নেশাময় আসক্তি

পর্ব - ৩৫

🟢

দেখতে দেখতে কয়েকটা দিন কেটে গেল। অয়ন সদ্য হসপিটাল থেকে বাসায় ফিরেছে। বাসায় ফিরেও যেন শান্তি পাচ্ছিল না। পুরো বাড়ি কয়েকবার ঘুরে দেখল, কিন্তু যাকে খুঁজছে তাকে কোথাও পাচ্ছে না। অবশেষে মুনে’র রুমের সামনে এসে থামতেই তার চোখে পড়ল, আহি সেখানে বসে আছে। অয়ন আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। কোনো কথা না বলেই সোজা এগিয়ে গিয়ে আহি’কে কোলে তুলে নিল। হঠাৎ এমন কাণ্ডে সবাই অবাক হয়ে গেল। অয়ন কাউকে কিছু বলল না, সরাসরি নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিল। রুমে ঢুকে খুব সাবধানে আহি’কে বিছানায় বসিয়ে দিল। তারপর একটু ঝুঁকে তার কপালে আলতো করে ঠোঁট স্পর্শ করলো।

তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত কোমলতা,

“রুম থেকে এক পা-ও বের হবি না। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি। একদম নড়বি না, জাস্ট ওয়েট।

এই বলে অয়ন ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই আহি মুখ বাঁকিয়ে ফেলল।

"এই এসেছে আবার হুকুম দিতে! রুম থেকে বের হবো না মানে? রুম কি তোর বাপের?

নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে সে উঠে দাঁড়াল।

"আমার যখন ইচ্ছা আমি যেখানে খুশি যাবো। তাতে তোর কী খবিশ। আমি রুম থেকে বের হবো মানে হবো।

ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি নিয়ে আহি হেলতে দুলতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। প্রায় ঘণ্টা খানেক পর অয়ন শাওয়ার শেষ করে বের হলো। রুমে ঢুকেই সে থমকে গেল। বিছানায় কেউ নেই। অয়ন বিরক্ত হয়ে মাথা নেড়ে বলল,

“এই মেয়েটা এক মিনিটও শান্ত হয়ে বসতে পারে না।

সে দ্রুত তোয়ালে খুলে ট্রাউজার পরে নিল, গায়ে টি-শার্ট চাপাল। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে গেল। কোথায় যেতে পারে সে খুব ভালোই জানে। ধীরে ধীরে সাজ্জাদে’র রুমের দিকে এগিয়ে গেল অয়ন। কারণ এই সময় সব ভাই বোন সাজ্জাদে’র রুমেই আড্ডা দেয়। রুমের দরজার কাছে গিয়ে দেখল—আহি, মাহি, মুন আর সাজ্জাদ বসে গল্প করছে।

ঠিক তখনই, অয়ন হঠাৎ লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসল। সরাসরি গিয়ে আহি’র গা ঘেঁষে বসে পড়ল। রুমের সবাই একসাথে কপাল কুঁচকে তাকাল। কিন্তু অয়নে’র মধ্যে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং সে আরও একটু কাছে সরে এলো। আহি চোখ কটমট করে তাকিয়ে রইল। তবুও অয়ন নির্বিকার।

শেষে আহি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"এত ঘেঁষাঘেঁষি করছেন কেন?

অয়ন শান্ত গলায় বলল,

“রুমে চল!

"আপনি যান। আমি এখন কেন রুমে যাবো?

অয়ন আবারও একটু নরম গলায় বলল,

“চল না বউ প্লিজ প্লিজ প্লিজ।

আহি মুখ ঘুরিয়ে বলল,

"বিরক্ত করবেন না কিন্তু।

হঠাৎ অয়ন তার কোমর জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তের মধ্যে মাহি, মুন আর সাজ্জাদে’র চোখ বড় বড় হয়ে গেল। এই দৃশ্য তারা আশা করেনি। আহি সঙ্গে সঙ্গে রেগে উঠল।

"খবিশ লোক সেদিন তো খুব বড় মুখ করে বললেন, আমার কাছাকাছি থাকলে নাকি আপনার রোজা হালকা হয়ে যাবে তাহলে এখন কেন এসেছেন?

অয়ন ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিসিয়ে আওরাল,

“চুপ কর আলুর চপের বাচ্চা। বউ’য়ের কাছাকাছি থাকলে রোজা হালকা হয় না বরং রোজা ডাবল হয়। নে এবার লম্বা করে একটা চুম্মা দে তো!

এতক্ষণ সবাই ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বসে ছিল। কিন্তু অয়নে’র শেষ কথাটা শুনে সাজ্জাদ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ফিক করে হেসে ফেলল সে। মুহূর্তের মধ্যে অয়ন ঘুরে তাকাল। তারপর ধুমধাম করে সাজ্জাদে’র পিঠে কয়েকটা কিল বসিয়ে দিল।

এবং দাঁতে দাঁত চেপে বলল—

“শালা সজনে ডাটা, সজনে ডাটার মতো চুপচাপ বসে থাক। সিরিয়াস মুহূর্তে তোকে হাসতে বলছে কে? রোজা রাখছি বলেই তোকে ছাড় দিচ্ছি। নয়তো তোকে একদম বোম মেরে উড়িয়ে দিতাম।

সাজ্জাদ মুখ বাঁকিয়ে বলল,

- ভাইয়া, আমি তোমার ভাই হই শালা না।

“তোর মতো স্যা… ধুর। বা*লের মুখ রমজান মাসও মানে না।

মাহি আর মুন এবার আর হাসি আটকাতে পারল না। রুম জুড়ে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। অয়ন বিরক্ত হয়ে আহি’র দিকে তাকাল। তারপর হঠাৎ করেই তাকে কোলে তুলে নিল। আহি চমকে উঠল,

"এই খবিশের বাচ্চা কি করছেন কি?

অয়ন কোনো কথা বলল না। সোজা তাকে নিয়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিল। পিছনে বসে থাকা সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

রুমে ঢুকে অয়ন ধপ করে দরজা বন্ধ করল। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে আহি’কে বিছানায় বসিয়ে দিল। নিজে গিয়ে ঠিক তার সামনে বসে পড়ল। আহি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু হঠাৎ, অয়ন তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। আহি হতবাক। অয়ন চোখ বন্ধ করে বলল,

“পাখি! মাথাটা একটু টিপে দে তো।

আহি সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

"মাথা কেন? সোজা গলা টিপে দেই? তাহলেই তো আপনার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে।

অয়ন চোখ আধখোলা করে বলল,

“ফেল মেরে, তোকে আটকে রেখেছে কে?

তারপর দেখবো রাতে ইন্টু মিন্টু করিস কার সাথে...হু?

তার কথা শুনে আহি দুষ্টু করে হাসল। চোখ টিপে বলল,

"কেন? আরেকটা বিয়ে করে ফেলবো।

কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো লাগল অয়নে’র কানে। সে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বসে পড়ল। তারপর হঠাৎই কাশতে শুরু করল। আহি মুহূর্তেই ঘাবড়ে গেল। অয়ন কোনো রকম নিজেকে সামলে নেয়।

তারপর অসহায় চোখে তাকাল আহি’র দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে আওরাল,

“আমি মরে গেলে তুই আরেকটা বিয়ে করবি, দোয়েল পাখি?

"হ্যাঁ, করবো তো।

অয়নে’র চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। সে ধীরে ধীরে আবার জিজ্ঞেস করল,

“সত্যি সত্যি করবি?

"হ্যাঁ!

মুহূর্তেই অয়ন মাথা নিচু করে ফেলল। মনে হচ্ছিল ভেতরটা হঠাৎ খালি হয়ে গেছে। রুমটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য একদম চুপ হয়ে গেল। তারপর হঠাৎ আহি ঝুঁকে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

অয়ন অবাক হয়ে গেল। আহি তার বুকে মুখ লুকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

"আপনি এত বোকা কেন?

অয়ন কিছু বলল না। আহি এবার একটু দূরে সরে তার চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠ স্বর নরম করে বলল,

"আমি কি আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারি না। আপনি আমার প্রথম ভালোবাসা আর আপনিই আমার শেষ! এরপর আর কোনো দ্বিতীয় পুরুষ আমার জীবনে আসবে না।

অয়ন যেন কিছুক্ষণের জন্য কথা হারিয়ে ফেলল। তারপর অয়ন নিজেও আহি'কে শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরে।

“ভালোবাসি আমার দোয়েল পাখি!

"আমিও আপনাকে অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি স্বামী জান!

অয়ন মুচকি হেসে আহি”র দিকে তাকায়। মেয়েটার মধ্যে অন্য রকম এক নেশা আছে। যতই চেষ্টা করে একটু দূরে থাকবে, ততই যেন উল্টোটা হয়—এক কদম দূরে যাওয়ার কথা ভাবলেই চার কদম এগিয়ে আসে। ভালোবাসার দৃষ্টি বুঝি এমনই; যেখানে প্রিয় মানুষটাকেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়!

মাহি ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে নিজের রুমের দিকে হাঁটছিল। হঠাৎ কারও হেঁচকা টানে শক্ত, পোক্ত একটা বুকে গিয়ে পড়ে। চমকে উঠে চোখ পিটপিট করে তাকাতেই আদিলে’র হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখতে পেল। আদিল তার কোমর জড়িয়ে ধরে, নাকে নাক ঘষতে ঘষতে ফিসফিস করে বলল,

"ওহু, দিন দিন কিন্তু খুব পঁচা হয়ে যাচ্ছিস। পাত্তা দেওয়ার পর থেকে তো আমার ধারে কাছেও আসিস না। এই জন্যই বলি, ভালোবাসা এত সহজে প্রকাশ করতে নেই।

মাহি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। আদিল আবারও মৃদুস্বরে বলল,

"আমার কুইনটা ইদানীং এত শান্ত হয়ে গেল কেন? আমি তো সেই চনচল কুইনকেই চাই, যে আমাকে পাওয়ার জন্য পাগলামি করবে, আমাকে অনেক অনেক অনেক ভালোবাসবে।

মাহি একটু লাজুক গলায় বলল,

- আমি কি আপনাকে ভালোবাসি না, আদিল ভাইয়া?

কথাটা শুনে আদিল এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারপর একটু ঝুঁকে খুব নিচু স্বরে বলল,

"ভালোবাসিস, কিন্তু আগের মতো ফিল পাই না।

মাহি ভ্রু কুঁচকে বলল,

- এটা কিন্তু রমজান মাস।

আদিল কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসল।

"সো হোয়াট? তুই রোজা, আমি তো না। তাছাড়া অন্তত রাতে একটা পাপ্পি তো দিতেই পারিস।

সঙ্গে সঙ্গে মাহি’র গাল লাল হয়ে উঠল। সে নিচের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,

- আগে বিয়ে হোক।

আদিলে’র চোখে হঠাৎ এক অদ্ভুত ছায়া নেমে এল। সে আস্তে করে বলল,

"যদি বিয়ে হওয়ার আগেই আমি হারিয়ে যাই তখন?

বিজ্ঞাপন
নেশাময় আসক্তি গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় স্পেশাল রোমান্টিক গল্প