়ে গেলে তোমার বোনটা যে একা হয়ে যাবে। তাকে কে তোমার মতো ভালোবাসবে? কে তার অবাধ্য আবদার পূরণ করবে?
আহি'র চোখ লাল হয়ে উঠেছে কান্নায়। সে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো,
"আব্বা, আপনি কিছু বলছেন না কেন? ভাইয়াকে বলুন না, সে যা বলছে সব মিথ্যা। ভাইয়া কোথাও যাবে না, ভাইয়া আমাদের সাথেই সারাজীবন থাকবে।
আহি ডুকরে ডুকরে কাঁদছে, শ্বাস কাঁপছে। তার জীবনে কোনোদিন সে তার ভাইকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখেনি। আদিল ধীরে ধীরে নিজের ছোট বোনটাকে বুকে টেনে নিল। যেন খুব যত্ন করে আগলে রাখছে। এই মেয়েটা তার পৃথিবীর সবচেয়ে আদরের মানুষ। ছোট থেকে নিজের হাতে বড় করেছে তাকে। তার সব আবদার, সব জেদ, সবকিছুই হাসিমুখে মেনে নিয়েছে। বোনটার চোখে পানি সে কখনো সহ্য করতে পারেনি। কিন্তু আজ, তার কারণেই বোনটা কাঁদছে।
আদিল চোখ বন্ধ করে একবার গভীর শ্বাস নিল। তারপর শান্ত ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
“বনু, প্লিজ শান্ত হ। কেউ চিরদিন বেঁচে থাকে না। আর আমি অপারেশনটা করবো না। কারণ অপারেশন না করলে আমি তোদের সাথে আরও কিছু সময় থাকবো। তারপর হুট করে একদিন হারিয়ে যাবো, কাউকে কিছু বলারও সময় পাবো না। তখন দেখবি, সব ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
কথাগুলো শুনে আহি যেন আরও ভেঙে পড়লো। সে আদিলে’র শার্ট আঁকড়ে ধরে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
"না, আমি আমার ভাইয়াকে ছাড়া থাকতে পারবো না। আমি তোমায় কোথাও যেতে দেবো না, তুমি যেখানে যাবে আমিও তোমার সাথে যাবো।
আদিল হঠাৎ যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লো। কথা বলতে চাইছে, কিন্তু শব্দগুলো গলায় এসে আটকে যাচ্ছে। তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠেছে। সে খুব ভালো করেই জানে—তার ছোট বোনটা তাকে কতটা ভালোবাসে। এই পৃথিবীতে যদি কেউ তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে তবে সে এই মেয়েটাই। কিন্তু জীবনের সবকিছু কি নিজের ইচ্ছায় চলে?
মানুষ চাইলেই কি বেঁচে থাকতে পারে? প্রতিটি মানুষের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় লেখা থাকে। সময় ফুরিয়ে গেলে সবাইকেই একদিন বিদায় জানাতে হয়। এই পৃথিবীকে, নিজের মানুষগুলোকে, সবকিছুকে। আদিল দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বোনটাকেই সে ঠিকমতো সামলাতে পারছে না। আর তার মা যদি এখন এখানে থাকতেন, তাহলে কি হতো এই ভাবনাতেই তার বুক কেঁপে উঠলো। ভাগ্য ভালো যে তার মা কয়েক দিনের জন্য মামার বাড়িতে গেছেন। কিন্তু তিনি যখন ফিরে আসবেন তখন এই খবর শুনে কী করবেন? এই চিন্তাতেই আদিলের বুকের ভেতর অদ্ভুত ভয় জমে উঠলো।
রুমের একপাশে মাহি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে একদম নিশ্চুপ। মুখে কোনো কথা নেই, চোখে গভীর স্থিরতা আর ভেতরে জমে আছে অসংখ্য প্রশ্ন। আদিল এক পলক তার দিকে তাকালো। তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিললো। তারপরই আদিল চোখ নামিয়ে নিল। মেয়েটার সাথে তার আলাদা করে কথা বলা দরকার, অনেক কিছু বলা দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তটা সেই সময় নয়।
আদিল ধীরে ধীরে আবার বোনটার দিকে তাকালো। তারপর তপ্ত একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“বনু, ভাই তোর কষ্টটা সহ্য করতে পারছে না। একটু শান্ত হ। তুই যদি এভাবে ভেঙে পড়িস, তাহলে বাসার সবাইকে সামলাবে কে?সংসারের দায়িত্ব তো বড় বউদের নিতে হয়।
এমন ছোটখাটো ব্যাপারে যদি ভেঙে পড়িস, তাহলে চলবে কিভাবে?
কথাটা শেষ হতেই হিয়া যেন বিস্ফোরিত হয়ে উঠলো। তার চোখে রাগ জমে উঠেছে।
"ভাইয়া এটা তোমার কাছে ছোট ব্যাপার মনে হচ্ছে? এটা আমার ভাইয়ার জীবন-মরণের কথা!
আদিল আগের তুলনায় স্বাভাবিক কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,
“তো কি হয়েছে? অনেক তো তোদের সাথে হাসিখুশি ভাবে জীবন পার করে দিলাম, এবার না হয় একটু তাড়াতাড়িই বিদায় নিয়ে নিলাম।
অয়ন ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চোখেমুখে কঠিন রাগ, অথচ ভেতরে লুকিয়ে থাকা কষ্টটা খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছিল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে সে হাত বাড়িয়ে আলতো করে আদিলে’র কাঁধে রাখল। তারপর ভারী কণ্ঠে বলল,
“আমাকে তুই তোর বেস্ট ফ্রেন্ড বলতিস, তাই না? সব কথা নাকি আমার সাথে শেয়ার করিস। তাহলে তোর এই রোগের কথা আমাকে বলতে পারলি না কেন?
কথাগুলো খুব জোরে বলা হয়নি, কিন্তু রুমের সবাই স্পষ্ট শুনতে পেল। সেই স্বরের ভেতর লুকিয়ে ছিল অভিমান, কষ্ট আর রাগের মিশ্রণ। অয়ন আবার ধীরে ধীরে বলল,
“আমি বুঝে গেছি, আমি এখনো তোর বেস্ট ফ্রেন্ড হতেই পারিনি। যদি সত্যিই হতাম, তাহলে তুই এই কথা আমার কাছ থেকে লুকাতি না।
আদিল মাথা নিচু করে রইলো। তার বুকটা ভারী হয়ে আসে। সে জানে অয়ন তার উপর ভীষণ রেগে আছে, কিন্তু সেই রাগের ভেতরেও যে ভয় আর ভালোবাসা লুকিয়ে আছে সেটাও সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারে। হঠাৎ অয়নে’র কণ্ঠ শক্ত হয়ে যায়।
“ঠিক আছে, তোর বেস্ট ফ্রেন্ড না হতে পারলাম। কিন্তু একটা কথা ভুলে যাস না, আমি তোর বড় ভাই। আর তোর ভাই এখনো মরে যায়নি যে তোকে এত সহজে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে দেব। আমি আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করবো তোকে মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরিয়ে আনতে। আর আমি অপারেশনের ডেট ফিক্সড করতেছি। তুই রেডি থাকিস।
আব্বা,,বাবাই আপনারা সবাই এখন নিজের রুমে যান। আদিল আর মাহি’কে একটু সময় দেওয়া দরকার। আর আপনারা দুশ্চিন্তা করবেন না। আল্লাহ চাইলে অপারেশন সাকসেসফুলি হবেই, ইনশাআল্লাহ। খুব তাড়াতাড়ি আদিল নতুন জীবনে পা রাখবে।
কথাগুলো বলার সময় অয়নে’র গলায় এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ছিল। যেন সে নিজের জীবন দিয়েও আদিল’কে বাঁচিয়ে আনবে। এরপর সে ঘুরে দাঁড়াল। দু’কদম এগোতেই হঠাৎ আদিল তার হাত ধরে ফেলল।
“দোস্ত প্লিজ আমার কথাটা...
কিন্তু অয়ন থামল না। বরং নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে গটগট করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল আহি’র দিকে। তার চোখে তখনো রাগের ছাপ স্পষ্ট, তবু কোথাও একটা কোমলতা লুকিয়ে ছিল।
“দোয়েল পাখি, তোর ইচ্ছে হলে রুমে আসতে পারিস। আর ইচ্ছে না হলে যেখানে খুশি ঘুমিয়ে পড়িস।
কথাটা বলে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল। তার পিছু পিছু এক এক করে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল তারা। আহি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ এখনো দরজার দিকেই, যেদিক দিয়ে অয়ন বেরিয়ে গেল। তার দৃষ্টি ভীষণ অসহায়। এদিকে আদিল ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে তার বোনকে কাছে টেনে নিল। আলতো করে দু’গাল ছুঁয়ে দিল। তারপর নরম স্বরে বলল—
“বনু তোকে এখন অয়নে’র খুব প্রয়োজন। তুই ওর কাছে যা। আমি কাল ওর সাথে কথা বলবো, সব ঠিক হয়ে যাবে। আর আমাকে নিয়ে একদম চিন্তা করবি না ওকে?
আহি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। আদিল খুব যত্ন করে তার চোখের জল মুছে দিল। তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
“আমার বনুর ঠোঁটে সবসময় হাসি মানায়। এভাবে মুখ গোমড়া করে থাকা বনুটা আমার একদম ভালো লাগে না।
আহি একবার ভাইয়ের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি ঘুরিয়ে মাহি’র দিকে তাকাল। মাহি’র মুখে গভীর বিষণ্নতা। এক মুহূর্তের জন্য তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
তারপর আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। চুপচাপ দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।