অয়ন বেরিয়ে যেতেই মাহি ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কোমড়ে দু’হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কর্কশ কণ্ঠে বল,
- এই বেয়াদব লোক! আপনিও কি ভাইয়ার মতো সব লজ্জা ধুয়ে খেয়ে ফেলেছেন? আপনাকে পাকনামি করে বিয়ের কথা বলতে কে বলেছে শুনি? দুদিন পর তো এমনিতেই বিয়ে সবাই দিয়ে দিতো। কিন্তু না, আপনি কোনো না কোনো অকাজ করবেই করবেন।
তার চোখ দুটো রাগে জ্বলজ্বল করছে।
আদিল ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। মুখে একটুখানি রহস্যময় হাসি। সে একটাও কথা না বলে দরজার দিকে গিয়ে সেটাকে ভেতর থেকে লক করে দিল। দরজা লক হওয়ার শব্দে মাহি একটু থমকে তাকাল।
এরপর আদিল ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল। একটু ঝুঁকে পড়ল তার দিকে। এক হাত দিয়ে মাহি’র কোমর আলতো করে জড়িয়ে ধরে নিচু স্বরে ফিসফিস করল,
"অকাজ করলে যদি বউ’কে নিজের করে পাওয়া যায় তাহলে এই আদিল হাজারটা অকাজ করতেও রাজি। আর এত লজ্জা দিয়ে কী করব শুনি? লজ্জা করলে কি সেদিন তোর সাথে ওহু ওহু করতে পারতাম? না তো, তাহলে এই লজ্জা-টজ্জা আমার জন্য নয়, কুইন!
মাহি চোখ গোল করে তাকাল। তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজেকে আদিলে’র হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল।
- আমি যাচ্ছি।
এই বলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দু’পা যাওয়ার আগেই আদিল তার বাহু ধরে ফেলল।
"কোথায় যাচ্ছিস?
মাহি বিরক্ত গলায় বলল,
- আম্মার কাছে।
আদিল ভ্রু তুলে তাকাল।
"হোয়াই?
- আমার ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাবো। আর যতদিন না আমাদের বিয়ের রিসেপশন হচ্ছে, ততদিন আমরা আলাদা থাকবো।
"এ্যাহ্ বললেই হলো নাকি? বউ টউ ছাড়া আমি এক সেকেন্ডও থাকতে পারবো না, হু!
- হ্যাঁ, বললেই হলো। আর বউ টউ ছাড়া থাকতে না পারলে বালিশ জড়িয়ে ঘুমান। তবুও আমি থাকবো না।
এই বলে সে আবার এগিয়ে গেল। আদিল আবার সামনে এসে তার পথ আটকে দাঁড়াল। মাহি ততক্ষণাক বাজ খাই মেজাজ বলে উঠে,
- সরুন আপনি?
"যদি না সরি তাহলে?
- ধাক্কা দিয়ে ফেলে চলে যাবো।
"এত এনার্জি?
- হ্যাঁ এনার্জি! এবার সরুন, না হলে সত্যিই আপনাকে ফেলে দিয়ে চলে যাবো।
আদিল হেসে ফেলল।
"এনার্জি তো থাকবেই, স্পেশাল কিছু ডোনেট করেছি কিনা! উফফ আদিল, তুই রোজ একটু একটু করে স্পেশাল কিছু ডোনেট করিস তাহলে খুব তারাতাড়ি তোর চিকনা বউ গুলুমুলু হয়ে যাবে। আর তখন সব কিছুতে এতো হাড্ডি হাড্ডি লাগবে না।
- আদিল ভাইয়া…
আদিল আরেকটু এগিয়ে এলো। এবার তার কণ্ঠ অনেকটা নরম। সে আলতো করে মাহি’র চিবুক তুলে বলল,
"আমাকে এত দুর্বল ভাবিস না কুইন! আমাকে ষোল আনা দেখতে হলেও আঠারো আনা যন্ত্রনা দেওয়ার ক্ষমতা রাখি। নেহাত তুই ছোট মানুষ তাই অল্পতেই ছেড়ে দেয়। আর আজ তোর আমিটা একটু অসুস্থ, তবুও চল দেখি এই অসুস্থ মানুষটাকে কতটা সামলাতে পারিস। সব সময় ভালোবাসি ভালোবাসি বলতি না? চল তাহলে আজ তোকে দেখিয়ে দেয় আমি ভালোবাসতে শুরু করলে সহ্য করতে পারিস কিনা।
আদিল হেঁচকা টান দিয়ে মাহি'কে বিছানায় ফেলে দিলো। অপ্রস্তুত মাহি ভয়ে বেডশিট খাঁমচে ধরলো। সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে আদিল তাকে আজ কোনো ভাবেই ছাড়বে না। তার #নেশাময়_আসক্তি তে ডুবিয়ে ছাড়বে।
•
•
আহি ধীরে ধীরে সজাক হয়। চোখের পাতা ভারী লাগছিল, তবু সে চোখ পিটপিট করে তাকাল। ঝাপসা দৃষ্টি একটু পরিষ্কার হতেই সে বুঝতে পারল, সে অয়নে’র বাহুর ভেতরেই আছে। অয়ন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে, আর গভীর মনোযোগ দিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখে অদ্ভুত এক মায়া। আহি কিছু বলল না। ধীরে ধীরে সে মুখটা সরিয়ে অয়নে’র টি-শার্টের ভেতর গুঁজে দিল।
এই অভ্যাসটা তার অনেক দিনের। যখনই খুব বেশি কষ্ট হয়, বুকটা ভার হয়ে আসে, তখন সে এমন করেই অয়নে’র বুকের কাছে লুকিয়ে থাকে। মনে হয়, যদি পারত, তবে সরাসরি অয়নে’র বুকের ভেতর ঢুকে যেত। সেখানে থাকলেই হয়তো সব কষ্ট মিলিয়ে যেত। সে আরও শক্ত করে অয়নে’র টি-শার্ট খামচে ধরল। পরের মুহূর্তেই তার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠল সে। অয়ন কিছু বলল না। শুধু এক হাত দিয়ে ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। আঙুলগুলো আলতো করে চুলের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। প্রিয় মানুষটার এই নরম স্পর্শ পেতেই আহি’র কান্না যেন আরও বেড়ে গেল।
সে যেন সব জমে থাকা কষ্ট একসাথে বের করে দিতে চাইছে। অয়ন তবুও চুপ করে রইল। সে জানে, তার দোয়েল পাখিটা যখন এভাবে কাঁদে, তখন তাকে থামাতে নেই। বরং কাঁদতে দিতে হয়। যত কাঁদবে, ততই বুকের ভেতরের চাপা কষ্টগুলো হালকা হবে। কিছু সময় এভাবেই কেটে গেল। অয়ন আলতো করে আহি’কে নিজের বুক থেকে সরিয়ে নিল। তারপর দু’হাতে আহি’র মুখটা ধরে তাকাল তার দিকে।
চোখ দুটো কান্নায় ভেজা, গাল লাল হয়ে আছে। অয়ন ধীরে ধীরে তার মুখে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে তোলে। শেষে আলতো করে তার চিবুকে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
“পাখি, কষ্টটা একটু কম লাগছে?
আহি কিছু বলল না। ছলছল চোখে শুধু তাকিয়ে রইল অয়নে’র দিকে। সে আবার অয়ন’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট কাঁপছে। কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
"অয়ন ভাই, আমার আগের থেকে অনেক সৌন্দর্য কমে গেছে তাই না?
অয়ন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কিন্তু আহি থামল না। সে ঠোঁট উল্টো করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
"আমি জানি আমাকে দেখতে আগের থেকে পঁচা লাগে। তাছাড়া বেশি খেতে খেতে মোটা হয়ে যাচ্ছি, আবার আপনি কাছে আসতে চাইলেও আমি কান্না করি, আপনাকে হ্যাপি করতে পারি না। আপনি অনেক কষ্ট পান তাই না?
আমি আবার আগের মতো হয়ে যাবো। এত বেশি খাবো না, মিষ্টি আনলেও আর ধারে কাছেও যাবো না। আপনি যখন চাইবেন তখনই আপনার কাছে আসবো, একটুও কান্না করবো না। সারাদিন আপনার পাশে বসে থাকবো। একটুও দুষ্টুমি করবো না। মাহি, মুন, সাজ্জাদ ভাইয়ার রুমেও যাবো না, আপনি যা বলবেন আমি সব করবো। তবুও আমাকে রেখে অন্য কারো হয়ে যাবেন না প্লিজ। আমি হাসিমুখে পৃথিবী ছাড়তে পারবো, কিন্তু আপনার ভাগ কাউকে দিতে পারবো না। আপনি শুধু আমার...একান্তই আমার!
অয়ন বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে তাকায়। হঠাৎ আহি'র এই পরিবর্তন কেন হলো বুঝতে পারছে না সে। তবে এটা ধারনা করতে পারছে আহি তার এমন কিছু দেখেছে যার জন্য অনেক কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু কি এমন দেখেছে সেটাই বুঝতে পারছে না। যদিও সেই দিনের সামান্য একটা ম্যাসেজে আহি'র মতো মেয়ে ভেঙে পরবে না তাহলে কি এমন ঘটলো। আহি অয়ন’কে চুপ করে থাকতে দেখে তার মুখের দিকে তাকায়। দুজনের দৃষ্টি চোখাচোখি হতেই আহি উঁচু হয়ে কাঁপা কাঁপা দু-হাত দিয়ে অয়নে’র গাল আঁকড়ে ধরলো,
"অয়ন ভাই আমি সত্যি সত্যি বদলে যাবো তবুও আমাকে ছেড়ে দিয়েন না। হয়তো ওই মেয়েটার মতো এতো ছোট ছোট জামা পরতে পারবো না, তবে আপনাকে মুগ্ধ করতে পারবো আমি তবুও আমাকে নিঃস্ করবেন না। আমি আপনাকে ছাড়া এক মূহুর্তও থাকতে পারবো না। অনেক কষ্ট হবে আমার, আমি এতো কষ্ট সহ্য করতে পারবো না। আর আপনাকে হারিয়ে ফেললে তো আমি বেঁচে থাকতেই পারবো না।
মূহুর্তেই অয়ন তাকে নিজের বুকে জরিয়ে ধরলো। এবার তার বুঝতে বাকি রইলো না, আহি হয়তো তাকে আর সাদিকা’কে এক সাথে দেখে ফেলেছে। যার জন্য আহি এমন করছে। সে আহি'র অশ্রু সিক্ত চোখ দুটো বৃদ্ধা আগুল দিয়ে মুছে তার সারা মুখ মন্ডলে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে তোলে। তার গভীর স্পর্শে আহি নড়েচড়ে উঠলো। অয়ন কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে আওরাল,
“তোকে কে বলেছে আমার মিষ্টি বউ’য়ের সৌন্দর্য কমে গেছে? কে বলেছে সে মোটা হয়ে যাচ্ছে? কে বলেছে আমার বউ আমাকে হ্যাপি করতে পারে না? এমন নোংরা চিন্তা কে ঢুকিয়েছে তোর মাথায়? আর তুই বেশি বেশি কেন খাবি না? আমি এতো টাকা পয়সা রোজকার কার জন্য করি হ্যাঁ? কে খরচ করবে আমার এতো টাকা হুম?
আমার বউ আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী। আর তাকে আমি ছেড়ে দেবো, এমন ভাবনা কিভাবে মাথায় আনতে পারলি পাখি? তোর অয়ন ভাই কি খুব খারাপ? সে কি তোকে বিন্দু মাএ ও ভালোবাসে না?
আহি কিছু বললো না। শুধু নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইলো। অয়ন আবারও বলতে শুরু করলো,
“আমি বুঝতে পারছি তুই সাদিকা’কে নিয়ে আপসেট, তবে ওর সাথে আমার তেমন কোনো রিলেশন নেই। ওর কাছ থেকে কিছু ইনফরমেশন নেওয়ার জন্য একটু মিট করেছি। কেন? কি এমন কারন? তার সাথেই কেন? প্লিজ পাখি এসব বলিস না, টাইম হলে আমি নিজেই তোকে সব বলবো। তবে এখন পসিবল নয়, আমার লাইফে তুই ব্যাতিত কেউ কোনোদিন আসতে পারবে না। এইটুকু ট্রাস্ট করতে পারিস আমাকে।
"তাহলে একটু ভালোবাসেন আমায়।
অয়ন ভ্রু জোগল কুঁচকে তাকায়,
“এখন?
"সবাই তো এই সময়ই বউ'কে ভালোবাসে।
“আজকে থাক, তুই আগে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে নে তারপর সব হবে।
"আমি সুস্থই আছি।
“ওহু, এখনো ৯০° জ্বর আছে৷ তাছাড়া তোর শরীর এখন অনেকটা দুর্বল। আবার শুনলাম কোচিং থেকে ফিরে আসার পর কিছুই খাসনি।
"আমি পারবো।
“বললাম না এখন নয় তবুও জেদ করছিস কেন? তোর নিজেকে নিয়ে ভয় নাই হতে পারে তবে আমার অনেক ভয় হয়।
"এইটুকুতে কেউ তো মরে যায় না তবুও এমন করছেন কেন?
অয়ন রক্তিম দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। তবে আহি'র মধ্যে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য হলো না। আচমকা আহি অয়নে'র চুল টেনে ধরলো।
"এই অয়ন ভাই চুপ করে আছেন কেন? আমাকে একটু, শুধু একটু বিরক্ত করুন না প্লিজ। সত্যি বলছি, আমি সহ্য করতে পারবো। একটুও কান্না করবো না।
অয়ন মুচকি হাসলো। আহি'র কোমড় জরিয়ে নিজের দিকে টেনে নিল এবং ফিসফিস করলো,
“তুই কান্না না করলে আমি ফিল পাবো কিভাবে জান? আর আমি তোকে টাচ করবো অথচ তুই কান্না করবি না এটা কখনো হয়েছে? না তো, তাহলে ভাবলি কিভাবে আজ তুই একটুও কান্না করবি না হু?
মূহুর্তেই আহি অয়ন'কে ছেড়ে বিছানা থেকে নেমে যায়। তারপর দ্রুত পায়ে গিয়ে রুমের লাইট অফ করে দিয়ে অয়নে’র গলা জরিয়ে ধরে তার বুকের সাথে মিশে গেল। আবছা আলোয় হালকা হালকা আহি'র মুখ দেখা যাচ্ছে। অয়ন ছোট্ট করে বলল,
“লাইট অফ করলি কেন?
"এমনি।
“এমনি এমনি কেউ লাইট অফ করে?
"অয়ন ভাই আমি কিন্তু এবার রেগে যাচ্ছি। আপনি কেমন কেমন যেন করেন।
“কেমন কেমন করি ম্যডাম?
আহি গাল ফুলিয়ে আওরায়,
"আমি কিন্তু চলে যাবো?
“এতো রাতে কোথায় যাবি?
"কোথায় আবার, মাহি'র কাছে যাবো৷
“সে এখন রুমের লাইট অফ করে তার বর'কে সেবা করছে। সো তার কাছে গিয়ে কোনো লাভ হবে না।
"মানে?
"এতো মানে মানে করিস কেন? এতো ভালোবাসি তবুও বুদ্ধি সুদ্ধি হলো না। এবার একটু মুখটা অফ করে আমার ভালোবাসা গুলো ফিল কর।
"কিন্তু...
“আপাতত মুডে আছি সো তোর কিন্তু কিন্তু আগামীকাল শুনবো। আর মুখটা অফ রেখে আমাকে ডিস্টার্ব করা বন্ধ কর।