“শু**য়োরের বাচ্চা! তোর সাহস হয় কিভাবে আমাকে কু*ত্তার বাচ্চা বলিস? তুই কু*ত্তার বাচ্চা, আমি নই। তোকে কু*ত্তার বাচ্চা বললেও কু*ত্তার নামের অসম্মান হবে। নইলে, তোর মতো শাউ*য়্যা ফুলের মতো বাচ্চা মেয়েদের কেন কষ্ট দেবে?
রাহাতের মুখে কোনো ভ্রুক্ষেপ দেখা গেল না। বরং তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, বিকৃত হাসি ফুটে উঠল। সে হালকা হেসে, প্রায় তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল,
"হেই ইয়ার, তুই আসলেই পুরুষ তো? আরে ভাই, বুঝিস না কেন? ছোট বাচ্চা মানেই সুখ আর...
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অয়নে’র জোরালো লাথি গিয়ে পড়ল রাহাতে’র বুকে।
সে ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কুঁকড়ে গেলেও। অদ্ভুতভাবে তার ঠোঁটের কোণে সেই হাসিটা এখনো লেগে আছে। এই হাসিটাই যেন অয়নে’র ভেতরের আগুনে আরও তেল ঢেলে দিল। অয়নে’র চোখ লাল হয়ে উঠল। সে কিছু না বলে শুধু চোখের ইশারায় পাশে থাকা একজনকে নির্দেশ দিল। লোকটা দ্রুত এগিয়ে এসে রাহাতে’র হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিল। এরপর আরেকজন অয়নে’র হাতে একটা শক্ত লাঠি তুলে দিল।
অয়ন লাঠিটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। মুহূর্তের মধ্যেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাহাতে’র উপর। একটার পর একটা আঘাত পড়তে লাগল। নিয়ন্ত্রিত নয়, হিসেবি নয় বরং জমে থাকা ক্ষোভ একসাথে বেরিয়ে আসছে। রাহাত প্রথমে শক্ত থাকার চেষ্টা করলেও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে লাগল। সে দু’হাত তুলে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। প্রতিটা আঘাতে তার শরীর কেঁপে উঠছে।
ঘরের ভেতর তার চিৎকার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
ঠিক তখনই অয়ন হুংকার তুলে উঠল,
“জা**রকের বাচ্চা! তোর কাছে ছোট বাচ্চারা সুখ লাগে? ওরা ফুলের মতো নিষ্পাপ আর তুই তাদের কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাস? তোর জন্য আমি আমার মেয়েগুলোকে হারিয়েছি ওরা নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। আর তুই বলিস সুখ?
এই কথাগুলো যেন পুরো ঘরটাকে নিস্তব্ধ করে দিল। এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল। কিন্তু অয়ন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।নতার ভেতরের রাত তখন পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে। সে আবারও ঝাঁপিয়ে পড়ল রাহাতে’র দিকে—এবার তার আঘাতে ছিল প্রতিশোধ, হারানোর বেদনা আর এক অসহ্য ক্ষত। রাহাতে’র চিৎকার আরও তীব্র হয়ে উঠল। এই দৃশ্য দেখে মিনিস্টার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
তার চোখে ভয়, মুখে অসহায়তা। তিনি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলেন,
- অয়ন প্লিজ আমার ছেলেটাকে ছেড়ে দাও। ও ভুল করেছে, অনেক বড় ভুল করেছে কিন্তু ওকে আর মেরো না প্লিজ। ও মরে যাবে...
অয়নে’র ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে মিনিস্টারের সামনে গিয়ে বসে পড়ল। চোখ দুটো সরু করে, ভ্রু কুঁচকে রাখা। সে সোজাসাপটা প্রশ্ন করে,
“শিশুদের দিয়ে নিজের চাহিদা মিটিয়ে, তারপর তাদের অন্য দেশে পাচার করাকে আপনি ভুল বলছেন?
তার কণ্ঠে এমন এক ঠান্ডা বিদ্রূপ ছিল, যা শোনার মতো শক্তি খুব কম মানুষেরই থাকে।
মিনিস্টার কিছু বলার আগেই একটি গুলির শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল। মিনিস্টার ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল যন্ত্রণায়। অয়ন পাগলের মতো হেসে উঠল,
“কু*ত্তার বাচ্চা। তুই বলছিস তোর ছেলে ভুল করেছে? তুই আর তোর ছেলে ভুল নয়, জঘন্য পাপ করেছিস পাপ। তোদের মতো পশুদের জন্য কোনো বাচ্চাই নিরাপদ নয়। শুধু মাএ তোদের জন্য আমি আমার তিন তিনটা মেয়েকে হারিয়েছি।
অয়নে’র কন্ঠ ভেঙে আসছে। সে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“যাদের এতদিন এই হাত দিয়ে বুকে আগলে বড় করেছি, আবার এই হাত দিয়েই তাদের লাশ কাঁধে তুলেছি। আমার যে মেয়েটা এতদিন শক্ত ছিল, সে নিজের কাছেই নিজে হেরে গেল। দু’দিন আগে নিজেই সব শেষ করে দিল, আমি তাকে বাঁচাতে পারিনি। আমি বাবা হয়েও ওদের রক্ষা করতে পারিনি।
অয়ন চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস টেনে নিলো। তারপর রক্তিম দৃষ্টিতে তাকিয়ে কর্কশ কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,
“কতদিন ধরে তোদের খুঁজে বেড়াচ্ছি জানিস? কিন্তু তোরা কাপুরুষের মতো পালিয়ে ছিলি। আজ এতদিন পর তোদের খুঁজে বের করেছি। এখন তোদের পাপের শাস্তি দেবো আমি। আর তোদের পাপের শাস্তি একটাই, সেটা মৃত্যু! এমন ভাবে শাস্তি দেবো যাতে ভবিষ্যতে কোনো নিকৃষ্ট মানুষ এই কাজ করার আগে হাজারবার ভাবে।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল। রাহাত ও তার বাবা ভয়ে গুটিয়ে গেল। অয়ন আবার ঝুঁকে মিনিস্টারের চোখের দিকে তাকাল,
“তোদেরকে খুঁজে বের করতে তোর মেয়েকে একটা ‘ধন্যবাদ’ তো দিতেই হবে। মেয়েটা যে আমার অনেক হেল্প করেছে। হোক ইচ্ছেকৃত কিংবা অনিচ্ছেকৃতভাবে।
মিনিস্টার আর রাহাত একসাথে চমকে উঠল। রাহাত কাঁপা গলায় বলল,
"আ আ আ আমার বোন মানে? তুই কি বলতে চাচ্ছিস?
অয়ন হালকা হেসে মাথা নাড়ল,
“তোদের অনেক খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। লোকজন ঠিকই বলতো, সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে, আঙুল বাঁকা করতে হয়। আমিও সেটাই করেছি। তোর বোন আমাকে ভালোবাসত কিন্তু সে জানত না এই অয়নের জীবনে আগে থেকেই একজন আছে। যাকে সে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে। তোদের লুকিয়ে থাকা গর্ত থেকে বের করার জন্য আমি তোর বোনকে ব্যবহার করেছি। নিজের প্রেমের জালে আটকে, তোদের টেনে বের করেছি।
মিনিস্টার আর রাহাত দু’জনেই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অয়নে’র দিকে। তাদের চোখে এখন শুধু ভয় নয়, অবিশ্বাসও মিশে আছে। অয়ন ধীরে ধীরে পেছন ফিরে দাঁড়াল। তার কণ্ঠ ঠান্ডা,
“এদের জন্য স্পেশাল পানিশমেন্টের ব্যবস্থা হয়েছে?
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। অয়ন একবার ঘড়ির দিকে তাকাল। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। অয়ন ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়াল। তাদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে এক বিকৃত হাসি ঝুলিয়ে বলে উঠলো,
“উপরে গিয়ে সুখ খুঁজিস জা*রকের বাচ্চারা।
এই বলেই একের পর এক তাদের দুজনের পেটে ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত হানে। গড়গড় করে তাদের বুক ছিঁড়ে রক্ত ঝরছে। তাদের চিৎকার পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তবে অয়নে’র ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি। তাদের শরীর ক্ষত বিক্ষত করে ফুটন্ত পানিতে তাদের নিক্ষেপ করা হলো। ছটফট করতে করতে তারা এক সময় নিস্তেজ হয়ে পড়লো।
হঠাৎ কারো চিৎকারের শব্দে দরজার দিকে তাকাল অয়ন। মূহুর্তেই তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। দরজার কাছে আহি দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখ বিস্ফারিত, মুখ ফ্যাকাসে, আর পরের মুহূর্তেই সে জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
“পাখি!
অয়নে’র বুক কেঁপে উঠল। তার মুখের সেই কঠিন ভাব মুহূর্তেই ভেঙে গেল। সে দৌড়ে গিয়ে আহি’র কাছে বসে পড়ল। তাকে কোলে তুলে নিল। তার মাথাটা নিজের বুকে আগলে ধরে কাঁপা গলায় ডাকতে লাগল,
“পাখি এই পাখি কী হয়েছে তোর? চোখ খুল প্লিজ, তুই এখানে কিভাবে আসলি আর কেন? এই বউ কথা বল না।
কোনো সাড়া নেই। আহি সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। অয়ন তার গাল চাপড়ে, নাম ধরে ডেকে যেতে লাগল কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তার হাত-পা অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে আছে। অয়নে’র বুকের ভেতর হঠাৎ এক অজানা ভয় চেপে বসল। সে যেটা নিয়ে ভয় পেয়েছে আজ সেটাই হলো। আর এক মুহূর্তও দেরি করল না সে।
আহি’কে কোলে তুলে নিল। এবং দ্রুত পায়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। পা চলছেই না তবুও এগিয়ে যাচ্ছে।
•
•
অচেতন অবস্থায় বিছানায় শুয়ে আছে আহি। তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে বাসার প্রায় সবাই। অয়ন বিছানার এক পাশে আহি’র মাথার কাছে বসে আছে। তার চোখে অস্থিরতা, বুকের ভেতর যেন এক অজানা ভয় গেঁথে বসেছে। সে বারবার আহির দিকে তাকাচ্ছে মনে মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছে। জ্ঞান ফেরার পর কী হবে?
সে খুব ভালো করেই জানে কিছুই আগের মতো থাকবে না। যে মেয়েটা সামান্য রক্ত দেখলেই ভয় পেয়ে যায়, আজ সে নিজের চোখে দেখেছে অয়ন নিজ হাতে মানুষ খুন করেছে। এই সত্য মেনে নেওয়া আহি’র পক্ষে অসম্ভব? এটা ভাবাও কঠিন।
আহি ধীরে ধীরে নড়েচড়ে উঠল। তার চোখ কাঁপলো, তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলল। একটু ঝাপসা দৃষ্টি আর ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল অয়ন। মুহূর্তের মধ্যেই চিৎকার করে উঠল সে। সবাই চমকে উঠল। আহি এক লাফে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। ভয়ে, আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে দৌড়ে গিয়ে নিজের মায়ের কাছে আশ্রয় নিল।
তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল,
"আম্মা এই লোকটা এখানে কেন? এই লোকটা একটুও ভালো না আম্মা, এ অনেক খারাপ অনেক খারাপ।
রুমের সবাই হঠাৎ তার ব্যবহারে স্তব্ধ। অয়ন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তার চোখে বিশ্বাসই হচ্ছে না এই সেই আহি, যে তাকে “অয়ন ভাই, অয়ন ভাই” বলে পাগল করে দিত। আজ সে তাকে “এই লোক” বলে ডাকছে! এই পরিবর্তনটা সে সহ্যই করতে পারছে না।
অয়ন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দু’পা এগিয়ে গেল আহি’র দিকে কিন্ত আহি আরও জোরে চিৎকার করে উঠল। তার শরীর কাঁপছে,
"আম্মা এই লোককে আমার কাছে আসতে মানা করো। এই লোকটা একজন পশু! ডাক্তার হয়ে মানুষ বাঁচানোর বদলে মানুষ মেরে ফেলেছে।
রুমের ভেতর সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। অয়ন কাঁপা গলায় বলল
“দোয়েল কী বলছিস এসব? আমি তোর অয়ন ভাই, আমি কাউকে মারিনি।
কিন্তু আহি এবার মাথা নাড়তে নাড়তে কেঁদে উঠল,
"আপনি মিথ্যা বলছেন। আমি দেখেছি, নিজের চোখে দেখেছি আপনি ওদের মেরে ফেলেছেন। আপনি আমার অয়ন ভাই হতে পারেন না। আমার অয়ন ভাই কখনো কাউকে মারতে পারে না।
এই কথাগুলো যেন ছুরি হয়ে বিঁধল অয়নে’র বুকে। সে স্থির হয়ে গেল। ঠিক তখনই আদিল এগিয়ে এল। মূহুর্তেই আহি মায়ের কাছ থেকে সরে এসে আদিল’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল,
"ভা ভা ভাইয়া জানো এই লোকটা সত্যি সত্যি দু’জনকে মেরে ফেলেছে। ওদের পেটে ছুরি চালিয়েছে আমি দেখেছি। জানো এই লোকটা কাকে খুন করেছে? যাকে খুন করেছে সে হলো....
আদিল দ্রুত তাকে থামিয়ে দিল। সে কিছু বুঝতে পারছে না, কি এমন ঘটেছে। যার জন্য আহি এমন রুড বিহেভ করছে। আদিল ধীরে ধীরে আহি’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
- বোন একটু শান্ত হ।
আহি এখনো কাঁপছে। শ্বাস ঠিকমতো নিতে পারছে না। আদিল আবার বলল,
- বোন তুই এই লোক, এই লোক কেন বলছিস? অয়ন কাউকে খুন করেনি তোর কোথাও ভুল হচ্ছে। এই সকাল সকাল পাগলামো করছিস কেন? হয়তো বাজে কোনো স্বপ্ন দেখেছিস তাই এমন আচরণ করছিস।
আহি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। তার চোখে অশ্রুতে টলমল করছে।
"না ভাইয়া, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো। আমি একটুও মিথ্যা বলছি না, এই লোকটা কিভাবে আমার অয়ন ভাই হয়? জানো ভাইয়া, আমার অয়ন ভাই শুধু আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু এই লোকটা আরেকটা বিয়ে করেছে। আর সেই ঘরে তার মেয়েও আছে।
অয়ন হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। তার চোখে এক ঝলক আতঙ্ক খেলে গেল। আহি থামল না,
"আমি কাল রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছি। এই লোকটা বলেছিল তার মেয়ে আছে। তাহলে তুমি বলো....