অয়ন হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। তার চোখে এক ঝলক আতঙ্ক খেলে গেল। আহি থামল না,
"আমি কাল রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছি। এই লোকটা বলেছিল তার মেয়ে আছে। তাহলে তুমি বলো ভাইয়া, এই লোকটা কিভাবে আমার অয়ন ভাই হয়?
আদিল এক নজরে সবকিছু বুঝে গেল। আহি ঠিক কী শুনেছে, সে ধীরে অয়নে’র দিকে তাকাল। অয়ন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, চোখ দুটো ফাঁকা। না সে সত্যিটা বলতে পারছে, আর না আহি’র কাছে গিয়ে তাকে শান্ত করতে পারছে। বরং যতবার সে এগিয়ে যাচ্ছে, ততবারই আহি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠছে।
আদিল আবার আহি’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
"বনু, প্লিজ কান্না বন্ধ কর। এমন কিছুই হয়নি, অয়নে’র জীবনে তুই ছাড়া আর কেউ নেই। তাহলে মেয়ে আসবে কোথা থেকে? অয়ন যাদের ‘মেয়ে’ বলছে তারা আসলে....
আহি হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। সে এক ঝটকায় আদিলে’র কাছ থেকে সরে গেল। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে কান্নায়।
"ভাইয়া...তুমিও ওই লোকটার হয়ে কথা বলছো? তাহলে তুমি জানতেই, এই লোকটা কাউকে খুন করবে? তোমরা কেউ ভালো না, সবাই খুনি।
এই বলে সে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার পিছু পিছু ছুটে গেল মুন, মাহি আর তাদের মায়েরা। রুমের ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে এল। অয়ন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু, চোখে অজানা ঝড়। মহিবুল শেখ রক্তিম চোখে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
- আহি মা কী বলছে এসব? তুমি কাদের খুন করেছো?
অয়ন চুপ। এই নীরবতাই যেন সবচেয়ে ভয়ংকর উত্তর। জাহিদ শেখ এবার রাগ সামলাতে পারলেন না।
- কথা বলছো না কেন? তুমি কাদের খুন করেছো? আমার বউমা কখনো মিথ্যা বলে না, তুমি নিশ্চয়ই কিছু করেছো। নয়তো ও এভাবে ভয় পাবে কেন?
অয়ন মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে রইল। এই নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও অস্বাভাবিক করে তুলল। ঠিক তখনই আদিল এগিয়ে এসে তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল।
"বাবাই! কী বলছেন এসব? বনুর মতো আপনাদেরও মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? ও না হয় কিছু দেখে ভয় পেয়ে আবোল তাবোল বলছে, কিন্তু আপনারা সুস্থ থেকেও এসব বলছেন?
সে অয়নে’র দিকে তাকাল!
"এমনিতেই অয়ন বনুকে নিয়ে আপসেট তার উপর আপনারা আবার শুরু করলেন?
আদিলে’র কথায় পরিস্থিতি কিছুটা থামল।
কিন্তু জাহিদ শেখ এত সহজে থামার মানুষ না। তিনি ভ্রু কুঁচকে আবার বললেন
- ঠিক আছে, আমার বউমা ভুল বলছে ধরে নিলাম। কিন্তু অয়ন এত ভোরে কোথায় গিয়েছিল? আর অচেতন অবস্থায় ওকে কোথায় বা পেল? এই প্রশ্নের উত্তর আছে তোমার কাছে?
অয়ন আবারও চুপ। একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। আদিল একটুও বিচলিত হলো না। বরং শান্ত কণ্ঠে বলল,
"বাবাই আপনিও পাগল হয়ে গেছেন। বনু তো প্রায়ই অয়নে’র সাথে বের হয়, হয়তো আজ কিছু দেখে ভয় পেয়েছে।
তারপর অয়নে’র দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমি ঠিক বলছি তো?
অয়ন শুকনো ঢোক গিলে নিচু স্বরে শুধু বলল,
“হুম…
ব্যস এই একটুকু শব্দ বলেই সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আদিল তার পিছু নিল। অয়ন দ্রুত পা ফেলতে ফেলতে ছাদে উঠে গেল। ছাদে পৌঁছেই হঠাৎ দেয়ালে জোরে ঘুষি মারল। তার হাত লাল হয়ে উঠছে, ত্বক ফেটে যাচ্ছে কিন্তু সে থামছে না। যেন নিজের ভেতরের যন্ত্রণা, রাগ, অসহায়তা—সবকিছু এই দেয়ালে আঘাত করে বের করে দিতে চাইছে। সে আবার ঘুষি মারতে যাবে ঠিক তখনই আদিল দৌড়ে এসে তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
"স্টপ, ভাই! এসব কী করছিস তুই ?
“তো কি করবো আমি? দোয়েল পাখি আমার সাথে কথা বলছে না, আমাকে দেখলেই চিৎকার দিয়ে উঠে। ও বুঝে না ওকে ছাড়া আমার একটুও ভালো লাগে না।
"আমি বুঝতে পারছি তবে বনু ওখানে গেল কীভাবে? তোকে আরো সাবধানে যাওয়া উচিত ছিল আর তুই যখন যাচ্ছিস, আমাকে নিয়ে গেলি না কেন?
অসহায় চোখে তার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠ ভারী,
“আমি কীভাবে জানবো পাখি আমার পিছু নেবে? আমি ওকে ঘুমিয়ে রেখে গেছি কিন্তু ও বেলকনি দিয়ে নেমে আমার আগেই গাড়ির পেছনে লুকিয়ে পড়েছিল। আর সেটা আমি সিসিটিভি ফুটেজে দেখলাম।
"হোয়াট! বনু বেলকনি দিয়ে নামল কীভাবে?
আদিল হতবিহ্বল হয়ে বলল।
অয়ন নিচু গলায় বলল,
“শাড়ি বেঁধে! আমি ভেবেছিলাম আজকেই সব বলে দেব কিন্তু তোর বোনের সেই ধৈর্য হয়নি। বল তো আদিল আমি এখন দোয়েল পাখিকে ছাড়া কীভাবে থাকব? ও তো আমার ছায়াও সহ্য করতে পারছে না। আমি ওকে কীভাবে সব বলব?
"তোকে আমি আগেই বলেছিলাম এসব করার দরকার নেই।
অয়ন হঠাৎ মাথা তুলে তাকাল। চোখে তীব্র আগুন জ্বলে উঠে,
“দরকার নেই মানে? ওরা আমার মেয়েদের শেষ করে দিয়েছে। আর আমি চুপ করে থাকব? তুই কীভাবে এটা ভাবলি?
"আমি সব বুঝতে পারছি কিন্তু বনুকে না জানিয়ে এমন কিছু করা ঠিক হয়নি। আমি তোকে থামতে বলেছিলাম কিন্তু তুই শুনলি না। এখন কী হতে পারে বুঝতে পারছিস? বনু তো আমাকেও ভুল বুঝছে। আমারকেও কাছে আসতে দিচ্ছে না। তাহলে ওকে সব বুঝাবো কীভাবে?
অয়ন দুহাত মাথায় দিয়ে বসে পড়ল।
“আই ডোন্ট নো! কিন্তু আমার পাখিকে সব বলতেই হবে। ওকে ছাড়া আমি এক মুহূর্তও থাকতে পারব না।
•
•
অন্যদিকে…
আহি সাজ্জাদের বাহু জড়িয়ে ধরে আছে। যেন এটাই তার শেষ নিরাপদ জায়গা। তার চোখ লাল, মুখ ফ্যাকাসে, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন আর আদিল। কিন্তু কেউ ভেতরে ঢুকতে পারছে না। মুন, মাহি
এমনকি তাদের মায়েরাও কেউ তাকে শান্ত করতে পারছে না। হঠাৎ টিভির স্ক্রিনে ব্রেকিং নিউজ ভেসে উঠল। রুমের সবাই একসাথে তাকাল। সংবাদ পাঠকের কণ্ঠ ভেসে আসছে,
“আজ ভোরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার ছেলেকে নৃশংসভাবে হত্যা করে
তাদের বাড়ির সামনে ফেলে রাখা হয়েছে।
আহি মুহূর্তেই কেঁপে উঠল। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেল, সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।
"স স স স সাজ্জাদ ভাইয়া! এদেরকেই অয়ন ভাই নিজে খুন করেছে।
মূহুর্তেই সবাই থমকে গেল। সাজ্জাদ তাকে শক্ত করে ধরে বলল,
- বোন শান্ত হ। প্লিজ পাগলামো করিস না। ভাইয়া কেন মারবে এদের? তোর কোথাও ভুল হচ্ছে।
আহি মাথা নাড়তে লাগল। চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রু ঝরছে।
"না না, আমার একটুও ভুল হচ্ছে না। আমি নিজের চোখে দেখেছি অয়ন ভাই তাদের বুকে ছুরি চালিয়েছে। আবার তাদের ফুটন্ত পানিতে ফেলে দিয়েছিল। তবুও তোমরা কেউ আমাকে বিশ্বাস করছো না কেন?
দরজার আড়ালেই দাঁড়িয়ে ছিল অয়ন। তার ছায়া চোখে পড়তেই আহি হঠাৎ কেঁপে উঠল।
মুহূর্তেই সে আরও গুটিয়ে গেল, সাজ্জাদের টি-শার্ট শক্ত করে খামচে ধরল। তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। অয়ন ধীরে ধীরে রুমে ঢুকে পড়ল। তার পেছনেই আদিল। অয়ন এক পা দুই পা এগিয়ে এল আহি’র দিকে কিন্তু আহি সাথে সাথে সাজ্জাদে’র পেছনে লুকিয়ে পড়ল। তার কণ্ঠ কাঁপছে,
"ভাইয়া ওই লোকটাকে থামতে বলো। ওই লোকটা আমাকেও মেরে ফেলবে। প্লিজ থামতে বলো না।
এই কথাগুলো যেন সরাসরি আঘাত করল অয়নে’র বুকে। তার চোখে এক ঝলক ব্যথা ফুটে উঠল। সে কষ্ট চেপে রেখে বলল,
“দোয়েল পাখি এমন করছিস কেন? আমি তোর অয়ন ভাই প্লিজ একবার আমার কথাটা শোন।
আহি মাথা নাড়িয়ে উঠল,
"না, আমি কিছু শুনতে চাই না। আপনি আমার কাছে আসবেন না মানে আসবেন না।
“ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড, পাখি! একটু তো আমাকে বলার সুযোগ দে। আমার লাইফে তুই ছাড়া আর কেউ নেই ট্রাস্ট মি। আর তোকে আমি ভালোবাসি তাহলে মারবো কেন?
আহি কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ল,
"না, আপনি মিথ্যা বলছেন। আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না, নয়তো এমন জঘন্য কাজ করতেন না। আর আপনি এর আগেও কাউকে খুন করেছেন, আমি আপনার রক্তমাখা শার্ট দেখেছি। আর এখন আমাকেও মারতে এসেছেন।
এই কথাটা শোনার পর অয়ন যেন দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল। সে যেন নিস্তেজ হয়ে গেল। সে আর কিছু বলল না। এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমে চলে গেল। রুমে ঢুকেই সে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। ঠাসস করে দরজা বন্ধ করে দিল।
প্রায় এক ঘণ্টা পর দরজা খুলল। কোমড়ে তোয়ালে জড়ানো অয়ন ধীরে বাইরে এল। চোখ দুটো লাল, বিছানার ওপর বসে আছে সাজ্জাদ। অয়ন তাকে দেখেই এগিয়ে গেল। সাজ্জাদ উঠে দাঁড়াল।
- ভাই!
অয়ন টি-শার্ট পরতে পরতে বলল,
“বল।
সাজ্জাদ সরাসরি প্রশ্ন করল,
- আহি যা বলছে সব সত্যি?
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ অন্য প্রশ্ন করল,
“পাখিকে খাইয়ে দিয়েছিস?
- আমি অন্য কিছু জিজ্ঞেস করেছি।
“এক গ্লাস পানি দে তো?
সাজ্জাদ বিরক্ত হলেও পানি এনে দিল। অয়ন পুরো গ্লাসটা এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলল।
সাজ্জাদ আবার বলল,
- ভাই কথা এড়িয়ে যাচ্ছো কেন? সত্যি করে বলো, তুমি কি ওদের খুন করেছো?
অয়ন ভ্রু কুঁচকে তাকাল
তার চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি।
“কৈফিয়ত চাচ্ছিস?
সাজ্জাদ মাথা নাড়ল,
- না। জাস্ট জানতে চাইছি। আহি কখনো মিথ্যা বলে না এটা তুমি জানো। ও যদি সত্যি সত্যি কিছু না দেখত তাহলে এভাবে ভয় পেত না।
অয়ন একদম শান্ত স্বরে বলল,
“হ্যাঁ… খুন করেছি। দু’জন নয় অনেকজন।
তার কণ্ঠে কোনো কাঁপন নেই। কোনো অপরাধবোধ নেই। যেন এটা কোনো অপরাধ না বরং একটা সাধারণ। যেটা সে নির্দ্বিধায় স্বীকার করছে। তাতে সাজ্জাদ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে আসছে। নিচু স্বরে আবার জিজ্ঞেস করল,
- কেন এমন জঘন্য কাজ করলে ভাই? পুলিশ যদি সব জেনে যায়? তখম আমাদের ফ্যামিলির সম্মান কোথায় যাবে ভেবেছো?
“আমি কোনো জঘন্য কাজ করিনি। বরং ভালো কাজ করেছি। সমাজ থেকে দুটো পশুকে সরিয়েছি। আর পুলিশ? আমি কাউকে খুন করেছি এর কোনো এভিডেন্স আছে কারো কাছে ?
সাজ্জাদ চুপ করে রইল। সে বুঝে গেল, এই মানুষটা এখন অন্য জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তার কাছে এটা অপরাধ না, এটা প্রতিশোধ, এটা ন্যায়বিচার। তারপর অয়ন আবার আগের মতোই স্বাভাবিক গলায় বলল,
“পাখি কী করছে?
সাজ্জাদ কিছুটা থমকে গিয়ে বলল,
- ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি।
“খাবার খেয়েছে?
- অল্প খাইয়ে দিয়েছি।
অয়ন মাথা নাড়ল। তারপর নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“এবার তুই নিজের রুমে যা, আমার একটু প্রাইভেসি লাগবে।
সাজ্জাদে’র মনে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে কিন্তু একটা শব্দও মুখে আনতে পারল না। কারণ অয়নে’র সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস তার নেই। সে ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেল।
নিঃশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। রুমে একা রইল অয়ন।