নেশাময় আসক্তি

পর্ব - ৪৪

🟢

দেখতে দেখতে বেশ কিছু দিন কেটে গেছে। সময় যেন নিজের মতো করে এগিয়ে গেছে, কিন্তু আহি’র ভেতরের অস্থিরতা একটুও কমেনি বরং দিন দিন আরও ঘনীভূত হয়েছে। আজও সে বেলকনিতে বসে আছে। সামনে বিশাল আকাশ, অথচ সেই আকাশটাও আজ অদ্ভুত রকমের ভারী। কালো মেঘ জমে আছে চারদিকে—ঠিক যেন বৃষ্টি নামার আগ মুহূর্তের নিস্তব্ধ। হালকা বাতাস বইছে, কিন্তু সেই বাতাসেও আজ কোনো প্রশান্তি নেই। হঠাৎ করেই ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামতে শুরু করল।

কিন্তু আহির দৃষ্টি একটুও নড়ল না। সে ঠিক আগের মতোই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ তার মনটাও ঠিক এই আকাশটার মতো, কালো মেঘে ঢাকা, ভারী, অস্বস্তিকর। কারণটা একজনই—অয়ন। মানুষটা তাকে ভালোবাসে, সে জানে। তবুও কোথায় যেন একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে। অয়ন তাকে সময় দেয় না। আহি’র এতে কোনো অভিযোগ নেই, সে কখনোই বেশি কিছু চায়নি। শুধু একটু সময়, একটু পাশে বসে থাকা, দুটো কথা বলা।

কিন্তু এই ২৪ ঘন্টার মধ্যে কি তাকে এক ঘণ্টাও দেওয়া যায় না? এই প্রশ্নটাই বারবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। তবে সময় না দেওয়ার থেকেও বেশি কষ্ট দেয় অন্য একটা বিষয়, অয়ন রাতে হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। রাত দুইটা, তিনটা, কখনো চারটা বাজে অথচ সে নেই। কোথায় যায়, কী করে, কেউ জানে না। প্রথম প্রথম আহি জিজ্ঞেস করেছিল। ভয় আর কৌতূহল মিশিয়ে বারবার জানতে চেয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর,

“সময় আসুক সব জানতে পারবি!

এই কয়েকটা কথায় কি মন ভরে? না। বরং তার মনে হাজার হাজার প্রশ্ন জমে গেছে। কেন লুকাচ্ছে? কোথায় যায়? কার সাথে থাকে? কি এমন কাজ, যা এখন বলা যাচ্ছে না? ইদানীং অয়নে’র আচরণও বদলে গেছে। আগের মতো সহজ, হাসিখুশি, খোলামেলা নেই। সবকিছু আহি’র বুকের ভেতর একটা অজানা ভয় বাসা বেঁধেছে।

সে নিজেকে শক্ত বলে ভাবে, কিন্তু একটা জিনিস সে সহ্য করতে পারে না, রক্ত। রক্ত দেখলেই তার শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়, বুক ধড়ফড় করে ওঠে। আর সেই রক্ত, যদি পরিচিত কারো সাথে জড়িয়ে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। দু’দিন আগে—সেই ঘটনাটা মনে পড়তেই আহি’র আঙুলগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে শক্ত হয়ে গেল। সে অয়নে’র ক্যাবিনেট খুলেছিল। কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই, হয়তো কৌতূহলবশত, কিংবা নিজের অজান্তেই কিছু খুঁজছিল। আর তখনই, সে দেখেছিল একটা শার্ট রক্তে ভেজা। পুরোপুরি না, কিন্তু এতটাই যে বোঝা যায় এটা কোনো ছোটখাটো দাগ না।

সেই মুহূর্তে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হাত কেঁপে উঠেছিল। সে দ্রুত শার্টটা আবার রেখে দিয়েছিল, যেন কিছুই দেখেনি। কিন্তু দেখার পর কি আর না দেখার ভান করা যায়? তারপর থেকে সেই দৃশ্যটা বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সে অয়ন’কে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। কিন্তু না জিজ্ঞেস করলেও প্রশ্নগুলো তো মনের ভেতর থেকেই যায়। অয়ন কি কোনো খারাপ কিছুর সাথে জড়িত? কোনো বিপদে আছে? নাকি, সে নিজেই কোনো বিপদের কারণ? এইসব চিন্তা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

বৃষ্টির ফোঁটা এসে তার মুখে লাগছে, কিন্তু সে যেন কিছুই টের পাচ্ছে না। ঠিক তখনই হঠাৎ তার কাঁধে কেউ আলতো করে হাত রাখল। মুহূর্তেই আহি’র শরীর কেঁপে উঠল। হৃদপিণ্ড যেন একলাফে বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। ভয় মিশ্রিত দৃষ্টিতে সে তাড়াতাড়ি পেছনে ফিরে তাকাল। তার চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই ভয়টা একটু নরম হয়ে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মাহি।

চেনা মুখ, পরিচিত মানুষ, আহি হালকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার ঠোঁট কাঁপল একটু। ছোট্ট, ভাঙা স্বরে বলল,

"ওহ্ তুই?

মাহি ধপ করে এসে আহি’র পাশে বসে পড়লো। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আহি’র মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। যেন তার পাশের মানুষটার উপস্থিতিই যেন সে টের পাচ্ছে না। সে আগের মতোই স্থির দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে,চোখে জমে থাকা অগণিত প্রশ্ন, অজানা কষ্ট আর চাপা ভয় নিয়ে। নীরবতা ভেঙে মাহি হালকা ভঙ্গিতে বলল,

- ননদীনি, কী হয়েছে আপনার?

কোনো উত্তর নেই। আহি যেন নিজের জগতে হারিয়ে আছে। মাহি এবার একটু ভ্রু কুঁচকালো। পাশে বসে একটু ঝুঁকে নরম স্বরে আবার বলল,

- এই ননদীনি, কিছু বলছিস না কেন? ভাইয়ার উপর রেগে আছিস নাকি?

আহি খুব ধীরে, ছোট্ট করে বলল,

"রাগ করার কোনো কারণ আছে কি?

- তাহলে মুখ ভার করে রেখেছিস কেন? প্লিজ একটা হাসি দে না, তুই চুপ করে থাকলে একদম ভালো লাগে না।

আহি এবার ধীরে মুখ ঘুরিয়ে মাহি’র দিকে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা।

"আমার হাসি কি খুব ইম্পর্ট্যান্ট?

এই প্রশ্নটা শুনে মাহি একটু চুপ করে গেল। সে এবার পুরোপুরি ঘুরে আহি’র মুখোমুখি বসলো। আর তখনই দেখতে পেল আহি’র চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রু। পরক্ষনেই সেই অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গাল বেঁয়ে। মাহি একদম ঘাবড়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি দু’হাত দিয়ে আহি’র গাল ছুঁয়ে উদগ্রীব কণ্ঠে বলল,

- বনু! কাঁদছিস কেন? ভাইয়া কিছু বলেছে? কী হয়েছে বল না পাখি?

আহি হঠাৎ নিজেকে সামলে নিল। সে এমন না, সে নিজের দুর্বলতা কাউকে দেখাতে চায় না। যত কাছের মানুষই হোক না কেন। তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে চোখ মুছে ফেলল। তারপর জোর করে ঠোঁটে একটুখানি হাসি এনে বলল,

"কিছু বলেনি অয়ন ভাই। এমনি ভালো লাগছে না। আচ্ছা তুই এখানে কেন? ভাইয়া তো তোকে খুঁজবে, তুই রুমে যা।

মাহি বুঝতে পারছে কিছু একটা লুকাচ্ছে আহি। কিন্তু এই মুহূর্তে সে আর চাপ দিল না। হঠাৎ পেছন থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো,

“কুইন! আমার শার্টটা কোথায় রেখেছিস?

দুজনেই একসাথে চমকে পেছনে তাকালো। আদিল ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। মুখে তার সেই চিরচেনা দুষ্টু ভাব। এসেই আবার মাহি’র দিকে তাকিয়ে বলল,

“এই কুইন, বল না আমার শার্ট কোথায় রেখেছিস?

মুহূর্তেই মাহির মাথায় রাগ চওড়া হলো। প্রথমত এখন সন্ধ্যা, দ্বিতীয়ত তার গায়ে একটা টি-শার্ট জরানো আছে। তৃতীয়ত সে কোনো দিন এমনকি এই জন্মে রাতে শার্ট পড়েনি অথচ আজ এসে শার্ট খুঁজছে! মাহি বিরক্ত গলায় বলল,

- আমার মাথায় রেখেছি। এবার খুঁজে নিয়ে যান।

আদিল একটুও না থেমে আগের মতোই শান্ত ভঙ্গিতে বলল,

“কোথায়? তোর মাথায় তো লম্বা লম্বা কেশ ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।

- তাহলে আমার মাথা না খেয়ে নিজে খুঁজে দেখুন।

আদিল হালকা হেসে বলল,

“আশ্চর্য! আমি কোন দুঃখে তোর মাথা খেতে যাবো? তোর মাথায় তো কোনো ঘিলু নেই তাই খুব একটা টেস্টও লাগবে না। তবে তোকে খেতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই!

তার কথা শুনে মাহি ফুঁসছে। মূহুর্তেই রেগে বোম হয়ে উঠলো। সে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল,

- আদিল ভাইইইইই

বিজ্ঞাপন

আদিল বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে শান্ত গলায় বলল,

“চিৎকার করা শেষ? তাহলে এবার রুমে চল।

মাহি চোখ রাঙিয়ে তাকালো,

- যাবো না এখন।

“চল না কুইন?

এই কথায় মাহি ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। কোমড়ে হাত গুঁজে বিরক্ত গলায় বলল,

- বললাম না যাবো না। তবুও রাক্ষসের মতো জোর করছেন কেন?

পাশে বসে থাকা আহি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে সবকিছু দেখছে। আদিল হালকা ঝুঁকে আহি’র দিকে ফিসফিসিয়ে বলল,

“বনু, একটু চোখটা বন্ধ কর তো!

আহি মাথা নাড়লো। দু’হাত দিয়ে চোখ ঢাকলো ঠিকই, কিন্তু আঙুলের ফাঁক দিয়ে কৌতূহলী চোখে সবকিছুই দেখছে। আচমকা আদিল মাহি’কে কোলে তুলে নিল। মাহি যেন জমে গেল। তারপরই চিৎকার করে উঠলো,

- শয়তানের নানা! আমাকে ছাড়ুন। নির্লজ্জের মতো কোলে তুলে নিলেন কেন? আমি যাবো না আপনার সাথে। নামান, নামান।

কিন্তু আদিল কোনো কথাই কানে তুললো না। নিজের মতো করে হেঁটে চলে যেতে লাগলো।পেছনে বসে থাকা আহি এটা দেখে ফিক করে হেসে ফেললো। মাহি’কে রুমে এনে নামিয়ে দিতেই সে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। ঝাঁপিয়ে পড়ে আদিলে’র বুকে একের পর এক কিল-ঘুষি মারতে লাগলো।

- খারাপ লোক! আমাকে কেন নিয়ে এলেন? আপনার জন্য কোথাও দু’দণ্ড বসতেও পারি না। আহি মুড অফ করে বসেছিল, আমি ওর পাশে ছিলাম তাও আপনার সহ্য হলো না?

আদিল এবার তার হাত দুটো ধরে ফেললো।

“না, সহ্য হলো না। আহি’র জন্য অয়ন আছে। ওকে নিয়ে তোকে এত ভাবতে হবে না।

মাহি হতবাক হয়ে তাকালো,

- লাইক সিরিয়াসলি? আপনি আদৌ ওর আপন ভাই তো? আহি কষ্ট পাচ্ছে আর সেই কষ্টের কারণও ভাইয়া। তবুও আপনি বলছেন ওর জন্য ভাইয়া আছে? যেখানে আপনার ভাইয়াকে বকা উচিত, সেখানে আপনি তাকে সাপোর্ট করছেন?

আদিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে বলল,

“তো কী করবো?

এই এক কথাতেই যেন মাহি’র ভেতরের সব জমে থাকা অভিমান বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে এলো,

- আপনারা পুরুষ মানুষই খারাপ। বিয়ের প্রথম প্রথম ভালোবাসা উথলে পড়ে, তারপর কয়েক মাস যেতেই সব ফিকে হয়ে যায়। না চাইতেও পেয়ে যান তো, তাই আর মূল্য দেন না। যেদিন হারিয়ে যাবো সেদিন ঠিকই বুঝবেন!

আদিল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হালকা বিস্মিত গলায় বলল,

“আমি আবার কী করলাম?

মাহি ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকালো তার দিকে। চোখে এখনো রাগের আগুন জ্বলছে,

- আপনি কিছু করেননি কিন্তু দু’দিন পর ভাইয়ার মতো আপনিও দূরে সরে যাবেন। তবে আমাকে আহি ভাবতে আসবেন না। আর শুনে রাখেন, ভুলেও যদি কোনোদিন অন্য কোনো নারীকে আমার জায়গায় বসানোর কথা ভাবেন।

সে আঙুল তুলে হুঁশিয়ারি দিল,

- ডিরেক্ট আপনার সম্পত্তি কেটে দেবো। ওটাই তো আপনার আসল অস্ত্র, তাই না? না থাকবে বাঁশ আর না বাজবে বাঁশি।

আদিল শুকনো ঢোক গিলল। মেয়েটাকে সে যতটা শান্ত, ভদ্র ভেবেছিল বাস্তবে সে তার সম্পূর্ণ উল্টো। সে একটু ভয় মিশ্রিত হাসি দিয়ে বলল,

“এই কুইন ভয় দেখাস কেন? আমি কি অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাই নাকি?

- আগেই ওয়ার্নিং দিয়ে রাখলাম। পরে মাফ চাইলে কোনো কাজ হবে না। মাহি যা বলে, তাই করে।

আদিল মাথা নাড়লো। মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল,

“বুঝে গেছি, কাল নাগিনীকে আমি নিজেই কাঁধে তুলে এনেছি। এখন তো ফোঁস করবেই!

মাহি চোখ রাঙিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

- আমি কাল নাগিনী, তাই তো? ওকে ফাইন, আগামী এক সপ্তাহ এই কালনাগিনীর ধারে কাছেও আসবেন না। নয়তো…

কথাটা শেষ না করেই থেমে গেল সে। আদিল সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলো।

“এ্যাহ! বললেই হলো নাকি? কালনাগিনী হোস, বা যা হোস আমি তোকে ছাড়া এভাবে দূরে দূরে থাকতে পারবো না। বিয়ে করেছি বউয়ের থেকে দূরে থাকার জন্য নাকি? যাই হয়ে যাক, আমার তোকে চই মানে চাই-ই!

বিজ্ঞাপন
নেশাময় আসক্তি গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় স্পেশাল রোমান্টিক গল্প