নেশাময় আসক্তি

পর্ব - ৪৯

🟢

আদিল বিছানায় বসে আছে। কানে হেডফোন গুঁজে ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে।ওদিকে মাহি পা টিপে টিপে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। সে এতটাই চুপচাপ এসেছে, নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটাও যেন চাপা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু হঠাৎই আদিল না তাকিয়েই বলে উঠল,

"কুইন এখানে আয় তো!

মাহি থমকে গেল। চোখ বড় বড়, সে তো কোনো শব্দই করেনি। তাহলে বুঝলো কিভাবে? গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল সে। আদিলের সামনে দাঁড়াতেই হঠাৎ একটা টানে তাকে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। মাহি প্রথমে একটু ভয় পেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। আদিল হেডফোন খুলে তার দিকে তাকালো। মাহি এখনো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আদিল ভ্রু কুঁচকে বলল,

"কি প্রব্লেম? এমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছিস কেন?

মাহি ধীরে বলল,

- আপনি কিভাবে বুঝলেন আমি এসেছি? আমি তো কোনো শব্দই করিনি।

আদিল মুচকি হাসল। তার দিকে ধীরে ধীরে ঝুঁকে কপালে একটা নরম চুমু দিল। তারপর নিচু স্বরে বলল,

"ভালোবাসা বুঝিস?

- বুঝবো না কেন?

"তাহলে বল তো ভালোবাসা বেশি প্রখর? নাকি আসক্তি?

মাহি থেমে গেল। চোখ নামিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল কিন্তু উত্তর খুঁজে পেল না। তবুও আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল,

- ভালোবাসা তাই না?

আদিল হালকা হাসল। ধীরে ধীরে তার নাকের সাথে নিজের নাক ছুঁইয়ে ফিসফিস করে উঠে,

"ওহু! আসক্তি বেশি প্রখর, ভালোবাসা অনেক সময় ক্ষণিকের হয়। যেমন ছোট বাচ্চা, ছোট থাকতে সে মা ছাড়া কিছু বুঝে না মা-ই তার পৃথিবী। কিন্তু সময় বদলায়, একদিন সেই সন্তানই মাকে বোঝা মনে করে। কিন্তু আসক্তি, ওটা ভিন্ন। একজন মানুষ নেশায় আসক্ত হলে সে জানে এটা তাকে শেষ করে দেবে,তবুও ছাড়তে পারে না। তুই আমার জন্য ঠিক তেমন। #নেশাময়_আসক্তি তুই আমার! এই আসক্তি থেকে চাইলেও আমি আর বের হতে পারবো না। তাই তোর শব্দ না পেয়েও তোকে অনুভব করতে পারি তুই কোথায় আছিস।

মাহি’র বুকের ভেতর কেমন যেন ধুকপুক করছে। এই কথাগুলো ভালোবাসার থেকেও ভয়ংকরও। কারণ ভালোবাসা মানুষকে বাঁচায়, কিন্তু আসক্তি, মানুষকে নিজের ভেতরেই বন্দী করে ফেলে। কিন্তু মাহি থেমে রয় না বরং উল্টো চোখ-মুখ কুঁচকে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

- আমি এগুলো শুনতে চাই না।

আদিল ভ্রু কুঁচকে তাকাল, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।

"তাহলে কি শুনবেন ম্যাডাম?

মাহি এবার গম্ভীর মুখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,

- বিয়ের আগে কখনো বলেননি আমাকে ভালোবাসেন এমনকি বিয়ের পরেও না। আজ বলবেন। সরাসরি বলবেন, মাহ আমি তোকে অনেক অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি!

আদিল কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল,

"মুখে বললেই কি ভালোবাসা হয়ে যায়?

মুহূর্তেই মাহি অভিমানে আদিলে’র গলা জড়িয়ে ধরল।

- এত কথা শুনতে চাই না! আপনি বলবেন মানে বলবেন।

"কুইন!

- আপনি ভালোবাসি বলেন না প্লিজ? ভাইয়া সব সময় আহি'কে ভালোবাসি বলে আর আপনি আমাকে একটুও বলেন না। আজকে একটু বলেন না। আপনার মুখ থেকে ভালোবাসি শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে প্লিজ প্লিজ প্লিজ।

আদিল একটু থামল। তারপর ধীরে ধীরে ঝুঁকে এলো তার দিকে। মাহি’র কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের সাথে আরও কাছে টেনে নিল। তার কণ্ঠ গভীর হয়ে উঠলো,

"ভালোবাসি কুইন! তোকে অনেক অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি। চাঁদ-সূর্য যেমন সত্য, তোর প্রতি আমার ভালোবাসাটাও তেমন সত্য। তুই আমার মনের রানি, আমার মাহি কুইন। আমার হৃদয়ের রাজরানি, অসম্ভব ভালোবাসি তোকে মাই কুইন!

কথাগুলো শুনে মাহি’র চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়লো। সে খিলখিল করে হেসে উঠলো। সেই হাসির দিকে তাকিয়ে আদিল কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেল, যেন সময় থমকে গেছে। হঠাৎ করেই সে ঝুঁকে পড়ে মাহি’র ঠোঁটে আলতো করে কয়েকটা চুমু এঁকে দিল। মাহি লজ্জায় লাল হয়ে গেল, মুখ লুকিয়ে ফেলল আদিলে’র বুকে।

কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল। তারপর মাহি ধীরে ধীরে মাথা তুলে নরম স্বরে বলল,

- আদিল ভাইয়া..

"হুম?

- একটা গুড নিউজ আছে।

আদিল চমকে উঠলো। চোখ বড় বড় করে তাকাল,

"এত তাড়াতাড়ি?

মাহি মুচকি হাসলো। চোখে দুষ্টুমি নিয়ে বলল,

- হুম, জানেন কি গুড নিউজ?

"তুই না বললে আমি জানবো কিভাবে?

- আমি নিজেও তো আজকেই জানলাম।

"তাহলে বল শুনি।

মাহি একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,

- আপনি মামা+চাচ্চু হতে যাচ্ছেন আর আমি ফুপি+মামি!

"হোয়াট? আমি তো ভাবছিলাম আমি বাবা হতে যাচ্ছি!

সাথে সাথে মাহি তার বুকে কিল বসিয়ে দিল।

- অসভ্য লোক।

আদিল হেসে তাকে আবার জড়িয়ে ধরল।

"আরে মজা করছিলাম জান! তুই এখনো এতোটাও বড় হয়ে যাসনি যে আরেক জনকে সামলাতে পারবি। আগে আমাকে সামলাতে শেখ, তারপর এসব নিয়ে চিন্তা করবো।

মাহি গাল ফুলিয়ে বলল,

- এত পরে?

"তোর এখনই চাই?

-হুম

আদিল মাথা নেড়ে হেসে বলল,

"হুম বললেই হবে না কুইন! তোর আরেকটু টাইম লাগবে। তারপর তোর সব ইচ্ছে পূরণ করবো, কথা দিলাম।

- আমি তো বড় হয়েছি। তাছাড়া আহি আর আমি তো সেম সেম বয়সের। ও যদি আম্মু হতে পারে, তাহলে আমি কেন পারবো না?

আদিল এবার তার মুখ নিজের দিকে ঘুরিয়ে গভীরভাবে তাকাল।

"আমি কি বলেছি তুই পারবি না? পারবি, অবশ্যই পারবি। কিন্তু একটু সময় পরে। আহি হয়তো তোর মতোই, কিন্তু ও অয়ন’কে সামলাতে পারে।

মাহি গাল ফুলিয়ে বলে,

- আমি আপনাকে সামলাতে পারি না?

আদিল মুচকি হেসে মাথা নাড়ল,

"আমি সেটা বলিনি কুইন, তবে তোর আরেকটু টাইম লাগবে। আমার দেওয়া সমস্ত যন্ত্রনা গুলো যেদিন পুরোপুরি সহ্য করতে পারবি তারপর আমরা এসব নিয়ে ভাববো। তাছাড়া একসাথে দুটো বেবি এলে সবাই কাকে রেখে কাকে দেখবে বল তো? আগে বনুর হোক, তার কিছুদিন পরে আমরা নেবো পাক্কা প্রমিজ।

মাহি’র চোখ ঝলমল করে উঠলো,

- সত্যি তো?

আদিল আলতো করে তার কপালে চুমু দিয়ে বলল,

"হুম, একদম সত্যি!

মাহি হঠাৎ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

- আচ্ছা, আপনি তাহলে বসুন আমি আসছি।

কথা শেষ করতেই আদিল তড়িঘড়ি করে তার হাতটা আঁকড়ে ধরল।

"কোথায় যাচ্ছিস?

- ননদীনি’র কাছে।

আদিল ভ্রু কুঁচকে বলল,

"এই রাতের বেলায় যেতে হবে নাকি? আপাতত আমাকে একটু টাইম দে, কালকে গিয়ে যত খুশি গল্প করিস বনুর সাথে।

মাহি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

- সরুন তো! আমি আহি’র কাছে গিয়ে জানবো মা হওয়ার অনুভূতি কেমন, পেটে বেবি থাকলে কেমন লাগে, বেবিটাকে অনুভব করা যায়!

তার চোখে তখন কৌতূহল, আনন্দ আর এক অদ্ভুত মায়া মিশে ছিল। আদিল কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর নরম স্বরে বলল,

"যেতেই হবে?

- হুম!

আদিল আর বাধা দিল না। মনের ভেতর হালকা হাসি ফুটে উঠলো। মেয়েটা কত ছোট ছোট জিনিসে খুশি হয়ে যায়! তার প্রতিটা কথা, প্রতিটা অনুভূতি কত মন দিয়ে শোনে, এই জিনিসটাই আদিলে’র সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। মাহি দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু কয়েক কদম যেতেই আবার থেমে গেল। যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়েছে। সে দ্রুত ঘুরে আবার আদিলে’র কাছে ফিরে এলো।

- শুনেন!

"বল কুইন?

মাহি একটু কাছে এসে গলা নিচু করে বলল,

- আপনি যে মামা হবেন এটা কিন্তু ভাইয়াকে বলবেন না, কেমন?

আদিল অবাক হয়ে ভ্রু তুলল,

"বাট হোয়াই?

বিজ্ঞাপন

মাহি চারপাশে তাকিয়ে আরও নিচু স্বরে বলল,

- আহি কনসিভ করেছে এটা আমি, আপনি আর মুন ছাড়া কেউ জানে না। আহি ভাইয়াকে সারপ্রাইজ দিতে চায়। সো আপনি মুখ বন্ধ রাখবেন। মনে থাকবে তো?

আদিল মুচকি হেসে মাথা নেড়ে বলল,

"ওক্কে মহারানি! আপনি আদেশ করবেন আর আমি শুনবো না, এটা কি কখনো হয়?

মাহি’র মুখে সঙ্গে সঙ্গে একগাল হাসি ফুটে উঠলো। তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। আদিল কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। এবং এই দৃশ্য দেখে তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি খেলে যায়।

অয়ন ক্লান্ত শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে আসছিল। আজ তার বাসায় ফেরার কথা ছিল অনেক আগেই, কিন্তু আশ্রমে যাওয়ার কারণে বেশ দেরি হয়ে গেছে। তার জানা মতে তার দোয়েল পাখি নিশ্চয়ই এখন গভীর ঘুমে বিভোর। সে আস্তে করে দরজা খুলে গুটি গুটি পায়ে রুমে ঢুকল। ভেতরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালো। রুমটা অন্ধকার। অয়ন ভ্রু কুঁচকে লাইট অন করল। আলো জ্বালতেই চারপাশে চোখ বুলালো, কিন্তু কোথাও আহি নেই। তার বুকটা ধক করে উঠল। সে দ্রুত বিছানার পাশে গেল, তারপর বাথরুম, বেলকনি পুরো রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফেলল। কিন্তু আহি নেই।

হঠাৎ তার চোখ পড়ে বিছানার উপর রাখা একটা ছোট্ট চিরকুটে। অয়ন সেটা তুলে নিল। কাগজটা খুলতেই ছোট্ট করে লেখা,

"অয়ন ভাই, বিছানার উপর আপনার জন্য পাঞ্জাবি রেখে এসেছি। শাওয়ার নিয়ে ওই পাঞ্জাবিটা পরে তাড়াতাড়ি ছাদে চলে আসুন। আপনার জন্য আমি অপেক্ষা করছি!

চিঠিটা পড়তেই অয়নে’র ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। পরক্ষণেই তার চোখ চলে গেল দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের দিকে।

আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকী। এক মুহূর্তেই তার মুখের হাসিটা মিশে গেল হালকা অপরাধবোধে। সে ভুলে গেছে কিন্তু আবারই ভাবল—না, যদি সত্যিই আহি অভিমান করত, তাহলে কি এমন আদুরে চিরকুট লিখত? তার বুকটা নরম হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। তড়িঘড়ি করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।

মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল। বিছানার উপর রাখা সবুজ রঙের পাঞ্জাবিটা হাতে তুলে নিল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার পাখি সবকিছু কত যত্ন করে ভাবে। পাঞ্জাবিটা পরে নিয়ে সে ক্যাবিনেট খুলল। ভেতর থেকে একটা ছোট্ট বক্স বের করল। গত সপ্তাহেই কিনেছিল, আজকে যেহেতু স্পেশাল কিছু কেনা হয়নি তাই এটা আজকেই দেবে। মুখে হালকা হাসি নিয়ে বক্সটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ছাদের দরজার সামনে এসে থেমে গেল অয়ন। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। সে দু-তিনবার হালকা করে নক করতেই দরজাটা খুলে গেল। আর দরজা খুলতেই অয়ন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আহি, সবুজ শাড়িতে মোড়া, একদম তার স্বপ্নের মতো। চুলগুলো খোলা, হালকা সাজ, চোখে একরাশ ভালোবাসা আর সবচেয়ে বড় কথা— সে অয়নে’র জন্যও একই রঙের পাঞ্জাবি বেছে রেখেছে। মুহূর্তটা যেন থেমে গেল। অয়ন কিছু না ভেবেই তাকে টেনে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল। তার বুকের ভেতর যেন জমে থাকা সব ক্লান্তি, সব অপরাধবোধ গলে গেল এই এক আলিঙ্গনে। সে ভেবেছিল আহি হয়তো অভিমান করেছে কিন্তু এখানে তো অভিমানের ছায়াও নেই, আছে শুধু ভালোবাসা।

আহি হালকা ছটফট করে বলল,

"অয়ন ভাই, আমি অভিমান করিনি, প্লিজ সরি বলার দরকার নেই।

অয়ন তার কথা শুনে ফিক করে হেসে দিল। আহিও খিলখিল করে হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে অয়নে’র হৃদয় হালকা হলো। সে ধীরে ধীরে অয়নে’র চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে লাজ, ভালোবাসা আর একরাশ আদুরে আবদার মিশে ছিল। তারপর নরম কণ্ঠে বলল,

"অয়ন ভাই আমাকে কোলে নিয়ে দোলনায় গিয়ে বসুন না।

অয়ন একটুও দেরি করল না। আজকের রাতটা তার কাছে অন্যরকম, আজ সে তার অর্ধাঙ্গিনীর কোনো আবদারই ফিরিয়ে দেবে না। সে আলতো করে আহি’কে কোলে তুলে নিল। খুব যত্ন করে—খুব সাবধানে তার নিজের পৃথিবীটাকে বুকে তুলে নিয়েছে। তারপর দোলনার দিকে গিয়ে বসে পড়ল। দোলনাটা আস্তে আস্তে দুলতে শুরু করল।

চারপাশে হালকা ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, সেই বাতাস এসে দুজনের গায়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আকাশে তারার মেলা, আর নিচে দুটো ভালোবাসায় ডুবে থাকা মানুষ, মুহূর্তটা যেন গল্পের মতো। হঠাৎ অয়ন তার পকেট থেকে একটা ছোট্ট গিফট বক্স বের করল।

আহি’র দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, তারপর বলল—

“হ্যাপি অ্যানিভার্সারি, বউ! আজ আমাদের সুখের সংসারের এক বছর পূর্ণ হলো কিন্তু অনেক অনেক সরি। আমি সত্যিই ভুলে গিয়েছিলাম। তাই তেমন কিছু প্রস্তুতি নিতে পারিনি। এই সামান্য গিফটটা নে পাখি কাল তোকে তোর ইচ্ছেমতো শপিং করাবো, গড প্রমিজ!

আহির চোখ চকচক করে উঠল।

"আমার জন্য গিফট?

একটু শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস নিয়ে সে দ্রুত বক্সটা অয়নে’র হাত থেকে নিয়ে নিল। ধীরে ধীরে খুলল ভেতরে একটা সুন্দর গোল্ডের চেইন। আর তার সাথে ছোট্ট একটা লকেট। আহি কৌতূহল নিয়ে লকেটটা খুলতেই, সে থমকে গেল। ভেতরে তাদের দুজনের ছবি একসাথে, এক ফ্রেমে বাঁধা। মুহূর্তেই তার চোখ ভিজে উঠল খুশিতে। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঝট করে অয়ন’কে জড়িয়ে ধরল। তার গালে টুপটুপ করে কয়েকটা চুমু এঁকে দিল।

"অয়ন ভাই এটা অনেক সুন্দর!

তার কণ্ঠ কেঁপে যাচ্ছিল। অয়ন হালকা হেসে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল। এই ছোট্ট গিফটটাই যেন তাদের ভালোবাসার প্রতীক, যেখানে কোনো আড়ম্বর নেই, আছে শুধু একে অপরকে নিয়ে বাঁচার প্রতিশ্রুতি।

হঠাৎ আহি মিষ্টি কণ্ঠে বলে উঠল,

"অয়ন ভাই এটা পড়িয়ে দিন তো?

অয়ন একটুও দেরি করল না। খুব যত্ন করে চেইনটা তার গলায় পরিয়ে দিল। লকেটটা ঠিক করে বসিয়ে দিতে দিতে কিছুক্ষণ তাকিয়েই রইল, যেন নিজের ভালোবাসাটাকেই সাজিয়ে দিচ্ছে। আহি লাজুক হেসে দোলনা থেকে নেমে গেল। তারপর নির্দিষ্ট জায়গা থেকে একটা প্যাকেট এনে অয়নে’র হাতে ধরিয়ে দিল। অয়ন অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল,

“দোয়েল পাখি, এটা কি? তুই আমার জন্য গিফট এনেছিস? আমি তোকে স্পেশাল তেমন কিছুই দিতে পারলাম না। আর তুই...

আহি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

"আমি আপনাকে গিফট দিয়েছি, আপনি খুশি হননি?

“এই পঁচা মেয়ে, এমন কথা বলিস কেন? আমি অনেক খুশি হয়েছি।এবার আয়, আমার পাশে এসে বস।

আহি নড়ল না। বরং আরও একটু জেদি স্বরে বলল,

"আপনি আমার দেওয়া গিফটটা খুলেও দেখবেন না?

“বউয়ের থেকে দৃষ্টি সরাতে পারছি না গিফট কিভাবে খুলবো বল? গিফট পরে দেখবো, আগে আমার দোয়েল পাখিটাকে মন ভরে দেখি। আজ আমার পাখিটা শাড়ি পড়েছে, তাকে আজ অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

আহির গাল লাল হয়ে উঠল। তবুও জিদ ছাড়ল না,

"খুলুন না গিফটটা!

অয়ন একটু হাসল,

“আচ্ছা আচ্ছা, ওয়েট।

এক প্রকার বাধ্য হয়েই সে প্যাকেটটা খুলতে শুরু করল। ভেতরে একটা কাগজের খাম। সে খামটা খুলে কাগজটা বের করল আর মুহূর্তেই থেমে গেল। তার চোখ স্থির হয়ে গেল সেই রিপোর্টের উপর। একবার রিপোর্টের দিকে তাকায় তো আরেকবার আহি’র দিকে। তার বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠলো। কথা হারিয়ে ফেলল সে।পরক্ষণেই হঠাৎ অয়ন ঝট করে আহি’কে কোলে তুলে নিল!

তার কণ্ঠ কাঁপছে, চোখে অবিশ্বাস আর অগাধ আনন্দ, সে আহি’কে নিয়ে ঘুরতে শুরু করল চারদিকে।

“পাখি আমি বাবা হতে যাচ্ছি বাবা? সত্যি পাখি?

তার হাসি, তার চোখের পানি দুটোই একসাথে বের হয়ে আসছে। আহি লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলল তার বুকে,

"হুম!

অয়ন থামছেই না। বারবার তাকে জড়িয়ে ধরছে, কপালে, গালে, ঠোঁটে চুমু এঁকে দিচ্ছে। অয়ন যেন আনন্দে নিজেকে সামলাতে পারছে না। তার কণ্ঠ কাঁপছে, চোখে অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা।

“আই’ম সো হ্যাপি বউ আই’ম রিয়েলি সো হ্যাপি! তুই আমাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুটা দিয়েছিস। আমি বাবা হবো, বাবা! আমার ঘরে পূর্ণিমার চাঁদ আসবে।

তার কণ্ঠে ছিল অবিশ্বাস, আনন্দ আর একরাশ স্বপ্ন। আহি হালকা ভয় মিশ্রিত হাসিতে বলল,

"অয়ন ভাই, ছাড়ুন প্লিজ পড়ে যাবো তো।

অয়ন আরও শক্ত করে তাকে আগলে নিল,

“আমি থাকতে তোর কিছুই হবে না পাখি।

এরপর ধীরে ধীরে আহি’কে কোলে থেকে নামিয়ে দোলনায় বসাল। নিজে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর আলতো করে মাথা নামিয়ে আহি’র পেটে কান রাখল। ফিসফিস করে বলল,

“আমার চাঁদ তোর পেটে বউ, ও কি তোকে খুব কষ্ট দিচ্ছে?

"একটু একটু!

অয়ন সাথে সাথে আহি’র পেটে আলতো করে চুমু খেল। তার কণ্ঠ হয়ে উঠল আরও নরম,

“আমার চাঁদ! মাম্মাহকে একটুও কষ্ট দেবে না কিন্তু। তোমার পাপ্পার খুব শখের মানুষ সে, তাকে কষ্ট দিলে তোমার পাপ্পা কিন্তু তোমার সাথে কথা বলবে না।

আহি খিলখিল করে হেসে উঠল। তার হাসিতে যেন চারপাশ ভরে গেল। অয়ন উঠে এসে তার পাশে বসল। আজ আহি’র মুখে এমন একটা আলো, যেন দূরের আকাশের চাঁদের জোছনা নেমে এসেছে তার গালে।

“বউউউ!

"হুম?

“আমাদের বেবির কয়দিন?

আহি একটু লাজুক গলায় বলল,

"দুই মাস!

“হোয়াট? তোর পেটে আমার চাঁদ দুই মাস ধরে আছে আর তুই আমাকে বললি না?

আহি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

"আপনি কি পাগল? আমি কিভাবে জানবো আপনার চাঁদ আমার পেটে দুই মাস না দুই বছর ধরে আছে! অনেক দিন ধরেই শরীর ভালো লাগছিল না, বমি বমি আসতো। তাই দুদিন আগে একটা প্রেগনেন্সি কিট এনেছিলাম। সেখানে পজিটিভ আসে তবুও বিশ্বাস হয়নি। তাই কাল মাহি আর মুনকে নিয়ে হসপিটালে গিয়ে চেক করালাম। আর আজ যেহেতু আমাদের বিবাহবার্ষিকী তাই ভাবলাম এই স্পেশাল দিনে আপনাকে একটা স্পেশাল গিফট দেই। এবার বলুন তো গিফটটা আপনার কেমন লেগেছে?

অয়ন আর এক মুহূর্তও নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ঝট করে আহি’কে নিজের বুকে টেনে নিল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন কোনোদিন ছাড়বে না। তার কণ্ঠ ভেঙে গেল আবেগে,

“তোকে আমি ভাষায় প্রকাশ করে বলতে পারবো না, আমি আজ কতটা খুশি। আমি আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখটা অনুভব করছি পাখি।

তার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে নতুন এক অনুভূতি। একজন প্রেমিক থেকে, একজন স্বামী থেকে। আজ সে একজন বাবা হতে চলেছে।

“ভালোবাসি বউ!

অয়নে’র কণ্ঠে ছিল এক ধরনের নরম আদর, যেন প্রতিটা শব্দে ভালোবাসা গলে পড়ছে। আহি ভ্রু তুলে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো,

"কতটা ভালোবাসেন?

অয়ন একটু ঝুঁকে তার চোখের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে গভীরতা,

“অগণিত! তোকে অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি। যে ভালোবাসার কোনো শেষ নেই, কোনো হিসাব নেই। যে ভালোবাসা কখনো ফুরাবে না ঠিক ততটাই ভালোবাসি তোকে!

আহি’র চোখে চিকচিক করে উঠলো অশ্রুতে, কিন্তু ঠোঁটে ফুটে উঠলো সবচেয়ে মিষ্টি হাসি।

"আমিও আপনাকে অসম্ভব ভালোবাসি, মি. আদনান শেখ অয়ন!

অয়ন হেসে উঠলো। তার কণ্ঠে দুষ্টুমি মিশে গেল,

“ইয়েস, মিসেস আদনান শেখ অয়ন! এবার বলেন, আপনি আমার থেকে কী গিফট চান? আকাশের চাঁদ-সূর্য বাদে যা চাইবেন, আজ আমি আপনার পায়ের সামনে এনে দেবো। শুধু একবার বলুন, কি চান আপনি?

আহি ধীরে ধীরে তার গলা জড়িয়ে ধরলো। মুখটা একটু তার বুকে গুঁজে মিষ্টি হেসে বললো,

"আমার আর কিছু চাই না। শুধু আপনি আমাকে অনেক অনেক অনেক ভালোবাসবেন। ব্যাস, এতটুকুই চাই আমার। আর আমি ছাড়া আর কারো প্রতি আসক্ত হবেন না, মনে থাকবে?

অয়ন তার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর গভীর ভালোবাসায় ভরা কণ্ঠে বলল,

“তুই নামক #নেশাময়_আসক্তি থেকে কার সাধ্যি আছে অয়ন‘কে সরায়? ওই উপরওয়ালা সাক্ষী, আমি তুই ছাড়া আর কারো নেশায় আসক্ত হবো না। সারাজীবন শুধু তোর এই #নেশাময়_আসক্তি’তেই ডুবে থাকবো! তোর প্রতি আমার ভালোবাসা কোনোদিন ফুঁড়াবে না আমার জান!

বিজ্ঞাপন
নেশাময় আসক্তি গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় স্পেশাল রোমান্টিক গল্প