নেশাময় আসক্তি

পর্ব - ৩১

🟢

মাহি গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ মুখ লাল, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। আর আদিল ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ আদিল এগিয়ে এসে মাহি’র হাত ধরে ফেলল। মুহূর্তেই মাহি ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিল। এবং কর্কশ কণ্ঠে সে বলে উঠল,

"স্পর্শ করবেন না আমাকে!

কথাটা রুমের ভেতর প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ল। মাহি’র বুক উঠানামা করছে। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,

"আপনি আমার ভালোবাসাকে নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেললেন আদিল ভাইয়া? দিনের পর দিন কুত্তার মতো আপনার পেছনে পেছনে ঘুরেছি আমি আর আপনি? আপনি আমার ভালোবাসাকে এভাবে ছোট করলেন। মিথ্যা বলেছেন আপনি, সবটা মিথ্যা। কি হতো যদি সেদিন সত্যিটা বলতেন?

আপনি কিভাবে ভাবতে পারলেন আপনার ক্যান্সার হয়েছে জানার পর আমি আপনার জীবন থেকে হারিয়ে যাবো। আমার ভালোবাসা কি এতোটাই ঠুনকো যে ক্যান্সার হওয়ার জন্য আমার ভালোবাসা আপনার প্রতি থেকে চলে যাবে। আমাকে আপনি এতোটাই ঘৃণিত নারী মনে করেন? আমার ভালোবাসার কি দাম নেই?

আদিল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখে অপরাধবোধ স্পষ্ট। সে ধীরে ধীরে বলল,

“কুইন প্লিজ, একটু শান্ত হ! আমি তোকে কখনোই ছোট করে ভাবিনি কিংবা তুই আমার লাইফ থেকে হারিয়ে যাবি ভেবে তোকে সত্যিটা বলিনি এমনটা নয়।

"আমি কৈফিয়ত চায়নি, আমি আপনার কেউ না। চলে যান আমার রুম থেকে।

ততক্ষণে আদিল মাহি'র দু বাহু চেপে ধরে অসহায় কন্ঠে আওরায়,

“কুইন ট্রাস্ট মি আমিও তোকে ভালোবাসি! আমি জানি তুই আমাকে অসম্ভব ভালোবাসিস। তোকে মিথ্যা বলা ছাড়া আর কোনো ওয়ে ছিল না। আচ্ছা তুইই বল, আমার এই অবাঞ্ছিত জীবনে তোর মতো সুন্দর একটা জীবন টেনে এনে নষ্ট করি কীভাবে? নিজের দুই দিনের সুখের জন্য তোকে সারাজীবন কাঁদাতে পারতাম?

তোকে আমার কাছে টেনে নিলে তুই আরো আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়তি। তখন আমি চিরতরে হারিয়ে গেলে তুই আরো কষ্ট, যন্ত্রনা পেতি। আমি শুধু চেয়েছি আমার থেকে তুই দূরে থাকলে আমাকে ধীরে ধীরে ভুলে যেতে পারবি। তখন যদি আমি চিরকালের জন্য হারিয়েও যায় তাহলে আর কষ্ট পাবি না।

মাহি নির্বাক। তার চোখে অশ্রু জমে উঠেছে। সে এক ধ্যানে আদিলে'র দিকে মত্ত রয়েছে। এক সেকেন্ডের জন্যও দৃষ্টি অন্য দিকে সরে যায়নি। আদিল ধীরে ধীরে আবারও বলল,

“তুই আমার কাছে খুব দামি, কুইন! তুই কষ্ট পেলে আমি সহ্য করতে পারি না। আমি সব সময় চেয়েছি তুই হ্যাপি থাক, কেউ একজন তোর লাইফে থাকুক যে আমার নাম তোর হৃদয় থেকে মুছে দেবে। তারপর আমার কুইন অনেক সুন্দর ভাবে লাইফ কাটাতে পারবে আর কষ্ট পাবে না।

মাহি আগের ন্যায় তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

"আপনি বলতে চাচ্ছেন, এতদিন আপনাকে ছাড়া আমি খুব খুশি ছিলাম? একটুও কষ্ট হয়নি আমার? কেউ একজন আসলে আমি আপনাকে ভুলে তার হয়ে যাবো?

কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

আদিল আরেক ধাপ এগিয়ে এল।

“আমি এভাবে বলতে চাইনি, কুইন!

মাহি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।

"বললাম না আমাকে স্পর্শ করবেন না।

কিন্তু কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আদিল আচমকা হাত বাড়িয়ে মাহি’র কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে টেনে নিল।

এত দ্রুত সবকিছু ঘটল যে মাহি প্রস্তুতই ছিল না। হঠাৎ টানে সে ঘাবড়ে গিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল। মাহি চোখ খুলল না, কিন্তু আদিল তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।

ওই মুখে ভয়, কষ্ট, অভিমান মিশ্রিত।

মাহি’র কপালের সামনে উড়ে আসা চুলগুলো আলতো করে ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিল আদিল।

তারপর একটু ঝুঁকে খুব নিচু স্বরে আওরায়,

“এ্যাহ, বললেই হলো নাকি? স্পর্শ করব না মনে? একবার নয়, শতবার, হাজারবার স্পর্শ করব। কী করবি তুই?

মাহির বুক ধক করে উঠল। সে চোখ নামিয়ে নেয়। অশ্রুসিক্ত নয়ন আদিল হাতের আগুল দিয়ে মুছে ফিসফিস করে বলল—

“তুই আমার, একান্তই আমার। আর আদিল নিজের জিনিস কখন, কীভাবে স্পর্শ করবে সেটা কাউকে বলে দিতে হবে না।

মাহি স্থির হয়ে গেল। তার চোখ ধীরে ধীরে আবারও ভিজে উঠছে। সময়ের সাথে এই মানুষটাই তার জীবনের সাথে মিশে গেছে। অথচ এই মানুষটাই আজ সকালে তাকে কত কঠিন কথা বলেছে।

মাহি’র বুক ভেঙে যাচ্ছে। হঠাৎ সে ডুকরে কেঁদে উঠল। দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল আদিলে’র শার্ট। মাথা গুঁজে দিল তার বুকে। শার্টটা খামচে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল—

"ভাইয়া ঠিকই বলে, আপনার কাছে আমরা কেউ আপন না। আমরা যদি আপনার আপন হতাম, তাহলে এতগুলো মিথ্যা বলতে পারতেন? আমি থাকব না আপনার কাছে, আর চাইও না আপনাকে। আপনি খুব খারাপ, খুবই খারাপ। চলে যাবো আমি সত্যি সত্যি চলে যাবো।

হঠাৎ আদিল ঠোঁট চেপে হেসে উঠলো,

“চলেই যখন যাবি তাহলে আমার বুকে লেপ্টে আছিস কেন? চলে যা, তারাতাড়ি চলে যা। তুই চলে গেলে আমি মৌরি’কে বিয়ে করে নেবো। তখন ওর সাথেই না হয় বা***

বাকি কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মাহি ঝট করে আদিলে’র বুকে ঘুষি মেরে বসে। আদিল হালকা চিৎকার করে উঠল,

“আউচ! এভাবে মারলি, কুইন?

মাহি নাক ফুলিয়ে তার দিকে এগিয়ে এল।

"তো কি করব? একেই ওই ডাইনিটাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, তার জন্য কিছু বলিনি। আবার এখন তাকে বিয়ে করে বা'স'রও করতে চান?

বিজ্ঞাপন

আদিল ভ্রু তুলল।

“আমি কখন বললাম আমি বা'স'র করতে চাই?

মাহি রাগী চোখে তাকাল।

"বলতেই তো যাচ্ছিলেন! চোখের সামনে একটা পিচ্চি মেয়ে ছোটাছুটি করে তাতে আপনার নজর যায় না। অথচ কোন দেশের পেত্নী এলে তার দিকে ঠিকই নজর যায়!

হঠাৎ আদিল কিছু না বলে তাকে কোলে তুলে নিল। অপ্রস্তুত হয়ে মাহি ভয়ে তার গলা আঁকড়ে ধরল। আদিল কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে তাকে বিছানায় বসিয়ে দিল। তারপর মাহি’র দু’হাত নিজের হাতের মধ্যে আটকে শীতল কণ্ঠে বলল,

“আমার কুইন যখন আমার সামনে ছোটাছুটি করে, তখন খুব ইচ্ছে হয় তার গালে দুটো চুমু খাই। কিন্তু সেই চুমু দিতে গিয়ে যদি কোনো অঘটন হয়ে যায় তখন কে সামলাবে শুনি? আমার পিচ্চিটা তো এখনও এত বড় হয়নি যে আমাকে সামলাতে পারবে।

মাহি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

"তাহলে আহি কিভাবে ভাইয়াকে সামলায়?

কথাটা বলেই সে নিজের জিভে কামড় দিল। সে বুঝতেই পারেনি কী বলে ফেলেছে। আদিল ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। মুহূর্তেই মাহি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। আদিল একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—

“বুঝতে পারছি, আমার কুইন এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। আমাকে সামলানোর জন্য সে প্রস্তুত তবে....

"তবে কি, আদিল ভাইয়া?

“ছিঃ ছিঃ, পুরোপুরি তোর ভাইয়ের মতো নির্লজ্জ হয়ে গেছিস। যেমন তোর ভাইয়ের মুখে কোনো কথা আটকায় না, তেমন তোরও না। পঁচা মেয়ে! বিয়ের আগেই এত ইটিসপিটিস করতে চাস?

মাহি একেবারে চুপ হয়ে গেল। লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে তার। ঠিক তখনই আদিল একটু ঝুঁকে নরম গলায় বলল,

“আচ্ছা থাক আর লজ্জা পেতে হবে না। এবার একটু আমার দিকে তাকা তো। দেখি আমার লজ্জাবতীকে দেখতে কেমন লাগে।

হঠাৎ মাহি তার বুকের দিকে ঝুঁকে পড়ল। নিচু স্বরে বলল,

"একটা কথা জিজ্ঞেস করি আপনাকে?

“হুম বল।

মাহি শুকনো ঢুক গিলে মিনমিন স্বরে আওরায়,

"আমাকে কতটুকু ভালোবাসেন আদিল ভাইয়া?

আদিল মাহি'র দিকে তাকায়। সে আদিলে'র দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। তারপর আদিল কোনো দ্বিধা ছাড়ায় উওর দেয়,

“মানুষ তার নিঃশ্বাস কে যতটা ভালোবাসে আমি তার চেয়েও দ্বিগুন ভালোবাসি তোকে। যদি বলিস কতটুকু চাই তোকে, তাহলে আমি বলব মানুষ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যতটা বাঁচতে চাই আমি তার থেকে অধিক পরিমাণ তোকে চাই। আমি নিশ্বাস ত্যাগ করার শেষ মূহুর্ত পর্যন্তও শুধু তোকেই চাই, শুধু তোকে!

আদিলে'র বলা প্রতিটি কথা মাহি মুগ্ধ নয়নে শুনছিল। এই প্রথম সে আদিলে'র মুখ থেকে এতোটা আদুরে স্বরে ভালোবাসার কথা শুনলো। আদিলে'র শব্দে বাস্তবে ফিরে আসে মাহি। আদিল আবারও ভ্রু জোগল কুঁচকে তাকায়,

“হয়েছে এবার চোখ দুটো নামিয়ে নে। অনেক রাত হয়েছে এবার ঘুমিয়ে পর কাল তো সকাল সকাল উঠতে হবে।

"কেন?

“আরে গাঁধি কাল যে প্রথম রোজা ভুলে গেছিস? বাই দ্য ওয়ে রোজা থাকতে পারবি তো, আই মিন সারাদিন কিন্তু কিছুই খাওয়া চলবে না। পারবি তো?

"হুম! কেন পারবো না, আমি তো প্রতি বছরই রোজা থাকি।

“হুম বুঝলাম, এবার বাচ্চা মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পর সকালে কথা হবে। আর যদি কোনো দিন ভুলভাল কিছু মাথায় আসে তারপর দেখবি কত ধানে কত চাল।

"ধান চাল আপনি দেখেন গিয়ে, আমি তো আমার আদিল ভাইয়াকে পেয়েই গেছি।

আদিল আর কথা বড়ায় না। সে মুচকি হেসে মাহি'র কপালে হালকা ঠোঁট ছুঁয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মাহিও শান্তিতে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমায়।

_

_

আহি গুটিগুটি পায়ে রুমের দিকে এগিয়ে চলল। রুমে ঢুকেই সে একটু অবাক হয়ে গেল, লাইট অফ, আর অয়ন শান্ত ছেলে হয়ে নিজেই বিছানায় শুয়ে আছে। অন্ধকারে ড্রিম লাইটের আলোয় আবছা আবছা অয়ন’কে দেখা যাচ্ছে। আহি দেরি না করে ধীরে ধীরে অয়নে’র দিকে এগিয়ে গেল। তারপর আস্তে আস্তে অয়নে’র টি-শার্টের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দিল।

অয়ন তার উপস্থিতি টের পেলেও নিশ্চুপ থেকে গেল। অয়ন’কে স্থির দেখে আহি অয়নে’র বুকে আলতো চুমু দিল। অয়ন হঠাৎ নড়েচড়ে বসে ফিসফিস করে বলল—

“দোয়েল পাখি, বিরক্ত করিস না। অনেক রাত হয়েছে, এখন ঘুমিয়ে পড়।

আহি টি-শার্টের ভেতর থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে তার মুখোমুখি শুয়ে পড়ল।

"কিহহহ? আপনি নিজে আমাকে ঘুমিয়ে পড়তে বলছেন?

অয়ন চোখ বন্ধ রেখেই উওর দিল,

“হুম, এবার ঘুমিয়ে পড়।

"অয়ন ভাই, আপনি এখনও রেগে আছেন?

অয়ন ফিসফিস করে বলল,

“হোয়াই?

"ভাইয়া, আপনাকেও সত্যটা বলেনি সেই জন্য।

“ওহু, তেমন কোনো ব্যাপার নেই। তবে তুই কি আমার কাছে কৈফিয়ত চাচ্ছিস?

বিজ্ঞাপন
নেশাময় আসক্তি গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় স্পেশাল রোমান্টিক গল্প