পুরো দু’দিন কেটে গেছে। এই দু’দিনে অয়ন একবারও আহি’র ছায়া পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারেনি। বরং উল্টো আহি তাকে দেখলেই দৌড়ে পালিয়েছে। যেন অয়ন কোনো পরিচিত মানুষ নয়, অচেনা, ভয়ংকর কেউ। নিজের রুমে বসে আছে অয়ন। দু’হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে। চোখ লাল, ভেতরের অস্থিরতা তার চেয়েও ভয়ংকর। সে কিছুই বুঝতে পারছে না—কি করবে? কিভাবে সব ঠিক করবে? এখন দুপুরের সময়। পুরো বাসা নিস্তব্ধ। সবাই খাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েছে। এই সুযোগটাই নিল অয়ন। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল আহি’র রুমের দিকে। রুমের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। দরজা ভেতর থেকে লক। অয়নে’র ভ্রু কুঁচকে গেল। এক ধরনের বিরক্তি ভিড় করল তার ভেতরে।
অয়ন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আর কিছু না বলে ফিরে গেল নিজের রুমে। কিন্তু আজ সে থামার পাত্র না। নিজের বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। একটা লম্বা শ্বাস নিল, তারপর ঝুঁকি নিয়ে পাশের বেলকনিতে উঠে পড়ল। শেষমেশ পৌঁছে গেল আহি’র বেলকনিতে। রুমের ভেতরে ঢুকে দেখল আহি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। শান্ত, নির্ভার যেন এই পৃথিবীর কোনো ভয় তাকে ছুঁতে পারেনি। অয়ন ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। আহি’র বুকে জড়িয়ে ধরা বালিশটা আলতো করে সরিয়ে দিল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজেকে গুটিয়ে দিল আহি’র পাশে। তার গলায় মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল।
দু’দিন, মাত্র দু’দিন কিন্তু অয়নে’র কাছে সেটা যেন দুই যুগ। এই মানুষটা, এই স্পর্শটা, এই কাছাকাছি থাকা এটাই তার বাঁচার কারণ। হঠাৎ ঘুমের ভেতরেই আহি অদ্ভুত একটা অনুভূতি পেল। গলার কাছে উষ্ণ, ভারী কোনো উপস্থিতি। শরীরটা নড়াতে চাইলো কিন্তু পারল না। মনে হলো যেন তার উপর ভারী কিছু চাপা পড়ে আছে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে।
চোখ মেলে দেখল অয়ন। মুহূর্তেই তার চোখ বড় হয়ে গেল। ভয়, আতঙ্কে শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ল। সে চিৎকার দিতে যাবে ঠিক তখনই অয়ন বিদ্যুৎগতিতে তার মুখ চেপে ধরল। আহি’র নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। চোখে স্পষ্ট ভয়, সে ভাবছে এইবার এই মানুষটা তাকেও মেরে ফেলবে। তার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। হাত কাঁপছে চোখে জমে উঠছে অশ্রু, কিন্তু আওয়াজ বের হচ্ছে না।
অয়ন কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“পাখি, প্লিজ আমার কথাটা শোন। আমি তোকে মারতে আসিনি ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড!
আহি ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মুখ চেপে ধরা, বুক ধড়ফড় করছে। গলা দিয়ে শুধু অস্পষ্ট উম উম শব্দ বের হচ্ছে। চোখ দুটো ভয়ে বড় হয়ে গেছে সেখানে একটাই আতঙ্ক এই মানুষটা তাকে মেরে ফেলবে।
হঠাৎ অয়ন তার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। আর পরের মুহূর্তেই সে ডুকরে কেঁদে উঠল। আহি থমকে গেল। সবকিছু যেন এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। এই মানুষটা যাকে সে একটু আগেও ভয় পাচ্ছিল সে এখন ভেঙে পড়েছে। আহি’র ভয় কিছুটা কমল। কিন্তু পুরোটা না, চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করছে এখনো। ধীরে খুব ধীরে সে বলল,
"অয়ন ভাই!
কোনো উত্তর নেই। অয়ন মাথা নিচু করে কাঁদতেই থাকল। আহি’র বুকটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে অয়নে’র মাথা তুলতে চাইল কিন্তু পারল না। হঠাৎ অয়ন নিজেই তাকে আধা শোয়া অবস্থায় বসিয়ে দিল। তার সামনে বসে পড়ল। আহি’র দু’হাত নিজের হাতের ভাঁজে আটকে নিল। মাথা নিচু কণ্ঠ ভাঙা....
“পাখি প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দে! আমি তোকে ছাড়া একটুও ভালো নেই। আমি জানি, তোকে সব আগে বলা উচিত ছিল কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম।
সে ধীরে মাথা তুলল চোখে অপরাধবোধ আর আগুন মিশে আছে।
“আমি ওদের মারতে চাইনি কিন্তু ওরা খুব জঘন্য কাজ করেছে। ট্রাস্ট মি পাখি, আমার লাইফে তুই ব্যাতিআ কেউ নেই। আমি যাদের ‘মেয়ে’ বলি তারা অনাথ। এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া ওদের কেউ নেই।
আহি নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। অয়ন কথা গুলো বলার সময় তার কন্ঠ বারবার কেঁপে উঠছিল। তার কন্ঠ স্বর আবারও ভারী হয়ে উঠল,
“ওদের আমি রাস্তায় থেকে তুলে এনে অনাথ আশ্রমে রেখেছি। ওরা আমাকে ‘বাবাই’ বলে। ওরা আমাকে খুব ভালোবাসে,কিন্তু ওদের বাবাই ওদের রক্ষা করতে পারেনি।
শেষ কথাটায় তার গলা কেঁপে উঠল। চোখ ভিজে গেল তার।
“জানিস, ওই পশুগুলো কী করেছে? স্কুলে যাওয়ার সময় আমার চারটা মেয়েকে তুলে নিয়ে যায় অন্য দেশে পাচার করার জন্য। আমি পাগলের মতো খুঁজেছি। তারপর জানতে পারি রাহাত, ওই জানোয়ারটা ওদের কিডন্যাপ করেছে। ও শুধু কিডন্যাপই করেনি ও আমার ছোট্ট ছোট্ট মেয়েগুলোর সাথে...
তার গলা আটকে গেল। কথা শেষ করতে পারল না। আহি’র চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। অয়ন আবার বলতে শুরু করল,
“ওরা খুব ছোট ছিল পাখি। এতটা টর্চার সহ্য করতে পারেনি। আমার দুইটা মেয়ে সেখানেই মারা যায়, আমি চেষ্টা করেছি, অনেক হসপিটালে নিয়েছি। কিন্তু কেউ আমার মেয়ে গুলোকে ফিরিয়ে দিতে পারেনি। নিতু সবার বড় ছিল৷ ও একটু বুঝত এসব। ও আমাকে বলেছিল ও হারিয়ে যাবে না কিন্তু ও হারিয়ে গেল।
অয়ন চোখ বন্ধ করল। সাথে সাথে তার গাল বেঁয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
“কয়েকদিন আগে আমার মেয়েটা সুইসাইড করেছে। আমি ওকে ও বাঁচাতে পারিনি। যে হাতে ওদের বড় করেছি সেই হাতেই ওদের বিদায় দিতে হয়েছে। তুই বল, আমি কীভাবে ওদের ছেড়ে দিতাম? ওরা তো ফুলের মতো নিষ্পাপ ছিল। ওরা শুধু বাঁচতে চেয়েছিল কিন্তু ওই জানোয়ার গুলো তাদের সেইটুকুও থাকতে দেয়নি। এখন বল তো আমি ওদের মেরে ভুল করেছি?
আহি যেন বরফ হয়ে গেল। একদম স্থির। চোখ খোলা কিন্তু দৃষ্টি ফাঁকা। সে কিছুই জানত না, কিছুই না। আর না জেনেই সে অয়ন’কে দোষী বানিয়ে ফেলেছিল। একটা মুহূর্তে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকেই ভয় পেতে শুরু করেছিল। অয়ন আবারও বলল,
“আমি ওদের বলেছিলাম, আমার মেয়েদের ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু ওরা পারেনি, তাই আমিও ওদের বাঁচতে দেইনি। এবার আমার মেয়েগুলো নিশ্চয়ই খুশি হবে, তাদের বাবাই তাদের কথা রেখেছে।
আহি'র চোখ বেয়ে টুপটুপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তার বুকটা ভারী হয়ে আসছে। সে কখনো ভাবেনি, এই মানুষটার ভেতরে এতটা কষ্ট লুকিয়ে আছে। ধীরে খুব ধীরে সে বলল,
"আপনি পুলিশের কাছে যেতে পারতেন।
অয়ন হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
“পুলিশ? পুলিশ বড় মাপের লোকদের দোষ দেখে না, ওরা খুঁজবে কিভাবে? উল্টো আমার মেয়ে গুলোকেই দোষ দিল। বলল, ওরাই নাকি ওদের উসকে দিয়েছে। আমার ছোট্ট ছোট্ট মেয়ে গুলো, যাদের কিছু বোঝার বয়সই হয়নি। তাদেরকেই দোষী বানালো, তাই ওদেরও আমি ছাড়িনি। যে আমার মেয়েদের দিকে আঙুল তুলবে, সে বাঁচার অধিকার রাখে না।
হঠাৎ অয়ন নরম হয়ে গেল। আহি’র হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। চোখে ভয়, হারানোর ভয়। সে আকুতি স্বরে আওরায়,
“পাখি প্লিজ আমাকে ভুল বুঝিস না। আমি তোকে কখনো আঘাত করবো না। তুই তো আমার প্রাণ। আমি তোকে ভালোবাসি, তাহলে তুই কিভাবে ভাবলি আমি তোকে মেরে ফেলবো?
আহি চুপ। তার চোখে অপরাধবোধ জমছে। অয়ন ধীরে বলল,
“আমি তোকে সব বলতাম, সময় মতো সব জানাতাম। কিন্তু তুই তার আগেই আমাকে ভুল বুঝলি। আর সাদিকার সাথে আমার কোনো রিলেশন ছিল না শুধু ওর বাপ আর ভাইকে খুঁজে বের করার জন্য ওর সাথে একটু কথা বলেছি।
আহি নাক ছিঁটকে বলল,
"সদিকার সাথে আমার কোনো রিলেশন নেই, কিন্তু তাকে জরিয়ে ধরতে আমার সেই লাগে সেই সেই।
অয়ন ফিক করে হেসে দিলো। সাথে সাথেই আহিও হেসে উঠলো। মূহুর্তেই অয়ন আবার মুখ ভার করে আওরায়,
“আমি কখন ধরলাম? ওই মেয়ে নিজেই নির্লজ্জের মতো আমাকে জরিয়ে ধরলো। এখন আমি কি করবো?
পরক্ষনে আহি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"আপনিও ধরতেন। এতো বড় সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে
“ছিহ্ বউ, পঁচা কথা বলিস না। আমার ঘরে বউ আছে, দুদিন পর বাচ্চা হবে, তারপর বাপ হবো, তারপর দাদা-নানা, তারপর...
"চুপ করুন বেহায়া লোক। লজ্জা সরমের মাথা খেয়েছেন।
অয়ন দুষ্টু হাসলো তারপর মিন মিন করে বলল,
“আরেকটু বেহায়া হবো বউ? দুদিন সভ্য ছিলাম, এবার একটু বেহায়া হলে ক্ষতি কি?
এই বলে অয়ন ধীরে ধীরে আহি’র কোমর আঁকড়ে ধরলো। আহি ছটফট করে বলল,
"অয়ন ভাই না প্লিজ, এখন দুপুর।
“সো হোয়াট? দুপুর হলে কি রোমাঞ্চ করা বারণ নাকি? শোন, দিন-রাত পরিশ্রম করলেই সফল হতে পারব। নয়তো এই জন্মেও বাপ ডাক শুনতে পারব না। আর বেশি চিৎকার করিস না বউ, রুমটা মোটেও সাউন্ড প্রুফ নয়।
•
•
দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ কেটে গেল। এই এক সপ্তাহ অয়ন আহি’র থেকে এক মূহুর্তের জন্যও দূরে যায়নি। সারাক্ষণ আহি’র আঁচল ধরে তার সঙ্গে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কেউ কিছু বলার চেষ্টা করলে অয়ন সঙ্গে সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে দিত। আজ আহি সদ্য শাওয়ার নিয়ে বের হলো, আর অয়ন সাথে সাথে তার ওড়নার আঁচল ধরে পিছু পিছু ঘুরছে। আহি বিরক্ত হয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে বলল,
"এই আপনার লজ্জা করে না? সারাদিন বউয়ের আঁচল ধরে ঘুরে বেরান?
অয়ন হেসে জবাব দিল,
“না বউ, একটুও লজ্জা করে না। বরং তোকে আরো বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে। এখনো ইচ্ছে হচ্ছে ভীষণ। তুই জাস্ট হ্যাঁ বল, আমি ভালোবাসতে শুরু করি।
আহি সাথে সাথে চেঁচিয়ে উঠলো,
"মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো বদ লোক? মুখে লাগাম দিন, বেহায়া!
“লাগাম দিতে পারব না বউ। বিয়ে করেছি মুখ বন্ধ করার জন্য নয়।
আহি বিরক্ত হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল, আর অয়ন পিছু পিছু তার পেছনে চলল। আহি যেখানে থেমে গেল, অয়নও সেখানে থেমে গেল। হঠাৎ আহি থেমে কোমড়ে হাত গুঁজে কর্কশ কন্ঠে বলল,
"আপনি হসপিটালে যাবেন কবে? আপনাকে আর সহ্য হচ্ছে না আমার!
অয়ন নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আওড়াল,
“আর যাবো না।
"যাবো না মানে?
“যাবো না মানে, যাবো না। ডক্টর টক্টর বাদ, এই ডক্টর হওয়ার চক্করে বউ'কে টাইম দিতে পারিনা। তাই ভাবছি আদিলে'র সঙ্গে ব্যবসার কাজে লেগে পড়বো। সপ্তাহে দুদিন, দু’ঘন্টা থেকে আর যাবো না।
আহি অবাক হয়ে বলল,
"ফাজলামো করছেন? ডক্টর হওয়া আপনার স্বপ্ন ছিল, আর যখন পূরণ হলো, তখন বলছেন এই পেশা ছেড়ে দেবেন?
“হ্যাঁ, ছেড়ে দেবো। সবার আগে বউ, তারপর স্বপ্ন!
"আমার টাইম লাগবে না, তবুও আপনি হসপিটালে যান।
“ওহু! অয়ন প্রথম ভুল, দ্বিতীয়বার করে না। তোকে ছেড়ে…
কিন্তু সেই কথা শেষ হবার আগেই আহি দু’হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে দৌড়ে চলে গেল নিজের রুমে এবং বেসিং-এ গড়গড় করে বমি করতে শুরু করল। অয়ন আহি’র এমন আচরণ দেখে তৎক্ষণাৎ ঘাবড়ে গেল। সে দৌড়ে এগিয়ে গেল, আহি’র পাশে দাঁড়িয়ে রইলো এবং ভ্রু কুঁচকে বলল,
“পাখি কী হলো তোর? তুই বেঁচে আছিস তো?
কিছু সময় পর আহি আগের তুলনায় স্বাভাবিক হলো। তার দাঁতে দাঁত পিষে কটমট করে আওরায়,
"বাঁচবো কেন? আমি মরে গেছি, বমি করলে মানুষ মরে যায় তাই আমিও নাচতে নাচতে মরে গেছি। এই বা*লকে ডক্টর কে বানাইছে। কি হলে মানুষ মরে সেটাও জানে না, ধুররর শালা।