মূহুর্তেই অয়ন দাঁত খিঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
“ওই আলুর চপের বাচ্চা দিনে আমার থেকে দূরে দূরে থাকবি৷ তুই কাছে থাকলে আমার রোজা হালকা হয়ে যাবে। তোর মতো স্যা*** আস্তাগফিরুল্লাহ্ নাউজুবিল্লাহ্। আল্লাহ মাফ করো আমায়, এই মাতারী আমার রোজা খাইয়া ছাড়বে!
আহি ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তাকে কিনা আলুর চপের বাচ্চা বলছে! কথাটা ভাবতেই তার গা গুলিয়ে উঠছে। অথচ অয়ন নির্বিকার দৃষ্টিতে ফোন স্ক্রল করে যাচ্ছে। এমন ভাব করছে যেন কিছুই ঘটেনি। তার এই নির্লিপ্ত আচরণে আহি আরও ক্ষেপে গেল। হঠাৎ করেই সে চিৎকার করে উঠল,
"কিহহহ? আপনি আমাকে আলুর চপের বাচ্চা বললেন, অয়ন ভাই?
সঙ্গে সঙ্গে অয়ন মাথা তুলে আহির দিকে তাকাল। আহির মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে ভীষণ রেগে আছে। কিন্তু অয়নও দমে থাকার পাত্র নয়। সে আহি’র চোখে চোখ রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
“মাননীয় দূর সম্পর্কের চাচাতো বউ, আপনি এই রোজার মাসে আমার থেকে একটু দূরে দূরে থাকবেন। আপনি যেভাবে ঘেঁষাঘেঁষি করছেন, তাতে আমার রোজা আর রোজা থাকবে না!
কথাটা বলে অয়ন ভ্রু উঁচু করে তাকিয়ে রইল। আর আহি? সে কয়েক সেকেন্ড বোকার মতো তাকিয়ে রইলো।
তারপর হুট করে অয়নে’র হাতে কামড় বসিয়ে দেয় আহি। অয়ন তাজ্জব বনে যায়, মেয়েটা দিন দিন বড় হচ্ছে নাকি ছোট হচ্ছে সেটাই বুঝতে পারছে না। তার করা ব্যবহারে বোঝায় যায় না সে বিবাহিত। অয়ন অনেক কষ্টে নিজেকে আহির কবল থেকে ছাড়িয়ে নেয়।
এমনিতে মেয়েটার শরীরে শক্তির শ ও বলতে নেই অথচ রেগে গেলে দুনিয়া অন্ধকার। এমন বিচ্ছু মেয়ে পৃথিবীতে আর দু'টো আছে কিনা জানা নেই তার। মূহুর্তেই অয়ন চোখ রাঙিয়ে বলে ফেলল,
“ওই শরবতের বাচ্চা, এই রমজান মাসেও কামড়াকামড়ি করছিস? তোর ভা'তা'** ওহ্ নো। এই আঙ্গুর ফলের সাথে থাকলে আমি নিজের মুখ ঠিক রাখতে পারি না। এই আলুর চপের বাচ্চা তুই সর তো সর, রাত না পর্যন্ত আমার ধারে কাছেও আসবি না। যদি আসিস তাহলে তোকে তক্তা বানিয়ে ফেলবো।
অয়নে’র শুনে কিছু সময় নীরব থাকে আহি। শুধু কাছাকাছি বসেছে বলে এমন ভাবে তাকে বলা হচ্ছে। না আর সহ্য করা যাচ্ছে না। হঠাৎ করে আহি ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদতে থাকে,
"প্রথমে আলুর চপের বাচ্চা তারপর শরবতের বাচ্চা এখন আবার আঙ্গুর ফল। অয়ন ভাই এই আপনি আমায় ভালোবাসেন? একটা কামড় না হয় দিয়েই ফেলেছি তাই বলে এভাবে বকা দেবেন। আর আমি আপনার চাচাতো বউ হই তাই না? ওকে ফাইন, আজ থেকে আমি আপনার চাচাতো বউ হয়েই থাকবো। যখন আপনি আমার কাছে আসবেন না তখন দেখাবো চাচাতো বউ কাকে বলে হু!
এই বলে আহি গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মুখে তার তীব্র রাগ জমে আছে। অয়ন সেসব পাত্তা দিল না, আপাতত রেগে থাক ইফতার করার পর তার সমস্ত রাগ, অভিমান ভাঙিয়ে দেবে। এখন তার অভিমান ভাঙাতে গিয়ে আরো বিপাকে পড়বে।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আহি সোজা ছাদের দিকে চলে গেল। ছাদে আগে থেকেই মানি, মুন, আদিল আর সাজ্জাদ বসে ছিল। মুন আর সাজ্জাদ ছাদের একপাশে বসে নিজেদের মতো ফোনে কথা বলছিল। আর অন্যদিকে মুখোমুখি বসে আছে আদিল আর মাহি। আদিল একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহি’র দিকে। দৃষ্টি যেন সরছেই না। এতে মাহি’র ভীষণ অস্বস্তি লাগছে, কিন্তু কিছু করারও নেই।
সে একটু নড়াচড়া করলেই আদিল ধমক দিয়ে আবার বসিয়ে দেয়।
কিছুক্ষণ এভাবে কাটার পর মাহি’র ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
- আদিল ভাইয়া, কিছু তো বলেন! এভাবে কেউ কি বসে থাকতে পারে?
আদিল নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
“কেউ না পারলেও আমি পারি। আচ্ছা তোর এত প্রব্লেম হচ্ছে কেন? হোয়াই? ভালোবাসি ভালোবাসি বলে তো আমার মাথা খেয়ে ফেলেছিলি। আর এখন আমি একটু ভালোবাসা দেখাতে গেলেই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিস? এই অল্পতেই কে অতিষ্ঠ হয় শুনি?
মাহি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
- গরুর মতো তাকিয়ে থাকাকে আপনার কাছে ভালোবাসা মনে হচ্ছে? এর চেয়ে ভালো হতো গন্ডারের সাথে বসে থাকতাম। অন্তত সে ঘেউ ঘেউ তো করত!
আদিল হঠাৎ ফিক করে হেসে উঠল। মাহি চোখ রাঙিয়ে বলল,
- দেখেন আদিল ভাইয়া, আপনি কিন্তু...
মাহি কথা শেষ করার আগেই আদিল হাসি চেপে বলল,
“সরি কুইন! এটা রমজান মাস, তাছাড়া এখনো তো আমাদের বিয়ে হয়নি। আর আমি লুচু না যে বিয়ের আগেই তোকে দেখবো হুঁ!
- এবার কিন্তু ছাদ থেকে ফেলে দেবো! আপনাকে রাক্ষসের মতো হাসতে বলছে কে? মুখ বন্ধ রাখতে পারেন না?
“হ্যাঁ, এখন সব দোষ আদিলে’র! আমি কথা বললে তোর সমস্যা, না বললেও সমস্যা। তোর যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে মনে হচ্ছে আমাকে চান্দের দেশে চলে যেতে হবে।
- যান না, আপনাকে কে আটকেছে? আপনার জন্য চান্দের দেশই ঠিক আছে।
আদিল দুষ্টু হেসে বলল,
“যাবোই তো, তবে তার আগে বিয়ে করে বউয়ের সাথে বা'স'র সেরে নেই। তারপর বউ'কে নিয়ে চান্দের দেশে হানিমুন করতে যাবো। আইডিয়াটা খারাপ না, কী বলিস?
- চুপ করেন, শাশুড়ির পুত! এবার কিন্তু সত্যি সত্যি বোম মেরে আপনার মুখ উড়িয়ে দেবো। আগে কত শান্তিতে ছিলাম,যেখানে ইচ্ছে যেতাম। আর এখন এই খাটাশকে ছাড়া কোথাও যাওয়া যায় না। গণ্ডারকে ভালোবেসেই ভুল করেছি, হু!
আদিল ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছিল। মাহি’র রাগ দেখলে তার অদ্ভুত ভালো লাগে। আর দূরে বসে মুন আর সাজ্জাদ মাঝেমধ্যে তাকিয়ে হাসছিল। আদিল ধীরে ধীরে একটু মাহি’র দিকে ঝুঁকে এল। তারপর নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“এখনো তো আসল ভালোবাসা শুরুই করতে পারলাম না, তার আগেই তোর মনে হচ্ছে আমাকে ভালোবাসা তোর ভুল হয়েছে?
মাহি চোখ কটমট করে তাকাল। আর সহ্য করা যাচ্ছে না মানুষটাকে। আগে তবুও মুখে একটু লাগাম ছিল তবে এখন সেসবের ধারে কাছেও নেই। হুট করে মাহি বাজ খাই মেজাজ বলে উঠলো,
- রোজা রেখেও নষ্ট পুরুষদের মতো কথা বলতে লজ্জা করে না আপনার?
আদিল ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“আগে করত, কিন্তু এখন আর করে না। তোর ওই লাগামহীন ভাই নিজের সঙ্গে আমার লজ্জাটাও নদীতে ফেলে দিয়েছে।
মাহি কিছু বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই হঠাৎ পেছন থেকে কেউ এসে তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। আচমকা স্পর্শে মাহি ভয়ে চমকে উঠল। বুক ধড়ফড় করতে লাগল। কিন্তু পরক্ষণেই ঘুরে দেখে, আহি। সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে উঠল সে।
- বেয়াদব মহিলা! এভাবে কেউ ভয় দেখায়? আর একটু হলেই কিন্তু স্ট্রোক করতাম।
আহি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
"আগেই স্ট্রোক করবি কীভাবে? তার আগে তো আমার ভাইয়ার মাথা খেয়ে নে।
কথাটা শুনে মাহি’র ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল।
- কী বললি?
আহি চোখ বড় বড় করে একেবারে নিরীহ স্বরে আওড়াল,
"কোথায়? কখন? কিভাবে? সত্যি বলছি, পিয়ারের ভাবি, আমি কিন্তু কিছুই বলিনি।
আদিল পাশেই বসে সব শুনছিল। আহি’র কথা শুনে সে হেসে ফেলল।
মাহি এবার দুই ভাইবোনের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন সুযোগ পেলেই দুজনকেই ছাদ থেকে ফেলে দেবে।
হুট করে আহি মাহি’র হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। সঙ্গে মুন’কেও টেনে নিচ্ছে সে। আদিল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আহি আসলে কী করছে সেটাই সে বুঝতে পারছে না। আদিল অবাক হয়ে বলল,
“এই বনু! তুই আমার ফিউচার বউ’টাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস? একটু কি শান্তিতে ভাইয়াকে পিরিতও করতে দিবি না?
আহি পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে কর্কশ গলায় বলল,
"অয়ন ভাই আমাকে অনেক বকা দিয়েছে। বলেছে আমি নাকি তার রোজা হালকা করে দিচ্ছি। তাই ভাবলাম তোমার রোজা যেন হালকা না হয়, সেই জন্যই আমার পিয়ারের ভাবিকে নিয়ে যাচ্ছি।
"আরে বনু, আমি আর আদিল এক নয়। ওই খাম্বার জন্য আমার পিরিতে বেঘড়া দিচ্ছিস কেন? আমার বউ'টাকে আমার কাছে দিয়ে যা না বনু, প্লিজ আমার কথাটা শুনে তো যা!
আহি ভ্রু কুঁচকে বলল,
"অয়ন ভাইকে গিয়ে শোনাও। ওই খাটাশ লোককে রাতে দেখে নেবো হু!
কে শোনে কার কথা! আদিলে’র নিষেধ সত্ত্বেও আহি নিজের মতো করে চলে গেল। সে মাহি আর মুন’কে টেনে নিয়ে সোজা সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর তিনজন এসে পৌঁছাল তাদের বাড়ির বাগানে। সেখানে এসে আহি দুজনের হাত ছেড়ে দিল।
হঠাৎ মুন চিৎকার করে উঠল,
- বড়ইইই!
মুন’কে আর পায় কে! সে দৌড়ে গিয়ে বড়ই গাছের নিচে দাঁড়াল। গাছের নিচে পড়ে থাকা একটা টসটসে বড়ই তুলে নিয়ে মুখে দিতে যাবে ঠিক তখনই আহি ঝট করে তার হাত ধরে ফেলল।
কর্কশ গলায় বলল,
"এই ছেমরি থাম! আমাকে তো সারাদিন রাক্ষসী বলিস, আমি নাকি শুধু খাই খাই করি। তাহলে তুই এখন কোন আক্কেলে বড়ই খেতে যাচ্ছিস? তুই যে রোজা আছিস ভুলে গেছিস নাকি?
মুন মেকি হাসি দিয়ে বলল,
- সরি সরি! আমি তো একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু তুই হঠাৎ আমাদের এখানে নিয়ে এলি কেন?
আহি চোখ টিপে বলল,
"গাছে উঠে বড়ই পাড়বো!
সঙ্গে সঙ্গে মুন আর মাহি একসাথে চিৎকার করে উঠল,
- কীইই!