আহি চোখ টিপে বলল,
"গাছে উঠে বড়ই পাড়বো!
সঙ্গে সঙ্গে মুন আর মাহি একসাথে চিৎকার করে উঠল,
- কীইই?
আহি বিরক্তিকর চাহুনিতে আওরায়,
"এই ছেমড়ি, তোরা চিৎকার করছিস কেন? সারাদিন এভাবে বসে থেকে আমার ভীষণ বিরক্ত লাগছে। এখন আমি বড়ই পাড়বো, তারপর ইফতারের সময় সেগুলো খাবো। তোরা তো জানিস, মিষ্টি আর টক জিনিস আমার কত ফেভারিট! আমার তো এখনই জিভে পানি চলে এসেছে।
কথাটা বলেই হঠাৎ আহি নিজের মুখ দু’হাতে চেপে ধরল। চোখ বড় বড় করে মাহি’র দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"পিয়ারের ভাবি...আমার রোজা কি এবার থাকবে? আমি কিন্তু ইচ্ছে করে জিভে পানি আনিনি, নিজে নিজেই চলে এসেছে! এখন আমি কী করবো?
মাহি আর মুন দুজনেই ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু আহি তাদের কোনো কথাই শুনল না। এক লাফে বড়ই গাছের ডালে উঠে পড়ল। মুহূর্তেই মুন চিৎকার করে উঠল,
-ওই আহি'র বাচ্চা, গাছ থেকে নাম! তোর কিছু হলে ভাইয়া আমাদের সোজা উপরে পাঠিয়ে দেবে!
মাহি দৌড়ে গিয়ে আহি’র পা ধরে টান দিল, যাতে সে আর উপরে উঠতে না পারে। কিন্তু আহি তো নাছোড়বান্দা। সে মাহি’র হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে আরও উঁচু ডালে উঠে বসে পড়ল। মাহি আর মুন ভয়ে কুঁকড়ে গেল। বারবার চারদিকে তাকাচ্ছে, অয়ন যদি হঠাৎ এসে পড়ে! ভয়ে তাদের হাত-পা কাঁপছে। আর এদিকে আহি দাঁত বের করে দিব্যি হাসছে। মাহি ভীত গলায় বলল,
- আমাদের লক্ষ্মী বোন, প্লিজ নেমে আয়। গাছ থেকে পড়ে গেলে একটা হাড়ও ঠিক থাকবে না।
আহি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"চুপ কর তোরা। আমি বড়ই ছুঁড়ে দিচ্ছি তোরা ধর।
বলেই আহি গাছের ডাল শক্ত করে ধরে ধীরে ধীরে ঝাঁকি দিতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে টুপটাপ করে বড়ই মাটিতে পড়তে শুরু করল। মুন দৌড়ে গিয়ে সেগুলো কুড়াতে লাগল। আহি আবারও ডাল ঝাঁকাতে যাবে, ঠিক তখনই তার পা হঠাৎ পিছলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সে ডাল থেকে নিচে পড়ে যেতে লাগল। মাহি আতঙ্কে জমে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ কোথা থেকে অয়ন এসে তাকে দু’হাতে আগলে নিল তাকে। ভয়ে আহি চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলেছিল। মনে হচ্ছিল সে যেন শূন্যে ভাসছে। কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকাতেই সামনে কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে দেখে তার গলা শুকিয়ে এলো।
অয়ন রক্তিম দৃষ্টি নিক্ষেপ তার দিকে তাকিয়ে আছে। অন্যদিকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে মাহি আর মুন এক দৌড়ে বাড়ির দিকে পালাল। আহি তাদের চলে যেতে দেখে হতবাক হয়ে গেল। এমন বিপদের সময় তাকে একা রেখে পালাচ্ছে! সে চিৎকার করে উঠল,
"এই পেত্নীরা! তোরা আমাকে একা রাক্ষসের মুখে ফেলে দিয়ে পালালি? আমাকে নিয়েও তো যা!
কিন্তু তাদের কারও ফিরে তাকানোর ফুরসত নেই। অয়ন কিছু না বলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার বড় বড় পদক্ষেপে বোঝাই যাচ্ছে সে ভীষণ রেগে আছে। আহি ভয়ে চুপ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে অয়নে’র শার্ট আঁকড়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর অয়ন তাকে কোলে নিয়েই রুমে ঢুকল।
তারপর বিছানার উপর ধপ করে ফেলে দিল। আহি ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে বলল,
"ও আল্লাহ গো! এই রমজান মাসেও খাটাশ আমার উপর টর্চার করছে! আপনার কপালে কোনোদিন বউ জুটবে না দেখে নিয়েন। আপনার বউ হবে একটা চুন্নি, পেত্নী, রাক্ষসী, শয়তানের নানী। আপনাকে ফেলে আরেক বেডার সাথে পালিয়ে যাবে! আমি রোজাদার মানুষ হয়ে আপনাকে অভিশাপ দিলাম!
অয়ন তখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু আহি'র কথা শুনে শব্দ করে হাসতে থাকে। আহি অয়নে’র মুখের হাসির দিকে হ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইল। সে এখনো বুঝতে পারছে না মানুষটা হঠাৎ করে কেন হাসছে। অয়ন ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকে এল।
তারপর কানের কাছে ঠোঁট এনে ফিসফিস করে বলল,
“তুই ঠিকই বলেছিস, দোয়েল পাখি। আমার কপালে কোনোদিন বউ জুটবে না। অথচ দেখ আমার কপালে তো ওয়াইফ জুটে বাসরও হয়ে গেছে। আমার বউ চুন্নি, পেত্নী, রাক্ষসী এমনকি শয়তানের নানীও। কিন্তু সে আমার কাছ থেকে পালাতে পারবে না। কারণ অয়ন তাকে পালাতেই দেবে না। নিজের ভালোবাসার চাদরে বেঁধে রাখবে সারাজীবন!
নিজের কথার মানে বুঝতেই আহি ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে কি থেকে কি বলে ফেলেছে, নিজেই বুঝতে পারছে না। নিজের অজান্তেই তো নিজেকেই এত গালি দিয়ে দিল! হঠাৎ অয়নে’র কণ্ঠ গম্ভীর হয়ে উঠল।
“গাছে উঠেছিলি কেন?
আহি শুকনো ঢোক গিলল। তারপর মিনমিন করে বলল,
"এ এ এ এমনি অয়ন ভাই।
অয়নের চোখ মুহূর্তেই সরু হয়ে গেল।
“গাছে উঠেছিলি কেন?
"ও ও ওই বড়ই পাড়তে।
“আমি তোর কি লাগি?
প্রশ্নটা শুনে আহি পুরো বেকুব বনে গেল। সে কিসের মধ্যে কি বলবে ভেবেই পাচ্ছে না। অয়ন চোখ রাঙিয়ে আবার বলল,
“কি হলো? বল।
আহি ঠোঁট কামড়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
"স্বামী নামক জল্লাদ!
কথাটা শেষ হতে না হতেই অয়ন আচমকা তার দুই গাল চেপে ধরল।
“তাহলে আমাকে না বলে তুই একা একা গাছে উঠলি কেন? হা কর! দেখি তোর জিহ্বা কত বড় হয়েছে যার জন্য এই ভর দুপুরে গাছে উঠার সাহস হলো!
আহি ব্যথায় মুখ কুঁচকে বলল,
"অয়ন ভাই গাল ব্যথা করছে। ছেড়ে দিন না প্লিজ। আর কোনোদিন আপনাকে না বলে কোথাও যাবো না, এমনকি গাছেও না।
“রোজই তো বলিস। মনে থাকে কয়দিন?
হঠাৎ করেই আহি অয়ন’কে ধাক্কা দিল।
অয়ন বিছানায় পড়ে গেল। কিন্তু আহি বিছানা থেকে নামার আগেই—অয়ন বিদ্যুৎগতিতে তার হাত ধরে টেনে আবার বিছানার উপর ফেলে দিল।।আহি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কী হচ্ছে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
অয়ন ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকে এল। দুজনের দূরত্ব এখন প্রায় নেই বললেই চলে। তারপর নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“আমার সাথে লাগতে আসিস? তুই কি ভুলে যাচ্ছিস, তোর মতো দশটা মেয়েকে সামলানোর ক্ষমতা রাখে তোর অয়ন ভাই! আর সেখানে তুই একা হয়ে এত পাকনামি করছিস?
কথা বলতে বলতেই অয়ন আহি’র দুই হাত শক্ত করে বিছানার উপর চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু ঝিলিক, আর আহি’র বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে। অয়ন আরো ঝুঁকে তার মুখের কাছে আসতেই আহি তাড়াতাড়ি ফিসফিস করে বলল
"অয়ন ভাই, আপনার রোজা কিন্তু হবে না।
অয়ন মুচকি হেসে বলল,
“সেই জন্যই তো এখনো ঠিক মতো কথা বলতে পারছিস। নয়তো এতক্ষণে তোকে আমিতে আসক্ত করে ফেলতাম!
কথাটা শুনে আহি’র গাল লাল হয়ে উঠল। ঠিক তখনই হঠাৎ অয়নে’র ফোন বেজে উঠল। অয়ন বিরক্ত মুখে আহি’কে ছেড়ে দিল। তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল। অয়ন চলে যেতেই আহি গভীর একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। মনে হচ্ছিল এতক্ষণ যেন সে শ্বাসই নিতে পারছিল না। সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ির দিকে তাকাল।
ইফতারের এখনো বেশ কয়েক ঘণ্টা বাকি। আহি ধীরে ধীরে হাতে একটি বই নিয়ে বেলকনির দিকে হাঁটা দেয় এবং রকিং চেয়ারে বসে পড়লো। কারণ এখন যদি সে আর কোনো বাঁদরামি করে তাহলে অয়ন তাকে সত্যি সত্যিই ছাদ থেকে ফেলে দেবে। কিন্তু ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল। লোকটা যে অনেক ভালোবাসে তাকে। আহি এসব ভবনা ছেড়ে হুমায়ুন আহমেদ স্যারের ❝বৃষ্টি বিলাশ❞ বইটি পড়তে শুরু করে। বইটি ভিষণ প্রিয় তার, এভাবেই ডুবে যায় বইয়ের ভেতর!
_
_
ইফতার শেষ করেই আহি বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। যে লোকটা দিনে তার থেকে দূরে দূরে থেকেছে সে এখন পিছু পিছু ঘুরতেছে। আহি যেখানেই যাচ্ছিল অয়ন তার পিছু নিচ্ছিলো। আহি চোখ রাঙিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেও কোনো উওর দেয়নি, শুধু রুমে আসতে বলেছে। হুট করে অয়ন বিদুৎ গতিতে এসে আহি'কে ঝাপটে ধরলো নিজের বুকে।
সারাদিন মেয়েটার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলছে কিন্তু এখন আর পারবে না। আহি চোখ পাকিয়ে তাকায় এবং কর্কশ কন্ঠে আওরায়,
"সরেন এখান থেকে, দিনে একটু পাশে বসেছিলাম বলে কত কথা বললেন। এখন আবার নির্লজ্জের মতো আমার সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করছেন কেন?
অয়ন ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিসিয়ে আওরাল,
“দিনে চাচাতো বউ ছিলি তাই একটু কথা শুনিয়েছি। আর রাতে তুই আমার আপন বউ তাই শুধু ঘেঁষাঘেঁষি নয়, ফরজ কাজ টাও করতে পারি!
আহি চোখ বড় বড় করে অয়নে’র দিকে তাকিয়ে রইল। রমজান মাস, তবুও মানুষটার মুখ দিয়ে ভালো কথা বের হয় না। আহি দাঁত চেপে বলল,
"দেখেন অয়ন ভাই আ...
বাকি কথাটা শেষ করার আগেই অয়ন ফিসফিসিয়ে বলে উঠল—
“দেখতেই তো চাচ্ছি, কিন্তু তুই তো শুনছিস না।
আহি রাগান্বিত হয়ে বালিশ তুলে অয়নে’র পিঠে আঘাত করতে থাকে। মুহূর্তেই অয়ন দুষ্টু হেসে আহি’র কোমড় চেপে ধরে। এবং খুব নিচু স্বরে আওরায়,
“সাতবেলা খেয়েই আমার সঙ্গে পারতিস না, এখন রোজা রেখে তো ক্লান্ত হয়ে গেছিস। তাহলে এখন কীভাবে পারবি হুম হুম?
তার কথার মাঝেই আহি হাই তুলতে তুলতে বলে উঠে,
"আমি ঘুমাবো!
তার কথার প্রতিধ্বনি শুনে অয়ন কপাল কুঁচকে তাকালো।
“এমন আনরোমান্টিক কেন তুই? তুই জানিস না, বরকে বেশি বেশি ভালোবাসতে হয়।
"আমার জানার দরকার নেই। আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি ঘুমাবো। আপনার ইচ্ছে হলে ঘুমিয়ে পড়ুন নয়তো জেগে থাকুন।
“তার আগে আমাকে একটু চার্জ দিয়ে নে, পাখি!
"আব্বা...
সঙ্গে সঙ্গে অয়ন তার মুখ চেপে ধরে।
“এখন আবার বা*লের শ্বশুরকে ডাকছিস কেন? আমি তো এমনিতেই ঘুমিয়ে যাচ্ছিলাম। এতো রাত পর্যন্ত জেগে থাকা ভো নয়।
সে আর কথা বড়ালো না। আহি'কে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জরিয়ে ধরে ঘুমের দেশে তলিয়ে যায়।